#অনাকাঙ্ক্ষিত_প্রণয়
#তানভী_ইসলাম_তিশা
#পর্বঃ৪
তুষার এখন নিশিদিন দুনিয়া ভুলে তসবিহ জপে। যখনই অবসর পায় তসবিহ হাতে নিয়ে ধ্যানে মগ্ন হয়। ফাঁকা সময় পেলেই তসবিহ হাতে নিয়ে সারা রুমময় পায়চারী করে। ধবল জুব্বা ও টুপি পরে সে জিকিরে আত্মনিবিষ্ট হয়ে থাকে। তুষার আজ সকাল থেকেই এমন বেশভূষা ধারণ করেছে লম্বা জুব্বা, মাথায় সাদা টুপি, হাতে তসবিহ আর সেই তসবিহ জপতে জপতে সারা বাড়ি জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তুষার এমন ভাবে নিজেকে বদলে ফেলেছে যেন এক রাতেই ঈমানদারদের তালিকায় নাম লিখে ফেলেছে। মনে হচ্ছে তুষার একরকম জাদুবলে রাতারাতি “তুষার হক” থেকে “হজরত তুষার সাহেব” হয়ে উঠেছে। তসবিহ ঘোরানোর স্টাইলে এত ইনভেস্টমেন্ট কেউ বললেই বিশ্বাস করবে সে পুরোদস্তুর জিকির ট্রেনিং নিয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে বাড়িটা কোনো ধর্মীয় মিছিলের রিহার্সেল মঞ্চ। তুষারকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো ওয়াজ মাহফিলে উঠে যাবে বক্তৃতা দিতে। পুরো বাড়ি জুড়ে পায়চারী করা দেখে মনে হচ্ছে সে হাঁটছে না বরং কোনো পবিত্র মঞ্চে মহাপ্রবেশ করছে। একবার বারান্দা একবার ডাইনিং তারপর সোজা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে বলে…
__মাশাআল্লাহ! আহা! কী নূরের জ্যোতি। আল্লাহু আকবার। হায়! এ যে একেবারে নূরের আলো। হে আল্লাহ! আমি এখন থেকে তোমার ইবাদত ও জিকিরে সর্বদা ধ্যান মগ্ন থাকব তবু প্লিজ আমার উপর দয়া করো। আমাকে ওই পাগল মেয়েটার হাত থেকে যেকোনো উপায়ে বাঁচাও নয়তো ওই পাগলের সাথে আমিও পাগল হতে বেশিদিন লাগবে না। যত দোয়া-দরুদ, জিকির-আমল আছে সব করতে রাজি তবুও ওই পাগল মেয়ের খপ্পরে আর পড়তে চাই না। প্লিজ আল্লাহ! দয়া করো আমার উপর।
তুষারের এহেন কাণ্ডে বাড়ির সকল সদস্য হতবাক। তারা বুঝতে পারছে না তুষার বদলেছে নাকি তুষারের উপর ভর করেছে কোনো পীর সাহেব। তুষারের ভাবী সুরাইয়া আক্তার বলল…
__তুই আবার কী শুরু করলি? গরমে মাথা গেছে নাকি?
মা রান্নাঘর থেকে বলে উঠলেন…এই ছেলেটার আবার কী হলো রে বাবা। পাগল-টাগল হয়ে গেল নাকি।
তুষার নিজের ধ্যানে এতটাই মগ্ন যে ভাবি আর মায়ের কথা এক কানে ঢোকে আরেক কানে বের হয়ে যায়। তবুও একপর্যায়ে সে আয়নার সামনে থেকে না ঘুরে দাঁড়িয়ে থেকে গম্ভীর স্বরে বলে উঠল…
__আম্মু! ভাবি! আমি এখন দুনিয়ার মোহ-মায়া ত্যাগ করেছি। আমি এখন জিকিরের পথে ইবাদতের পথে। প্লিজ! আমাকে নিয়ে আর দুনিয়াবি কথাবার্তা বলো না। আমাকে আমার জিকির করতে দাও। যেন ওই পাগল মেয়ের থেকে থেকে রক্ষা পাই।
