Friday, June 5, 2026







এক শহর প্রেম পর্ব-১৩+১৪

#এক_শহর_প্রেম💓
লেখনীতেঃ #নুরুন্নাহার_তিথী
#পর্ব_১৩
সন্ধ্যার পর বাড়িতে প্রবেশ করার পর মাহির কর্ণকুহরে ভেসে এলো রূঢ়ভাষী কারও কন্ঠস্বর।

–তোমাকে বলা হয়েছিল সন্ধ্যার আগে ফিরবে। এখন সাতটার বেশি বাজে। কোথায় ছিলে?

মাহি বিরক্ত হলো। জবাব দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করলো না। নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালে আবারও সেই রূঢ় কন্ঠস্বর।

–তুমি কী আমাকে ইগনোর করছো? কথার জবাব না দিয়ে বে*য়াদবের মতো চলে যাচ্ছ কেনো?

মাহি থামলো। তাচ্ছিল্যতা ফুটে উঠে চোখে-মুখে। ব্যাগটা সোফাতে ফেলে নিজেও সেখানে গা এলিয়ে বসে। তারপর ফোন স্ক্রোল করতে করতে বলল,

–নেও গেলাম না! কী কী বলবে বলো। বসে আছি।

মহিলাটি ক্রুদ্ধ হলেন। ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন,
–দিন দিন বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছ। তোমার ওই বে*য়াদব ভাইয়ের সান্নিধ্যে আরও বিগড়ে যাচ্ছ। মায়ের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় সেটাও ভুলে যাচ্ছ।

মাহি ভাবলেশহীন ভাবে বলে,
–উঁহু। আমি কারও থেকে কোনো স্বভাব এডপ্ট করছি না বা করি নি। আমি এমনই। পরিবেশ আমায় বদলে দিয়েছে যেমনটা তুমি নিজেকে ক্লেইম করো। আর তোমার কোনো কাজে যেমন কারও কাছে কৈফিয়ত দেও না তেমনি আমিও বাধ্য না। থাকো না তুমি তোমার ফ্রেন্ডস নিয়ে। আমিও বেশ আছি।

মিসেস মনিকা অপ্রস্তুত ও বিরক্ত হলেন। বিরক্তি নিয়ে বললেন,
–তোমার সন্ধ্যায় আমার সাথে আমার ফ্রেন্ডের মেয়ের বার্থডে পার্টিতে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু তুমি এলেই এখন। বিকেলে এসে তোমাকে ফেসিয়াল, প্যানিকিউর, ম্যানিকিউর করতে হতো। যাও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে রেডি হও।

মাহি ঠোঁট কামড়ে হাসলো। তারপর হাই তুলে বলল,
–আই এম টায়ার্ড এনাফ মম। আমি যাবো না।

মিসেস মনিকা সন্দেহের স্বরে বললেন,
–কী করেছ তুমি এতোক্ষণ?

মাহি মিসেস মনিকাকে রাগাতে বলল,
–ফ্রেন্ডের মেসে গিয়েছিলাম তারপর ইয়াম্মি অনেক ডিশ দিয়ে দুপুরের খাবার খেলাম। বাঙালি খাবার। অসম্ভব মজা।

মিসেস মনিকা নাক ছিঁটকালেন। কিছু বলতে উদ্দ্যত হলে মাহি ব্যাগ নিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে যায়। মিসেস মনিকা মিস্টার আরসাদের স্টাডি রুমে গিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে ক্রুদ্ধ কন্ঠে বললেন,

–তোমার ছেলের কারণে আমার মেয়েটা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে। ছেলেকে তো সব স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছ।

মিস্টার আরসাদ খুব মনোযোগ দিয়ে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের একটা নোবেল পড়ছেন। নোবেলের ভিতর উনি পুরো আসক্ত হয়ে গেছেন। মিসেস মনিকা স্বামীর মনোযোগ নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে পারলেন না বিধায় সে আরও রেগে গেলেন। রেগে গিয়ে মিস্টার আরসাদের হাত থেকে বইটা নিয়ে টেবিলে ধপাস করে ফেলে বললেন,

