Saturday, June 6, 2026







এক শহর প্রেম পর্ব-৩৬+৩৭

#এক_শহর_প্রেম💓
লেখনীতেঃ #নুরুন্নাহার_তিথী
#পর্ব_৩৬
সকালে ঘোরাঘুরি করে বেলা বারোটার আগেই খাগড়াছড়ি এসেছে। খাগড়াছড়ি থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে যাবে। প্রকৃতিতে সন্ধ্যা নামল আর ওরা সবাই কক্সবাজার কলাতলী পৌছাল। কলাতলী বিচের ও সুগন্ধা বিচের মাঝামাঝিতে হোটেল নিয়েছে। দুইটা ডাবল বেডের ও দুইটা সিঙ্গেল বেডের রুম নিয়েছে। হোটেলে গিয়ে ফর্মালিটি পূরণ করে ফ্রেশ হয়ে বিচে যাওয়ার জন্য বের হলো। সমুদ্র সৈকতে ওরা পাঁয়ে হেঁটেই যাচ্ছে। রাস্তার দুইপাশে সারি সারি দোকান। শুঁটকি মাছের দোকান বেশি দেখা যায়। বার্মিজ মার্কেটে এখন রমরমা অবস্থা। সুগন্ধা বিচের দিক দিয়ে ওরা বিচে গেল। বিচের কিছুটা আগে সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, অক্টোপাস, কাঁকড়া এসব ফ্রাই করা ও বিক্রির দোকান। ওরা আগে সৈকতে ঘুরবে তারপর এসে খাবে।

আদিরা সবকিছু অবাক নজরে দেখছে। আদিরার পাহাড় ও সমুদ্রের মধ্যে দুইটাই প্রিয় তবে সমুদ্র ওর ভিষণ ভালো লাগে। হুমায়ুন আহমেদের “দারুচিনির দ্বীপ” বইটাও সে আহনাফদের বাড়িতে পড়েছিল তাছাড়া গ্রামে দোকানের সাদা-কালো টিভিতে এই মুভিটা ছোটোবেলাতে দেখেছিল। সাজেকে ঘন সবুজ পাহাড় ও মেঘ দেখে সে অনেকটাই উৎফুল্লিত। এখন সমুদ্র দেখে তার দৌঁড়ে পানিতে নামতে ইচ্ছে করছে। সমুদ্রের শীতল নোনাজলের ছোঁয়া পেতে মন বারংবার আঁকুপাঁকু করছে। গ্রামে থাকতে ছোটোবেলায় সে পুকুরের মধ্যে সাঁতার কেটে বেড়াত। সমুদ্র সৈকতের শীতল বাতাসে খোলা চুলগুলো উড়ছে ওর আর ও মুগ্ধ দৃষ্টিতে সবকিছু অবলোকন করছে। আঁধারে ঢাকা অম্বরে একফালি চাঁদ সমুদ্রের জলের উপর প্রতিফলিত হচ্ছে। জোয়ারের সময় তাই সৈকতে বড়ো-ছোটো ঢেউয়ের আছড়ে পরছে। সমুদ্রের গর্জনে হৃদয়ে কাঁপন সৃষ্টি করে। আদিরা মারসাদকে টেনে নিয়ে যায় পানিতে পা ভিজাবে বলে। দুজন একত্রে পানিতে পা ভিজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আদিরার দৃষ্টি সম্মুখপানে যেখানে বিশাল জলরাশির কোনো কূল-কিনারা দৃশ্যমান না। আর মারসাদের নজরে সমুদ্রের জোৎসনা প্রতিফলিত জলরাশির থেকেও নিজের হৃদয়রাণীর চোখে-মুখে প্রশস্ত হাসিটা বেশি আকর্ষণীয়। আদিরার পায়ের উপর যখন সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পরছে তখন শীতল জলের ছোঁয়ায় সে কেঁপে কেঁপে উঠছে।

এদিকে রিন্তি এই অন্ধকারে সেলফি তোলার চেষ্টা করছে তখন রাহিন এসে বলে,

–তুমি কী অন্ধকারে কিছু দেখবে? ক্যামোরায় তো কিছুই উঠবে না। এক কাজ করো। আমি ফোনের ফ্লাশলাইট অন করি তারপর তুমি ছবি তুলো।