তুষারের ভাবি অবাক হয় সেই সাথে হেসে কুটিকুটি হয়ে বলল…
__ওরে বাবা! তুই আবার কোন মেয়ের খপ্পরে পড়লি?যার জন্য দরবেশ বাবা হয়ে গেলি। মেয়েটা পাগল নাকি তুই পাগল হয়ে গেলি?
তুষার এবার ভাবির সামনে এসে গম্ভীরভাবে বলল…
__সে কথা আর বলো না ভাবি। এমন পাগলের পাল্লায় পড়েছি জীবন আমার তেজপাতা হয়ে গেছে। পাগল এখনো হয়নি তবে নিশ্চিত থাকো এরকম চলতে থাকলে পাগল হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। তাই এখন থেকে শুধু নামাজ, রোজা, জিকির নিয়ে মশগুল থাকতে চাই। এমন কোনো দিন বাকি নেই ওই মেয়ের খপ্পরে পড়ি না। যেদিন থেকে হাসপাতালে দেখা হয়েছে সেদিন থেকে আমার জীবন টা বরবাদ হয়ে গেছে। রাস্তায় বের হয়ে শান্তি নেই। বন্ধুদের সাথে ঘোরাফেরা করে শান্তি নেই। বন্ধুর দোকানে বসে যে একটু আড্ডা দেব সে শান্তিও নেই। যেখানে যাই সেখানেই ওই মেয়ে হাজির। শুধু যে হাজির তা না পাগলের প্রলেপ বকতে বকতে মাথা খারাপ করে দেয়। তুমি জানো! ওই মেয়ে আমাকে কী বলে ডাকে? চাক্কুওয়ালা আংকেল! তুমিই বলো আমাকে দেখে কী চাচা চাচা ফিল আসে? আমার মতো হ্যান্ডসাম একটা ছেলেকে আংকেল ডাকে। এটা কোনো ভাবে মেনে নেয়া যায়, বলো? আবার চাক্কুওয়ালা ডাকে। যেখানে সেখানে যার তার সামনে চাক্কুওয়ালা ডেকে মান-সম্মানের ফালুদা বানিয়ে দেয়। ওই মেয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য যত ধরনের চেষ্টা আছে সব করেছি তবুও ওই মেয়ের হাত থেকে রেহাই মিলছে না। হেলমেট, হুডি,মাস্ক,সানগ্লাস সব পরে ছদ্মবেশ নিয়েও কোনো লাভ হয়নি। ওই মেয়ে ঠিকই চিনে ফেলেছে। এখন শুধু বোরকা পরে বের হওয়া টা বাকি। কবে জানি এটাও করতে হয়।
তুষারের ভাবি হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তুষারের থায় বেশ মজা পেয়েছে। তুষার ক্ষেপাটে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে…
__আমি আছি মহা জ্বালা-যন্ত্রণায় আর তুমি হাসছো? কই তুমি সুন্দর একটা পরামর্শ দেবে তা না মজা নিচ্ছো।
তুষারের ভাবি মহা কষ্টে নিজের হাসি বন্ধ করে বলে…
__কী বলিস রে তুষার। মেয়েটা দেখছি ভারী বিপজ্জনক। তবে একটা বিষয় মেয়েটার প্রশংসা না করলেই নয়। মেয়েটা কিন্তু তোর দারুণ একটা নাম দিয়েছে। আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। আমি ভাবছি এখন থেকে আমিও তোকে চাক্কুওয়ালা বলে ডাকব।
তুষার রাগী স্বরে বলে…আমি আছি আমার জ্বালায় আর তুমি আছো নাম নিয়ে। আমি মেয়েটার হাত থেকে মুক্তির সলিউশন খুঁজছি কই তুমি বুদ্ধি দিয়ে একটু হেল্প করবে তা না করে তুমি বিষয় টা নিয়ে মজা নিচ্ছো।