–তোমরা আমার কথায় গুরুত্ব দিচ্ছো না কেনো? আমি তোমাকে কিছু বলছি আরসাদ।

মিস্টার আরসাদ তাচ্ছিল্য হেসে বললেন,
–আমাদের বেডরুম আলাদা। এখন কী বাড়িটাও আলাদা করতে চাচ্ছো? না করতে চাইলে আমাকে বিরক্ত করা বন্ধ করো। আর আমার ছেলে শুধুমাত্র তোমার জন্যই আজ বাড়ি ছাড়া। আমার জীবনে গ্রহণ হয়ে এসেছ তুমি। এখন আমার এই খানিক শান্তিটাও নষ্ট করতে উঠে পরে লেগেছ। কী চাও বলতে পারো? সবকিছুতে তোমার অভিযোগ! তাহলে বুঝে নেও, আমাদের অভিযোগটাই তুমি।

মিসেস মনিকা অপমানবোধ করে ধপাধপ পা ফেলে চলে গেলো। মিস্টার আরসাদ আবারও নোবেল পড়ায় মনোযোগ দিলেন। মনিকার রাগ ক্ষোভে তার কিছু যায় আসে না। নিজের বড়ো মেয়েকে তো একেবারের জন্য হারিয়েছেই এখন ছেলেও বাড়িছাড়া।

__________

পরেরদিন সন্ধ্যায় মারসাদ এসেছে আদিরাকে নিয়ে স্টুডেন্টের বাসায় যাবে বলে। আদিরা রাস্তায় এসে দেখে মারসাদ আজ একটা রিকশাও ঠিক করে নি। আর রাস্তাতে একটা রিকশাও নেই। আদিরা মারসাদের দিকে এগিয়ে গেলো। মারসাদ তখন সিগরেট ফুঁকছিল। আদিরাকে আসতে দেখে সিগরেটটা মাটিতে ফেলে দিয়ে পি*ষে ফেলল। আদিরা এসে আশেপাশে নজর বুলালো। মারসাদ সেটা লক্ষ্য করে বাঁকা হাসলো। তারপর কন্ঠস্বরে হতাশা এনে বলল,

–রিকশা দুইটা পেলাম না আজকে। একটা পেয়েছিলাম তাই ছেড়ে দিয়েছি। তুমি তো আর আমার সাথে এক রিকশায় যাবে না! চলো আজ হেঁটে হেঁটে যাই।

আদিরা রাজী হলো। তবে রাস্তা একটু শুনশান। রাতের বেলা ঝোঁপঝার থেকে কোনো শি*য়াল, কুকুর বেরিয়ে আসলে কী হবে সেটাই তাকে উদ্ধিগ্ন করে তুলছে। রিকশার সামনে দিয়ে প্রায়ই শি*য়াল দৌঁড়ে যায় এমন দেখা যায়।

আদিরা ও মারসাদ পাশাপাশি হেঁটে চলেছে। মারসাদ একটা ফাঁকা গলির ভিতর গিয়ে আদিরাকে বলল,

–ধরো, এখন তোমার সামনে ভূ*ত এসে হাজির হলো!

আদিরা মনোযোগ দিলো না। কারণ তার কাছে সবসময় ম্যাচ থাকে যা গ্রামে প্রচলিত। মারসাদ আদিরার অভিব্যক্তির পরিবর্তন না দেখে ভ্রুঁ কুঁচকালো। তারপর বলল,

–আচ্ছা। ভূ*ত বাদ দেও। কোনো শি*য়াল সামনে এসে হাজির হলো আর আশেপাশে আমাকে পেলে না। তখন?

আদিরা শি*য়াল খুব ভয় পায়। গ্রামে একবার তাকে শি*য়াল আক্রমন করেছিল কিন্তু কাম*ড় দেয় নি মানুষ চলে আসাতে। আদিরা ভয়ে ভয়ে বলল,

–কেনো আপনি কই যাবেন?

