#অ_সময় (শেষ)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
শিউলি নিলু কাছে এসে অনুরোধ করলেও আমার কানে কথাটা এসেছে অন্যভাবে। শিউলি আমায় জানায়, আমার বউ তাকে নানাভাবে অপমান করে গেছে। তার বলার ভাষা, মিছে কান্না সব আমায় ভুলিয়ে দেয়। সে রাতেও বাসায় এসে নিলুর উপর খুব অত্যাচার করলাম। এক সময় সব শান্ত হয়ে যায়। নিলু চুপচাপ হয়ে যায়। খুব শান্ত। বছর দেড় ঝামেলা ছাড়াই কেটে যায়। আমার শিউলির কাছে যাওয়া আসা আর নিলুকে কষ্ট দিতে পারে না। হয়তো কষ্ট দেয় কিন্তু ও আর আমাকে ওর কষ্টটা বুঝতে দেয় না। আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। প্রয়োজনে যদি দুই চারটা কথা বলা লাগে তখন, এছাড়া বলে না।
তার পুরো পৃথিবী এখন মুন্নাকে ঘিরেই কাটে। তার সঙ্গেই পুরোটা সময় কাটিয়ে দেয়। হয়তো মনেমনে ভাবে, আর একটু সময়। ছেলেটা বড় হোক। সে বড় হলে নিলুর দুঃখ কমে যাবে। সেই অবধি সয়ে যাক। এটা ভেবেই বোধহয় চুপচাপ রয়ে যায়। নিলুর সময় কিভাবে কাটে সেটার খোঁজ সেভাবে নেইনি কখনো। তাই তো এখন সব ধারণা থেকে বলতে হচ্ছে। তার খোঁজ নেওয়ার সময় ছিলো আমার? আমি তো আমার দুনিয়ায় ব্যস্ত ছিলাম। যে দুনিয়ায় শিউলি ছিলো, নিলু অল্প একটু ছিলো। কখনো কখনো প্রয়োজন বোধ করলে তার সঙ্গে মিলিত হতাম। কখনো বা টুকটাক থাপ্পড় দেওয়ার ইচ্ছা হলে যেকোন অজুহাতে দিতাম। এই তো ছিলো তার সঙ্গে দেনা পাওনা। এভাবে বিয়ের আট বছর পার হয়।
সপ্তাহ দুই আগের কথা, একদিন নিলু খুবই মলিন গলায় বলে,“আমি মা হতে যাচ্ছি।” আমি তার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে যাই। এই সময়ে বাচ্চা? সত্যি বলতে বাচ্চার পরিকল্পনা তো করিনি। তবে খুশি নাহলেও দুঃখী হইনি। হ্যাঁ একটু কষ্ট পেয়েছিলাম নিলুর মলিন মুখ দেখে। বাচ্চা তো মায়ের জন্য সুখের। তবে মা হয়ে সে মলিন গলায় তার আগমনের কথা জানাচ্ছে কেন? এটা ভেবে খারাপ লাগছিলো। আমার মন অজান্তেই বলেছিলো,“এত কষ্ট দিয়েছি আমি নিলুকে যে সে এখন আমার সন্তান গর্ভে নিয়ে খুশি হতে পারছে না।” জানি না এটাই সত্য কি-না। তবে মনে হয় এক মুন্নার জন্য তার জীবনটা বাঁধা পড়ে রয়েছে। মুন্না না থাকলে হয়তো এ জীবন থেকে মুক্তির জন্য আত্ম হত্যা করতো। তার মুখের দিকে তাকিয়ে এই নরকে মানিয়ে নিয়েছে। তার মধ্যে এখন এই দ্বিতীয় সন্তান। এটা নিলুকে খুশি দিতে পারেনি। এটা তার জন্য ঝামেলার বোধহয়। তবুও মাতৃ হৃদয় তো তাকে অবহেলা করতে পারেনি৷ তাই তো সন্তানটাকে নষ্ট করার কথা ভাবেনি।
