#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_১২
#জান্নাত_সুলতানা
-“আমি কিন্তু তোমাকে বিশ্বাস করলাম ভাই।”
আলভির কথা শুনে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো আভিরাজ ওর দিকে। সাথে সাথে আলভি হকচকিয়ে গেলো। আর দ্রুত নিজের ভুল সংশোধন করার মতো করে বলে উঠলো,
-“আমি তেমন কিছু বোঝাতে চাইনি। তুমি যেমন ভাবছো। আমি বলতে চাচ্ছি, ওকে বেশি বকাবকি করো না। ও তো অনেক ছোট।”
-“তোর বোন ছোট? লাইক সিরিয়াসলি!”
আভিরাজ বিস্ময় নিয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে অবিশ্বাস্য স্বরে বলে উঠলো। আলভি চোখ পিটপিট করে। আভিরাজ চুলার দিকে মন দেয়। যেখানে সে কিছু একটা রান্না করছে। আলভি কাউন্টারের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর সেভাবেই থেকেই আভিরাজের মুখের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বিরক্তিকর স্বরে জানতে চাইলো,
-“তো তোমার কী মনে হয় ও দামড়ি?”
-“আমার মতো ছয় ফুট লম্বা চওড়া একজন বলিষ্ঠ দেহের মানুষের ভেতর থাকা বিশাল বড়ো একটা মন গিলে খেয়েছে। বেয়াদব রাক্ষস মেয়ে।”
আভিরাজ দাঁত কটমট করে জবাব দিলো। মনে হয় না এতে সে ক্ষতিগ্রস্ত। বরং খুশি মনে স্বীকার করলো। আলভি মুখ গম্ভীর করে নিলো। প্রতিবাদী স্বরে বলে উঠলো,
-“ওকে দোষ দিয়ো না ভাই। প্রেমে কিন্তু প্রথম তুমি পড়ছো।”
-“তুই যাবি? নয়তো লাত্থি মেরে তোর রাস্তা অর্ধেক এগিয়ে দেবো আমি।”
আভিরাজ হঠাৎ রেগে গেলো। আলভি মুখ ভেংচি কেটে নিলো রাগী পুরুষ টার অগোচরে। আর মুখে হাসি টেনে চুলায় থাকা রান্নার দিকে ইশারা করে আবদার করলো,
-“একটু খেয়ে যাই। তুমি রান্না করছো।”
আভিরাজ খুন্তিতে এক টুকরো খাবার তুলে ওর হাত টেনে ধরে হাতের তালুতে দিয়ে আদেশ দিলো,
-“হয়েছে খাওয়া, এবার আউট হ।”
আলভি হাতের তালু থেকে খাবার টা খেয়ে নিলো। আর ইশারা করে বোঝাল দারুণ হয়েছে। আর বললো,
-“ভাই তোমার একটা রেস্টুরেন্টে ওপেন করলে দারুণ লাভ হবে বিজনেসে। আমরা কিছুদিনের মধ্যে বিশ্বের ধনী ব্যাক্তির তালিকায় পৌঁছে যাব। তোমার রান্না জাস্ট ওয়াও।”
আভিরাজ চোখ পাকিয়ে তাকালো। আলভি সাথে সাথেই হকচকিয়ে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। আলভি যেতেই আভিরাজ তপ্ত শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলে উঠলো,
-“ভাই-বোন দুইটাই পাবনা মেন্টাল হসপিটালে সিট পাওয়ার যোগ্য।”
——
-“আপনি রান্না করেছেন?”