রিন্তির কাছে আইডিয়াটা পছন্দ হয় তাই সে রাজি হয়। রাহিন রিন্তির হাতে একটা ঝিনুক দেয়। ঝিনুকটা সে এতক্ষণ যেখানে ঝিনুকে নাম লেখে সেখান থেকে নাম লিখিয়ে এনেছে। রিন্তি ঝিনকা হাতে নিয়ে একবার রাহিনের দিকে তাকায় আরেকবার ঝিনুকের দিকে। রাহিন মাথা চুলকাতে চুলকাতে রিন্তির কাছ থেকে চলে যায়। রিন্তি অবাক হয়ে তাকিয়েই আছে। তার মনে প্রশ্ন, এটা কী কোনোরকম প্রপোজ ছিল?

সাবিহা সমুদ্রপাড়ে হাঁটতে হাঁটতে তার ফিয়ন্সে আহানের সাথে ফোনে কথা বলছে। আহান অফিসের কাজের জন্য ওদের সাথে আসতে পারেনি। এমনিতেও আহানের সাথে সাবিহার খুব একটা দেখা হয়না। আহান একমাস হলো ঢাকায় ট্রান্সফার হয়েছে। সাবিহার ফার্স্ট ইয়ার শেষ হলে আহানের সাথে বিয়ের কথা বলছে সাবিহার বাবা-মা। সুমি, মৃদুল ও রবিন হাঁটছে তখন ওদের সাথে রাহিন এসে যোগ দিল। মাহি ও আহনাফ পাশাপাশি হাঁটছে। মাহি অন্যমনা হয়ে আহনাফকে জিজ্ঞেসা করে,

–সব কি ঠিক করা যায় না? মায়ের সাথে আমার সম্পর্ক ভালো না তাতে আমার আফসোস নেই কারণ উনি উনার মতো ব্যাস্ত। আমার কেয়ার করে বলেই আমি তাকে খুব একটা বাজে কথা বলি না। শুধু তার সব কথা চুপচাপ শুনে যাই আর দাভাইকে নিয়ে কিছু বললে বলি। উনি একটু স্বাভাবিক হলে খুব কী ক্ষতি হতো? জানেন? বাবার হার্টে প্রবলেম বাড়ছে। আমাদের না বললেও সে লুকিয়ে ডাক্তার দেখায়। আমি কয়েকদিন আগে তার স্টাডিরুমে তার রিপোর্ট দেখেছি। বাবাকে সে কোনোদিনও বিয়ে করতে পারত না যদি না মীরামা বাবাকে জোর করত। মীরা মায়ের মৃ*ত্যুর পরে তো বাবা বিয়ে করতোই না। মীরামা তার জীবিত অবস্থায় বিয়ে দিয়েছে বলে। অকৃতজ্ঞ আমার মা। নিজের মায়ের সম্পর্কে এসব ভাবতেও খারাপ লাগে। বিশ্বাস করুন, আপিলির মৃ*ত্যুর আগ পর্যন্ত আমি মায়ের সাথে ভালোই কথা বলতাম। দাভাই ও আপিলিকে নিয়ে বাজে কথা না বললে তার সাথে আমার সম্পর্ক ভালো ছিল। কিন্তু আপিলির মৃ*ত্যুতে আমি মনে করি আমার মায়ের অবহেলাটা বেশি ছিল। বাবা তো আগে থেকেই ছন্নছাড়া। তাও বাবা আমাদের সাথে কথা বলত। সবকিছু এখন আমাকে বিষণ্ণ করে। দাদীর শরীরও অতো ভালো নেই। দাভাই বিয়ে করেছে তা নিজে না জানানোতে দাদী ও বাবা খুব কস্ট পেয়েছে।

আহনাফ মনোযোগী শ্রোতার মতো মাহির প্রতিটা অভিযোগ শুনলো। আহনাফ সবসময় খুব ভালো শ্রোতা। আহনাফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

–সবকিছু নিমিষেই মিটে যায় না। অনেক অনেক কিছুর সম্মুখীন হতে হয়। আদিরা পারলে পারতে পারে মারসাদ ও আঙ্কেলের সম্পর্ক ঠিক করতে। মারসাদের মনে আঙ্কেলের প্রতি রাগ নেই আমি জানি কিন্তু আছে একরাশ অভিমান। অভিমান ভাঙাতে হবে। আদিরা এখন মারসাদের স্ত্রী। সে পারবে বলে আমি মনে করি।

