#Standing_next_to_you
#অনামিকা_আহমেদ
পর্ব:০৯
– লিনা কে তুই কি বলেছিস সাজ্জাদ? মেয়েটা আজ আমায় কল দিয়ে কাদছিল, বলছিল আংকেল আমি সাজ্জাদ কে ছাড়া বাঁচবো না। তুমি প্লীজ কিছু একটা করো।
খাবার টেবিলে বাবার মুখে লিনার নামটা শুনেই চড়চড় করে রাগ উঠে যায় সাজ্জাদের। তবুও রাগ কে নিজের মধ্যে দমন করে সে, ধীরে সুস্থে খাবার চিবাতে থাকে সাজ্জাদ। যেনো বাবার কথায় তার কিছুই যায় আসে না। এমনিতেও খুব দরকার না হলে বাবা ছেলের কথাবার্তা একেবারেই হয়না। দুজন দুজনের আলাদা পৃথিবীতে বসবাস করে, জর যোগসূত্র ঘটে কেবল রাতের খাবারের সময় দেখার মাধ্যমে। কোনোদিন যদি ডিউটির জন্য সাজ্জাদের ফিরতে দেরি হয় তবে ওইদিন আর তার সাথে আরাফের দেখা হয় না। তাতে আরাফ কিংবা সাজ্জাদ কারোরই কিছুই যায় আসে না।
– তোকে কিছু একটা জিজ্ঞাসা করেছি সাজ্জাদ। উত্তর না দিয়ে কি প্রমাণ করতে চাচ্ছিস? মনে রাখিস আমি তোর বাবা, বন্ধু নই যে আমার সাথে বেয়াদবি করবি।
সাজ্জাদ বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। ভীষণ খিদে নিয়ে সে রাতের খাবার খেতে এসেছিল। কিন্তু আরাফের কথায় সাজ্জাদ এতটাই রেগে যায় যে সবকিছু তার কাছে তুচ্ছ মনে হচ্ছে। বাসায় থাকতে এক বিন্দু ও ইচ্ছা করে না তার। লীনা কে যে তার পছন্দ নয় সেটা সে আগেও জানিয়েছে তার বাবা কে কিন্তু আরাফ তার কথা শুনতে নারাজ। আরাফের কাছে নিজের ছেলের ইচ্ছার চেয়ে লোক লৌকিকতা অনেক প্রিয়।
– ওহ মনে আছে তোমার যে তুমি আমার জন্মদাতা। আমি তো মনে করেছিলাম সবার মত আমাকেও তুমি বলি দিবে নিজের স্বার্থের জন্য। আমি তোমাকে আগেও বলেছি আমি লিনা কে পছন্দ করি না, আমি অন্য কাউকে ভালবাসি আর তাকেই বিয়ে করব।
এবার আরাফ ও উঠে দাঁড়ায়। রাগে ফেটে পড়ছে সে। তার ছেলে তাকেই চোখ রাঙাচ্ছে, তার মতামতের দাম না দিয়ে তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে আজ। আরাফ সবাইকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও সাজ্জাদ কে কখনো পারে নি, এটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বলে মনে করে সে।
– তুই কাকে বিয়ে করতে চাস সেটা আমি জানি না ভেবেছিস? তোর লজ্জা লাগে না নিজের বোন কে বিয়ের চিন্তা করছিস? কি ভেবেছিস আমি জানতে পারব না? আরাফ শিকদার ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না, তোর প্রতিটা গতিবিধির ওপর আমার নজর আছে। তোকে কি আমি এই শিক্ষা দিয়েছি? তোর রুচিতে বাঁধলো না শুভ্রতা কে কু নজর দিতে।
– ভালবাসা কে কু নজর দেওয়া বলে না। এটা আপনার জ্ঞানের স্বল্পতা। আমি শুভ্রতা কে ভালবাসি আর ওকেই বিয়ে করব। আর এর মাঝে আপনার বন্ধুর মেয়ে যদি নাক গলায় তাকে তাকে পথ থেকে সরিয়ে দিতে আমার একবারের জন্য ও বাঁধবে না।
এই বলে সাজ্জাদ চলে যেতে বলে আরাফ শান্ত গলায় বলে উঠে,
– শুভ্রতা কে তুই আসলেই ভালবাসিস? নাকি প্রতিশোধের জন্য ওকে ব্যবহার করছিস তুই?
