#অনাকাঙ্ক্ষিত_প্রণয়
#তানভী_ইসলাম_তিশা
#সূচনা_পর্ব
চাকু টা ভুল জায়গায় ধরেছেন ভা ভা ভাইয়া। মানুষ চাকু গলায় ধরে হুমকি দেয় কিন্তু আপনি চাকু মাথায় ধরে আছেন। ভুল টা শুধরে সঠিক জায়গায় চাকুটি ধরুন। আমি এতো দিন শুনে এসেছি গুণ্ডারা মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দেয় কিন্তু আপনি চাকু ঠেকিয়ে হুমকি দিচ্ছেন। কী আশ্চর্য! ঠিকঠাক ভাবে গুন্ডামি করাটাও শিখেন নি দেখি।
কাঁপাকাঁপা গলায় কথাগুলো বলল এক রমণী। এই মুহুর্তে যার মাথায় চাকু ঠেকিয়ে তারই পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি যুবক। যুবকটি ডান হাত দিয়ে রমণীটির গলা প্যাঁচিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়েছে আর বাম হাত দিয়ে মাথায় চাকু ধরে আছে। রমণীর পিঠ গিয়ে ঠেকেছে যুবকটির বক্ষস্থলে। তার দলের বাকি লোকেরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হাসপাতালের প্রতিটি কোণায় কোণায়। যুবকটির পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আরও দুটো হ্যাংলা-পাতলা যুবক। এই মুহুর্তে যারা রমণীটির কথায় হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। তার পাশে দাঁড়ানো যুবক দুটির পানে যুবকটি রক্তিম চোখে তাকায় অতঃপর ক্রুদ্ধ কন্ঠে উচ্চারণ করে…
__এই মেয়ে এইই! বেশি জ্ঞান দিতে আসবি না। যা বলছি তা তাড়াতাড়ি কর নাহয় এখানেই জ্যান্ত পু্ঁতে রেখে দেব।
__ভাইয়ায়য়! আমার কাছে তো কিছু নেই। ব্যাগ বাসায় রেখে এসেছি আর ব্যাগের ভেতরে টাকা রাখা। ফোনটাও সাথে নেই কেবিনে ফেলে রেখে এসেছি। আপনি আমাকে ত্রিশ মিনিট সময় দিন আমি বাসা থেকে ব্যাগ আর কেবিন থেকে মোবাইল এনে দিচ্ছি। এই যাবো আর এই আসবো শুধু ত্রিশ মিনিট অপেক্ষা করবেন, পারবেন না অপেক্ষা করতে? আর একটা কথা ভাইয়ায় আপনি আমাকে জ্যান্ত পুঁতে দিতে পারবেন না কারণ এখানে টাইলস আছে।
ভয়ে ভয়ে কথা গুলো বলে থামল রমণীটি। যুবকটি গর্জন করে বলে…
__আমাকে বলদ মনে হয় তোর? জোকার পেয়েছিস আমাকে? তুই যা যা বলবি আমি সেটাই শুনব?
মেয়েটি মেকি হাসি দিয়ে বলে…
__তা কেন হবেন ভাইয়ায়! আপনি কী গরু যে আপনাকে বলদ মনে হবে। আপনি তো জলজ্যান্ত মানুষ।
যুবকটি জোরে ধমক দেয়। মেয়েটি দুই হাতে কান চেপে ধরে…বেশি পটর পটর করবি না। মেয়ে মানুষের পটর পটর আমার ভালো লাগে না। আর কী ভাইয়া ভাইয়া ডেকে মুখে ফেনা তুলছিস। আমি তোর কোন জন্মের ভাই লাগি?