মারসাদের সামনে আদিরার মুখশ্রী আলোক স্বল্পতার কারণে দৃশ্যমান না হলেও কন্ঠস্বর শুনে বুঝতে পারলো। মারসাদ ডোন্টকেয়ার ভাবে বলল,

–চলে গেলাম কোথাও একটা। তখন তোমার কী হবে? আর আজ তো রিকশাও পাবে না।

আদিরার শরীর ভয়ে কেঁপে উঠলো। মারসাদ এবার নিজের উদ্দেশ্য জাহির করলো।

–তুমি যদি আমার কথা মানো তবেই আমি কোথাও যাবো না।

আদিরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো কিন্তু তা মারসাদের দৃষ্টিগোচর হলো না। মারসাদ আদিরার নিরবতা দেখে মৌন সম্মতি বুঝে বলল,

–আমাকে তোমার হাতের রান্না খাওয়াতে হবে। ওইযে পেয়াজ, রসুন দিয়ে ভর্তা দেখলাম সেটা, আর ডিম ও চিচিঙ্গা দিয়ে ভাজি, ঢেঁড়স ভাজি। আর শোনো, আমার চিংড়িতে এলার্জি আর পটল আমি ডিসলাইক করি। তাই পটলের বদলে বেগুন দিতে পারো।

আদিরা হতবাক হয়ে গেলো। খাবারের জন্য লোকটা ওকে এখানে একা ফেলে চলে যাবে? আদিরা হড়বড়িয়ে বলল,

–কিন্তু ভাইয়া। এসব আমি কী করে বানাবো?

মারসাদ আদিরার চালাকিতে বাঁকা হাসলো অতঃপর ফোনের নেট অন করে মাহির পোস্টটা দেখালো। তারপর চতুরতার সাথে বলল,

–এভাবে। যেভাবে তুমি মাহিদের জন্য বানিয়েছ। দরকার পরলে আমি বাজার করে দিবো। তাও তোমাকে রান্না করে দিতে হবে। বলো রাজী?

আদিরা কিছুটা বিরক্ত হলো। লোকটা তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে এমন এমন যুক্তি উপস্থাপন করে যে অপরপাশের মানুষ অবাকের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যায়।
আদিরাকে কিছু বলতে না শুনে উৎসুক মারসাদ বলে,

–কী হলো? কী ভাবছো? আমি কিন্তু সত্যি সত্যি এখান থেকে চলে যাবো। আর যাওয়ার আগে তোমাকে ধরে কয়েকটা চক্কর দেওয়াবো যাতে বুঝতে না পারো কোনদিকে যেতে হবে। আর ভাবো, শুনশান নিরিবিলি পথ। আশেপাশে ঘন ঝোপঝাড়। ঝিঝি পোকার শব্দ আবার ডোবা থেকে ব্যাঙের ডাক। মাঝে মাঝে শি*য়াল ও কু*কু*রের ডাক। ভাবতেই গা ছমছম করে উঠে না?

মারসাদের এমন ভাবে বলার ধরণে আদিরার গা আসলেই ছমছম করে উঠলো। আদিরা ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল,
–ভাইয়া প্লিজ এমন করবেন না। আপনিই বলেন? রান্না করে আনাটা কী সম্ভব? বাজে দেখায় তো।

মারসাদ চোখ ঘুরিয়ে বলে,
–কী সমস্যা? টিউশন শেষ হওয়ার পর বক্সটা আমাকে দিবে। তাহলেই হয়। তোমাকে কী ক্যাম্পাসে সবার সামনে খাবার দিয়ে প্রপোজ করতে বলছি?

আদিরা হতাশ হয়। অগ্যতা রাজী হয়। তবে তার মনেও কিছু কুটিল বুদ্ধি ঘুরপাক খাচ্ছে। যা সে খাবারের সাথে করবে। লোকটা তখন নিশ্চয়ই আর এমন সব কথা বলবে না!