দিয়া অবাক বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলো। আভিরাজ প্লেটে খাবার নিতে নিতে উত্তর দিলো,
-“না চুরি করেছি।”
দিয়া সাথে সাথে ফিক করে হেঁসে উঠলো। আভিরাজ ওর সামনে প্লেট রাখতেই ও খাবার মুখে নিলো। আভিরাজ নিজেও একটা প্লেটে খাবার নিয়ে ওর পাশে বসেছে। আলভি সকালে ভার্সিটি চলে গিয়েছে। ওরা বিকেলে রওনা দিবে। দিয়া ভেবেছিলো কোচিং থেকে ফিরে রান্না করবে। কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখে আভিরাজ ভাই রান্নাবান্না শেষ করে শাওয়ার নিয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছে। দিয়া চৌধুরী বাড়ির কোনো পুরুষ কে কখনো রান্না ঘরে যেতে দেখেনি। তার এতটুকু বয়সে এই প্রথম চৌধুরী বাড়ির কোনো পুরুষ কে দিয়া রান্না ঘরে যেতে দেখলো। তার মনে ব্যাপার টা সত্যি দাগ কাটলো। খাবারের স্বাদ ও যথেষ্ট নয় দারুণ ভালো। দিয়ার খাওয়ার ফাঁকে আভিরাজ ভাই তার পাতে তুলে এটা-সেটা দিলো। দিয়া দ্বিধা ছাড়াই খেয়ে নিলো সব। খাওয়া শেষ পানি খেয়ে বেচারি বুঝলো সে আজ জীবনে প্রথম বোধহয় এতো খাবার খেয়েছে। চেয়ার থেকে উঠতেও ইচ্ছে করছে না তার। আভিরাজ সব গুছিয়ে এসেও ওকে এভাবে বসে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
-“হোয়াট? এভাবে বসে আছিস কেনো? শরীর খারাপ লাগছে?”
-“আপনি অনেক বেশি মজা করে রান্না করেছেন আভিরাজ ভাই। আমি বেশি খেয়ে ফেলছি।”
দিয়া কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো। আভিরাজের হাসি পায়। হাসি পেলেও তার এদিকে চিন্তা হচ্ছে। ওর রেস্ট এর প্রয়োজন। সকালে শুধুমাত্র নুডলস খেয়েছে সবাই। এর মাঝে হয়তো বেআক্কেল টা আর কিছু খায় নি। তাই শরীর খারাপ লাগছে এখনো এতো খাবার খেয়ে। আভিরাজ চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
-“রুমে যেতে পারবি?”
-“আমি বসে একটু জিড়িয়ে নেই। পরে রুমে যাচ্ছি।”
আভিরাজ ওর ক্লান্ত স্বরে কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওকে কোলে তুলে নিলো। দিয়া চমকে উঠলো। আভিরাজ কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ওকে নিয়ে রুমে এলো। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বললো,
-“রেস্ট কর। আলভি এলে আমরা বেরুবো।”
দিয়া ঘোরে চলে গেলো। শরীর তখন ও থরথর করে কাঁপছে মুরগির ছানার ন্যায়। এটা তার কাছে অনেক বেশি অস্বস্তিকর। তবুও সে নিজে কে স্বাভাবিক রাখতে চাইলো। আর ধীরে ধীরে বললো,
-“ডাকবেন কিন্তু আমায়।”
-“ওকে।”
আভিরাজ দরজা ভিড়িয়ে চলে গেলো। দিয়া কিছু সময় পূর্বের ঘটনা ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো।
—
দিয়ার যখন ঘুম ভাঙে চারদিকে অন্ধকার মনে হচ্ছে। শুধু দূর দূর থেকে গাড়ির হর্নে শব্দ দোতলায় এসে লাগছে। দিয়া বিছানা থেকে নেমে গিয়ে পর্দা মেলে দিতেই চমকে উঠলো। বাইরে নিকেশ কালো। অন্ধকার। দিয়ার মাথায় আকাশ ভেঙে পরলো। রাত? এখন রাত? তবে তারা কী বিয়ে বাড়িতে যেতে পারলো না হলুদের প্রোগ্রামে?
আভিরাজ ভাই কোথায়? দিয়া সেভাবেই বেরিয়ে এলো। আভিরাজ ভাই কে খুঁজে পেলো নিচে গ্যারেজে। দিয়া সেখানে উপস্থিত হতেই আভিরাজ বললো,
-“আমার সাথে যাবি? না-কি বাড়িতে একা থাকতে পারবি?”
-“কোথায় যাবেন আপনি?”
