Friday, June 5, 2026







অনুভূতিরা শব্দহীন পর্ব-২+৩

#অনুভূতিরা_শব্দহীন
লেখনীতে: #ইসরাত_জাহান_তন্বী

দ্বিতীয় পর্ব

ক্লাস শেষে বের হলো আহনাফ৷ কলেজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালো। কুমিল্লার আকাশটা আজ বড্ড কালো হয়ে আছে, ঝিরঝির করে বৃষ্টিও পড়তে শুরু করেছে।

আহনাফের মনে পড়লো ভার্সিটি লাইফের কথা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাটাপাহাড় রোডে বৃষ্টির দিনেই দেখা হয়েছিল তাহসিনার সাথে। বাদলার দিনে ভিজা শরীরে জোঁ°কের কবলে পড়েছিল সে।

আহনাফ কাছে গিয়ে বলেছিল,
“হেল্প লাগবে ম্যাডাম।”

তাহসিনা ওর দিকে সন্দেহের চোখে চেয়ে বলেছিল,
“নো।”

আহনাফ হেসে হাঁটু গেড়ে বসে জোঁ°ক তুলে দিয়ে বলেছিল,
“বৃষ্টির দিন এভাবে রাস্তায় কি করছেন? স্টুডেন্ট নাকি ঘুরতে আসছেন?”
“স্টুডেন্ট।”
“তবে হলে চলে যান, সা°পে ধরবে।”

আহনাফ চলে আসার সময় তাহসিনা পেছন থেকে চেঁ°চিয়ে বলে উঠেছিল,
“চবিতে কি শুধু সা°পই থাকে, মানুষ থাকে না? ভর্তির পর থেকে শুধু এই কথাই শুনছি।”

আহনাফ ফিরে হেসে দেয়।
“ফার্স্ট ইয়ার?”
“হুম।”

দুজনে সেদিন পরিচিত হয়েছিল। আহনাফ তখন সেকেন্ড ইয়ারে ছিল আর তাহসিনা ফার্স্ট ইয়ারে। পুরো ভার্সিটি লাইফ দাঁ°পিয়ে প্রেমে মজেছিল দুজনে।

“বেস্ট কাপল, মেইড ফর ইচ আদার” এমন অনেক কথা বলতো তাদের বন্ধুরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়গুলোতে প্রায়ই ঘুরতে যেতো, শাটলে করে শহরে আসতো। কত সকাল শাটলে ঘুরেছে, কত দুপুর ষোলশহরের তপ্ত রোদে ঘুরে বেড়িয়েছে।

শুধু প্রেম না, পড়াশুনা আর চাকরির প্রস্তুতিতেও পাল্লা চলতো ওদের৷ একে অন্যের পড়া ধরা, ব°কা দেওয়া সব চলতো। প্রচন্ড মেধাবী এই দুজনের বেবি নাকি বাংলার আইনস্টাইন বা নিউটন হবে, এই বলে ভবিষ্যতবানী করেছিল অনেকে। তবে মাত্র কয়েকটা মুহুর্তে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।

হঠাৎ ব°জ্রপাতের তীব্র শব্দে বাস্তবে ফিরে আসলো আহনাফ৷ গতসপ্তাহের শনিবারটা যে তাকে বড্ড পো°ড়াচ্ছে।

বিয়ের আগের দিন রাতে অর্থাৎ শুক্রবার দিবাগত রাতে ফোনে তাহসিনার বলা একটা কথা তো আজও তার কানে বাজছে,
“দূরত্ব মিটে গেছে আহনাফ, আর মাত্র কয়েক ঘন্টা।”

দূরত্ব মিটেনি, ঘন্টার ব্যবধানে বেড়েছে এবং বেড়েই চলেছে। এতোটাই বেড়েছে যে এখন অসীম দূরত্বে আছে দুজনে।

বাতাসের ঝাপটায় বৃষ্টির পানি এসে আহনাফের মুখে পড়ছে, ওর শার্ট ভিজে গেছে, দাঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে গলা থেকে বুকে। সেদিকে ওর খেয়াল নেই, মন যে এখনো ভাবছে সেই চলে যাওয়া পাখিটিকে।

জীবনের প্রথম বিসিএস পরীক্ষায় শিক্ষা ক্যাডারে চান্স পেয়ে গিয়েছে আহনাফ। মানুষ বছরের পর বছর পরীক্ষা দেয় আর সে একবারেই উত্তীর্ণ হয়ে গেল। সেদিন তাহসিনা বোধহয় সবচেয়ে খুশি ছিল।

দুজনে রেস্টুরেন্টে গিয়েছিল সেলিব্রেশনের জন্য। তাহসিনার বলা প্রথম কথা ছিল,
“বিয়েতে আমি সাদা শাড়ি পড়বো আহনাফ, আই লাভ হোয়াট।”

সূচনা ছাড়া এমন কথায় আহনাফ অবাক হয়েছিল।
“লাল বধূ চাই আমার।”
“বাট আমার সাদা রং প্রিয়।”

তাহসিনার কথা ফেলতে পারেনি। তার ইচ্ছা মেনে নেয়ায় মেয়েটার খুশির অন্ত ছিল না। বড় বড় চোখগুলো সেদিন খুশিতে থৈথৈ করে নেচে উঠেছিল।

সেই চোখগুলো আহনাফ আর দেখতে পারবে না, এই একটা কথাই মানতে পারছে না সে।

“স্যার, আপনি তো পুরো ভিজে গেছেন।”

