#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_৬
#জান্নাত_সুলতানা
দিয়া কিছু সময় বসে থেকে ওঠে দাঁড়ালো। আলভি ভাইয়া কেনো আসছে না সেটা ভেবে অস্থির হচ্ছে মেয়ে টা। রাস্তাঘাটে কোনো বিপদ-আপদ হলো কি-না সেই চিন্তায় আবার মাথায় ভর করতেই দ্রুত পা ফেলে আভিরাজ ভাই এর কাছে এলো। বললো,
-“ভাইয়া কে একটা কল দিয়ে দেখুন না। কতটুকু এলো।”
-“চুপচাপ বোস।”
ধমক না। উচ্চস্বর না। ভারিক্কি গম্ভীর স্বরে দিয়ার সমস্ত কায়া কেঁপে উঠলো। আলগোছে চেয়ারটায় বসে ফুলগুলো নড়াচড়া করতে লাগলো। আভিরাজের হাতে একটা দামী ফোন। অ্যাপেল ইউজার এই ব্যাক্তি সেই সতেরো বছর বয়স থেকে। ফোন নিয়েছিল নিজের টিউশনির ফিস দিয়ে। ব্রাইট স্টুডেন্ট হওয়ায় এই কাজ খুব একটা কঠিন ছিলো না। প্রতিমাসে দশ বেশ মোটা অংকের একটা বেতন তিনি পেয়ে থাকতেন। দিয়া এ-সব ভাবছিল আভিরাজ ভাই তখন ফোনের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বললো,
-“সেদিন ঘুরতে কোথায় গিয়েছিলি?”
-“ওই তো ভার্সিটিতে। আমির ভাইয়ার সেখানেই পড়ে।”
দিয়া বললো। আভিরাজ তৎক্ষনাৎ ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দিয়ার আপাদমস্তকে দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো। গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো,
-“আমির? ওই তোকে পড়াতো না?”
-“হ্যাঁ। কিন্তু আর পড়াতে পারবে না। আমি তো এখন এক্সাম দিয়ে ফেলছি।”
দিয়া কিছু টা মন খারাপ করে বললো। আভিরাজ চোয়াল শক্ত করে ওঠে দাঁড়ালো। বললো,
-“আলভি চলে এসছে।”
-“যাবো আমরা?”
আভিরাজ সে কথার জবাব দিলো না। হাত উঁচিয়ে আলভিদের ইশারা করলো। আলভি ফাহাদ আসতেই দিয়া দাঁড়িয়ে গেলো। আলভি বললো,
-“চলো। যাওয়া যাক। আব্বু কল করেছিলি। বোনু কে মামা বাড়ি নিয়ে যাবে বললো।”
আভিরাজ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আলভি কে জিজ্ঞেস করলো,
-“কেনো?”
-“ওই মৃত্তিকা আপুর বিয়ে।”
-“কবে?”
-“নেক্সট ফ্রাইডে।”
-“তো ও এতো আগে কেনো যাবে?”
-“বল, কেনো?