সাজ্জাদ ফিরে তাকায়। আরাফের চোখে মুখে আত্মবিশ্বাস, যেনো সাজ্জাদের দাড়া করানো সকল যুক্তি তার আত্মবিশ্বাসের কাছে পরাজিত। আরাফের তীক্ষ্ম দৃষ্টি যেনো এবার সাজ্জাদ কেও দুর্বল করে দেয়।
– মনে করে নিন দুটোই। একজন কে ভালবাসি, তাকে বিয়ে করে নিজের ভালবাসার পূর্ণতা দিবো আবার একজনের কাছ থেকে আমার শৈশব ধ্বংস করার শোধ তুলবো। এক ঢিলে দুই পাখি মারবো।
সাজ্জাদের কথা শুনে আরাফ হট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। বাবাকে এমন পাগলের মত হাসতে দেখে সাজ্জাদ চোখ কুঁচকে তাকায়।
– আমি জানতাম তুই মুখে যা কিছুই বলিস তোর আসল উদ্দেশ্য প্রতিশোধ। তোর মনে শুভ্রতার প্রতি তোর ভালবাসার চেয়ে দ্বিগুণ বেশি প্রতিশোধের আগুন। শুভ্রতা কে বিয়ে করা নিছক মাত্র, শুভ্রতা কে ব্যবহার করে তুই রুমা কে কষ্ট দিতে চাস।
সাজ্জাদ একেবারে দমে যায়। মনটা তার ভীষণ খচখচ করছে আসলেই কি সে শুভ্রতা কে চায় না বরং পরিশোধ চায়। নাকি তার বাবা তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। কিছু ভেবে না পেয়ে সাজ্জাদ সোজা নিজের রুমে গিয়ে দরজা আটকে দেয়।
বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই সকল চিন্তা তাকে জেঁকে ধরে। সাজ্জাদ পারছে না তার অতীত কে ভুলতে, সেই সাথে বর্তমান কে কেন্দ্র করে নতুন করে বাঁচতে। কে দোষী আর কে নির্দোষ সেটা প্রমাণ করতে গিয়ে আজ বিবেকের আদালতে সে নিজেই দোষী। সব ভাবনা চিন্তা কে সরিয়ে সাজ্জাদ বিছনার ওপর আলগোছে ঘুমিয়ে পড়ে ।
_________________________________________
সিলেটে পৌঁছালে এক হাতে কাধে ঝোলানো ব্যাগ আরেক হাত দিয়ে চৈতির হাত ধরে রাহাত তার চাচার বাসায় উঠে। চাচা তাকে বাড়ির চাবি বুঝাতে এলে তার দৃষ্টি পড়ে চৈতির ওপর। লাল টুকটুকে মেয়েটার পরণেও লাল কাপড়, ঠিক যেনো সদ্য বিবাহিতা বউ।
– কি ভাতিজা, বিয়ে করবে করলা জানালে না তো।
রাহাত শুকনো ঢোক গিয়ে মিশে হাসিমাখা কন্ঠে বলে,
– ইয়ে মানে চাচা প্রেমের বিয়ে। বাড়িতে কেও জানে না। ঈদে বাড়ি গেলে সবাইকে জানাবো।
– ওহ আচ্ছা।
চাচা তখনও সন্দেহের দৃষ্টিতে চৈতির দিকে তাকিয়ে আছে। রাহাত ভালো ছেলে, সে যে কোনো অসামাজিক কাজের সাথে জড়িত না সেটা চাচা ভালই জানে। তবুও যে দিনকাল পড়েছে কারোর বিশ্বাস নাই মনটা খচখচ করেই চলেছে। একবার সে ভেবেছিল তাদের কাবিননামা দেখতে চাইবে কিন্তু পরে বলব রাহাত কে সে সেই ছোট থেকে চিনে। এতটুকু ভরসা সে করতেই পারে। তাই এবারের মতো বেঁচে যায় রাহাত আর চৈতি।
– আচ্ছা কিছু লাগলে জানিয়ে কেমন। আমি এখন আসি।
এই বলে চাচা চলে যায়। চৈতি তরতর করে তখনও ঘামছে। আর একটু হলেই তার গায়ে বেশ্যা অপবাদ লাগতো।
– ভয় নেই, চাচা ভালো মানুষ। আমার কথায় অবিশ্বাস করবে না।
– আমার জন্য আপনার অনেক অসুবিধা হচ্ছে। আমি যদি পারতাম তাহলে আপনাকে কোনো ভাবে সাহায্য করতাম।
রাহাত চাবি দিয়ে তালা খুলতে খুলতে বলে,
– সাহায্য চাইলে করবেন একটা?