মাহি ও আহনাফ বালু উপত্যকায় বসল। দুজন বিশাল জলরাশি উপভোগ করছে নিরবে নিভৃতে।

_________

ফেরার পথে রাস্তার ধারে রেস্তোরায় ওরা সামুদ্রিক মাছ খেলো। ছেলেরা সবাই অক্টোপাস ও কাঁকড়াও নিয়েছে। মাহিও এগুলো নিয়েছে। আদিরা অক্টোপাস দেখে মুখ চেপে বসে আছে। ওর কাছে অক্টোপাসের নাম শুনেই পেটের নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসছে। মারসাদদের খেতে দেখে আদিরা চোখ মুখ কুঁচকে বিদঘুটে মুখের ভাব করে তাকিয়ে আছে আর বারবার মুখে হাত দিচ্ছে। মারসাদ খেতে খেতে বলে,

–মুখ এমন বিদঘুটে করেছ কেনো? তুমি আমাদের দিকে তাকিও না তাহলেই হলো। নিজের প্লেটে তাকিয়ে খাও। এমনেই বমি করে শরীর খারাপ।

আদিরা চুপ করে চোখমুখ খিঁচে নিজের খাবার খাচ্ছে। খাওয়া-দাওয়ার শেষে হোটেলে ফিরে গেল। আদিরা একটা ঝিনুকের মালা ও খোঁপার কাঠি কিনেছে সাথে কিছু প্রবাল। সবাই টুকটাক কিছু কিনেছে। বাকি কেনাকাটা কাল সকালে করবে।

আদিরা হোটেলে গিয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে পরেছে। কক্সবাজার আসার পথে বাস থামিয়ে সে বমি করেছিল তাই শরীর দুর্বল। সমুদ্র দেখে তার দুর্বলতা এক নিমিষেই উবে গিয়েছিল। এখন তার শরীর ভাড় ছেড়ে দিচ্ছে। মারসাদ হোটেলের হেল্পলাইনে কল করে লেবুপানি আনিয়েছে। এখন আদিরার সামনে ধরে বলে,

–এটা খাও তারপর ঘুমাও। কালকে অনেক জায়গায় ঘুরব আমরা। সমুদ্রে ভিজবও তো।

আদিরা পানিটা পান করে। তারপর শুয়ে পরে। মারসাদের হঠাৎ ফোন বাজাতে সে ব্যালকনিতে গিয়ে রিসিভ করে। ফোনের অপরপাশ থেকে নিহাদ বলে,

–রুহুল আমিনের আজকে রাত তিনটায় একটা বড়ো এমাউন্টের টাকার ড্রা*গ পাচার হবে। আমি অলরেডি শফিক ভাইকে ইনফর্ম করেছি। শফিক ভাই বর্ডারে ফোর্স পাঠিয়ে দিয়েছে।

মারসাদ কপালে ঘষতে ঘষতে চিন্তিত স্বরে বলে,
–এটাকে সে আগেরবারের মতো ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিবে। তার ফ্যাক্টরির খোঁজ পেলে ভালো হতো।

নিহাদ হাসতে হাসতে বলে,
–সেটাও পেয়েছি। গাজিপুরে আরেকটা রূপগঞ্জে। সেখানে একটু পরে রেট হবে। (কাল্পনিক)

মারসাদ অবাক হয়ে বলে,
–কখন করলে এসব?

নিহাদ বলে,
–এক গুপ্তচর ঢুকিয়েছি তার ফ্যাক্টরিতে। সেই খোঁজ দিলো। কাল ব্রেকিং নিউজে চোখ রেখো। তুমি এখন তোমার হানিমুন এন্জয় করো ব্রো।

মারসাদ বাঁকা হেসে ফোন রেখে দেয়। বিড়বিড় করে স্বগোতক্তি করে,

“এবার রুহুল আমিনের চাপ্টার ক্লোজ। দুইটা ফ্যাক্টরিতে কয়েক কোটি টাকার চালান। জেলের চারদেয়াল তার অপেক্ষায়।”