এক ছাত্রের ডাকে ফিরে তাকিয়ে আহনাফ অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
“ইটস ওকে, তুমি ক্লাসে যাও। এখানে কি করো?”
“সরি স্যার।”
“যাও।”

ধ°ম°ক খেয়ে ছেলেটা ক্লাসে চলে গেল। আহনাফ একটা বড় নিশ্বাস ফেলল, যেন কষ্টগুলোকে বিদায় করার একটা উপায় এটা। ওই অন্ধকার আকাশ আর এই জমিনের মাঝে অসহায় হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে সে। না আকাশের বুকে মিশতে পারছে আর না জমিনে লুকাতে পারছে।
______________________________________

দুপুরের রান্নাটা আজ সারাহ্ একা হাতে করছে, কিন্তু সব কাজে বাধা দিচ্ছে সামিহা। সাহায্যের নামে কাজ বাড়ানোই যেন তার উদ্দেশ্য। রেগে গেলেও নিজেকে শান্ত রেখে সামিহাকে সহ্য করছে সারাহ্।

মাত্রই ভাতটুকু ফুটতে শুরু করেছে। চুলা কমিয়ে সারাহ্ বেগুন ভাজতে শুরু করেছে। সামিহা এসে বলল,
“আপু, বেগুন তো পু°ড়ে যাচ্ছে।”
“পু°ড়ুক।”
“কি পু°ড়ুক? (একটু থেমে) আজকে খিচুড়ি রান্না করলে ভালো হতো।”
“এতো পারবো না, আগে বলতে পারিস নি।”
“ব°কা দেও কেন?”

একটু পরে সামিহা ন্যাকাসুরে বলল,
“আপু, আজকে একটু বাইরে যাবো।”
“কোথায়?”
রান্না করতে করতেই সারাহ্ বলে।

সামিহা হেলেদুলে বলল,
“চলো, আজকে রাতের খাবার‍টা বাইরে কোথাও খাই।”

সারাহ্ একটু ভেবে বলল,
“আইডিয়া খারাপ না, কোথায় যাবি?”
“যেখানে নিয়ে যাবা, সেখানেই যাবো। আব্বুকে আমি রাজি করিয়ে ফেলেছি, আম্মুকে তুমি করো।”

সারাহ্ হাসলো, যদিও ওর হাসি সামিহা দেখেনি। তার আগেই হেলেদুলে নিজের রুমে চলে গেছে সে। মাথানেড়ে আবারো সে রান্নায় মন দিলো। কিছুক্ষণ যেতেই যে সামিহা এসে আবার হাজির হবে তা সে জানে।

সারাহ্-র ভাবনা সত্যি হলো, একটু পরেই সামিহা এসে হাজির হলো। হাতে একটা নিউজপেপার।

সারাহ্ ওর দিকে একবার তাকিয়ে বলল,
“কি রে? আবার কি দেখাতে এসেছিস?”

সামিহা বলল,
“দেশে কত কত দু°র্ঘ°ট°না ঘটে যাচ্ছে গো আপু।”
“কেন? আবার কি হলো?”

সামিহা নিউজপেপার এগিয়ে দিয়ে বলল,
“দেখো না, সড়ক দু°র্ঘ°ট°নায় কনেসহ তিনজনের মৃ°ত্যু।”

সারাহ্ নিউজপেপারের তারিখ দেখে বলল,
“দেখ, একসপ্তাহ আগের নিউজ।”
“বাদ দাও না তারিখ, দেখো এখানে কি লিখছে। এক পরিবারের দুই মেয়ে মা°রা গেছে। বাবা-মায়ের কি অবস্থা গো?”

সামিহার কথায় সারাহ্ হঠাৎ চুপ করে গেল। নিজের বাবা-মায়ের কথা মনে পড়লো৷ ওরা দুইবোন ছাড়া আর কেউ তো নেই তাদের। পরক্ষণেই সারাহ্ ভাবলো,
“আল্লাহ্ যা করবেন ভালোর জন্যই করবে, সবার জীবন তো আর একরকম হবে না।”

কিন্তু মানুষের মন তো খারাপটাই ভাবে বেশি। সারাহ্ আর বেশি কথা বলতে পারলো না।

একটা কথাই সামিহাকে বলল,
“মানুষের জীবনে কত কষ্ট দেখেছিস। আমরা ভালো আছি, সুখে আছি, এজন্য শুকরিয়া না করে উলটো আফসোস করি এটা নেই ওটা নেই করে।”

দুপুর দেড়টা,

নামাজ পড়া শেষ করেও জায়নামাজে বসে আছে মৃত্তিকা। মামের জন্য দোয়া করছে। তার মাম বলেছিল,
“নেককার সন্তানদের দোয়া মৃ°ত্যুর পরেও সুখের কারণ হয়।”

দোয়া করলে মামের সুখ হবে, একটুকু ভেবেই দোয়া করছে সে। ঠোঁট নড়ছে না, কিছু মুহূর্ত পর পর শুধু কেঁপে উঠছে আর চোখ দিয়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে অশ্রু ঝরছে। ঝরুক অশ্রু, তবুও রব তার দোয়া কবুল করুক।

চোখ মুছে জায়নামাজ গুছিয়ে রেখে ডাইনিং এ গেল। ইমতিয়াজকে খাবার দেয়ার কথা বলে গিয়েছিল তানজিম। ও প্রায় ভুলেই গিয়েছিল বাসায় ও ছাড়াও আরো কেউ আছে।

রান্নাঘর থেকে ডাইনিং টেবিলে খাবার নিয়ে এলো মৃত্তিকা। ইমতিয়াজ কি রুমে আছে নাকি বাইরে তা ও জানে না। কিভাবে ডাকবে?

