#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_৯
#জান্নাত_সুলতানা
-“আমার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখছো আম্মু?”
আভিরাজ খাবার টেবিলে বসে কথা টা জিজ্ঞেস করলো। ডাইনিং, লিভিং তখন কোথাও কেউ নেই। দুই মা ছেলে আর আলভি আছে শুধু। বাকিরা যে যার কক্ষে বিশ্রাম করছে। বিয়ে বাড়ির কাজে সবাই কে কমবেশি পেয়েছে। তাই তো আজ সবাই ঘুমিয়েছে আগে। শরীর ক্লান্ত সবার। আভিরাজ বাড়ি ছিলো না। আলভি আর সে কোথাও একটা গিয়েছিল সন্ধ্যায় মাত্র ফিরেছে। রাত এখন প্রায় সাড়ে এগারো টা। আভিরাজের মা বললেন,
-“হ্যাঁ বাবা। তোকে বলতাম আমি।”
-“কেনো দেখছো?”
শক্ত কণ্ঠে যখন আভিরাজ এমন অদ্ভুত এক প্রশ্ন করলো তার মা তখন আলভির দিকে আঁড়চোখে চাইলো। ছেলে টা কী পাগল হলো? বিয়ের জন্য মেয়ে দেখবে। এটাই তো স্বাভাবিক। কেনো দেখছে এর উত্তরে দেওয়া কী উচিৎ! বাবা-মা নিজেরাই দায়িত্ব নিয়ে এই কাজ করে থাকে। এটা তাদের দায়িত্ব। সন্তান বিয়ের উপযোগী হলে বিয়ে দেওয়া। তাহলে এমন বোকার মতো প্রশ্ন কেনো আসছে এখানে? আভিরাজের মা ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলেন,
-“বিয়ে করবি না? না-কি তোর কোথাও পছন্দ আছে? থাকলে বলতে পারো। আমি তোমার বাবা-র সাথে কথা বলবো।”
বলতে বলতে তিনি মুখখানা গম্ভীর করে নিলেন। আভিরাজ খাবার খাচ্ছে তখন। আলভি বুঝতে পারছে না এমন পরিস্থিতিতে আদৌও খাওয়া উচিৎ? না-কি মন দিয়ে তাদের কথোপকথন শোনা উচিৎ? সে খাবার সামনে বেশ সিরিয়াস মুখে একবার বড়ো মায়ের দিকে তো একবার আভিরাজের দিকে তাকাচ্ছে। আভিরাজ খেতে খেতে জবাব দিলো,
-“আম্মু এতো কষ্ট করতে হবে না তোমাকে। সবেমাত্র দেশে এসছি। কিছু একটা করি। তারপ,,
-“তোমার কিছু একটা কী সেটা আমি খুব ভালো করে জানি। রাজনীতি করা। যদি এ-সব করবে তাহলে আমি মেনে নেবো না এ-সব।”
আভিরাজের খাওয়া প্রায় শেষ মায়ের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে থাকে সে। মা চলে যায়। আলভি বেশ চিন্তায় আছে মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে। সে গম্ভীর স্বরে বললো,
-“ভাই, আমার মনে হচ্ছে বড়ো মা তোমার প্রেমের প্রধান শত্রু। তোমার ও কী তাই মনে হচ্ছে?”