_________

সূর্যোদয়ের সময় সকলে সমুদ্র সৈকতে উপস্থিত হয়। সবাই উদীয়মান সূর্যের সাথে অনেক ছবি তুলল। সূর্যোদয় দেখে মনে হচ্ছে সমুদ্রের বিশাল জলরাশির তল থেকে আ*গুনের গোলক বের হয়ে পূর্বাকাশে দিকে জ্বলজ্বল করছে। এখন ভাটার সময়। ওরা সকলে গল্প করতে করতে সৈকতে অনেক দূর পর্যন্ত হাঁটে। সুগন্ধা বিচ থেকে কলাতলী বিচে হেঁটে সকাল আটটায় নাস্তা খেতে একটা রেস্তোরাতে ঢুকল। তারপর সমুদ্রে গোসল করা, খেলা করা, বাইক চালিয়ে বারোটার দিকে হোটেলে ফিরল। হোটেলে ফিরে শরীরের বালি ছাড়িয়ে গোসল করে একটুক্ষণ রেস্ট করে দুপুরের খাবার খেয়ে হিমছড়ি, ইনানী বিচ ও তার থেকে কিছুটা দূরে যাবে।

হিমছড়িতে ঝর্ণার কাছে পাশ দিয়ে ঘুরে হালকা করে হাতে পানির ছোঁয়া নিয়ে ওরা পাহাড়ে উঠছে। মারসাদ আদিরাকে বলেছিল উঠতে না পারলে না যেতে। কারণ খাড়া সিঁড়িতে অনেক রিস্ক থাকে। কিন্তু কৌতুহলী মন কী মানে? ওরা পাহাড়ের উপর উঠার সময় অনেক ছবি তুলেছে তারপর পাহাড়ের চূড়ায় উঠে সেখান থেকে আশেপাশের পরিবেশ দেখছে। আশেপাশের ছোটো বড়ো পাহাড় গুলো অনিন্দ্য সুন্দর দেখায়। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাওয়া যায় তবে পথ অনেকটা সরু ও পরে যাবার সম্ভাবনা অনেকটা।

এরপর ওরা ইনানী বিচে কিছুক্ষণ ঘুরাফেরা করে হালকা করে পা ভিজিয়ে গাড়িতে করে আরও কিছুটা দূরে একটা জায়গায় ওরা গেল। সেখানে প্রবাল পাথরের সমাহার। যেতে কিছুটা সময় লাগে তবে জায়গাটা অনেক সুন্দর। প্রবালের উপর বসে সমুদ্রের পানে চেয়ে হেলে পরা সূর্য আকর্ষণীয় দেখায়। সেখানেই ওরা সূর্যাস্ত দেখবে। সেখানে আর্মি ক্যাম্পও আছে। ওরা বারোজনে একটা গাড়ি ভাড়া করে এনেছে। মাহি সমুদ্রের অনেকটা দূরে গিয়েছে কারণ এখানে গভীরতা কম। অন্যসব বিচে ঢালু থাকলেও এখানে ঢালু না। সূর্যাস্ত দেখে ওরা গাড়িতে উঠল ফিরে আসতে। সূর্যাস্তের পর এখানে কারও থাকার অনুমতি নেই। ফেরার পথে আবারও হিমছড়ি নেমে কিছু আচার ও বাদাম কিনে নিলো। কোনো রেস্তোরা থেকে ডিনার শেষে হোটেলে ফিরল।

চলবে ইনশাআল্লাহ,
ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন। কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ।

#এক_শহর_প্রেম💓
লেখনীতেঃ #নুরুন্নাহার_তিথী
#পর্ব_৩৭
মারসাদ ফ্রেশ হয়ে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখে আদিরা সকালের কেনা ঝিনুক, শামুক গুলো দেখছে। সকালে আদিরা ঝিনুকের অনেক কিছু কিনেছে। ঘরের জন্য ঝালর, দরজার জন্য ঝালর, ব্যালকনির জন্য ঝালর সাথে কতোগুলো মালা, ব্রেসলেট এসব। মারসাদ নিঃশব্দে হেসে আদিরার পাশে বসল। আদিরা মারসাদের দিকে একবার তাকিয়ে হেসে আবার ঝিনুক দেখতে দেখতে বলল,

–এই রাতেরবেলাও গোসল করলেন? তাও শীতকালে?