ইমতিয়াজের রুমের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইলো মৃত্তিকা।

এদিকে ইমতিয়াজ ফ্লোরে বসে আছে, দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে তাকিয়ে আছে উপরে ঘুরতে থাকা ফ্যানটার দিকে। ওর ইচ্ছা করছে চিৎকার করতে অথচ ও নিরবে বসে আছে। যোহরের নামাজটাও এখনো পড়া হয়নি তার। কয়টা বাজে তাও জানে না।

হঠাৎ দরজায় নক পড়ায় চমকে উঠলো।
“কে?”

ওপাশ থেকে মৃত্তিকা বলল,
“খেতে আসুন।”

ইমতিয়াজ গলা ঝে°ড়ে বলল,
“খাবো না।”
“হাসপাতালে কখন যাবেন?”

ইমতিয়াজ ফোন হাতে নিয়ে সময় দেখে বলল,
“তিনটায় বের হবো।”

আর কোনো সারাশব্দ পাওয়া গেল না। মৃত্তিকা নিজের রুমে চলে গেছে। ইমতিয়াজ উঠে ওযু করে এসে নামাজ পড়ে নিলো। তাহমিনা থাকলে জামায়াত ছাড়া নামাজ পড়তেই পারতো না ইমতিয়াজ, ঠিক সময়ে ঠে°লে°ঠু°লে মসজিদে পাঠাতো ওকে। এমনকি অফিসে থাকলেও বারবার ফোন করে নামাজের কথা মনে করিয়ে দিতো। অফিসেও যাচ্ছে না সে, চাকরিটা আছে কিনা তাও জানে না। এসব জানার ইচ্ছা ওর নেই, কার জন্য আর চাকরি করবে আর টাকা আয় করবে? নেই তো ওর কেউ।

নামাজ শেষে রুম থেকে বের হয়ে দেখে মৃত্তিকা খাচ্ছে। ইমতিয়াজকে আসতে দেখে মৃত্তিকা একটা প্লেট এগিয়ে রেখে নিজের প্লেট নিয়ে রুমে চলে গেল। খাওয়ার ন্যূনতম ইচ্ছা নেই ইমতিয়াজের। তাই আবারো রুমে চলে গেল। আজকাল একবেলা খাবার খেয়ে আরেকবেলা উপোস থাকা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে তার।

তিনটার দিকে বেরিয়ে গেল দুজনে। কাকরাইল থেকে স্কয়ার হাসপাতাল খুব একটা দূরে না হলেও পাবলিক বাহনে যাওয়া একটু কষ্টেরই বটে।

বাসে উঠে মৃত্তিকা বসার জায়গা পেলেও ইমতিয়াজ দাঁড়িয়ে রইলো। আরেকজন পুরুষ মৃত্তিকার কাছে এসে দাঁড়ালে ইমতিয়াজ সামনে একহাত দিয়ে রাখলো। হুট করে সামনে একটা হাত আসায় মৃত্তিকা চমকে উঠে তাকালো ইমতিয়াজের মুখের দিকে। মৃত্তিকার দিকে তাকায়নি সে, সামনের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক।

মৃত্তিকা জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালো। বাবা তার মামকে প্রতিদিন কিভাবে মা°রধর করতো তা মৃত্তিকা দেখেছে, হয়তো ছোট ছিল কিন্তু প্রত্যেকটা ঝ°গড়া ওর সামনে হতো। রিপা বেগম যতই মেয়েকে দূরে রাখুক, ওর বাবা এসবের পরোয়া কখনো করে নি। এই নি°কৃ°ষ্ট মানুষটা নাকি আবার ডাক্তার ছিল, ভাবতেই অবাক হয় ও।

তার মামের শরীরের ক্ষ°ত°স্থান আর পো°ড়া জায়গাগুলো সে দেখেছে। সি°গা°রেট জ্বালিয়ে গলার কাছে, হাতে, পায়ে চে°পে ধরতো আর রিপা বেগম কিভাবে চিৎকার করতো তা ও জানে। ওই আ°র্ত°নাদ° ভুলতে পারবে না এই মৃত্তিকা। আবারো কান্না পাচ্ছে ওর, গাল বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়তেই মুছে ফেললো।

স্কয়ার হাসপাতাল থেকে একটু দূরে নেমে গেল ওরা। ৫-৬ মিনিটের রাস্তা হেঁটে যেতে হবে। ইমতিয়াজ একটু আগে আগে হাঁটছে আর মৃত্তিকা পিছনে।
_____________________________________

সন্ধ্যা ৭ টায় বাবা-মায়ের সাথে সারাহ্, সামিহা বেরিয়েছে। সামিহার ইচ্ছা অনুযায়ীই রাতের খাবারটা বাইরে কোনো রেস্টুরেন্টে খাবে সবাই।

যমুনা ফিউচার পার্কে গেল সবাই। টুকটাক শপিং এর এটা ওটা দেখছে সামিহা আর কিছুক্ষণ পর পর সারাহ্কে বলছে,
“আপু, এটা সুন্দর না?”