নিলু দ্বিতীয়বার মা হবে তাতে আমার কোন খারাপ লাগা ছিলো না। তবে ছোট ভালো লাগা ছিলো। প্রথমবার বাবা হয়েও তো সব অবহেলায় হারালাম। তবে এবার কেন জানি না বাচ্চাটাকে নিয়ে কল্পনা করে খুব খুশি হচ্ছিলাম। কিন্তু এই খবরটা শিউলি খুশিমনে নেয় না। আমি যে নিলুর কাছাকাছি যাচ্ছি, সে আমার সন্তানের মা। এটা মানতে পারছে না শিউলি। শিউলি থাকা অবস্থায় আমি নিলুর সন্তানের বাবা। এটা মানা যায়? তাছাড়া শিউলি ভয় পাচ্ছিলো, কারণ গ্রাম অঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে পুরুষরা প্রথম সন্তানের সময়ও পুরোপুরি বাবা হয়ে উঠতে পারে না কিন্তু দ্বিতীয় সন্তানের সময় সে সম্পূর্ণরূপে বাবা হিসাবে ধরা দেয়। তখন সন্তানদের প্রতি আরও বেশি মায়া কাজ করে। এটা শিউলির বাবার বাড়ির দিকে বলতো। তাই ভয় পাচ্ছিলো। এই মায়ায় না আবার আমি নিলুতে মজে যাই।
আর এজন্য শিউলি আমাকে বোঝাতে শুরু করলো, এই বাচ্চা আমার নয়। আমি কতটা সময় আর নিলুর সঙ্গে থাকি। নিলু নিশ্চয় অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্ক বানিয়েছে। নয়তো বাচ্চা আসবে কিভাবে? তবে এবার এই কথা আমি মানলাম না। কারণ আমি জানি নিলুর কারো সঙ্গে সম্পর্ক নেই। ওর কাছে কেউ আসেনি। ওটা আমারই বাচ্চা। সত্যি বলতে আমি সেই মানুষ যার সঙ্গে নিলুর লাভ ম্যারেজ হয়েছে। এই মানুষটা তাকে যে নরক দুনিয়ায় দেখিয়েছে, তারপর অন্য কোন পুরুষকে বিশ্বাস করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এটা অসম্ভবের ঘটনা। তাছাড়া নিলু চরিত্রহীন নয়। ও বাচ্চার বাপ আমি নাহলে সে কখনো আমায় জানাতো না। এটা নিয়ে শিউলির সঙ্গে আমার একটু তর্ক হয়। তবে শিউলি অনেক চেষ্টা করছিলো, আমাকে বোঝানোর। এক পর্যায়ে তার একই কথা বারবার ঘ্যানঘ্যান করায় আমি বিরক্ত হয়ে যাই। তাই একটু উচ্চশব্দেই বলে ফেলি,“তুমি সবাইকে নিজের মতো ভাবো নাকি যে যার তার সঙ্গে শুয়ে পড়বে।”
এই কথাটা তখন অজান্তেই মুখ দিয়ে বের হয়েছিলো। আমি চাইনি শিউলিকে অপমান করতে। তবে শিউলি অপমানিত হয়। এটা তার ইগো হার্ট করে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমি তাকে বে…. বোঝালাম। মানতে পারে না শিউলি। সেদিন রাতে নিলুকে ফোন দিয়ে গালাগালি করে। তার এক কথা,“কার না কার বাচ্চা পেটে ধরে এখন তুই সুজয়ের নাম দিচ্ছিস মা….।”