মারসাদ তোয়ালেটা বিছানায় রেখে বলে,
–আমরা পাঁচজন তো সমুদ্রে আবারও নেমেছিলাম ইনানীতে। তোমরা বাকিরা শুধু হেঁটেছ। তাই আমার শরীরে বালি কিচকিচ করছিল।

আদিরা মারসাদকে ভেজা তোয়ালেটা বিছানায় ফেলতে দেখে চোখ-মুখ কুঁচকে তোয়ালেটা নেয় অতঃপর বিছানা থেকে নেমে মারসাদের বরাবার দাঁড়িয়ে বলে,

–ভেজা তোয়ালেটা ব্যালকনিতে মেলে দিলে কী হয় হ্যাঁ? আপনার এই স্বভাব যাবে না!

আদিরা তোয়ালেটা ব্যালকনিতে মেলে দিতে অগ্রসর হবে ঠিক তখনি মারসাদ আদিরার বাম হাতে হেচকা টান দিয়ে আদিরাকে নিজের কোলে এনে ফেলল। আদিরা হঠাৎ টানে হকচকিয়ে হালকা চিৎকার করে উঠলে মারসাদ শব্দ করে হেসে উঠে। মারসাদ বলে,

–এতো ভয় কেনো পাও হ্যাঁ? আমিই তো। তোমার হ্যান্ডসাম হাজবেন্ড।

কথাটা বলে মারসাদ আদিরার কাঁধে নিজের অধর স্পর্শ করায়। আদিরা কেঁপে উঠে। কিছু বলতে নিচ্ছিল সে কিন্তু মারসাদের এমন স্পর্শে সে থতমত খেয়ে গেছে। মারসাদ এবার আদিরার গলার কাছে নাক ঘষতে ঘষতে বলে,

–কিছু বলো?

আদিরা হাত দিয়ে মারসাদকে সরিয়ে আমতা আমতা করে বলে,
–আমি ঘুমাব। আজ কতো ঘুরাঘুরি হলো। টায়ার্ড লাগছে।

আদিরা ঠেলে উঠে যেতে নিলে মারসাদ ওকে টেনে এবার বিছানায় ফেলে। আদিরা চোখ-মুখ খিঁচে রেখেছে। মারসাদ নিঃশব্দে হেসে আদিরার বন্ধ নয়নযুগলে ফুঁ দেয়। আদিরা ঈষৎ কেপে উঠে। মারসাদ সম্মোহিত কন্ঠে বলে,

–আমার নিদ্রা কেড়ে তুমি সুখনিদ্রায় কী করে যাও মনোহারিণী?

আদিরা নিশ্চুপ। তার উজ্জ্বল কায়া অনুভূতির মহালগ্নে শিহরিত। আলো নিভিয়ে প্রিয়তমাকে গভীর আলিঙ্গনে প্রেমের শহরে আবারও অবাধ বিচরনে রজনী পার।

_________

পরেরদিন সমুদ্রপাড়ে হালকা ঘোরাফেরা করে ওরা বেলা বারোটায় ঢাকা ফিরতে রওনা হয়। পরেরদিন সকালে ঢাকা পৌঁছে ওরা। আবার শুরু আগের মতো জীবন। মারসাদ ঢাকা এসেই রুহুল আমিনের খোঁজ নেয়। কক্সবাজার থাকা অবস্থায় সেই চিন্তা নিতে চাচ্ছিল না। রুহুল আমিনের দুইটা ফ্যাক্টরির ডকুমেন্ট চেক করছে ডিবি। আর সব অবৈধ মা*লামা*ল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। রুহুল আমিন মিডিয়ার সামনে আসছে না এবার কারণ তার ওই দুইটা ফ্যাক্টরিই ছিল মূল। বাকি শাখা সেগুলোর সূত্র ধরে বের হয়ে আসবে। মারসাদ প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিলো।

…….
সাগর নিউজে যেদিন দেখেছে সেদিন থেকে সে কিছুটা দিশাহারা অবস্থায়। কিসের সাথে সে জড়িয়ে গেছে তাই ভাবছে। এতো সলিড পরিকল্পনাও যদি ধরা পরে যায় তাহলে সাগরের সব পরিকল্পনা তো তুচ্ছ। তাছাড়া সাগরের কাছে ওর এক বন্ধু আরেকটা খবর দিয়েছিল যে, নিলয় রাত্রীর সাথে যোগাযোগ রাখছে এবং ওদেরকে রেস্টুরেন্টে হাত জড়িয়ে ঢুকতে দেখেছিল। সাগরের বিষয়টা হজম না হওয়ায় সে নিলয় ও রাত্রীর উপর নজরদারী করতে বলেছিল। আজকে খবর পেয়েছে, নিলয় ও রাত্রীকে একে অপরকে জড়িয়ে ধরতে দেখেছে। সাগর নিলয়কে আসতে বলেছে। নিলয় এসে সাগরকে বলে,

–হ্যাঁ দোস্ত বল। কী অবস্থা?