সারাহ্-র উত্তর “সুন্দর” হলেই বলে,
“কিনে দাও।”

সারাহ্ ধমকের মাঝেও কয়েকটা কসমেটিকস কিনেছে সে। জাহাঙ্গীর সাহেব কিংবা নার্গিস পারভিন তেমন ব°কা দেননা মেয়েদের। দুজনের খুনশুটি ভালোই উপভোগ করছেন উনারা।

বড় বড় আয়নাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকটা মিরর সেলফিও তুলেছে ওরা৷ সামিহা যতটা নাচানাচি করে খেতে এসেছিল, তার একভাগও খেতে পারেনি। মেয়েটার চঞ্চলতা দিন দিন বাড়ছে। বড় হয়েছে সে, এইটুকু বোধ এখনো তার পুরোপুরি হয়নি।
_____________________________________

“মা আমার, আর ইতালিতে ফিরে যেও না। আমাদের সাথেই থাকো।”

লুৎফর সাহেবের অনুরোধে মৃত্তিকা মাথানিচু করে ফেলল। একটু চুপ থেকে বলল,
“মামের স্মৃ°তিটুকু ইতালিতেই আছে। এখানে আমি ভালো থাকতে পারবো না।”

হাসপাতালে মমতাজ বেগমের কেবিনে বসে কথা বলছে উনারা। তানজিম পাশেই বসে আছে, ইমতিয়াজ বাইরে আছে। মমতাজ বেগমকে ঘু°মের ওষুধ দেয়া হয়েছে, মেয়েদের চলে যাওয়া সহ্য করার ক্ষমতা উনার এখনো হয়নি।

“আপু, ওখানে গিয়েও আপু ভালো থাকবে না।”

মৃত্তিকা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাইরে চলে এলো। একটু দূরে ইমতিয়াজ দাঁড়িয়ে আছে, ফোনের স্ক্রিনে তার চোখদুটো নি°ব°দ্ধ।

“আরে মিউকো যে, মায়ের মৃত্তিকা।”

ব্য°ঙ্গসুরে বলা কারো কথায় ফিরে তাকালো মৃত্তিকা। কপাল কুঁচকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো সামনের লোকটির দিকে। চেনাচেনা ঠে°কলেও হুট করে চিনলো না।

অবশেষে চিনতে পারলো, এ যে ওরই বাবা, শরীফ আহমেদ। কপালের ভাঁজগুলো গভীর হলো।

“আমাকে কি করে চিনলেন?”

মৃত্তিকার কথায় শরীফ হাসলো। মাথা ঝাঁ°কিয়ে কুঁকড়ানো চুলগুলো নেড়েচেড়ে বলল,
“তোমার মা আমার থেকে তোমাকে দূরে রাখতে চাইলেও আমি কিন্তু দূরে থাকিনি, তাই চিনি। (একটু থেমে) শুনলাম সে ম°রে°ছে।”

মৃত্তিকা রেগে গিয়ে বলল,
“ভদ্র ভাষায় কথা বলুন।”
“হুশ।”
শরীফ মুখে আঙ্গুল দিয়ে বলল।

ঝা°মেলা কিছু হয়েছে ভেবে ইমতিয়াজ এগিয়ে এলো। শরীফ ইমতিয়াজকে দেখে বলল,
“এখানে দেখার কিছু নেই, যেতে পারেন।”

ইমতিয়াজ মৃত্তিকাকে বলল,
“এনি প্রবলেম?”

মৃত্তিকা তার বাবার দিকে শুধু ইশারা করলো। শরীফ আবারো বলল,
“কে হয় এই মেয়ে আপনার? এতো ইন্টারেস্ট কেন?”
“বোন হয়, কোনো সমস্যা? বি°র°ক্ত করছেন কেন?”

ইমতিয়াজ স্বাভাবিক কথায় শরীফ হেসে উঠে বলল,
“বোন? (একটু হেসে মৃত্তিকার দিকে তাকিয়ে) তোর মায়ের আরো কোনো চ°ক্ক°র ছিল নাকি?”

মৃত্তিকা কিছু বলার আগেই শরীফের গালে একটা থা°প্প°ড় বসায় ইমতিয়াজ। মৃ°ত একজন মানুষের প্রতি এমন ভাষা ওর সহ্য হয়নি।

শরীফ সরে গিয়ে বলল,
“বড়দের সাথে এমন বিহেভ কেন? মা-বাবা কিছু শেখায়নি?”
“সে কৈফিয়ত আপনাকে না দিলেও হবে।”

ইমতিয়াজ আর কিছুই বলে না, চলে যায় এখান থেকে। জন্মের পরে মাকে আর ১৭ বছর বয়সে বাবাকে হা°রিয়ে একা বড় হওয়া ছেলেটা এই ৩২ বছর বয়সে এসে বাবা-মাকে নিয়ে অচেনা কাউকে কিছু বলতে চায় না।

মৃত্তিকা আবারো কেবিনের ভিতরে চলে গেল। শরীফ ওকে ফলো করছে, শুধু এখন না আরো আগে থেকে করছে। এটা মৃত্তিকা হা°ড়ে হা°ড়ে টের পাচ্ছে। ওর মামের মৃ°ত্যুর পিছনে আবার এর হাত নেই তো? হঠাৎ অজানা একটা ভ°য়ে ঘা°ব°ড়ে যায় মৃত্তিকা।

চলবে……

#অনুভূতিরা_শব্দহীন
লেখনীতে: #ইসরাত_জাহান_তন্বী

তৃতীয় পর্ব

রাত সাড়ে ১০ টার কিছুক্ষণ পর বাসায় এসে পৌঁছায় মৃত্তিকা, তানজিম আর ইমতিয়াজ। তানজিম সোজা নিজের রুমে চলে যায়। বোনদের চলে যাওয়া আর মায়ের অসুস্থতা এই বাচ্চা ছেলেটাকেও অসুস্থ করে দিচ্ছে। বয়স আর কত হবে? মাত্রই তো ১৯ ছেড়ে ২০ এ গেল। ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে, এ সময়টা অন্যদের মতো হাসি-আনন্দে যাচ্ছে না ওর।

ইমতিয়াজ রুমে যাওয়ার সময় আবারো ফিরে আসে। মৃত্তিকাকে বলল,
“লোকটা কে ছিল?”

