#অনাকাঙ্ক্ষিত_প্রণয়
#তানভী_ইসলাম_তিশা
#সমাপ্তি_পর্ব
তুষারের চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। মাথায় যেন শূন্যে একটা বেলুন উড়ছে। নিচে নামার নামই নিচ্ছে না। সে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে হৃদিকার দিকে। এই মেয়েটা কী আদৌ মানুষ? নাকি তার জীবনে প্রেরিত কোনো বিশেষ বিপর্যয়?
তুষার একেবারে চুপচাপ। হৃদিকার “সন্ন্যাসী চাক্কুওয়ালা আংকেল” নামটা তার কানে ঢুকে গিয়ে মস্তিষ্কের সব সার্কিট শর্ট করে দিয়েছে। চারদিকে শুধু ঝাপসা দেখছে সে। সুরাইয়ার হাসি, হৃদিকার চটুল মন্তব্য আর পেছনে রিকশাওয়ালার বিরক্ত মুখ সব মিলিয়ে তুষারের মনে হচ্ছে জীবনটা এক জ্যাম পার্টির মঞ্চে আটকে গেছে। তুষার কাতর গলায় বলল…
__হৃদিকা, প্লিজ! তুমি যা করতেছো এটা মানসিক নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে। আমি যদি চুপচাপ সন্ন্যাস বেশ না নিই তাহলে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হবো।
দুষ্টু হাসি দিয়ে হৃদিকা আবারও উচ্চারণ করে সন্ন্যাসী চাক্কুওয়ালা আংকেল…
তুষার এবার আর সহ্য করতে না পেরে রিকশা থেকে লাফিয়ে নামল। রাগে ফুটতে থাকা চেহারায় বলে উঠল…
__তুমি চাইছো আমি পাগল হয়ে যাই, তাই তো? ঠিক আছে। আমি আর পালাব না। আমি আর ছদ্মবেশ পরব না। আমি বোরকা পরব না, হিজরতও করব না। আমি তোমার মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছি এখন। হৃদিকা! তুমি কি সত্যিই জানো তুমি কী করছো?
হৃদিকা হালকা হেসে দু-হাতে তুষারের গাল টেনে বলল…
__আচ্ছা চাক্কুওয়ালা আংকেল, আপনি এত রাগ করেন কেন? কী করছি আমি?
__তুমি আমাকে পাগল করে দিচ্ছো। আমি যে স্বাভাবিক ছিলাম সেই জীবনটা তো তুমি আর ফিরিয়ে দেবে না। তাহলে এবার একটা উত্তর দাও। তুমি আসলে কী চাও?
হৃদিকা এবার মুখে গাম্ভীর্য এনে ধীরে ধীরে বলল….
__আমি শুধু চাই আপনি আমায় দেখে একবার হাসুন। চাক্কু হাতে নয়, হৃদয়ে একটু জায়গা দিন। আপনি তো সবসময় পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। একবার থেকে যাবার চেষ্টা করেছেন কি?
তুষার থতমত খেয়ে তাকাল। এবার সে নিশ্চয়ই কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে।
__কী…কী বললে?
হৃদিকা মাথা নিচু করে বলল…আমি তো আপনাকে ভালোবাসি।
তুষার স্থির হয়ে যায়। রোদে দাঁড়িয়ে থেকেও তার মনে হয় আশেপাশে কোথাও একফোঁটা শান্তির ছায়া নেমে এসেছে।
__তুমি কি তাহলে সিরিয়াস? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি শুধু মজা করো, পাগলামো করো…
হৃদিকা গম্ভীর গলায় বলল…
___হ্যাঁ! আমি আপনাকে ভালোবাসি। যেদিন হাসপাতালের করিডোরে প্রথম দেখেছিলাম সেদিনই ঠিক করেছিলাম এই চাক্কুওয়ালা আংকেলই আমার লাইফের হিরো। তারপর থেকে আপনি যতই পালান আমি ততই ধরি। আপনি বুঝেননি আমি আপনাকে হারাতে চাইনি বলেই এতটা পাগলামি করেছি। ভালোবাসা তো একটু পাগলামোই, তাই না?