আলভি দিয়া কে জিজ্ঞেস করলো। দিয়া হাত কচলায়। ঠোঁট কামড়ে ধরে মনে মনে নিজের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করতে লাগলো। এখনো এতো কৈফিয়ত কিভাবে দেবে সবাই কে, যে ওর এখানে ভালো লাগছে না। সে-সব ভাবনা চিন্তা বাদ দিয়ে বললো,
-“এখন তো অবসর। এক্সাম ও শেষ। কিছু দিন বেড়াতে যেতে চাই।”
আলভি ঘাড় নাড়লো। আভিরাজ কিছু বললো না। সে সেই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলো। আলভি আর ফাহাদ কে বললো,
-“কিছু খেয়ে নে। বোস তোরা।”
-“কিন্তু মেঝো আব্বু অপেক্ষা করছে দিয়া আপুর জন্য।”
ফাহাদ বললো। আলভি তাল মেলালো। আভিরাজ ঠাই বসা। বললো,
-“চুপচাপ বোস। মেঝো আব্বুর সাথে এব্যাপারে আমি কথা বলবো।”
আলভি আর ফাহাদ আমতা আমতা করলো। দিয়া ভ্রু কুঁচকে নিলো। আলভি বসে যেতে দিয়া বললো,
-“ভাইয়া তুমি আমাকে দিয়ে এসো। আমি চলে যাবো।”
-“এখান থেকে এক পা নড়ে দেখ। ঠ্যাঙ ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেবো।”
দিয়ার অন্তর আত্মা কেঁপে উঠলো। আলভি দিয়ার জন্য আনা কফি ততক্ষণে খাওয়া শুরু করেছে। ফাহাদ এর জন্য ও কফি অর্ডার করাই ছিলো। দশ মিনিটে নিজেদের খাওয়া শেষ সবাই বেরিয়ে এলো। আলভি বোন কে ধরে ধরে বের করে নিয়ে এলো। আভিরাজ বাইকে বসলো। আলভি দিয়া কে নিজের সাথে বসাতে নিলেই আভিরাজ বলে উঠলো,
-“ওকে আমার বাইকে দে।”
আলভি কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলো। মূলত সেই তো তখন খোঁচা মেরেছে আভিরাজ কে। তাই একপ্রকার না চাইতেও বাধ্য হয়ে দিয়া কে আভিরাজের বাইকে দিলো।
আলভির পাঁচ মিনিট আগে এসে আভিরাজ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। আলভি এলো ফাহাদ কে নিয়ে অনেক পরে। আভিরাজ দিয়া কে সেখানে নামিয়ে দিলো। দারোয়ানকে চাবি দিয়ে ওরা ভেতর এলো। আভিরাজ আসতে আসতে বললো,
-“কি জানি বলেছিলি বিকেলে? আমি পারবো না! আমার প্রশিক্ষণ নেই অনেকদিন ধরে! হাত-পা ভাঙার শখ নেই!”
-“সরি ব্রো।”
আলভি পানসে মুখে বললো। আভিরাজ সোজা নিজের রুমে চলে গেলো। দিয়া সোফায় বসে সেদিকে তাকালো একবার। এরপর নিজের বাবা-র সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলো।
রাত এখন সাড়ে সাত টা। ইশতিয়াক চৌধুরী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
-“দুটে দিন বাদে গেলে হয় না? পা যে বড্ড ফুলেছে মা।”
-“আমি চলতে পারবো আব্বু। প্লিজ না করো না।”
মেয়ের এতো আকুতি ভরা স্বর তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। তবে এর একটু বাদেই বাড়ির পরিবেশ বদলে গেলো। আভিরাজ অনেক গুলো বই নিয়ে এসে লিভিং রুমের সেন্টার টেবিলের ওপর রাখলো। ইশতিয়াক চৌধুরীর পাশে বসে বললো,
-“দিয়া এগুলো তোর এডমিশনের জন্য লাগবে।”
দিয়া চোখ বড়ো বড়ো করে আভিরাজের দিকে তাকালো। ইশতিয়াক চৌধুরী বললেন,
-“ওহ হ্যাঁ এডমিশনের জন্য তো প্রস্তুতি নিতে হবে।”
-“সময় তো বেশি পাবে না মেঝো আব্বু। এখন থেকে প্রিপ্রারেশন নেওয়ার ভালো।”
-“আমাদের আভিরাজ তো পড়াশোনায় মাশা-আল্লাহ বেশ ভালো। ওর কাছে আপাতত পড়ুক না-হয়। কোচিং শুরু হলে তখন কোচিং-এ পড়তে হয়ে যাবে।”