–ভালোই। তোর কী অবস্থা?

–এইতো ভালো। তা হঠাৎ জরুরী তলব?

–তুই হোস্টেল ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে অনেকটা চেঞ্জ হয়েছিস সেই ব্যাপারে জানতে।

নিলয় ভ্রুঁ কুঁচকে বলে,
–কেমন চেঞ্জ?

–এই যে পুরানো প্রেম জেগে উঠেছে। খুব মা*খোমা*খো প্রেম!

নিলয় নড়েচড়ে বসে। সাগর কী কিছু সন্দেহ করল? এরকম ভয় তার। সাগর তা দেখে বাঁকা হেসে বলে,

–তোর আর রাত্রীর প্রেম তো জমে উঠেছে শুনলাম। তা কবে থেকে? আমাদের জানালি না পর্যন্ত! কী প্রেম!

নিলয় জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে দৃষ্টি লুকাচ্ছে। সাগর বলে,
–সত্যি বলবি। আমি শিউর হয়েই তোকে ডেকেছি। রাত্রীর জন্যই বুঝি তোর আমাদের সাথে মন নেই? সত্য না বললে আমি কী করতে পারি তা তো তুই জানিসই।

নিলয় হাত দিয়ে কপাল ঘষে চিন্তায় পরে যায়। রাত্রির পরিবারে রাত্রির বিয়ে নিয়ে আবারও কথা হচ্ছে। নিলয় মাস দুয়েক হলো একটা পার্ট টাইম জবে ঢুকেছে যা বিকাল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। আর টিউশন দুইটা ব্যাচ শুক্রবার সহ সপ্তাহে চারদিন করে পড়ায়। নিলয় যেহেতু বিবিএ এর স্টুডেন্ট আর তার রেজাল্ট মোটামোটি ভালো। প্রথম দুই বছর তো রেজাল্ট অনেক ভালো ছিল তারপর সাগরদের সাথে হোস্টেলে উঠার পর তার রেজাল্ট আগের তুলনায় খারাপ হচ্ছিল। সে স্টুডেন্ট হিসেবে পার্টটাইম জব নিয়েছে। এখন সে লেখাপড়াতেও মনোযোগ দিচ্ছে তার সদ্য শেষ হওয়া সেমিস্টার ভালো হয়েছে। সাগরের ঝাঁকুনি দেয়াতে নিলয় কল্পনা থেকে বাস্তবে ফেরে। সাগর বলে,

–তুই আমাদের ধোঁকা দিচ্ছিস নাতো? তুই মুখে বললে ভালো আর তুই না বললেও আমি তোর সবই জানতে পারব। তখন তোকে খুব পস্তাতে হবে। আর রাত্রী তো..!

নিলয় ভয় পেয়ে যায়। নিলয় হড়বড়িয়ে বলে,
–রাত্রীর কিছু করিস না। ওর সত্যি কোনো দোষ নেই। ও এখন মারসাদদের সাথে চলাফেরাও কম করে। এইযে মারসাদরা সবাই ঘুরতে গেল রাত্রী যায়নি। ও এখন শুধু আমার সাথে থাকে।

সাগর অট্টহাসি হাসে। হাসতে হাসতে বলে,
–তুইও তো আমাদের সাথে কম চলিস। আমাদের বেশিরভাগ আড্ডায় তুই থাকিস না। শুধু ওই রাত্রীর জন্য। তাই না?