মেয়েটি নিজের মাঝে একটু সাহস সঞ্চয় করে বুকে ফু দিয়ে বলে….সব সম্পর্ক যে জন্ম থেকে হতে হবে বিষয়টি এমন না ভাইয়া। কিছু রক্তহীন সম্পর্কও রক্তের সম্পর্কের থেকেও খাঁটি হয়।
যুবকটি প্রচুর বিরক্তবোধ করে। ইচ্ছে করে এখুনি চাকু দিয়ে মাথার খুলি উড়িয়ে সারাজীবনের মতো চুপ করিয়ে দিতে। কোনো রকম নিজেকে সংযত রাখে।
__বেশি কথা বলবি না! আর ভাইয়া ডাকতে না করলাম না? আরেকবার ভাই ডাকবি তো চিরকালের জন্য তোর মুখ বন্ধ করে দেব। যা আছে সব বের করে দে। যত তাড়াতাড়ি সব বের করবি তত তাড়াতাড়ি ছাড়া পাবি। এখন কী কী আছে বের কর।
__সত্যি কথা বলছি ভা… সরি, সরি! সত্য কথা বলছি আংকেল! আমার কাছে কিচ্ছু নেই। আমার আম্মু অসুস্থ, ফোনটা আম্মুর কেবিনে রেখে আসছি। আপনি বললে ফোনটা এনে দিচ্ছি কিন্তু টাকা পয়সা একটাও সাথে নেই।
যুবকটি বেশ বিরক্ত হয়। কার পাল্লায় পড়ল সে বকবক করে মাথা খেয়ে নিচ্ছে। ভাইয়া ডাক ঠিক ছিল আংকেল ডাক অপমানজনক। তার সাথে আংকেল ডাক যায় না আর এই মেয়ে কি যা তা বলছে।
__এই আমাকে দেখে তোর কী আংকেল মনে হয়? আমার বয়স কী আংকেল হবার মতো ?
মেয়েটি মুখ হা করে অবাক হবার ভান করে শুধায়…তওবা, তওবা। আপনার বয়স আংকেলের মতো হতে যাবে কেন? আপনি তো ইয়াং এখনো।
__তাহলে আংকেল ডাকলি কেন?
মেয়েটি দুঃখী দুঃখী ভাব করে ঠোঁট উল্টে বলে… কিছু করার নেই। আপনি ভাইয়া ডাকতে বারণ করলেন তাই আংকেল ডাকলাম। আমার ছোট থেকে একটা স্বভাব আছে সবাইকে সম্বোধন করা, তাই…
__এই চুপ চুপ! আর একটাও কথা বলবি না যা এখান থেকে। এই কেউ এ কে আমার চোখের সামন থেকে সড়া।
নিজের কাছ থেকে মেয়েটিকে ঝটকা মেরে সড়িয়ে দিয়ে যুবকটি বলল। হাতের চাকু রাগে মেঝেতে আঁচড়ে ফেলে দিল। স্টিলের চাকুটি টাইলসের সাথে লেগে ঝনঝন শব্দের তৈরি করল।
__কী হলো ভাই…
__এই মেয়ে এখান থেকে যেতে বলছি না? ভাগ এখান থেকে, দূর হ। এখানে আর এক সেকেন্ড থাকলে ভালো হবে না বলে দিলাম কিন্ত।
মেয়েটি আর কথা বাড়ায় না। হাসপাতালের করিডোর ছেড়ে আম্মুর কেবিনে চলে যায়৷ যুবকটি রাগে মাথার চুলগুলো শক্ত করে টেনে ধরে। রাগ নিবারণ করার প্রায়স।