তুষারের ভাবি ফিচলে হাসি দিয়ে বলে…আমার কাছে দারুণ একটা সমাধান আছে তবে তোর সেটা পছন্দ হবে না।
সমাধানের কথা শুনে তুষার তড়িঘড়ি করে বলে… কী সমাধান আছে দ্রুত বলো। যত কঠিন বিষয় হোক আমি তাই করব তাও ওই মেয়েটার হাত থেকে মুক্তি চাই।
সুরাইয়া মেকি হাসি দিয়ে বলে…মেয়েটা বিয়ে করে ফেল। বউ করে বাড়িতে নিয়ে আয় ল্যাটা চুকে গেল।
হতাশ হয়ে তুষার কয়েক সেকেন্ড সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন সেখান থেকেই জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর চলে আসবে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে ভাবির দিকে তাকাল। হতাশ সুরে শুধাল…
__ভাবি! তুমি কী বললে একটু আগে? আবার বলো তো।
সুরাইয়া আবার হাসতে হাসতে বলল…
__আরে বিয়েটাই কর তবেই না ওর থেকে রেহাই পাবি। তোর পিছে মেয়েটা এমন পাগলের মতো ঘুরে বেড়ায় মনে হয় প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। তুই বিয়ে করলে বউ হয়ে আসলে আর এভাবে জ্বালাবে না। ব্যস, খেলা শেষ।
তুষার এক ঝটকায় বসে পড়ে বলল…
__বিয়ে করব মানে? ভাবি আমি ওর হাত থেকে পালাতে চাই আর তুমি বলছো ওকে বউ করে বাড়ি নিয়ে আসতে। তুমি কি ঠিক আছো? এই গরমে তোমার মাথা ঠিক আছে তো?
সুরাইয়া ভ্রু কুঁচকে অভিনয় করে বলল…
__দেখ! আমি সব দিক ভেবেই বলছি। তুই যেভাবে পালিয়ে বেড়াচ্ছিস কোনো লাভ হচ্ছে না। মেয়ে তোকে পাগলের মতো খুঁজে বের করছেই। এখন যদি বউ করে আনিস ওর আগ্রহ হয়তো কমে যাবে। তুই, বাড়ির লোক, আমার নজর, মা-র চোখ সবকিছুর ভেতর পড়বে তাহলে ও মেয়ে নিজেই হার মেনে যাবে। আর যদি সত্যি তোর প্রতি ওর কিছু ফিলিংস থাকে তাহলে হয়তো তোদের জুটি দারুণ হবে।
তুষার চরম হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ তাকিয়ে রইল ভাবির দিকে। তারপর মুখে বিস্বাদ হাসি এনে বলল…
__ভাবি আমি বুঝেছি। তুমি চাও আমি আস্তে আস্তে আসলেই পাগল হয়ে যাই। মানে মেয়েটা আমার পিছু ছাড়ছে না আর তুমি বলছো তাকে নিয়ে আসতে। এখন শুধু বলো বিয়ের প্যান্ডেল কোথায় হবে? আমি হুজুর ডাকিয়ে দিই। মিষ্টির অর্ডার দিয়ে দিই আবার রিসেপশনে তুমি নিজেই ডান্স করবে, তাই না?
সুরাইয়া হেসে বলে উঠল…
__ওমা! এমনটা হলে ক্ষতি কী? আমি তো এগুলোই বলতে যাচ্ছিলাম তার আগে তুই বলে ফেললি।
তুষার চোখ পাকিয়ে বলল…
__না ভাবি! তুমি আমাকে ভালো সমাধান খু্ঁজে দাওনি। তুমি আমায় ফাঁদে ফেলতে চাইছো। কিন্তু না, আমি আরেকটা নতুন পরিকল্পনা করেছি।