মৃত্তিকা প্লেট ধুয়ে এনে টেবিলে রাখছিলো। ইমতিয়াজের কথায় থমকে যায়। মৃত্তিকার নিরবতায় ইমতিয়াজের কৌতুহল বাড়ে।

“আমার বাবা উনি।”

কথাটা শুনে ইমতিয়াজ ছোটখাটো ধা°ক্কা খায়। বাবা হয়ে মেয়ের সাথে এমন ব্যবহার কিভাবে সম্ভব।

“আপনার বাবা?”
“দেখুন, উনাকে নিয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাইছি না।”

ইমতিয়াজ চলে যেতে নিলে মৃত্তিকা পিছু ডেকে বলল,
“আপনি তো দুপুরেও খাননি, এখন খেয়ে নিন। আমি ডিম ভেজে আনছি।”

ইমতিয়াজ কিছু বলে না, রুমে চলে যায়। তাহমিনা প্রতিরাতে ওকে খাইয়ে দিতো। ক্লান্ত হয়ে অফিসে থেকে ফিরে দেখতো তাহমিনা খাবার সাজিয়ে রেখেছে। একপ্লেটে দুজনে খেতে বসতো। গত দেড়বছরে এটা ওর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

বিছানায় শুয়ে পড়লো ইমতিয়াজ। একটা হাত মেলে দিয়েছে। এই হাতের উপর তাহমিনা শুয়ে পড়তো। তারপর ধীরে ধীরে কাছে চলে আসতো দুজনে। ওর বুকে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকতো ওর মিনা, ওর দুষ্টুমির স্পর্শগুলোতে লজ্জায় মুখ লুকাতো।

ও অনুভব করছে তাহমিনা এসে ওর হাতের উপর শুয়েছে।
“আমার তাজ, খাবে না? আমিও তো খাইনি।”

“মিনা।”
লাফ দিয়ে উঠে বসে ইমতিয়াজ। তাহমিনার ডাকা “আমার তাজ” কথাটা যে শুনেছে ও।

“ভাইয়া, কি হয়েছে?”

জোরে চিৎকার করায় তানজিম এসে হাজির হয়েছে। ইমতিয়াজ স্বাভাবিক ভাবে বলল,
“কিছু না।”
“ভাইয়া, খেতে আসুন।”

শেষ পর্যন্ত খেতে যায় ইমতিয়াজ। তার মিনা যে তাকে খেতে বলেছে। মনের ভুলটাকে জোরপূর্বক সত্য বলে ধরে নিলো।

খাবার টেবিলে বসে তানজিম বলল,
“আপু, কালকে একটু আমার সাথে ভার্সিটিতে যেতে পারবে? আমার এইচএসসির মার্কশীট জমা দেয়া হয় নাই।”
“কালই?”
“হুম, না দিলে ভর্তি বাতিল হয়ে যাবে।”

মৃত্তিকা আর কিছু বলার আগেই ইমতিয়াজ বলল,
“আমি নিয়ে যাবো।”
______________________________________

“জুহাইব আজকে টিকেট নিয়ে এসেছে, বাবা। আগামী সপ্তাহে আমরা চলে যাবো।”

আফরোজার কথায় আব্বাস সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“চলে তো যেতেই হয়। এই পৃথিবীর নিয়মই তো এটা।”

আফরোজা এসে বাবার কাছে বসে বলল,
“বাবা প্লিজ, এভাবে হায়°হু°তাশ করো না। আমার কষ্ট হয়।”

আব্বাস সাহেব মেয়ের মাথায় হাত বুলালেন। এই মেয়েটাই তাকে প্রথম বাবা ডাক শুনিয়েছিল, আধো আধো বুলির সেই ডাক আব্বাস সাহেব ভুলেননি। এখন মেয়ে বড় হয়েছে তাই নিজের সংসারে যেতেই হবে।

আফরোজার কপালে চুমো দিয়ে বলল,
“আহনাফের অবস্থাটা দেখেছিস? ওকে কিভাবে সামলে রাখবো আমি?”
“চিন্তা করো না তুমি। আহনাফ নিজেই সামলে থাকবে।”

আফরোজা কিছুক্ষণ আহনাফের ঘরের দরজার দিকে চেয়ে থেকে বলল,
“যে ছেলেটা দায়িত্বের খাতিরে এরকম মানসিক অবস্থায় কলেজে যেতে পারে, সে ভুল সিদ্ধান্ত নিবে না।”
“হুম, তাই যেন হয়।”

আহনাফ নিজের ঘরেই আছে। কলেজ থেকে এসে এখানে পড়েছে তো পড়েছেই। মানসিক অবস্থার সাথে শারিরীক অবস্থাও খারাপ, হুট করে ঠান্ডা লেগে গেছে, হালকা জ্ব°রও আছে বোধহয়।

আফরোজা ওর ঘরে আসলো। এতোক্ষণ চোখ খুলে রাখলেও শব্দ শুনে চোখ বন্ধ করলো আহনাফ। কপালে হাত দিয়ে জ্ব°র বুঝতে পারলো আফরোজা। জল প°ট্টি দিলো, শরীর মুছে দিলো, কিন্তু আহনাফ উঠলো না। ঘুমন্ত মানুষকে জাগানো যায়, জেগে থাকা মানুষকে তো আর জাগানো যায় না।

কপালে ভেজা রুমালটা দিয়ে আফরোজা নিজের রুমে চলে আসলো। প্রচন্ড খারাপ লাগছে ভাইয়ের জন্য, কান্নাও পাচ্ছে। বাবা-ভাইকে এ অবস্থায় ফেলে দূর ইউরোপে থাকতে পারবে ও? দম ব°ন্ধ হয়ে যাবে তো।

জুহাইব ল্যাপটপ নিয়ে বসে ছিল। আফরোজাকে দেখে ল্যাপটপ রেখে দিলো। আফরোজা ওর পাশে বসতেই বলল,
“আশকিম (আমার ভালোবাসা)?”

