#অ_সময় (১)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
আমার স্ত্রী এবং আমার প্রেমের বিয়ে ছিলো। তার প্রতি এক সময় আমার গভীর প্রেম ছিলো। অথচ আজ আমিই তার মৃ ত্যুর কারণ। শুধু কারণ, বলা যায় খুনি আমি। তার খু নি। এক সময় যে মানুষটা আমার তীব্র প্রেম উপেক্ষা করতে পারেনি বলে বাবা-মাকে ছেড়ে চলে এলো। আজ সেই মানুষটাকে আমার জন্য ম রতে হলো।
গতকাল রাতে যে শরীরে আঘাত করতে আমি দু’বার ভাবেনি। আজ সেই শরীরটায় হাত ছোঁয়াতে ভয় হচ্ছে। খুব ভয়। ভয় তো হবেই। এই শরীরটায় যে প্রান নেই। তার এই প্রানহীন দেহটার দিকে তাকিয়ে আমার অতীতের প্রেমটা জেগে উঠলো। এখন তার মুখটা কত মিষ্টি লাগছে। কি সুন্দর! চমৎকার! অথচ কাল অবধি তাকে দেখলে বিরক্তি লাগতো। ভালো লাগতো না। আচ্ছা এটা ভালোবাসা? নাকি শুধুই তার চলে যাওয়ার অনুশোচনা? কোনটা? তার নিথর দেহের দিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছি আমি। আমার চোখজোড়া নড়ছে না যেন। এই তো বছর আট হলো দাম্পত্যের। বছর চার তো সুন্দরই ছিলো। স্বপ্নের মতো। বিয়ের আগে তাকে যে যে স্বপ্নের সংসারের আশা দিয়েছিলাম তেমন ছিলো। কিন্তু হঠাৎ সব বদলে গেলো।
তখন বিয়ের চার বছর। নিলু তখন গর্ভবতী। সাত মাস চলছিলো। এতদিনে তার পরিবারও আমাদের মেনে নেয়। তার ভুলটা ক্ষমা করে দেয়। তাই তো নিলুর অসুস্থতা দেখে তার বাবার বাড়ি পাঠাই। সেই পাঠানোই হয়তো আমার ভুল ছিলো। সত্যি কি তাই? এটাই ভুল ছিলো নাকি দোষটা আমারই ছিলো? যেই দোষটা ঢাকতে এখন অজুহাত খুঁজে বেড়াচ্ছি। হবে হয়তো তাই।
তখন প্রায় বছর খানেক বাবার বাড়ি কাটায় নিলু। বাচ্চা জন্ম হওয়ার ছয় মাস পর বাড়ি ফেরে। আর তার এই লম্বা সময়ের বাবার বাড়িতে থাকার সময় মাসে একবার আমি তার বাবার বাড়ি যেতাম। তিন, চারদিনের জন্য। বাকিটা সময় নিজ বাড়িতেই থাকতাম। যদিও নিলু খুব চিন্তা করতো। একা থাকছি, কি খাচ্ছি না খাচ্ছি? ফোনে কথা হলেই তার কথার মাঝে স্ত্রীসুলভ এসব চিন্তা ফুটে উঠতো। তার ভালোবাসাটাও প্রকাশ পেতো। প্রথম দুই মাস আমিও তাকে খুব মিস করতাম। ভালোবাসতাম যে। কিন্তু পরে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিলাম। তার মাঝে এসে জুটে আপদ পাশের বাসার শিউলি ভাবী।
শিউলি ভাবীর স্বামী প্রবাসী। এক ছেলে এবং এক মেয়ে নিয়ে সে এখানে একাই থাকে। নিলুর সঙ্গে তার বেশ সখ্যতা ছিলো। নিলু বাড়ি নেই শুনে সে প্রায়ই আমার খোঁজ নিতে চলে আসতো। প্রথম প্রথম সব স্বাভাবিকই ছিলো। তবে আস্তে আস্তে সব অন্যরকম হয়ে যায়। শিউলি ভাবীর অসাবধানতায় শাড়ীর আচল পড়ে যাওয়া, কখনো বা পেটের অংশ বের হয়ে আসা এসব আমার চোখে পড়তে থাকে।