তিনদিন থেকে হৃদিকার আম্মু হাসপাতালে। হঠাৎ অসুস্থ হবার কারণে গত পরশু হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। হৃদিকাদের বাসা থেকে হাসপাতাল খুব বেশি দূর না। বাসা থেকে হাসপাতালে আসতে দশ মিনিট সময় লাগে। হৃদিকা রাতে মায়ের সাথে থাকে সকাল হলে বাসায় চলে যায়। আজও তার ব্যতিক্রম নয় সকালে হৃদিকা বাসায় যাবার সময় হঠাৎ একদল গুন্ডা হাসপাতালে হানা দেয়। তিনজন এসে হৃদিকাকে ঘিরে ধরে তন্মধ্যে একজন হৃদিকার মাথায় চাক্কু ধরে হুমকি দেয়। হৃদিকা বেশ অবাক হয়৷ তার মুখ অটোমেটিক হা হয়েছে। এতদিন সে নাটক-সিনামায় দেখে এসেছে মাস্তানেরা পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দেয় আর এই বলদ গুণ্ডার কাণ্ড দেখো চাক্কু ঠেকিয়ে হুমকি দিচ্ছে। কী আশ্চর্য! মনে মনে অসংখ্য গালি দেয়। অশিক্ষিত গুন্ডা! আগে গুন্ডামি বিষয় ভালোভাবে পড়াশোনা করিস তারপর গুন্ডামি করতে আসিস৷ এভাবে অশিক্ষিত সেজে মাস্তানী করতে আসলে মানুষ তো দূর মানুষের চুলডাও ভয় পাবে না। কিন্তু মুখে কিছু বলে না।
__বস! মাইয়াডা কিন্তু ভুল কিছু কয় নাই, সঠিক কথায় কইছে। আপনে চাক্কু মাথায় ধরলেন ক্যান? চাক্কু গলায় ধরন লাগত।
সুমনের কথায় যুবকটি বেশ রেগে যায়…এখন তোর কাছ থেকে জ্ঞান নেয়া লাগবে আমার? আমার কাছে পিস্তল ছিল না বাসায় রেখে এসেছি তাই উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে চাকু ধরেছি।
সুমন জিভে কামড় দিয়ে শুধায়…
__ছিঃ ছিঃ বস কি যে কন না। আপনে হইলেন বস আর আমি হইলাম আপনের কর্মচারী। আমার থেকে আপনে জ্ঞান নিবেন ক্যান? আপনে তো এমনেই বহুত জ্ঞানী মানুষ। না মানে আমি কইছিলাম যে উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগাইছেন ভালা কথা কিন্তু চাকু টা মাথায় না ধরে গলায় ধরন লাগত। যাকগা সেটা বড় কথা না বড় কথা হইলো আপনে এই লাইনে নতুন তাই হয়তো বুঝবার পারেন নাই। আস্তে আস্তে শিখে যাইবেন। জীবনে প্রত্তম চাক্কু হাতে নিছেন তো তাই বুঝবার পারেন নাই। বড় বস আমাগো আগেই বইলা দিছে আপনে এই বিষয় কিছু জানেন না তাই যেন আপনারে একলা কোথাও না ছাড়ি।
বস লোকটি নীরবে সব কথা শুনল। সে কখনো এসব গুন্ডামী করেনি৷ আজ প্রথম মাস্তানি করতে এসেছে। তার বড় ভাই এগুলো লাইনে বেশ পাঁকা কিন্তু সে কাঁচা। আজ সে বড় ভাইয়ের কথাতেই হাসপাতালে হামলা করতে এসেছে। অনেক আগে থেকেই বড় ভাই তাকে এই পথে আনতে চেয়েছিল কিন্তু আনতে পারেনি কারণ যুবকটির এসব গুন্ডামী মাস্তানী পছন্দ নয়। বড় ভাইও নাছর বান্দা তাকে এই পথে পরিচালিত করবেই করবে তাই বাধ্য হয়ে আসতে হয়েছে কিন্তু মেয়েটার সামনে এভাবে লজ্জিত হতে হবে কে জানত? আর একটু হলেই মেয়েটা বকবক করে কানের পোঁকা আলগা করত। কী মেয়েরে বাবা মুখ তো নয় যেন ভাঙ্গা ক্যাসেট।
______________
আসসালামু আলাইকুম আংকেল! ভালো আছেন?