তুষার এবার আর কোনো কথা খুঁজে পেল না। তুষারের ভাবি তখন পাশে দাঁড়িয়ে হাসছিলেন। সুরাইয়া চোখে পানি এনে মেকি কান্নার ভান করে বলে উঠলেন…
__আহারে! প্রেমের এমন কাহিনি সিনেমাতেও হয় না। তুই বিয়ে করে নে রে পাগল।
এরপর সিরিয়াস হয়ে বললেন…
__তুষার, জীবনটা ছোট। আর ওই মেয়েট শুধু পাগলামিই করেনি। তোকে বাঁচতেও শিখিয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত তোর। তুই বাঁচবি নাকি পালাবি?
তুষার ধীরে ধীরে হৃদিকার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। এক দমকা মুক্তির হাসি।
__ঠিক আছে হৃদিকা। আজ থেকে আমি পালাব না। চাক্কুওয়ালা আংকেল না হয়ে তোমার হবু ‘চাক্কুওয়ালা হাসবেন্ড’ হতে রাজি। তবে একটা শর্ত আছে…
হৃদিকা কৌতূহলী চোখে বলল…
__কী শর্ত?
__বিয়ের পর আর আংকেল ডাকলে আমি কিন্তু সত্যিই চাক্কু বের করে তোমার মাথার খুলি উড়িয়ে ফেলব।
সবাই হেসে উঠল। হৃদিকা দুষ্টু চোখে বলল…
__ঠিক আছে। বিয়ের পর ডাকব ‘তুষার মাই লাভ’।
তুষার হেসে মাথা নেড়ে বলল…
__হায় আল্লাহ! এবার বুঝি আমি সত্যিই সন্ন্যাসী হয়ে গেলাম। ভালোবাসার সন্ন্যাসী।
তারপর শান্ত গলায় বলল…
__হৃদিকা, আমি হালকা পাগল তুমি ফুল পাগল। আমাদের মিলটা বুঝি এখানেই।
_________
আজ তুষার ও হৃদিকার বিয়ে। বিয়ের অনুষ্ঠান এতটাই জমকালো ছিল যে প্যান্ডেলে খাবারের চেয়ে গুজব আর হাসির শব্দ বেশি ছিল। বিয়ের দিনটি ছিল একেবারে ব্যতিক্রমী। তুষার যাকে হৃদিকা সবসময় “চাক্কুওয়ালা আংকেল” বলে পরিচয় দিতো আজ বিয়ের মঞ্চে এসে তুষার নিজে থেকে বলল…..
__আজ থেকে আমি ‘চাক্কুওয়ালা জামাই’।
হৃদিকা হাসতে হাসতে বলল…তাহলে আমি ‘চাক্কুওয়ালি বউ’।
তুষারের বন্ধুরা একে একে এসে তার কানে কানে বলে যাচ্ছে…
__চাক্কুওয়ালা আংকেল এখন হবে হানিমুন ওয়ালা আংকেল।
__সতর্ক থাকিস। তোর বউ কিন্তু চোখে রাডার ফিট করে ঘুরে।
__আরেকবার পালাতে গেলে হেলমেটের নিচে পায়জামা পড়ে যাস না যেন।
বিয়ের মঞ্চে তুষার হঠাৎ করে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলল….
__সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছি। আমি আজ থেকে হৃদিকার ‘চাক্কু’ হয়ে গেলাম।
এই ঘোষণা শুনে অতিথিরা হেসে কুটিকুটি। সবাই যখন হাসছে তখন তুষার ব্যতিব্যস্ত। সে নিজেও জানে না বিয়ে করল নাকি অপহরণে সিলমোহর পড়ল।
বাসর ঘরে প্রবেশ করতেই তুষার দেখল ঘরটি ফুল ও বেলুনে সজ্জিত। বাসর ঘরে ঢুকেই তুষার যেভাবে বসে পড়ল দেখে মনে হলো ওর আর বাঁচার আশা নেই। এদিকে হৃদিকা বিছানার এক কোণে বসে আছে। চোখে সেই পুরোনো নীল ফ্রেমের চশমা। মুখে রহস্যময় হাসি। তুষার মুখ গম্ভীর করে বলল…