সুরাইয়া কৌতূহলী চোখে বলল…
__আবার কী নতুন পরিকল্পনা?
তুষার গম্ভীর মুখ করে বলল…
__আমি হিজরত করব। শহর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাব। হয়তো পাহাড়ে জঙ্গলে কিংবা মরুভূমিতে। যতদূরে যাওয়া যায় চলে যাবো। এই মেয়ে আমার জীবনের সিস্টেম হ্যাং করে দিয়েছে। এখন বাঁচতে হলে নতুন সফটওয়্যার ইনস্টল করতে হবে।
সুরাইয়া হেসে হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল।
__তুই না থাকলে এই বাড়িতে এত হাসির খোরাক থাকত না রে তুষার। চল আগে খেয়ে নে তারপর আবার তোর হিজরত শুরু করিস।
তুষার একরাশ হতাশা নিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল…
__হায় আল্লাহ! তুমি কী পরীক্ষা নিচ্ছো আমার। এ জীবনে প্রেম না হোক অন্তত একটু শান্তি দাও।
______
তুষার আজ হিজরতের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে হিজরত না করে নিজের মাথা খারাপ করে ফেলেছে। সকাল সকাল এক ব্যাগ জামাকাপড় গুছিয়ে সবার অলক্ষ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। ছদ্মবেশে হেলমেট, সানগ্লাস, মাস্ক, মাথায় মাফলার জড়ানো, গলায় ক্যামেরা ঝোলানো। নিজেকে সাংবাদিক সেজে রিকশা করে পালানোর চেষ্টা করছে। মনে মনে ভাবছে…
__এইবার ওই পাগল মেয়ে আর চিনতেই পারবে না। আমি এখন রিপোর্টার তুষার, চাক্কুওয়ালা নয়।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! রিকশা স্টার্ট দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো…
__এই চাক্কুওয়ালা আংকেল। দাঁড়ান!
তুষারের শরীর মুহুর্তেই অন্ধকারে ছেয়ে গেল। মনে হলো গলায় রশি পড়ে গেছে। ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল সেই পাগল মেয়ে। চোখে নীল ফ্রেমের চশমা। হাতে চিপসের প্যাকেট আর ঠোঁটে সেই চেনা হাসি।
__আচ্ছা! এত ছদ্মবেশ কেন? আপনি কী সিআইএ এজেন্ট? নাকি হিন্দি সিরিয়ালের হিরো?
তুষার চোখ বড় করে বলল…
__তুমি আবার! এখানে কী করো? আমি তো অন্য রাস্তায় যাচ্ছি।
মেয়েটি চোখ টিপে বলল…
__তাই নাকি? আপনি যেদিকেই যান না কেন আমার রাডার থেকে বের হতে পারবেন না। আপনার চাক্কু দেখে আমি ভয় পাই না জানেন। বরং এখন তো আপনাকে চাক্কু ছাড়া কল্পনাই করতে পারি না।
তুষার হতাশ গলায় বলল…
__তোমার কি কোনো কাজ নেই? তুমি কি আমার পেছনে কোনো GPS লাগিয়ে রেখেছো?
হৃদিকা দুষ্ট হেসে বলল…
__তা লাগাইনি ঠিকই তবে আপনার চোখে আমার জন্য যে ভয় তা দেখে ঠিকই বুঝে ফেলি আপনি কোথায়।
তুষার এক হাত দিয়ে কপাল চাপড়ে বলল…
__আল্লাহ তুমি রহম করো। আমি বুঝি হিজরতেও শান্তি পাব না।
তখনই পাশ থেকে জাওয়াদ কে নিয়ে তুষারে ভাবি সুরাইয়া লে এলেন। হেসে বললেন…
__আরে পাগল! হিজরত না করে বিয়েটা কর। আর এই মেয়েটা…
মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল…তোমার নাম কী?
হৃদিকা উত্তর দেয়…. হৃদিকা।
সুরাইয়া হেসে বললেন….
__হৃদিকা তুমি তো দেখি দারুণ চালাক। আমার দেবরকে তো পুরোপুরি হিপনোটাইজ করে রেখেছো। চাইলে আমি তোমাদের এনগেজমেন্টের দিন-তারিখ ঠিক করে ফেলতে পারি।
তুষার চিৎকার করে উঠল…
__ভাবি! আর নয়। আমি এবার সত্যিই বোরখা পরে সন্ন্যাস বেশ নেব।
হৃদিকা মুচকি হেসে বলল…
__আর আমি আপনারর নাম রাখব সন্ন্যাসী চাক্কুওয়ালা আংকেল।
#চলবে