নিলু এসব কথার পর সেদিন আমার সঙ্গে তর্ক করে। বহুদিন পর সে আমার সঙ্গে অনেক কথা বলে। তবে মিষ্টিমধুর গল্প হয় না, হয় ঝগড়া। নিলু এক সময় হতাশ গলায় বলে,“আমার বাচ্চা অবৈধ নয়। এই বাচ্চা তোমারই।”
আমি আর সেদিন কথা বাড়াতে পারলাম না। আমি তো জানি এই বাচ্চা আমার। তবে নিলু ভাবছিলো, শিউলির মতো আমিও বিশ্বাস করি এ বাচ্চা আমার নয়। কিন্তু সেটা সত্যি নয়। তবে সত্যটা নিলুকে বোঝাতে পারলাম না। এদিকে শিউলি চাচ্ছিলো না এই বাচ্চাটা দুনিয়ায় আসুক। সে বাচ্চা নষ্ট করতে বলছিলো। তবে আমি এসব কথা নিলুকে বলিনি। আমি কোথাও গিয়ে এই বাচ্চা চাচ্ছিলাম। আমাকে দিয়ে কাজ হচ্ছে না দেখে শিউলি নিজেই বাড়ি এসে বাচ্চা নষ্ট হওয়ার ঔষধ খাওয়াতে চাচ্ছিলো নিলুকে। এই খবর আমি জানতাম না।
আমাকে না জানিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় শিউলি এসে আমার বাসায় ওঠে। সে এসে নিলুর সঙ্গে খুবই আজেবাজে ব্যবহার করে। এক পর্যায়ে বাচ্চা নষ্ট করার কথা বলে। শিউলির বলার ধরণ ছিলো এমন,“এই বাচ্চা অবৈধ। জারজ সন্তান। এটাকে রেখে তুই সুজয়ের ঘাড়ে চাপাবি তা তো হবে না। এই বাচ্চা তোকে নষ্ট করতে হবে।”
বাচ্চা অবৈধ, তার উপর নষ্ট করতে হবে এই কথা শুনে নিলু সহ্য করতে পারে না। সে গর্জে ওঠে। এক মূহুর্তে কয়েকটা থাপ্পড় শিউলির গালে বসিয়ে দেয়। তারপর বলে,“খবরদার৷ নিজের নোংরা মুখ দিয়ে আমার বাচ্চা সম্পর্কে একটা বাজে কথা উচ্চারণ করবি না।”
“তুই আমার গায়ে হাত তুললি?”
শিউলি প্রচন্ড ক্ষেপে যায়। সেও নিলুকে পাল্টা আঘাত করে।অতঃপর দু’জনার মধ্যে লেগে যায় মারাত্নক তর্ক বিতর্ক। হাতাহাতিও হয়। তবে শিউলি পারে না। নিলু তার অসাবধানতার সুযোগ দিয়ে তাকে এক ধাক্কা দেয়। যার ফলে তার মাথাটা গিয়ে সজোরে ফ্রীজে বারি খায়। আর মাথা আঘাত পেয়ে সে একটু দূর্বল হয়ে যায়। মেঝেতেই শুয়ে পড়ে। নিলুর মধ্যে সেসময়ে কি হয়েছে জানা নেই? মুন্না এসব দেখে কান্নাকাটি করছিলো। নিলু তাকে পাশের ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। অতঃপর সে এক ভয়াবহ কান্ড ঘটিয়ে ফেলে। নিলু এটা জানতো আজ শিউলিকে ছেড়ে দিলে সে তার এবং তার বাচ্চার অবস্থা খারাপ করে দিবে। তাছাড়া বহুদিনের ঘৃণা তো জমা ছিলোই। সেজন্য শিউলি নিজেকে সামলে উঠে বসার মধ্যে সে হাতে করে নিয়ে আসে কেরোসিন তেল। এতক্ষণে শিউলি উঠে বসে। নিলু এসে সরাসরি শিউলির কোমরের নিচের অংশে তেল ফেলে দেয়। শিউলি এটা দেখে রাগান্বিত গলায় বলে,“খা… মা….। তুই লড়াই করতে চাচ্ছিস আমার সাথে। তবে আয় দেখাচ্ছি