__ দেখো আমি এখনো জিকিরের মানুষ। বিয়ে করেছি মানে এই না যে জিকির ভুলে গেছি।
হৃদিকা ঠোঁট কামড়ে হাসল।
__আর আমি এখনো ওই চাক্কুওয়ালা আংকেলকেই ভালোবাসি।
তুষার কপাল চেপে বলল…
__আহ! আবার সেই ডাক! তুমি কী এবার আমার নাম বদলে ন্যাশনাল আইডিতেও ‘চাক্কুওয়ালা আংকেল’ করে দিবে?
হৃদিকা ব্যাগ থেকে একটা ছোট চাকু বের করে বলল…
__না, এটা শুধু রিমাইন্ডার। যাতে ভুলে না যাও তুমি আমার কিডন্যাপ হওয়া বর।
তুষার বলল…এই ঘরটা কী বিয়ের বাসর নাকি কোনো সার্কাসের মঞ্চ?
চাকুটা তুষারের সামনে ধরে হৃদিকা হেসে বলল…তুমি তো সার্কাসের জোকার।
তুষার চমকে খাট থেকে লাফ দিয়ে উঠে বলল…
__হায় আল্লাহ! বাসর ঘরে চাকু চালাচ্ছো। আমি তো ভেবেছিলাম বিয়ের পর অন্তত মুক্তি পাবো।
হৃদিকা এবার খিলখিল করে হেসে বলল…
__তোমার জন্যই তো অস্ত্র হাতে রাখতে হয়। কী জানি! আবার পালিয়ে যাও নাকি।
তুষার ধীরে ধীরে খাটে ফিরে এসে বসে। গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে…
__আচ্ছা শুনো! তুমি আমাকে ভালোবাসো ঠিক আছে। কিন্তু আমাকে ভয় না দেখিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করো, কী বলো?
হৃদিকা মুচকি হেসে বলল…
__আমি ভালোবাসি ভয় দেখিয়ে। তবেই তো তুমি আমার দিকে মনোযোগ দাও।
এই বলে হৃদিকা সামনে এগিয়ে এলো। চশমাটা খুলে রাখল পাশে। তুষার ধীরে ধীরে বলল…
__আচ্ছা একটা কথা বলো তো তুমি কি আসলেই পাগল?
হৃদিকা চুড়ান্ত দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল…
__পাগল তো ছিলামই কিন্তু এখন আমি তোমার বউ পাগল।
তুষার মাথা নিচু করে হাসল…
__ওরে বাপ! আমার জীবন তো এখন একেবারে জেলখানা আর আদালতের মাঝখানে। তবে হ্যাঁ একটাই সান্ত্বনা, জেলখানার বস তুমি।
হৃদিকা বিছানার দিকে ইশারা করে বলল…
__তবে আদালত বন্ধ। এখন রায় ঘোষণার সময়। এসো বর সাহেব বসো রায়ের আসনে।
তুষার উঠে এসে বসে আর বিছানার কুশনটা কোলে নিয়ে বলে…
__একটা জিনিস বুঝেছি। আমি যতই পালাই না কেন তোমার থেকে পালানোর উপায় নেই। আচ্ছা… এখন ঘুমাবো?
হৃদিকা চোখ টিপে বলল…
__বাসর রাতে বিড়াল না মেরেই ঘুম?
তুষার মাথা ঠুকে বলল…
__ওহ! বিয়ে মানেই তো ধাপে ধাপে শাস্তি।
তুষার ভেবেছিল বিয়ের পর অন্তত একটু রিল্যাক্স করবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ওর বউ না হয়ে হৃদিকা কোনো সিক্রেট মিশনের এজেন্ট।
হৃদিকা মজা করে বলল…তুমি কী জানো! আমি তোমার জন্য একটি বিশেষ উপহার এনেছি।
তুষার উত্তেজিত হয়ে বলল…কী উপহার?
হৃদিকা একটি ছোট বাক্স বের করে দিল। তুষার খুলে দেখল ভেতরে একটি ছোট চাক্কু।
তুষার বলল…এটা কি?
হৃদিকা হেসে বলল…এটা আমাদের ভালোবাসার প্রতীক।
তুষার বলল…তাহলে কী আমি এখন থেকে চাক্কুওয়ালা জামাই?