-“আমি মানিয়ে নেবো। শুধু সুযোগের অপেক্ষা।”
আভিরাজ মৃদু হেসে বললো। আলভি অবাক হয়ে তাকায় আভিরাজের দিকে। একটা মানুষ এতোটা শান্ত? কিভাবে হতে পারে? গোটা জীবনের প্রশ্ন আর সে-তো সামন্য পরীক্ষার হলের প্রশ্ন নিয়েই টেনশন করতে করতে এক্সাম টাইম পাড় করে ফেলে। আভিরাজ হাত ধুয়ে পানি খেয়ে ওঠে যাওয়ার আগে আলভির পিঠে চাপর মেরে বলে গেলো,
-“যতো বেশি চিন্তা তত বেশি ঝামেলা। চাপ নিস না। খাবার শেষ সব গুছিয়ে রেখে যাবি।”
আলভি ঘোরে থেকে মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে দিলো। তবে তার কয়েক সেকেন্ড পর-ই হুঁশ আসে। ততক্ষণে আভিরাজ ভাই নিজের রুমের প্রায় কাছাকাছি। আলভি টেবিলের দিকে তাকালো। পুরো টেবিল জুড়ে তরকারির বাটি। সে-সব দেখে সে আরও টেনশনে পড়ে গেলো। এতো সব তাকে করতে হবে? হায়, এই ছিলো কপালে? আলভির এখন আভিরাজের কথা টার মানে বুঝতে পারলো। সত্যি সত্যি যতো বেশি চিন্তা তত ঝামেলা বেশি। হাতেনাতে প্রমাণ হয়ে গেলো।
——-
দিয়া প্রতিদিনের মতোই আজ-ও ব্রেকফাস্ট টেবিলে সবার আগে এসছে। এসেই মনে পরে যায় সেদিন জুস ফেলে দেওয়ার ঘটনা। টেবিলে বসে মাত্রই রুটি তরকারি মুখে তুলেছে। তখন নীলয় এলো। সে স্কুলের জন্য এক্কেবারে তৈরী হয়ে এসছে। নাফিজা কোচিং-এ চলে গিয়েছে খুব সকালে। পরীক্ষা কিছু দিন পর। তাই পড়াশোনার বেশ চাপ। আলভি হন্তদন্ত হয়ে এসে দিয়ার পাশে বসতেই ভাবনা বিচ্ছিন্ন হলো দিয়ার। সে পাশে তাকিয়ে দেখলো আলভি খুব তাড়ায় আছে। মুখে খাবার দিচ্ছে বেশ তাড়াহুড়ো করে। দিয়া পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বললো,
-“ভাইয়া ধীরে খাও। গলায় আটকাবে তো।”
-“কিচ্ছু হবে না। তুই রেডি থাকিস। বিকেলে তোকে নিয়ে একটা যায়গায় যাবো।”
দিয়া আর জিজ্ঞেস করলো না কোথায় যাচ্ছে। সে মাথা নেড়ে আবারও খেতে লাগলো। কিন্তু হঠাৎ করে নাসারন্ধ্রে কড়া পারফিউম এর গন্ধ পেয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে তাকালো। ফর্মাল ড্রেসে আভিরাজ ভাই এদিকেই আসছে। শার্টের হাতা ফোল্ড করে কনুইয়ের ওপর ভাজ করে রাখছেন। দৃষ্টি তার নিজের হাতের দিকে। দিয়া সেই শীতের সকালের কথা মনে পড়ে যায়। মানুষ টার সৌন্দর্য যেকোনো রমণী প্রেমে পড়বে। গায়ের রং টা বরাবরই মতোই উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। সাদা শার্টে কী ভয়ংকর সুন্দর লাগছে তা কী এই সুদর্শন আভিরাজ ভাই জানে? দিয়া আস্তে করে ঢোক গিলে। চোরের মতোই দৃষ্টি সরিয়ে সে বুকে হাত রেখে লম্বা শ্বাস টেনে নেয়।
আভিরাজ ভাই এসে ওর বরাবর সমানের চেয়ার টায় বসলো। ওর দিকে একবার তাকিয়ে নিজের প্লেটে খাবার তুলে নিলো। রান্না ঘর থেকে আভিরাজের মা ডেকে বললো ওরা যেনো খাবার নিজেরা নিয়ে খায়। কেননা তারা সবাই পাটিসাপটা পিঠা বানাচ্ছে। কিন্তু এতো সকালে পিঠা কেনো বানানো হচ্ছে সেটাও দিয়া বুঝতে পারে। তাই নিজের দৃষ্টি সংযত রাখে। আলভি বলে,
-“ভাই আমার অনার্স শেষ হলে আমিও অফিস জয়েন করবো।”