মজা।” কথাটা বলে উঠেই নিলুকে ধাক্কা দেয়। পরপর দুই চারটা থাপ্পড়ও বসিয়ে দেয়। নিলু কিছুই বলে না। সে তো তার হাতে থাকা ম্যাচের কাঠিটা জ্বালানো শুরু করে। শিউলি তাকে বাঁধা দিচ্ছিলো। তবে তার বাঁধা সামলে কোনমতে জ্বালিয়ে ম্যাচের কাঠিটা নিলু শিউলির কোমরের অংশে ছুড়ে মারে। সঙ্গে সঙ্গে নিলুও দূরে সরে যায়। এদিকে শিউলির গায়ে কেরোসিন তেল পড়ায়, একটু আগুনের ছোঁয়া পেতেই সেটা জ্বলে ওঠে। শিউলি চিৎকার দিয়ে ওঠে। সে লাফাতে শুরু করে৷ এদিকে নিলু সেই সুযোগে তেলের বোতল তুলে নিয়ে আরও তেল ঢালতে শুরু করে। আর বলে,“এটা দিয়েই তো বশ করেছিস সুজয়কে। এবার মেটা এটার খাইস। এটাই যদি না থাকে তখন স্বামী, সুজয় তাছাড়া যত পুরুষ বশ করছিস সেটা কিভাবে করিস?”
শিউলিও ছেড়ে দেবার পাত্র ছিলো না। যখন সে বুঝেছে তার মরার সময় এসে গেছে। অবস্থা বেশ খারাপ তখন সে নিলুর দিকে এগিয়ে যায়। মরলে তাকে নিয়ে মরবে। নিলু এটা বুঝতে পেরে দ্রুত এক রুমে ঢুকে নিজেকে বন্দী করে নেয়। অতঃপর শিউলি বসার ঘরে বসে ছটফট করতে থাকে। সত্যি সত্যি তার নিচের অংশই বেশি পুড়ে যায়। সেখানে দগ্ধ বেশি হয়। এদিকে এসব চিৎকার চেঁচামেচি আশেপাশের ফ্লাটেও যায়। তারা শুনেও শোনে না। তবে শিউলি যখন বাঁচার আকুতি জানায়, কান্নাকাটি করে তখন দুই ফ্লাট থেকে লোকজন এগিয়ে আসে। তাছাড়া আগুনের ধোঁয়াও দেখতে পায় তারা। তখনই প্রাথমিক ব্যবস্থা নিয়ে শিউলিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি খবর পেয়ে হাসপাতালে না গিয়ে দ্রুত বাড়ি আসি।
শিউলি তখনও বেঁচে ছিলো। তবে তার অবস্থা খুব খারাপ। আর তার খারাপ অবস্থা শুনে আমার মাথাও খারাপ হয়ে যায়। নিলুর এতবড় সাহস ও শিউলিকে মেরে ফেলেছে। না রাগটা সেখানে ছিলো না৷ রাগটা ছিলো ওখানে যে নিলু শান্ত শিষ্ট, নরম স্বভাবের মেয়ে। যে আমার মার খেয়ে কখনো আমার মুখের উপর কথা বলার সাহস পায় না সেই মেয়ে শিউলি আমার সব জেনেও এতকিছু ঘটিয়ে ফেলেছে। এটা বেশি ইগোতে লাগে। আমি বাসায় এসে নিলুকে ডাকতে থাকি। নিলু বের হয়। ততক্ষণে নিলু মুন্নাকে পাশের ঘরে ঘুম পাড়িয়ে রাখে। নিলু বেরিয়ে আসতে আমি তার গালে থাপ্পড় বসিয়ে দেই। এটা দেখে প্রথমে নিলু বলে,“বে… জন্ম বউ পিটাচ্ছো। বাহ্। চমৎকার।”
“নিলু।”