আফরোজা অসহায় চোখে তাকালো। জুহাইব ওর গালে হাত দিয়ে বলল,
“কি হয়েছে?”

আফরোজা জুহাইবের বুকে মাথা রেখে বলল,
“আমি দেশে থাকি? তুমি বরং চলে যাও। বাবা আর আহনাফকে এভাবে রেখে যেতে ইচ্ছা করছে না।”

এক নিশ্বাসে কথাটা বলে ফেলে সে। জুহাইব ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ওর অবস্থাটা বুঝতে পারছে। মেয়েটা যে কাঁদছে সে অনুভূতিটাও হলো তার।

আফরোজারা মাথা তুলে ওর কপালে চুম্বন করে বলল,
“ঠিক আছে, তুমি থাকো। (একটু থেমে) একা একা ফিরতে পারবে তো?”
“খুব পারবো।”

কান্না ভেজা চোখে খুশির ঝিলিক দেখা দিলো। জুহাইব ওর চোখ মুছে দিয়ে বলল,
“পরে আমার জন্য কাঁদলে কিন্তু আসতে পারবো না। যা আদর আছে এখনি করে দাও।”

জুহাইবের কথায় হেসে ওর বুকে একটা মা°ই°র দিলো আফরোজা। এই লোকও পারে, শুধু অসময়ে প্রেম জেগে উঠে। আফরোজা উঠে যেতে নিলে জুহাইব ওকে টেনে কাছে নিয়ে আসে, আফরোজাও এতে সম্মত হয়।

ভোর ৫ টা,

নামাজ শেষে কোরআন তেলাওয়াত করছে সারাহ্। হঠাৎ একটা বি°ক°ট শব্দে চমকে উঠে। কালরাত থেকে বেশ কয়েকবার এমন শব্দ হয়েছে। সামিহা সবেমাত্র বিছানা নিয়েছিল, লাফিয়ে উঠে বসে সেও।

“পুরো রাত ঘুম হয়নি এই শব্দে, এখন আবার কেন?”

সারাহ্ কোরআন বন্ধ করে রেখে বি°র°ক্তি নিয়ে বেরিয়ে যায়। জাহাঙ্গীর সাহেবের রুমের সামনে গিয়ে বলল,
“বাবা।”

এক ডাকেই জাহাঙ্গীর সাহেব বেরিয়ে এলেন। হয়তো বের হওয়ার জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। নার্গিস পারভিনও বেরিয়ে এলেন। সারাহ্ বলল,
“উপরের তলায় রাত থেকে এতো সাউন্ড হচ্ছে কেন? বাড়িঘর ভে°ঙ্গে ফেলবে নাকি?”
“দেখছি আমি।”

জাহাঙ্গীর সাহেব বেরিয়ে গেলেন। সারাহ্ সদর দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। জাহাঙ্গীর সাহেব প্রথমে দারোয়ানকে বিষয়টা জানালেন। তারপর উপরের তলায় ওদের ফ্ল্যাটের বরাবর ফ্ল্যাটে গেলেন।

বেশ কয়েকবার কলিং বেল বাজানোর পর মধ্যবয়সী এক লোক এসে দরজা খুলল। ক°র্ক°শ কন্ঠে বলল,
“কি চাই?”

জাহাঙ্গীর সাহেব কিছু বলার আগেই দারোয়ান বলল,
“শরীফ সাহেব, আপনার বাসায় নাকি শব্দ হচ্ছে?”

শরীফ চেঁচিয়ে উঠে,
“তো হচ্ছে, আমার বাসায় হচ্ছে। উনার সমস্যা কি?”
“নিচের ফ্ল্যাটে শব্দ যাচ্ছে, আমাদের অসুবিধা হয়।”

জাহাঙ্গীর সাহেবের কথায় শরীফ সোজা জবাব দিলো,
“তো বাসা ছেড়ে দেন। চলে যান অন্য কোথাও।”

মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিলো। জাহাঙ্গীর সাহেব প্রচন্ড বি°র°ক্ত হলেন। ন্যূনতম ভদ্রতা নেই লোকটার।

শরীফ কাল বাসায় এসেই রাগে জিনিসপত্র ভা°ঙ°চু°র করছে। কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে কথা বলে, হঠাৎ করে চেঁ°চামেচি করে আর অতিরিক্ত রাগটুকু ফার্নিচার আর ঘরের ছোটখাটো জিনিসপত্রের উপর ঝাড়তেছে। রাগটা কি মৃত্তিকার উপর নাকি ইমতিয়াজের উপর তা সে নিজেও জানে না।

জাহাঙ্গীর সাহেব বাসায় এসে বললেন,
“ফালতু এক লোক থাকে।”

সারাহ্ উৎ°ক°ন্ঠা নিয়ে বলল,
“কি বলেছে বাবা?”
“বলেছে ডিস্টার্ব হলে বাসা ছেড়ে চলে যাও।”
“কি? এভাবেও কেউ বলে?”