হঠাৎ অল্প পরিচিত একটি কন্ঠে তুষার সামনে তাকায়। সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে দেখে তার মেজাজ সপ্তম আকাশে উঠে। আবার এই পাগল মেয়ের সাথে দেখা।
__এই মেয়ে তুমি এখানে কেন? আবার আংকেল ডাকছো!
মেয়েটি অবাক হবার ভান করে শুধায়….সেকি আংকেল আপনি দেখছি পোল্ট্রি মুরগীর থেকেও ভীষণ পল্টিবাজ।সেদিন হাসপাতালে তুই- তুকারি করলেন আর আজ তুমি।
একটু থেমে সন্দেহজনকভাবে বলে…ব্যাপার কী আংকেল তুই থেকে তুমিতে কনভার্ট হবার কারণ?
শুরু হয়ে গেছে পাগলের পাগলামি। এর সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই অযথা নিজের সময়ের অপচয়। সেদিন কোন ভুলে যে এই পাগলের খপ্পরে পড়েছিল। গুন্ডামিকে হাজার সালাম। তার দ্বারা এসব গুন্ডামি মাস্তানি সম্ভব না।
সেদিন বাসায় ফেরার পর….
ডাইনিং টেবিলে পরিবারের সকলে উপস্থিত আছে। সামছুল হক , তাহমিনা হক , তুফান হক , সুরাইয়া আক্তার আর পাঁচ বছরের জাওয়াদ হক। সকলে আপন মনে খেতে ব্যস্ত। খাওয়ার ফাঁকে হঠাৎ তুষার হক বড় ভাই তুফান হকের উদ্দেশ্যে বলে….
__দেখো ভাইয়া এসব গুন্ডামি মাস্তানি আমাকে দিয়ে হবে না। তুমি প্লিজ আমাকে আর এই নিয়ে জোর করো না। তুমি আছো বাবা আছে তবু কেন আমাকে এসবে জড়াতে চাচ্ছো?একে তো মানুষের সামনে ভালো মানুষের নাটক করে চলো তলে তলে এসব কারবার চালাও। প্লিজ! আমাকে এই লাইনে ঢোকানোর জন্য ফোর্স করিও না।
তুষার এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল। তুষারের কথায় সম্মতি জানিয়ে সুরাইয়া গম্ভীর কন্ঠে বলে…
__নিজে খারাপ পথে গেছো ঠিক আছে তাই বলে সবাইকে খারাপ পথে নিয়ে যাবে এটা কোনো ভাবেই কাম্য নয়। দেখো তুফান তোমার যা ইচ্ছে হয় তুমি করো কেউ বারণ করবে না কিন্তু তুষার কিংবা জাওয়াদ কে এসবে জড়াবে না।
তাহমিনা হক বলেন…আমারও এক কথা তুফান। তুই তোর বাপ যা খুশি কর কিন্তু আমার ছোট ছেলে আর নাতিকে এসবে টানবি না। তাহলে কিন্তু আমি অনর্থক ঘটিয়ে ফেলব। তোকেও বা কী বলছি আমি! আসল দোষ তো গোড়ায়। গোড়া ঠিক থাকলে আগাল এমনি ঠিক হয়। তোর বাপ তোকে কু-পথে নিয়ে গেছে আটকাতে পারিনি। তোর বাপকে বলে দিস তুষারকে এসবে টানলে পরিস্থিতি খুব খারাপ হবে।
সামছুল হক নীরবে তার সহধর্মিণীর কথা শুনলেন কিছু বললেন না। তার সাথে প্রায় ৫ বছর থেকে তাহমিনা কথা বলেন না। কথা না বলার অবশ্য যথেষ্ট কারণ আছে। তাহমিনা তাকে হাজার বার খারাপ পথ থেকে ভালো পথে আনার চেষ্টা করেছেন কিন্তু তিনি ফেরেননি। উল্টো বড় ছেলেকেও এই পথে টেনে নিয়ে গেছেন। তাহমিনা চেয়েও আটকাতে পারেননি। কিন্তু আর নয় তিনি কিছুতেই ছোট ছেলে আর নাতিকে এসবে জড়াতে দিবেন না।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠায় তুষারের ভাবনার সুতো ছিঁড়ল।
__হ্যাঁ তুফান ভাইয়া বলো।
তুফান নাম শুনে হৃদিকা মুখ ভেংচি কাটে। নামের কী ছিড়ি! তুষার কথা বলা শেষ করলে হৃদিকা জিজ্ঞেস করে… তুফান কে?