আমি চিৎকার দিয়ে উঠি। তবে আমার চিৎকারে কিছু যায় আসে না নিলুর। নিলু এক ভয়াবহ অপরাধ করে সাহসী হয়ে যায়। তার তো এখন এমনি শাস্তি হবে। হয়তো খুব তাড়াতাড়ি পুলিশ আসবে। তাই মনমতো আজ প্রতিবাদটা করে নিক নিলু। তাই নিলু আমাকে আর শিউলিকে যা নয় তা বলা শুরু করে। সবচেয়ে বড় ব্যপার হলো আমি অনাথ। আর নিলু আমাকে কোন বে… গর্ভে জন্ম হওয়া সন্তান বলে ফেলে। তাই আমার স্বভাব এমন। একে তো শিউলির ঐ অবস্থা, তার মাঝে নিলুর এমন কথা। সব মিলিয়ে আমি হয়ে যাই পশু। অতঃপর লাথি থাপ্পড় একের পর এক চলতে থাকে। নিলুর পেটে একের পর এক লাথি দিলে তখন নিলুর হুঁশ ফেরে। সে বাচ্চার জন্য বাঁচার আকুতি জানায়। পেটে আঘাত করতে বারণ করে। কিন্তু আমার কি সেসব শোনার সময় আছে? নাই তো। আমি তো তখন আস্ত এক জানো য়ার হয়ে গিয়েছি। আমার মধ্যে অন্য এক সত্তা ঢুকে পড়েছে যেন। এমনটা হয়তো শিউলি আসার পর নিলুরও হয়েছে। তবে নিলু তো তাও অনেক সহ্য করেছে। সহ্যশক্তি হারিয়ে গেছে বলেই এমন করলো। কিন্তু আমি কেন করছিলাম? হয়তো অমানুষ বলে। তাই তো নির্দয়ের মতো তাকে পেটাতে থাকি। এক সময় তো হাতের কাছে পাওয়া কাঠের চেয়ার তুলে পেটের উপর একের পর এক আঘাত করতে থাকি। যতক্ষণ না আমি ক্লান্ত হই ততক্ষণ অবধি তাকে মারতেই থাকি। এতক্ষণে নিলু জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়েছে। তার সাড়া শব্দ নাই দেখে আমি হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাই।
আমি হাসপাতালে এসে খবর পাই শিউলির অবস্থা জটিল। বাঁচার সম্ভাবনা রয়েছে। বাঁচবে। তবে তার নিচের অংশ খুব বাজেভাবে দগ্ধ হয়েছে। কয়েক ধাপে সার্জারী করার পরও কতটা কি ওখানে ঠিক হয় বলা যায় না। ডাক্তাররা নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। ইতিমধ্যে খবর পেয়ে শিউলির বাপের বাড়ির লোকজন আসে। তার স্বামীও ফোনে ফোনে যোগাযোগ রাখছে। পুলিশকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলছে। পুলিশ এখানকার পরিস্থিতি দেখছিলো। শিউলির পক্ষ হয়ে নিলুর বিরুদ্ধে এখনো কেউ মামলা করেনি। প্রতিবেশীরা জানিয়ে দিয়েছে, তারা শুধু তাকে আহত পেয়েছে এসব কে করেছে জানা নেই। এখন তারা হয়তো শিউলির মুখ থেকে অপরাধীর নাম শুনে নিশ্চিত হয়ে নিলুকে ধরতে যাবে।
____
ভোরের আলো ফুটতে আমি বাড়ি ফিরে আসি। তবে আসার আগে নিলুর নামটা পুলিশকে বলে আসি। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। শিউলিও হয়তো আদো আদো কন্ঠে নিলুর নাম বলছে। পুলিশ খুব শীঘ্রই নিলুকে ধরতে আসবে। তার আগে আমার একটু তাকে দেখতে আসা। ঘরে তো এসেছিলাম নিলুকে আরও শায়েস্তা করতে। তবে ঘরে এসে আমি নিজেই শেষ হয়ে গেলাম। গতরাতের মার সহ্য করতে না পেরে বাচ্চা তো পেটেই শেষ। তবে তলপেটে আঘাত খাওয়ায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয় নিলুর। সারারাত ওভাবে পড়ে থাকায়, রক্তক্ষরণে নিলু মা রা যায়। আমি এতই পাষাণ যে যাবার সময় ফ্লাটে তালা মেরে গিয়েছিলাম। তাই কেউ ঘরে এসে নিলুর খোঁজও নিতে পারেনি। আর নিলুর এই মৃ ত্যু আমার হৃদয়ে বহুবছর পর ধাক্কা দেয়। শুধু কি নিলু? সঙ্গে তো বাচ্চাও ছিলো। নিলুর নিথর দেহ, পাশের ঘরে মুন্নার মা মা কান্নার শব্দ শুনে এই প্রথমবার আমি আমার অপরাধ উপলব্ধি করলাম। তবে সেটা অসময়ে। যখন কিছুই করার ছিলো না। নিজ হাতে আমি আমার সাজানো গোছানো সুন্দর জীবনটা নষ্ট করে ফেলেছি। আমার ভালোবাসা, আমার নিলুকে মেরে ফেলেছি। এই অসময়ে এসে আমার স্মৃতির পাতায় আমার সব অপরাধগুলো ভেসে উঠেছে। পাশের ঘরে মুন্নার মায়ের সাড়া না পেয়ে কান্নার বেগ বাড়তে থাকে, তার কান্নার সঙ্গে অদৃশ্য কেউ যেন আমায় বলছে,“বাবা তুমি খু নি। তুমি আমায় মেরে ফেলেছো। আমার ভাইয়ের কাছ থেকে মাকে কেড়ে নিয়েছো। বাবা তুমি খুনি।” আর এসব শব্দ আমায় তীব্র অপরাধবোধ অনুভব করাচ্ছে। যা এক অসহ্যকর যন্ত্রণা। অন্যরকম যন্ত্রণা।
পরিশেষে, পুলিশ এসে নিলুর মৃত দেহ পায়। সুজন নিজ থেকে পুলিশের কাছে ধরা দেয়। তার সমস্ত অপরাধ স্বীকার করে নেয়। সে তার প্রাপ্য শা স্তি মাথা পেতে নিতে চায়। তার কেসটা আদালতে উঠেছে। অন্যদিকে মুন্নার দায়িত্ব তার নানা, নানী নেয়। যারা মেয়ে হারিয়ে এখন আফসোস করছে। তারা বাবা, মা নামের কলঙ্ক। সমাজ নামক এক মিথ্যে সম্মানের ভয়ে তারা তাদের আদরের মেয়েটাকে একেবারে শেষ করে দিলো। আর এখন অসময়ে এসে তাদের উপলব্ধি হচ্ছে ভুল করেছে। মেয়েটাকে নিজেদের কাছে এনে রাখলেই পারতো। অন্যদিকে শিউলি বেঁচে রয়েছে। তবে জীবন্ত লাশ হয়ে। তার নিচের অংশ প্যারালাইজড হয়ে রয়েছে। এসবের চিকিৎসা ব্যয়বহুল, যেটা বহন করেও কোন লাভ হবে না। তাই তার স্বামী তাকে তালাক দিয়ে দেয়। ইতিমধ্যে শিউলি জানতে পারে, তার স্বামী সেদিন নিলুর কথা যাচাই বাছাই করেছে অন্য এক লোকের মাধ্যমে। তার চরিত্র সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে সে বিদেশেই অন্য এক মেয়েকে বিয়ে করেছে। আর সেজন্য হয়তো তার চিকিৎসার খরচ বহন করতে চাচ্ছে না। তাই এভাবে তাকে তালাক দিলো। জীবনের এই সময়ে এসে শিউলিও তার ভুল বুঝতে পারে। অনুশোচনায় দগ্ধ হয়। এভাবেই চলছে তাদের জীবন।
(সমাপ্ত)