আভিরাজের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দিয়ার মা রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে কথা গুলো বললো। দিয়ার এবার কান্না পেয়ে গেলো। এখন তো কোনোভাবে সে বাড়ি থেকে বেরুতে পারবে না। বাবা-মায়ের মাথায় যে পড়াশোনার ভূত ঢুকে গেছে। তারা পড়াশোনা নিয়ে ভীষণ সেনসিটিভ। দিয়ার রাগে-দুঃখে আভিরাজ ভাইয়ের সব গুলো চুল ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। সে কিছু না বলে ওঠে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে যেতে লাগলো। দিয়ার মা পেছন থেকে ডেকে বললো,
-“ফ্রেশ হয়ে বইখাতা নিয়ে পড়তে বোস। আভিরাজ নাশতা করে যাবে পড়াতে।”
দিয়া মায়ের কথায় বিস্ময় নিয়ে পেছন তাকালো। আজ থেকেই পড়তে হবে? সে অসুস্থ এটা কী দেখতে পাচ্ছে না মা? তার খুব করে কান্না পায়। দাঁতে দাঁত চেপে রাগান্বিত চোখে আভিরাজ ভাইয়ের দিকে একবার তাকিয়ে ওপরে চলে গেলো। আভিরাজ নামক যুবকের ঠোঁটে তখন বাঁকা হাসি। একবার ঘাড় বাঁকিয়ে চাইলেই দিয়া ও সেই চমৎকার হাসিখানি দেখতে পেতো
দিয়া যাওয়ার পরপরই আভিরাজ বাপ চাচার সাথে অল্প কিছু নাশতা খেয়ে ওঠে এলো।
—-
দিয়া রাগে এলোমেলো হয়ে যখন বিছানায় বসে আছে আভিরাজ তখন হাতে দু’টো বই নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো। দরজায় নক তো করেছে তবে পারমিশন আর চায় নি। যার ফলে দুজনেই অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। দিয়া দ্রুত নিজের ওড়না টা পাশ থেকে তুলে গায়ে জড়িয়ে নিলো। আভিরাজ ভাই গম্ভীর চোখে একপলক দেখে নিজের হাতের বই গুলো নিয়ে টেবিলে রেখে চেয়ারে বসলো। বাঁ পাশের চেয়ার টা ইশারা করে দিয়া কে বললো,
-“বোস।”
দিয়ার পেটে আবারও মুচড়ো দিলো। বিকেল থেকে সন্ধ্যায় পর্যন্ত এই মানুষ টার সংস্পর্শে সে। এখন আবার? দম আঁটকে আসে যে ওর। কী করবে ও? দিয়া কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আভিরাজ আবার ধমকের স্বরে বলে উঠলো,
-“দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? তোর জন্য আমি এখানে সারাক্ষণ বসে থাকতে পারবো না। নেহাৎ মেঝো মা বলেছে।”
দিয়া ধমক খেয়ে রাগে ফুঁসে উঠলো। আভিরাজ ভাইয়ের সুন্দর মাথা ভরতি পরিপাটি করে রাখা চুল গুলো টেনে দিয়ে বলতে ইচ্ছে করলো “আমি বলেছি আপনাকে আমার জন্য বসে থাকতে?”
কিন্তু বলা হলো না। দিয়া আলগোছে চেয়ারে বসতে গেলো। তবে চেয়ারে বসতে গিয়ে বাঁধলো বিপত্তি। চেয়ার না বসে মেঝেতে পরে গেলো। ধপাস করে শব্দ হতে আভিরাজ ভাই মেঝের দিকে ছোট পিটপিট করে তাকালো। তবে পরক্ষণেই ঘটনা বুঝতে পেরে হু হা করে উচ্চস্বরে হাসতে লাগলো। দিয়া ব্যাথার চোটে এতো সময় চোখ মুখ কুঁচকে রাখা ভ্রু জোড়া আভিরাজ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে টানটান হয়ে এলো। অদ্ভুত সুন্দর এই পুরুষ। গালে অল্প টোল ও পড়ে যাচ্ছে হাসির তালে। দিয়া কে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আভিরাজ ভাই হাসি চট করে থামিয়ে দিলেন। গম্ভীর মুখে ফের বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
-“তোর পরিবর্তন দেখে আমি চমকিত, বিস্মিত, শিহরিত। এই পরিবর্তন এসছে তোর? পছন্দের খাবারে পরিবর্তন এলে-ও , আগের মতোই ধপাস ধপাস আছাড় খাওয়ার পরিবর্তন আসে নি। বাহ ইন্টারেস্টিং।”
এমনিতেই তার লজ্জায় পুরো দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসছিলো। তারউপর আবার এ-সব কথা। দিয়ার মাথা নত হয়ে আসে। রাগে-দুঃখে আবার কান্না পায়। এভাবে অপমান না করলে বুঝি এই মানুষ টার পেটের ভাত হজম হচ্ছিল না!
#চলবে….