__আমার বড় ভাই!
__আপনার নাম ঝড়, টর্নেডো নাকি সাইক্লোন ?
তুষার প্রচন্ড ক্ষেপে যায়। তুষার প্রথমে ভেবেছিল এই মেয়ে হাফ পাগল এখন মনে হচ্ছে এই মেয়ে পুরো পাগল। তুষার ক্ষেপাটে স্বরে বলে…এই মেয়ে মুখে কিছু আটকায় না? যা মুখে আসে বলে দাও। আমার নাম ঝড়, টর্নেডো,সাইক্লোন হতে যাবে কেন? আমার বাবা-মা সুন্দর দেখে একটা নাম দিয়েছে।
হৃদিকা আবার মুখ ভেংচি কেটে বলে… নাহ, আমি আরও ভাবলাম বড় ভাইয়ের নাম তুফান আপনার নাম ঝড়, টর্নেডো কিছু একটা হবে। যাকগে আপনার পরিবারের কোনো সদস্যর নাম ঝড়, টর্নেডো, সাইক্লোন আছে নাকি?
তুষার ক্ষিপ্ত স্বরে বলে…আর একটা বাজে কথা বললে এখানেই পুঁতে রেখে দেব।
হৃদিকা তুষারের কথায় পাত্তা দেয় না। গা ছাড়া ভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করে…তো আংকেল আপনার নাম কী?
তুষার বেশ গর্বের সাথে বলে…
__তুষার!
হৃদিকা ভ্রু গুটিয়ে বলে…এই আপনার কোনো বোন আছে?
তুষার বিরক্তি কন্ঠে দাঁত পিষে বলে…না,কেন?
__নাহ, আমি আরও ভাবলাম আপনার হয়তো বোন আছে যার নাম মেঘ, বৃষ্টি,বজ্রপাত….
__শাট আপ ইডিয়েট!
তুষার প্রচন্ড জোরে চিৎকার করে বলে। হৃদিকা বুকে থু থু দিয়ে বলে…এভাবে কেউ চিল্লায়। আল্লাহ গো এখনে আমার পরাণডা বের হয়ে যা…
তুষার বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইক ঘুড়িয়ে চলে যাবার প্রস্তুতি নেয়। এই পাগল মেয়ের এখানে থাকলে তুষারের স্থান নিশ্চিত পাগলাগারদে হবে। তুষারকে চলে যেতে দেখে হৃদিকা মাঝ পথে কথা থামিয়ে বলে…কী হলো আংকেল কোথায় যাচ্ছেন। আসল কথা তো এখনো বলাই হলো না।
তুষার বাইক স্টার্ট দেয় হৃদিকা তড়িঘড়ি করে বলে….
__আংকেল এক মিনিট থামুন। আপনি কী গুন্ডামি বিষয় পড়াশোনা শুরু করেছেন? আংকেল চলে যাচ্ছেন কেন? উত্তর টা দিয়ে যান। ও আংকেল আরে চাচা শুনন না, চাচা…
__যাহ বাবা চলে গেল। আমার কথা পুরো না শুনেই চলে গেল। আসল বিষয় তো জানাই হলো না।
হৃদিকা ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো মুখ করে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরে।
___________
__কী কথা শুনাইলি রে তুষার। মেয়েটাকে একদিন দেখাইস তো।
তুষারের বন্ধু সবুজ হৃদিকার কান্ডকারখানার কথা শুনে এভাবে বলল। তারপর গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল….