শিউলি ভাবীও ধীরে ধীরে ঘন ঘন আসা শুরু করে। আমার জন্য কখনো কখনো রান্না করেও নিয়ে এসে। কখনো বা আমার ঘরে বসেই আমার রান্নাটা করে দিয়ে যায়। তখন ঘন্টা দুই তিন থাকা হয় একসাথে। প্রথমদিকে ভাবী কি ভাববে সেটা ভেবে তার সঙ্গে গল্প করতে চলে আসতাম। তবে পরবর্তী এই গল্প করতে ভালো লেগে যায়। যেই ভালো লাগা ধীরে ধীরে কামনায় বদলে যায়।
আমি জানি না, এখানে দোষটা কার। আমার না নিলুর না শিউলি ভাবীর। তবে আমার মনে হয় বেশি দোষ নিলুরই ছিলো। ও আমাকে ছেড়ে এতদিনের জন্য কেনই বা বাড়ি থাকলো? তাই তো এসব হলো। আমি আর শিউলি ভাবী এত ক্লোজ হয়ে গেলাম। আর শিউলি ভাবী? সে তো খুব দুঃখী। স্বামী প্রবাসে পাঁচ বছর ধরে। ফোনে কথা বলে কি সব হয়? তাছাড়া স্বামীটা তো টাকা দিয়েই খ্যান্ত। একটুও ভালোবাসা দেখায় না। তাই তো ভুল হয়ে গেছে। আর সময়ের সঙ্গে ভুলটা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
আমার যেদিন ছেলে হয় সেদিনও আমি শিউলি ভাবীর সঙ্গে ছিলাম। নিলু ওদিকে লেবার পেইনে কষ্ট পাচ্ছে। আর আমি এদিকে। সেদিন বারবার নিলুর পরিবার ফোন দিচ্ছিলো। আর আমি আশ্বাস দিচ্ছিলাম, এই তো পথে, এই তো জ্যামে আটকা পড়ে গিয়েছি। অতঃপর ছেলেটা হওয়ার দুই ঘন্টা পর হাসপাতালে গিয়ে উপস্থিত হই। কিন্তু নিলু এরপরও কিছু মনে করিনি।আমি যে কাজের ব্যস্ততার অজুহাত দিয়েছি। নিলু সেই ব্যস্ততা সত্যি মেনে নিয়েছি। তবে নিলুর বাবা কিছুটা বিরক্ত ছিলেন। একে তো আমি তার পছন্দের পাত্র নই। তার উপর নিলুর এমন অবস্থায় আসতে দেরি করেছি। তাই বিরক্ত হয়তো। তবে বুঝতে দেননি।
অতঃপর আমার ছেলের ছয় মাস বয়স অবধি নিলু বাবার বাড়িই ছিলো। যদিও ও এক মাস পরই আসতে চাচ্ছিলো। কিন্তু আমি আসতে দেয়নি। বাঁধা দিয়েছি। তখন যে নিলুর কাছে ভালো স্বামী হয়ে থাকতে চাইছিলাম। সঙ্গে শিউলি ভাবীকেও হারাতে চাইনি। তাই আমিই নানা অজুহাতে রাখলাম। তবুও নিলু মনমরা হয়ে বলছিলো,“এতদিন ধরে তোমায় মনমতো কাছে পাই না। আমার ভালো লাগে না সুজয়। তাছাড়া তুমিও তো ওখানে কষ্ট করছো।”
“হ্যাঁ।কিন্তু নিলু তুমি এখন অসুস্থ। এই সময়ে এসে বাচ্চাকে সামলাও, সংসার সামলাও। সবটা পারবে না। তাই বাবু একটু বড় হোক। ততটা সময় মায়ের কাছে থাকো। একটু বড় হলে তখন নাহয় আসলে। ততদিনে তুমিও সন্তান লালন পালন শিখে যাবে।”
আমি শুধু এই কথা নয়। আরও অনেক অজুহাত দিয়েছি। নিলুর একা সংসারে কষ্ট হবে। বাচ্চা কান্না করলে দিক বেদিক হারিয়ে যাবে। সবকিছু সামলানো কষ্টকর। নিলুকে সেবার মানাতে বেশ বেগ পোহাতে হয়। তবুও সে মেনে যায়। কিন্তু বাচ্চার ছয় মাস বয়স হওয়ার পর থেকে আর তাকে সামলানো যাচ্ছিলো না। সে এবার আসবেই। তাই আমাকেও বাধ্য হয়ে তাকে নিয়ে আসতে হয়। সেই সময়ে মনে অনেক ভয় কাজ করতো। কারণ নিলুর কাছে খারাপ হতে চাইনি। তাকে তখনও বোধহয় ভালোবাসতাম। তাই খুব সাবধানে চলাফেরা করতাম। কিন্তু শিউলি ভাবী এসব মানতো না। বাচ্চা দেখার নামেও হুটহাট