নার্গিস পারভিন বললেন,
“বাদ দাও, যা খুশি হোক। একটু রয়েসয়ে যাবো, তাও এই অসভ্য মানুষটার সাথে আর দেখা করারই দরকার নেই।”
“হ্যাঁ, আম্মু ঠিক বলেছে।”
মাকে সমর্থন করে বলল সারাহ্।
______________________________________

ফজরের নামাজটা মসজিদে পড়ে ফাঁকা রাস্তায় একা একা হাঁটছে ইমতিয়াজ। কতবার ভোরে তাহমিনাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে, অথচ আজ এমন একা হয়ে গেছে সে।

ওদের বিয়েটাতেও একটা নাটকীয়তা ছিল। ব্যাচেলার বাসার এতিম ছেলেটা তো জানে বাবা-মায়েরা মেয়ের জন্য সবসময় পারফেক্ট একজন ছেলে চায়, যা ইমতিয়াজ নয়। এজন্য বিয়ে নিয়ে ভাবতেই চায়নি সে, কখনো কাউকে পছন্দ হলেও অনুভূতিকে পাত্তা দেয়নি।

ইমতিয়াজের এক বন্ধুর বাবার সাথে লুৎফর রহমান মেয়ের সাথে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে নিজে এসেছিলেন। অবাকের পাল্লা ভারী হয়েছিল ইমতিয়াজের। বাবা-মা ছাড়া টিউশন আর পার্ট টাইম জব করে নিজের অনার্সটুকু শেষ করেছিল সে। মাস্টার্স করার ইচ্ছা থাকলেও করা হয়নি। ছোটখাটো চাকরি করা ইমতিয়াজ যেদিন তাহমিনাকে বিয়ে করে সেদিন লুৎফর সাহেবের অনুরোধে তাদের সাথেই থাকতে শুরু করে সে।

লুৎফর সাহেব মেয়ের জন্য সাধারণ একটা ছেলে চেয়েছিলেন, কেন এমন ইচ্ছা ছিল তা আজও জানা হয়নি ইমতিয়াজের।

ধীরে ধীরে মেয়ের জামাই থেকে বাড়ির ছেলে হয়ে উঠে সে, বড় ছেলে। ঘটনা তো বেশিদিন আগের নয়, ১৮ কি ১৯ মাস হবে।

প্রথম যখন তাহমিনা নিজের মধ্যে আরেকটা নতুন অস্তিত্ব খুঁজে পায় তখন সর্বপ্রথম ইমতিয়াজকেই জানায়। সেদিনের মুহূর্তগুলো ভুলে যাওয়ার নয়।

ইমতিয়াজের হাতটা নিজের উদরে রেখে তাহমিনা বলেছিল,
“তোমার জন্য আরেকটা ভালোবাসা আসছে।”
“পুরো পৃথিবীকে জানিয়ে দাও মিনা।”
“আমার তাজ, সবাই জানবে।”

ছি°ন্ন°বিচ্ছি°ন্ন কথাগুলো ভাবতে ভাবতে রাস্তায় পড়ে থাকা ইটের টুকরায় লা°থি দিয়ে ইমতিয়াজ। টুকরাটা কিছুদূর গড়িয়ে গড়িয়ে গিয়ে থেমে যায়। বড় একটা নিশ্বাস ফেলে সে আবারো হাঁটতে থাকে।
______________________________________

সকাল দশটায় ঘুম ভাঙে আহনাফের। জ্ব°রের তীব্রতা বেড়েছে, শরীরে কাঁ°পুনি হচ্ছে৷ ফোন হাতে নিয়ে সময় দেখে উঠার ইচ্ছা হলেও শরীরটা সায় দিলো না।

আফরোজা ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এসেছে।

“আপু, এখন..”

আহনাফের কথা শেষ হওয়ার আগেই আফরোজা রেগে বলে,
“১০৪ ডিগ্রি জ্ব°র নিয়ে পড়ে আছো আর আমি এখানে কেন সেটা জানতে চাচ্ছো?”

আহনাফ চুপ করে। আজকের ক্লাস মিস হয়েছে, কিছুদিন পর ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের টেস্ট এক্সাম শুরু হবে আর ও এখন ক্লাসে যেতে পারলো না।

আফরোজা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“একটু বাঁকা হয়ে শুয়ে পড়, মাথায় পানি দিয়ে দিই।”

আহনাফ প্রতিবাদ করে না। বিছানায় আড় হয়ে শুয়ে পড়ে। আফরোজা ওর মাথায় পানি ঢালছে।

ভার্সিটিতে থাকতে একবার এমন জ্ব°র হয়েছিল আহনাফের৷ তাহসিনার কি ব°কাটাই না খেয়েছিল সেদিন। তারপর তাহসিনা ওর রুমে এসে ওকে খাইয়ে দিলো, মাথায় পানি দিয়ে গা মুছে দিলো।

ঘটনাগুলো আজও পুরোনো মনে হয় না। এইতো সেদিনের ঘটনা যেন সব। আহনাফ চোখ বন্ধ করে, ওই মানুষটা আর আসবে না এটা ভাবতেই পারছে না সে। ভুলে যাওয়া কি এতো সহজ?

“তুই কাঁদছিস?”