” বাবায় হরেক রকম পাগল দিয়া মিলাইছে মেলা
বাবায় হরেকরকম পাগল দিয়া মিলাইছে মেলা
বাবা তোমার দরবারে সব পাগলের খেলা।”
__তো দোস্ত মেয়েটা দেখতে কেমন রে?
__এতো কিছু দেখতে গেছি নাকি? সে যে একটা পাগল এটা জানি। আমি ভাবছি এই মেয়ের বাড়ির মানুষ একে কীভাবে সহ্য করে। ভাঙ্গা ক্যাসেট একবার বাজতে শুরু করলে বাজতেই থাকে বাজতেই থাকে। বন্ধ আর হয় না।
__সেকি কাণ্ড! দু দুবার দেখা হলো অথচ তুই বলছিস মেয়ে সুন্দর কিনা দেখিস নি। ভেরি ব্যাড কাজ!
তুষার কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে… হয় বাংলা বল নয়তো ইংরেজি শুদ্ধ ভাবে বল। আগে ঠিক কর কোনটা বলবি। তা না করে অর্ধেক বাক্য ইংরেজি অর্ধেক বাংলা।
__ধুর ওসব বাদ দে! মেয়েটাকে কবে দেখাচ্ছিস সেটা বল।
__ইহ জনমে না!
সবুজ ঠোঁট উল্টে ছোট বাচ্চাদের মতো কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে….
__পরের জনমে তো চান্স নেই দোস্ত! পরের জনমে চান্স থাকলে নাহয় অপেক্ষা করতাম। যেহেতু চান্স নেই তাই ইহ জনমেই দেখাতে হবে।
___অসম্ভব! ওই অসভ্য, ইতর, বাঁদর মেয়ের সামনে আমি কোনভাবেই যাচ্ছি না। কোনোভাবে ওই মেয়ের সামনে আর যাতে পড়তে নাহয় এরকম কোনো দোয়া-দরুদ, আমল তোর কাছে থাকলে বলিস। সব করতে রাজি তবু ওই মেয়ের সামনে পড়তে রাজি না।
তুষারের কথা শুনে সবুজ ফিক করে হেসে দেয়। একটা মেয়ে যে কিনা মাত্র দুই দিনের সাক্ষাৎ-এ তার বন্ধুর এই হাল করেছে তাকে দেখার কৌতুহল আরও বাড়ে। মানুষ বরাবরই কৌতুহল প্রিয়! সবুজও এর ব্যতিক্রম নয়। সবুজকে মিটিমিটি হাসতে দেখে তুষার ক্ষেপে যায়। রাগান্বিত কন্ঠে বলে….
__কিরে তুই এভাবে হাসছিস কেন? আমি যন্ত্রণায় আছি আর তুই মজা নিচ্ছিস?
সবুজ কোনো রকম নিজের হাসি চেপে বলে… আরে ধুর দোস্ত কী যে বলিস না! আমি কেন মজা নিতে যাবো? তোর দুঃখ দেখে আমার কেন্দে দিতে ইচ্ছে করছে।
তুষার দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে। তুষার মনে মনে বলে…
__কার কাছে সমস্যা শেয়ার করতে আসলাম আল্লাহ! ওই পাগলের থেকে এই পাগল আরও বড় পাগল।
তুষার নিজেকে সংযত করে সবুজকে ফেলে রেখেই বাইক টান দিয়ে চলে যায়। সবুজ পিছন থেকে এতো ডাকে তবু শোনে না। একটু পর বাইক ঘুরিয়ে এসে বলে…তাড়াতাড়ি উঠ নাহলে সত্যি সত্যি ফেলে রেখে যাবো।
চলবে।