ঘরে আসতো। হঠাৎ হঠাৎ কাছেও চলে আসতো। যেটা আমার জন্য ভয়ের ছিলো। তবে শিউলি ভাবী আমার ভয়টা বুঝতেই চাইতো না। তার মাঝে ভয় ডর কমই ছিলো। তবুও আমি বেশ সাবধানে চলতাম। কিন্তু চাইলেই সব আড়াল করা যায়? শিউলি ভাবী যখন তখন ফোন করে তার কাছে ডাকতো। না যাইতে চাইলে ঘরে চলে আসার কথা বলতো। তাই না চাইতেও যেতে হতো। তবে তার কাছাকাছি গিয়ে যে খারাপ লাগতো তা নয়। বেশ ভালোই লাগতো।
কিন্তু রাতে তার কাছে গেলে সে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে দিতো না। একলা ঘরে বাচ্চা নিয়ে নিলু খুব প্যারায় থাকতো। তার মাঝে আমার রাত করে বাসায় ফেরা, সবকিছু নিয়ে বেশ চিন্তায় ছিলো। এটা নিয়ে আমাদের টুকটাক কথা কাটাকাটি হতে থাকে। নিলুর একটাই কথা, রাতে তো আমি অফিস করি না। তবে বাসায় ফিরছি না কেন? এত লেট হয় কেন? আমার কথা, সে এত কৈফিয়ত চাচ্ছে কেন? এটা নিয়ে টুকটাক ঝগড়া হয়। এই শুরু আমাদের ঝগড়ার। তবে প্রথম প্রথম ঝগড়া শেষে আমি তাকে মানাতাম। রাগ কমাতাম। কথা দিতাম, পরে তাড়াতাড়ি আসবো। কিন্তু সেই পরটা আর আসে না। সত্যি বলতে শিউলি ভাবীর চাওয়া, সঙ্গে আমারও একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছে তার সাথে কাটানোর। তাই ছাড়তে পারছিলাম না।
আর রোজ রোজ এত দেখা করা কাল হয়ে দাঁড়ায়। সেদিন রাতে শিউলি ভাবীর বাসা থেকে বের হওয়ার সময় নিলুর নজরে পড়ে। সে জানালার কাছে কোন একটা কাজে এসেছিলো। আমি ঘরে ঢুকতেই নিলু জানতে চায়,“তুমি শিউলি ভাবীদের ঘরে গিয়েছিলে?”
নিলুর মুখে বিস্ময় ছিলো। এদিকে তার প্রশ্ন শুনে আমি ভয়ে চমকে গেলাম। তবুও নিজেকে সামলে খুব সাবধানে বললাম,“কই না তো। তাদের বাড়ি কেন যাবো আমি?”
“মনে হলো তুমি সেখান দিয়ে আসলে।”
নিলুর বিস্ময় এখনো কাটেনি। সে অবাক হয়েই বলে। তার মুখের ভাবভঙ্গি দেখে আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। নয় ছয় বোঝানো শুরু করলাম। সেদিন নিলু মেনে নিলো। তবে আরও দুইদিন তার একই কথা মনে হলো। আমি বোধহয় শিউলি ভাবীর বাসা থেকে বের হলাম। আমি তখনও তাকে নয় ছয় বুঝিয়ে দেই। তবে কতদিন? কথায় বলে না, চোরের দশদিন গৃহস্থতের একদিন? সেটাই হলো। একদিন নিলু নিজের সন্দেহ দূর করতে মুন্নাকে(ছেলে) ঘুম পাড়িয়ে শিউলি ভাবীর ঘরে আসে। তবে সরাসরি ঘরে প্রবেশ করে না। তাদের জানালায় এসে উঁকি দেয়। শিউলি ভাবী নিচতলায় থাকার সুবাদে সেই জানালায় তাকাতে নিলু আমাদের দেখতে পায়। নিলু বোধহয় আকাশ থেকে পড়ে। তার পুরো পৃথিবী কেমন ওলট পালট হয়ে যায়। তার মনের বয়ে চলা ঝড়ের খবর আমি তখনও নেইনি। পরে যে নিয়েছিলাম তা নয়। পরেও নেইনি। তবে সেদিন রাতে বাসায় ফিরলে নিলু খুব শান্ত গলায় জানতে চায়,“শিউলি ভাবীর শোবার ঘর অবধি যাবার অনুমতি কবে থেকে পেয়েছো তুমি?”
’
’
চলবে,