________

–রাদিব দুই মাস পর বাংলাদেশে আসবে। ওর বাবা-মা ওর বিয়ের জন্য মেয়ে দেখছে।

ফোনের বিপরীত পাশের ব্যাক্তির কথা শুনে মারসাদের হাত রাগে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেলো। চোখের সাদা অংশ ক্রমশ লালাভ রঙ ধারণ করছে। অপরপাশ থেকে আবার বলে উঠে,

–তবে রাদিব সরাসরি ঢাকার এয়ারপোর্ট দিয়ে আসবে না এটা হান্ড্রেট পার্সেন্ট শিউর। আদৌ এয়ারপোর্ট দিয়ে আসবে কীনা তা নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ আছে। তবে কক্সবাজার যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সিলেটও যেতে পারে। সিলেটে এমপি রুহুল আমিনের আত্মীয় স্বজন বেশি। আমি তোমাকে জেনে তারপর জানাবো।

মারসাদ “হুম” বলে ফোন ডিসকানেক্ট করে দেয়। আহনাফ, রিহান, মৃদুল ও রবিন মারসাদের পাশে ও সামনে দাঁড়িয়ে বিষয়ে জানার জন্য উৎসুক হয়ে আছে। মারসাদ দেয়ালে সজোরে একটা ঘু*ষি দিয়ে উগ্র কন্ঠে বলল,

–ওই জা*নো-য়া*র দেশে আসছে। আবার নাকি বিয়েও করবে। আবার কোন মেয়ের জীবনটা নষ্ট করার পরিকল্পনা করছে আল্লাহ ভালো জানেন। এবার ওর শেষ দেখে ছাড়বো আমি। ওকে খু ন করে জেলে গেলেও আমার শান্তি। আআআহ!

মারসাদের চিৎকারে আহনাফ মারসাদের হাত চেপে ধরে আছে। রবিন বলে,
–আমাদের এয়ারপোর্ট গুলোতে নজর রাখতে হবে।

রিহান বলে,
–কিন্তু রাদিব যা চতুর! সে কী সরাসরি আসবে? আমার তো মনে হয় না।

মৃদুল বলে,
–শফিক ভাইকে খবর দে মারসাদ। প্রতিটা এয়ারপোর্ট ও ইমিগ্রেশন ট্রান্সপোর্টে সিভিল লোক লাগিয়ে দিবে। এবার ওই বা*স্টা-র্ডের ছাড় নেই।

চলবে ইন শা আল্লাহ্,

#এক_শহর_প্রেম💓
লেখনীতেঃ #নুরুন্নাহার_তিথী
#পর্ব_১৪
মারসাদ নিজেকে শান্ত করে কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
–শফিক ভাইকে জানানো কী উচিত হবে? তাকে এসবে ইনভলভ করতে মন সায় দেয় না। তার মুভঅন করা উচিত। কিন্তু এসবে সে আদোও মুভঅন করতে পারবে কী?

আহনাফ মারসাদের পয়েন্টকে সমর্থন করলো না।
–শফিক ভাইয়ের প্রফেশনাল দিকটা দেখ। আপিলিকে সে পছন্দ করতো বা করে এটা তার পারসেনাল ইস্যু। উনার প্রফেশনাল স্ট্যাবেলিটি আমাদের কাজে লাগবে।

মারসাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–দুই মাস সময় আছে। আগে রাদিব দেশে আসার প্রস্তুতি নিক। আমার আপিলির সাথে যা করেছে তার শাস্তি আমি চাইলেই ওর বোনের হাসবেন্ডকে বলে ওর বোনের সাথে করাতে পারি কিন্তু ওর বোনটাই একমাত্র আমার বোনের দুঃখ বুঝতো। তাই নিরপরাধ কেউ সাফার করুক চাই না।

………………

চার দিন পর আদিরা মারসাদের জন্য খাবার বাটিতে করে নিয়ে এসেছে। সে পটল, রসুনের ভর্তা ও ঢেঁড়শ ভাজি ও ডিম দিয়ে চিচিঙ্গা ভাজি করেছে। ভর্তা গুলোতে মরিচ দিয়েছে ইচ্ছে মতো। ভর্তার আইটেম গুলো আদিরা নিজে ট্রাই করে দেখেছে ঝাল বেশি। আদিরা নিজে নিজেই বলে,

–আরও খাবেন আমার হাতের রান্না? ইচ্ছামত খান। হুহ্।

টিউশন শেষে আদিরা মারসাদের হাতে বাটিটা দেয়। আদিরা কিছু বলে না দেওয়ার সময়। মারসাদ খুশি হয়ে ধন্যবাদ দেয়। হোস্টেলে গিয়ে খাবারগুলো টেস্ট করে রাহিন, মৃদুল, রবিনের অবস্থা ঝালে নাজেহাল। আহনাফ ও মারসাদ দম মেরে বসে আছে। মৃদুল হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

–আরও জ্বা*লা ওই মেয়েরে! ওই আদিরা তোকে সহ আমাদের মুখে আ*গুন দিয়ে দিবে। এই তোকে বলে দিচ্ছি, আদিরার পিছনে যাবি না। আল্লাহ্ গো! কী ঝাল!