হৃদিকা বলল… হ্যাঁ, আর আমি ‘চাক্কুওয়ালি বউ’।
__________
গন্তব্য – কক্সবাজার।
উদ্দেশ্য – হানিমুন।
বাস্তবতা – হৃদিকার সিক্রেট হানিমিশন।
বাসে ওঠার আগেই হৃদিকা একটা চাদর দিয়ে তুষারকে মুখ ঢেকে দিল। তুষার হতবাক কন্ঠে শুধায়…
__এটা কী করছো?
__আমার বর যেন কেউ না দেখে। বর চুরি এখন অহরহ হচ্ছে।
হৃদিকার কাণ্ডে তুষার পারে না বাসে মাথা ঠুকে মরে যায়।বাসের ভেতর তুষার জানালা ধরে বসেছে। হৃদিকা তার পেছনে দাঁড়িয়ে মোবাইলে রিল বানাচ্ছে।
__হানিমুন going on, hubby behaving like kidnapped buffalo.
তুষার ক্ষেপে গিয়ে বলল…
__তুমি কী চাইছো পুরো বাংলাদেশ জানুক আমি তোমার মতো পাগলের হাতেই ধরা পড়েছি?
হৃদিকা এক গাল হেসে বলল…
__না রে পাগলা।আমি চাই সবাই জানুক আমি তোমাকে ছাড়ব না।
হোটেল রুমে প্রবেশঃ
তুষার দরজা খুলতেই বলে…
__আহ!শান্তির ঘর।
হৃদিকা ব্যাগ খুলেই বের করল ছোট একটা রিং লাইট, ফোন স্ট্যান্ড, আর বুম মাইক।
তুষার স্তব্ধ।
__তুমি কী হানিমুনে এসেছো না ‘ভ্লগ শ্যুটিং’-এ?
হৃদিকা টিপিক্যাল ইউটিউবার ভঙ্গিতে বলল….
__Hey guys, welcome back to our honeymoon vlog, featuring my confused husband.
সমুদ্রপাড়েঃ
তুষার পানিতে পা ভিজিয়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতি উপভোগ করছে। হঠাৎ পেছন থেকে হৃদিকা চিৎকার…
__তুষার! ভিড়ের মধ্যে আমার স্যান্ডেল হারিয়ে গেছে। এটা কি কোনো লিডিং মুভির ক্লাইম্যাক্স যে সবাই আমার আশেপাশে ঘুরছে?
তুষার হেসে বলল…
__না, তুমি নিজেই মুভির মতো আচরণ করছো।
হৃদিকা মুখ ফুলিয়ে বলল…
__তাহলে তুমি হিরো আমিই হিরোইন আর এইটা হানিমুন না ‘হিরোইনের হুলুস্থুল’।
রাতে হোটেলেঃ
হৃদিকা এক কাপ চা হাতে তুষারকে বলল…
__কাল সকাল ৭টায় Sunrise দেখতে বের হবো। শার্ট কালো পরবা।
তুষার হাঁ করে তাকিয়ে…
__হানিমুনে এসেছি, না শুটিংয়ের সেটে?
হৃদিকা ঘুমানোর আগে বলল…
__তোমার লাইনে না কইছিলাম বিয়ে মানেই যুদ্ধ। আর হানিমুন মানেই ‘অপারেশন-ভ্রমণভেজা ভালোবাসা’।
পরদিন ভোরে ৭:৩০ মিনিটে। তুষার তখনও ঘুমিয়ে।
হৃদিকা এসে জোরে বলে…
__ওঠো! সূর্য উঠেই গেছে। তুমি তো এখনো তেপান্তরের পথঘুমে।
তুষার হাফ নিঃশ্বাসে বলল…
__এই মেয়েটা সম্ভবত NASA থেকে এসেছে। সূর্যের খবর নিতে এসেও ঘুম হারাম করে।
শেষে তুষার একটামাত্র কথা বলল…
___হানিমুন শেষে আমি বোধহয় একখানা ডায়েরি লিখব…How to Survive a Wife on Mission Mode.
হৃদিকা খিলখিলিয়ে হেসে বলল…
__লেখো বর সাহেব। আর কভু ভুলো না তুমি একজন হৃদিকায়িত বন্দি।
#সমাপ্ত