-“আশেপাশে একটু ঘুরে আসবো।”
দিয়ার প্রশ্নের জানালো আভিরাজ। দিয়া চিন্তিত হলো। এখন রাত। আর আভিরাজ ভাই চলে গেলে এই এতো বড়ো বাড়িতে সে একা। দিয়া শিউরে ওঠে। দিয়া আভিরাজ ভাই কে অপেক্ষা করতে বলে ওপর গেলো। আর হালকা করে রেডি হয়ে এলো। আভিরাজ ওকে নিয়ে বাইক নিয়ে বেরিয়েছে। মনোভাব এই সন্ধ্যায় তাদের মধ্যে একটা স্মৃতি তৈরী হোক। মিষ্টি একটা স্মৃতি।
-“আমরা কখন যাবো আভিরাজ ভাই?”
-“যাবো।”
আভিরাজ ওকে নিয়ে ঘুরে-ঘুরে বাড়ি ফিরলো। দিয়া বাড়ি ফিরতেই আভিরাজ কে জিজ্ঞেস করলো। আভিরাজ বাইকের চাবি লিভিং রুমে রেখে ওপরের রুমে যেতে যেতে বলে গেলো,
-“শোন, দুইটা কফি নিয়ে আমার রুমে আয়।”
-“কেনো?”
-“এখন তো রাত। কফি না খেলে ঘুমের জন্য কার ড্রাইভ করতে পারবো না। আর আমি জেগে থেকে ড্রাইভিং করলে তুই ও জেগে থেকে আমাকে মনোযোগী হতে সাহায্য করবি।”
দিয়ার কাছে ব্যাপার টা অদ্ভুত লাগলে-ও আভিরাজ ভাইয়ের কথা শুনলো সে। কফি করতে গেলো। ফিরে এসে দেখলো আভিরাজ ব্যালকনিতে বসে আছে ফ্লোরে ঠান্ডার মধ্যে। দিয়া তাই বললো,
-“নিচে কেনো বসতে গেলেন, ওপরে চেয়ারে বসুন।”
-“তুই একটা টাওয়াল নিয়ে আয় রুম থেকে।”
দিয়া কফি রেখে টাওয়াল নিতে গেলো। ফিরে এসে দেখলো আভিরাজ অলরেডি কফি খেতে শুরু করেছে। আর দিয়া ফ্লোরে টাওয়াল বিছিয়ে চেয়ারে বসার জন্য উদ্যত হতেই আভিরাজ ওকে বললো,
-“টাওয়ালে বোস তুই।”
-“কিন্তু আপনি,,,”
-“অভ্যেস আছে।”
দিয়া বসলো টাওয়ালে। দুপুরের ঘটনার পর অস্বস্তি লজ্জা নিয়ে গুটিয়ে রাখলো নিজে কে। আভিরাজ গিটার হাতে নিয়ে টুংটাং শব্দ করলো। দিয়া মুগ্ধ হলো। কত বছর পর এতোটা ভালো লাগা তার মধ্যে এসছে সে মনে করতে পারলো না। কতদিন হয় আভিরাজ ভাইয়ের কণ্ঠে গান শোনা হয় না। মানুষ টা গম্ভীর হলে-ও কাজিনদের আড্ডায় আগে আভিরাজ ভাইয়ের একটা গান অবশ্যই থাকা লাগতো।
দিয়া কফি শেষ হওয়ার আগেই চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলো। গান শেষ হওয়ার আগে সে আভিরাজের পিঠের দিকে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। আভিরাজ ওর ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ পেয়ে বাঁকা হাসলো। এরপর গিটার রেখে খুব সাবধানে ওকে কোলে তুলে নিলো। দিয়ার রুমে এসে ওর বেডে শুইয়ে দিয়ে ওর কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো,
-“সরি সুইটহার্ট, তুই প্রোগ্রামে গেলেই সবার নজরে আসবি। তোর জন্য আবার বিয়ের প্রস্তাবের লাইন লাগুক। এটা আমি টলারেট করতে পারবো না। একদম না।”
#চলবে…..
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