রাহিন মৃদুলকে থা*প্পর দিয়ে বলে,
–আদিরা আপার কাছে আমি মাফ চামু মারসাদের হয়ে। ওর শোধ আমাদের উপর কেন ভাই!

মারসাদ গম্ভীর কন্ঠে বলল,
–তোদের খেতে বলি নি। এখন চুপ করে বসে থাক ঝাল কমে যাবে।

রবিন এতক্ষণ চুপই ছিল। এক প্রকার দম ধরে ছিল। এখন তার ঝাল কমেছে। এবার সে বলল,
–আদিরা হয়তো ঝাল অনেক পছন্দ করে। মেয়েরাতো এমনিতেই ঝালখোর হয়। আমাদেরই ভুল যে ভর্তা বেশি করে মেখেছিলাম। আর পটলের ভর্তাটা ঝাল হলেও খেতে ভালো লাগছিল।

মারসাদ রবিনের শেষোক্ত কথায় ভ্রুঁ কুঁচকালো অতঃপর সন্দিহান কন্ঠে সুধালো,

–পটল? ওটা পটলের ভর্তা ছিল? যেটা আমি বেশি করে নিয়েছি?

ওরা চারজন মারসাদের কথা শুনে ভ্যাবলার মতো মাথা নাড়ালো। মারসাদ চোখ মুখ কুঁচকে বলল,

–আমি ওকে মানা করেছিলাম। তাও সে পটল দিয়েছে।

আহনাফ পানি দিয়ে কুলি করে একটু দম নিয়ে বলল,
–আমরা না বললে তো তুই বুঝতিও না। কারণ তুই পটল লাস্ট কবে খেয়েছিস তোর নিজেরই হয়তো মনে নেই। মেয়ের দম আছে বলতে হবে! নাহলে তোকে পটল খাইয়েই ছাড়লো!

মারসাদ হেসে উঠে। তার নিজের কাছেই মনে হচ্ছে আদিরা তার অনেক অভ্যাস ভবিষ্যতে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। মারসাদ হাত ধোয়ার জন্য উঠে তারপর হোস্টেলের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশপানে নজর রেখে স্বগোতক্তি করলো,

“মায়াবতী তার মায়ার জালে আমায় জড়িয়ে নিয়েছে যে রাগ হয় না তার দুষ্টুমিতে। এক বুক ভালোবাসার উপস্থিতি জানান দেয়। ভালোবাসি আমি তাকে। অজান্তেই হৃদকুটিরে সে নিজের জন্য ঘর বানিয়ে বসেছে।”

আচমকা আহনাফ এসে পেছোন থেকে মারসাদের কাঁধে হাত রেখে বলে,
–হলো তো সত্যি? তুই পারবিও না কিছু আমার থেকে লুকাতে। হাহ্।

দুই বেষ্টফ্রেন্ড হেসে উঠে। দূর আকাশে দুটি তারা হঠাৎ জ্বলজ্বল করে উঠে।

____
আদিরা সকাল থেকে ফুরফুরে মেজাজে আছে। মাহিদের সাথেও খুব উৎফুল্লতার সাথে কথা বলছে। সকাল থেকে রিন্তির মন খারাপ কারণ পরীক্ষার রেজাল্ট তার খারাপ হয়েছে। রিন্তিকে হাসাতে আদিরা বলে,

–একটা ঘটনা শুনবি? বেশি হাসবি না কিন্তু হ্যাঁ?