নিলয় মাথা নিচু করে আছে। নিলয় হতাশ স্বরে বলে,

–দেখ সাগর, আমরা যা করছি তাতে আমাদের লাভ তো কিছুই হচ্ছে না। রুহুল আমিন যদি তোকে ফাঁসায় তাহলে কিন্তু তোকেও জেলে যেতে হবে। প্রতিটা ধাপে বিফল। এর চেয়ে ভালো আমি দেড় বছর আগে যেমন ছিলাম তেমনটাই হয়ে যাই। আমার কোনো বড়ো ভাই নেই। বাবার রিটায়ার্ডের সময় চলে আসছে। তাছাড়া রাত্রিকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি অনেক। আমি চাইনা ওর কোনো ক্ষতি হোক। তাছাড়া সি ইজ মাই ওয়াইফ!

সাগর হতভম্ব দৃষ্টিতে নিলয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। নিলয় হাত জোর করে বলে,
–বন্ধুত্ব বন্ধুত্বের জায়গায় আর পারসোনাল লাইফ তার জায়গায়। আমি চাইনা দুইয়ে সংঘর্ষ হোক। অনেক তো করলি। এবার অন্তত আমার দিকটা ভাব। তোকে মারসাদের কিছু করতে আমি বাধা দেইনি। সবসময় রিস্কটা জানিয়েছি। জানি আমিও সমান দোষী তোর সব কাজে। আমার পারসোনাল লাইফটাকে রেহাই দে। তোকে একদিন ইমার্জেন্সিতে এক ব্যাগ রক্ত দিয়ে বাঁচিয়েছিলাম আমি। তোর দুই ব্যাগের মতো রক্ত লাগত কিন্তু রক্ত পাওয়া যাচ্ছিল না বলে তৎক্ষণাৎ আমি এক ব্যাগ দিয়েছিলাম সেই ফার্স্ট ইয়ারে। সেইদিন কিন্তু তুই নিজের দোষেই মাথা ফা*টিয়ে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ছিলি। তোকে আমি আরও অনেক কিছু থেকে বাঁচিয়েছিলাম প্রথম দুই বছর। তারপর তোর সাথে বন্ধুত্ব গাড়ো হয়। সেটাই বলছি, এবার আমার পারসোনাল লাইফ নষ্ট করিস না। তাছাড়া তোর কোনো কাজে আমি থাকব না যে বাধা দিব। বন্ধুত্ব কী এমনিতে থাকে না?

নিলয় সাগরের একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকা ভাষা বুঝল না। সে কথা না বাড়িয়ে চলে গেল। নিলয় জানে সাগর নিলয়ের প্রতিটা কথা কিছুটা হলেও চিন্তা করে। অন্যদের সাথে সাগর রুড ব্যবহার করলেও নিলয়ের সাথে করেনা। নিলয় আজ নিজের পরিবার ও রাত্রীর জন্য স্বার্থপর হয়েছে। তার আর কিছুই যে করার নেই।

_________

আরও অনেকগুলো দিন চলে গেছে। শীতের রিক্ত বিদায়ে প্রকৃতিতে বসন্তের আগমন। ফুলের উষ্ণ অভ্যর্থনায় ঋতুরাজ তার সমস্ত রূপ নিয়ে হাজির। গাছে গাছে নতুন কুড়ি ও মুকুল। হালকা শীত, হালকা গরম। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। আদিরা আর মারসাদ বিকেলে রাস্তায় হাঁটছে। হিমেল হাওয়ায় দুজনের মন বিভোর। আজ আদিরা মারসাদকে ফোন করে আসতে বলেছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন আজ। বিকেলের টিউশনটা আদিরা সকালের দিকে পড়িয়ে ফেলেছে। মারসাদ জানতে চায়নি আদিরা কেনো ডেকেছে। তার মনোহারিণীর সাথে সে অসীম দিগন্তে হারাতে চায়। আদিরা আজ অন্য উদ্দেশ্যে হাঁটছে। অনেকটা সময় হাঁটার পর মারসাদ লক্ষ্য করল এই পথটা তার চিরপরিচিত। সে তৎক্ষাণাত আদিরার দিকে চাইল। আদিরা সামনের দিকে হাসি মুখে তাকিয়ে হাঁটছে। মারসাদ ভ্রুঁ কুঁচকে তীক্ষ্ম নজরে চেয়ে প্রশ্ন করল,

–তুমি এখানে কোথায় এসেছ?

আদিরার সরল জবাব,
–শ্বশুরবাড়ি!

চলবে ইনশাআল্লাহ,

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