আফরোজার কথায় চমকে উঠে আহনাফ। কখন ওর চোখ দিয়ে পানি বেরিয়েছে তা ও নিজেই জানে না।

আফরোজা কিছু না বলে বেরিয়ে চলে যায়। কান্না যে তারও পাচ্ছে, কিন্তু ভাইয়ের সামনে কাঁদবে না সে। জুহাইব রুম থেকে বের হয়ে ড্রইংরুমে আফরোজাকে কাঁদতে দেখে এগিয়ে যায়। জুহাইবকে দেখে কান্নার রে°শটা বাড়ে আফরোজার।
_____________________________________

কিছু বই কিনতে নীলক্ষেত এসেছে সারাহ্। সকাল সকাল এসেছে যেন জ্যাম না পড়ে, তবুও ঢাকা বলে কথা। জ্যামে, গরমে অ°স্থির হয়ে উঠেছে।

কয়েক দোকান খুঁজে ওর পছন্দমতো কিছু বই পেল। মূলত চাকরির প্রস্তুতির বই কিনতে এসেছে সে। বইগুলো নিয়ে কা°টাবন রোড ধরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে যায় একটু একা ঘুরাঘুরি করবে বলে।

রিকশা নিয়ে চলে গেল দোয়েল চত্বর। সেখানে রিকশা থেকে নেমে ফুটপাত ধরে হাঁটছে। সামিহার ডিপার্টমেন্টটাও এখানে, গণিত বিভাগে ভর্তি হয়েছে সে।

কেন্দ্রীয় শ°হী°দ মিনারের কাছে এসে রাস্তা পার হওয়ার সময় রাস্তার মাঝেই ব্যাগ ছিঁ°ড়ে বইগুলো মাটিতে পড়ে যায়। সারাহ্ হাঁটু গেড়ে বসে তাড়াহুড়ো করে বইগুলো তুলতে লাগলো। মাঝরাস্তায় এমন ঘটনায় রেগে গেছে সে। আশেপাশে এতো এতো মানুষ ওকে দেখছে।

হঠাৎ মানুষের চেঁ°চামেচি অনুসরণ করে তাকিয়ে মাত্রই বাঁক নেয়া মাইক্রোবাসটা ওর দিকেই আসছে। উঠে দাঁড়াতেই তড়িৎ গতিতে কেউ এসে ওকে ছি°টকে নিয়ে ফেললো একপাশে। শক্ত কং°ক্রি°টের ফুটপাতে বেশ ভালোই ব্য°থা পেয়েছে সারাহ্, সাথের লোকটাও বোধহয় আরো ব্য°থা পেয়েছে।

সারাহ্ উঠে বসলো, চশমাটা খুলে কোথায় পড়েছে খুঁজে পাচ্ছে না। অনবরত হাতড়াচ্ছে সে, লোকটা ওর হাতে চশমাটা দিয়ে ধ°ম°কের সুরে বলল,
“চশমা পড়েও চোখে দেখেন না?”

মাইক্রোবাসটাও থেমেছে। ড্রাইভার নেমে এসে ওকে বলল,
“এখানে গাড়ি মোড় নেয় জানেন না? এমনে রাস্তায় কেউ বসে থাকে?”

ইমতিয়াজ দাঁড়িয়ে জামা কাপড় ঝাড়তে থাকে। সারাহ্-কে বাঁচানো এই লোকটা ইমতিয়াজই। তানজিমকে নিয়ে ভার্সিটিতে এসেছে, ডিপার্টমেন্টের বাইরে এসে সারাহ্-কে এ অবস্থায় দেখে বাঁচানোর জন্য ম°রিয়া হয়ে উঠে সে। না জানি কোথায় কার মেয়ে, কার স্ত্রী বা কার বোন চলে যায়।

সারাহ্ উঠে দাঁড়ায়। তাৎক্ষণিক এক ঘটনায় সে বেশ লজ্জা পেল। আশেপাশে লোক জড়ো হয়েছে। ইমতিয়াজ সারাহ্-র বইগুলো তুলে এনে ওর সামনে রেখে বলল,
“এই কয়টা বইয়ের জন্য জীবন দিয়েন না। বেঁচে থাকলে বই জীবনে বহুত পড়তে পারবেন।”

ইমতিয়াজ চলে গেল। ধীরে ধীরে ভীড়টাও কমতে থাকলো। সারাহ্ বইগুলো তুলতে তুলতে আবারো তাকালো অচেনা লোকটির দিকে। ওকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন ঝুঁ°কিতে ফেলে দিলো কেউ একজন অথচ ও থ্যাংকস জানানোর সময়টুকুও পেল না।

বইগুলো কোনোরকম নিয়ে দৌড়ে ইমতিয়াজের পিছুপিছু গেল সারাহ্।

“শুনুন, এক্সকিউজ মি, এইযে হিরো। (একটু থেমে) এই যে একটু আগে ফুটপাতে পড়ে গেছিলেন ওর ভাইয়া।”

ইমতিয়াজ ফিরে তাকালো। চোখ মুখ কুঁচকে বলল,
“জি, আমাকে কিছু বলছেন?”

সারাহ্ হাঁ°পাতে হাঁ°পাতে বলল,
“হ্যাঁ, কখন থেকে ডাকছি।”
“কেন?”
“থ্যাংক ইউ, আমাকে বাঁচানোর জন্য। আজকাল কারো জন্য কেউ এমন করে না।”

ইমতিয়াজ আলতো হাসলো। বলল,
“যখন তার কেউ থাকে না, ভালোবাসাগুলো মাঝরাস্তায় বিলীন হয় তখন হয়তো মানুষ এমনই করে।”

সারাহ্ অবাক হয় ইমতিয়াজের কথায়। মাথামু°ণ্ডু খুঁজে পায়না, অর্থটাও বুঝতে পারে না। ইমতিয়াজ চলে গেল, সারাহ্ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।

চলবে……

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