রিন্তি সম্মতিসূচক ইঙ্গিত করলে আদিরা বলে,
–আমার পড়ালেখা নিয়ে আমার মায়ে আগ্রহ বেশি ছোটো থেকে। মা নবম শ্রেণীর পর আর পড়তে পারেন নি বিয়ে হয়ে যাওয়াতে তাই তিনি আমাকে পড়াতে চান। আমি যখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি, তখন গণিতে আমি প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় ১০০ তে ২৯ পেয়েছিলাম। আমি মাকে জানাই নি তখন রেজাল্টের কথা। এর এক সপ্তাহ পর মায়ের সাথে রাস্তায় নাকি গনিতের স্যারের দেখা হয়েছিল। তখন স্যার আমার রেজাল্টটা মাকে বলে দিয়েছিল। ওই গণিতের স্যার আমার মায়েরও স্যার ছিলেন। এরপর বাড়িতে এসে আমার মা তো আমাকে চিৎকার করে ডাকে তারপর গণিতের নাম্বারের কথা জিজ্ঞেস করার পর আমি জবাব দেওয়ার আগেই সে ঝা*ড়ু নিয়ে আমাকে দৌঁড়ানি দিয়েছিল। এবাড়ি ওবাড়ি দৌঁড়ে আমি বাজারের কাছে ডেউয়া গাছটার কাছে লুকিয়েছিলাম। সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত বাড়িতে যেতেই সেদিন ভয় করতেছিল। পরে বাবার সাথে বাড়িতে ফিরেছিলাম। মা তখন চোখ গরম করে আমার দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে ছিল। দুপুরের খাবারটাও খাইনি সেদিন জানো।

আদিরা বলার পর ওদের তিনজনের রিয়াকশন দেখতে তাকালো। দেখলো ওরা তিনজন হাসছে না বরং ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছে। সাবিহা বলল,

–এটুকুই? আমার মা তো আমাকে বলেছিল বিয়ে দিয়ে দিবে ওটুকুন বয়সে। এসব কমন বিষয়। তাই হাসি পেলো না।

মাহি বলল,
–আমাকে আপিলি সবসময় সেভ করতো। আর আমি ফেল করি নি তবে প্লেস ছুটে গেলে ব-কা খেতে হতো।

আদিরা মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে বলল,
–রিন্তিকে হাসাতে বলেছিলাম কিন্তু রিন্তি তো সেই মুখ ভাড় করে বসে আছে।

আচমকা রিন্তি বলে,
–চল! কড়া বোম্বাই দিয়ে পানিপুরি খাই। সব ডিপ্রেশন বের হয়ে যাবে। আজ আমার তরফ থেকে ট্রিট। চল চল।

রিন্তি ওদের টেনে নিয়ে গেছে তারপর ঝাল ঝাল পানিপুরি খেয়ে চারজনেই নাকের জল, চোখের জল এক করছে। তাও ওরা খেয়েই চলেছে। মাহির ফর্সা মুখশ্রী পুরো লাল হয়ে গেছে। মাহি অর্ধেকে এসে আর খেতে পারছে না। মাহি একদম দম ধরে বসে আছে। আদিরারা নিজেদেরটা শেষ করে মাহির কাছে আসে। সাবিহা চোখ মুছতে মুছতে বলে,

–কীরে? তুই ঝাল খেতে পারিস না?

মাহি চুপ করে আছে। মুখ খুলছে না। রিন্তি আবারও একই প্রশ্ন করে মাহিকে আলতো ধা*ক্কা দিয়ে। মাহি এবার বলে,

–পরিমান মতো ঝাল খেতে পারি। আমি ও দাভাই পরিমানের বেশি ঝাল খেতেই পারি না। এজন্য আপিলি সবসময় ঝাল খাওয়ার কোনো চ্যালেঞ্জে জিতে যেতো।

আদিরার হঠাৎ টনক নড়ে। সে যে ভর্তার আইটেম গুলোতে বোম্বাই মরিচ দিয়েছে সাথে শুকনো মরিচও। আদিরার এবার অনুশোচনা হচ্ছে। আরেকটু কম ঝাল দিলেও পারতো। রিন্তিরা কথা বলে যাচ্ছে তাতে আদিরার মনোযোগ নেই। তার এখন খারাপ লাগছে নিজের কর্মের জন্য।

________

–আচ্ছা রাতপাখি? তোমার বন্ধু মারসাদ কী প্রেম-টেম করছে নাকি? ইদানীং কেমন চেঞ্জ দেখা যায় তার মধ্যে।

রাত্রি ফোনের অপরপাশের ব্যাক্তির কথা শুনে কিয়ৎক্ষণ ভাবলো। ভেবেও কোনো উত্তর না পেয়ে বলল,

–কই নাতো। মারসাদ কারও সাথে রিলেশনে নেই। কেনো তোমার মনে হলো?