-“চাইলে এখন করতে পারো। সারাদিন তো কোনো কাজ নেই। ইচ্ছে করলে সময় দিতে পারো।”
পেছন থেকে আলভির বাবা এসে চেয়ারে বসে বললেন। দিয়া বাবা-র দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। ওর বাবা ও হাসে। আলভির মুখ পাংশুটে হয়ে আসে। বাবা কে সে ভয় পায়। তাই কথা ফেলে দিতে পারবে না। বললো,
-“ইয়ার ফাইনাল এক্সাম শেষ হলে,,।”
-“প্রয়োজন নেই। পরে রেজাল্ট খারাপ হলে দেখা যাবে সব দোষ আমার হবে।”
আলভি মাথা নিচু করে রাখে। বাড়িতে বাবা-ই একমাত্র যাকে আলভি ভয় পায়। পড়াশোনায় সে ভালো। তবে সে পড়ে না। সারাদিন ফোন নিয়ে থাকে। তারমধ্যে এখন তো আবার আভিরাজ নতুন ফোন দিয়েছে।
——
নাফিজা কে সাথে নিচ্ছে দিয়া। দু’জন হলে বোরিং লাগবে না। নয়তো আলভি যেখানে ওকে নিয়ে যাচ্ছে সেখানে গিয়ে আলভি বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মজে যাবে। তারপর দেখা যাবে ও এতিম হয়ে বসে আছে আলভির পাশে। তাই তো সাথে করে নাফিজা কে নিচ্ছে। হ্যাঁ, ওরা আলভির এক ফ্রেন্ডের বার্থডেো পার্টিতে যাচ্ছে। দিয়া থ্রি-পিস পড়ে হিজাব বেঁধে নিয়েছে মাথায়।
ওরা গাড়িতে করেই যাচ্ছে। ড্রাইভিং সিটে আছে আভিরাজ ভাই। অবাক হয় দিয়া। আভিরাজ ভাই ও ওদের সাথে যাচ্ছে সেটা দেখে। অফিস থেকে এলো কখন আর তৈরী ই বা হলো কখন! কে জানে। কিছু না বলে বরং ও পেছনে নাফিজা কে নিয়ে বসে গেলো। আভিরাজ আঁড়চোখে সেদিকে চাইলো তবে তেমন কোনো ভাবান্তর ঘটে নি যুবকের। আলভি ফ্রন্ট সিটে বসতেই আভিরাজ গাড়ি স্টার্ট করে। দিয়া নাফিজার সাথে কথা বলছে। সেই সাথে আভিরাজ ভাই কে ও একটু একটু আঁড়চোখে দেখছে। ব্ল্যাক স্যুটে মানুষ টাকে চমৎকার সুদর্শন একজন পুরুষ লাগছে। যাকে এক দেখায় চোখ ফেরানো দায়। দিয়া তাকিয়ে ছিলো তখনই আভিরাজ ভাই লুকিং গ্লাসের দিকে তাকিয়ে নাফিজা কে আদেশ করলো,
-“নাফু কানে আঙুল দে।”
-“কিন্তু কেনো ভাইয়া?”
নাফিজা অবাক কৌতূহল নিয়ে জানতে চাই। আলভি ধমকে উঠলো। ধমকের স্বরে বললো,
-“দিতে বলেছে দে বেয়াদব। মুখে মুখে প্রশ্ন করিস কেনো?”
কথা গুলো বলতে বলতে নিজেও কানে আঙুল দিলো। নাফিজা ও তা দেখে মুখ ভোঁতা করে নিয়ে আঙুলের টগা কানে গুঁজে দেয়। দিয়া অবাক হয়। চোখ পিটপিট করে আলভি আর নাফিজার দিকে বারকয়েক তাকায়। এরমধ্যে আভিরাজ ভাই বলে উঠলো,
-“এতো সাজতে কে বলেছে তোকে? আমরা বার্থডে পার্টিতে যাচ্ছি। তোর বিয়েতে না। আমাকে টেনশন দিতে ভালো লাগে বেয়াদব মেয়ে। এখন সারাক্ষণ নজরে রাখো। ”
শেষের কথা গুলো ফিসফিস করে বলে। দিয়া শুনতে পায় না। সে মাথা নিচু করে নেয়। এভাবে বলার কী আছে? সে সেজেছে কোথায়? মাত্রই তো ঠোঁটে আর চোখ গুলো একটু সাজিয়েছে। তা-ও তো মাথায় হিজাব বেঁধেছে। আগের মতোই আছে মানুষ টা। শাসনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে এখনো নিয়ে বসে আছে। হুঁ, মুখ ভেংচি কাটে দিয়ে।
#চলবে…….
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