–না ওই ফার্স্ট ইয়ারের একটা মেয়ের সাথে ঘনঘন দেখা যায়। আবার পোগ্রামে সামিরাকে ছাড়া ওই মেয়ের সাথে ডান্স করলো।

রাত্রি কথাটা শুনে হাসতে হাসতে বলল,
–আরেহ না। মেয়েটা মাহির ফ্রেন্ড। মারসাদ মেয়েটাকে সহজ-সরল দেখে ভাবলো সামিরার বদলে ওর সাথে ডান্স করবে। এক প্রকার র‍্যাগ বলতে পারো আরকি।

ফোনের অপরপাশের ব্যাক্তিটি সন্তুষ্ট হতে পারলো না। আবারও জিজ্ঞাসা করে,
–শুধু এটুকুই? তুমি শিউর কোনো রিলেশন নেই? হতেও পারে তুমি বাদে সবাই জানে।

রাত্রি হাসতে হাসতে বলল,
–তুমি বিশ্বাস করছো না আমাকে? ওয়ে আমি সুমি ও মৌমিকে জিজ্ঞাস করছি। তখন শুনে নিও।

রাত্রি ব্যালকনি থেকে রুমে গিয়ে সুমি ও মৌমিকে উদ্দেশ্য করে বলে,
–এই মারসাদ নাকি আদিরার সাথে রিলেশনে আছে? তোরা জানিস কিছু?

সুমি ও মৌমি অবাক হয়। সুমি রাত্রির হাতে ফোন দেখে তার কাছে ব্যাপারটা খটকা লাগে। মৌমি কিছু বলতে নিচ্ছিলো তার আগেই সুমি হড়বড়িয়ে বলে,

–আরে না তো। ডান্স ওসব তো পোগ্রামের জন্য। মারসাদ কারও সাথে প্রেমের সম্পর্কে নেই। কেনো? হঠাৎ জানতে চাইলি? তুই তো সবই জানিস।

রাত্রি হাত নাড়িয়ে হেসে বলে,
–আরে না। এমনেই। বাদ দে।

এই বলে রাত্রি আবার ব্যালকনিতে চলে যায়। রাত্রি চলে গেলে মৌমি গিয়ে সুমিকে ধরে বলে,

–কী হলো? তুই কথাটা চেপে গেলি কেনো? আমরা তো ধারণা করছি যে মারসাদ আদিরাকে পছন্দ করে। তো রাত্রিকে বললি না কেনো?

সুমি মৌমির মাথায় ঠো*কা মে*রে বলে,
–আরে ব*লদি! আমরা যা ধারণা করছি তাতো রাত্রিরও ধারণা করার কথা। কিন্তু ও আমাদের সাথে থাকলেও ওর মন আমাদের সাথে থাকে না। ব্যাপারটা আমি অনেকদিন ধরে লক্ষ্য করছি। আর এখানে এসে জিজ্ঞেস করার সময়ও ওর হাতে ফোন ছিল। ফোনটা কিন্তু বিছানায় রাখে নি। আবার দেখলি চলে গেলো। তারমানে ফোনের অপরপাশে কেউ তো আছে যে মারসাদ সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছে।

মৌমি হতবাক হয়ে বলল,
–কী সাংঘাতিক ভাবা যায়! মারসাদ সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে আমাদের সার্কেলের একজনকেই কাজে লাগাচ্ছে। কে হবে ওটা? আমাদের কাল সকালেই মারসাদকে আস্তে করে জানাতে হবে।

চলবে ইন শা আল্লাহ্,
ভুল ত্রুটি মার্জনীয়। কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