চৈতি মাথা নাড়ায়। রাহাত তার দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যজনক হাসি দেই না চৈতির চোখ এড়ায় না। চৈতি ও মনে মনে ভাবতে থাকে রাহাত তাকে কি সাহায্যের কথা বলতে পারে।
চলবে…………………….
#Standing_next_to_you
#অনামিকা_আহমেদ
পর্ব:১০
রাহাত তালা খুলে ঘরে প্রবেশ করে, কিন্তু চৈতি তখনও নিজের ভাবনায় মসগুল। কোনো এক কারণে রাহাত পিছনে ফিরতেই দেখতে পায় চৈতি আনমনে দাঁড়িয়ে আছে বাইরে।
– চিন্তা ভাবনা শেষ হলে এখন ঘরে ঢোকা যাক। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে আপনার ঠান্ডা লাগতে পারে। এমনিতেই সিলেটে অনেক ঠান্ডা।
রাহাতের কথায় চৈতির ভাবনায় ছেদ পড়ে। মাথাটা নুইয়ে সে রাহাতের পিছন পিছন যেতে থাকে। রুম দুইটা বেশ অন্ধকার, বাড়ির চিলেকোঠার ঘর হওয়ার একটা জানালা ছাড়া অন্য কোনো উৎস নেই আলো বাতাস প্রবেশ করার। সাথে লাগোয়া ছাদ থাকায় রাহাত একটু হাফ ছেড়ে বাঁচে, যখন অবসর পাবে ছাদে ঘুরে আসা যাবে। নাহয় বদ্ধ এই পরিবেশে দম আটকানোর জোগাড়। দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকায় ধুলার অন্ত নেই, তাই নাক চেপে ধরে রাফাত। হাঁচি দিতে দিতে তার অবস্থা কাহিল।
রুমে আসবাব পত্র সীমিত। একটা খাট আর একটা আলমারি ছাড়া তেমন কিছুই নেই ঘরটিতে। রাহাতের এমন বেহাল অবস্থা দেখে চৈতি রাহাত কে বাইরে যেতে বলে। রাহাত ও চৈতির কথা মতো রুমের বাইরে ছাদে চলে আসে।
প্রায় আধঘন্টা পর চৈতি রুম থেকে ডাক দেয়,
– আপনি ভিতরে আসেন, পরিষ্কার করেছি কতটুকু।
রাহাত ভিতরে আসতেই দেখতে পায় চৈতি বিছানার ওপর বিছানো চাদর পাল্টাচ্ছে, সেই থাকে পুরানো চাদরটা একমনে ঝাড়ছে। চৈতি কে দেখতে একেবারে বাড়ির বউ এর মত লাগছে, যে কিনা নিজের সংসার গুছাতে ব্যস্ত। রাহাতের মনে তোলপাড় শুরু হয়, একটু অস্বস্থি, একটু অস্থিরতা কাজ করছে তার মাঝে। চৈতির থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বড় বড় শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করে।
– আপনি কাজ সেরে গোসল করে নিন, আমি দুজনের জন্য খাবার কিনে আনি। কালকে থেকে তো মনে হয় পেটে কিছু পরেনি।
চৈতির হাত না চাইতেও থেমে যায়। এই প্রথম কেও তাকে নিয়ে ভাবছে। হয়তো সাধারণ ব্যাপার কিন্তু চৈতির জন্য এই অনুভূতি নতুন। বুকটা ধরফর করছে খুব, সে কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকায় রাহাতের দিকে। রাহাত তখন অন্যদিকে তাকিয়ে, হয়তো চৈতি কিছু একটা আন্দাজ করতে পারে। তৎক্ষণাৎ গলাটা ঝেড়ে সে বলে,
– আজকে আনছেন ঠিক আছে। কিন্তু প্রতিদিন এমন বাইরের খাবার খাওয়া চলবে না, শরীর খারাপ করবে। আমি বিকেলে একটা লিস্ট করে দিব, জিনিসগুলো এনে দিবেন। আমিই বাসায় রান্না করবো।
রাহাতের শ্বাস ঘন হয়, চৈতির কথার আলাদা জোর প্রয়োগ তাকে ভাবতে বাধ্য করে। মেয়েটা তার মনের ওপর জোর খাটাচ্ছে, ঠিক তার বিবাহিত স্ত্রীর মতো। তাদের পরিচয় হয়েছে একদিনও হয়নি, কিন্তু একে অপরকে বিশ্বাস করে তারা। কিছু একটা বলতে চেয়েও রাহাত কিছু বলে না। চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে নিচে চলে যায় খাবার কিনতে।
________________________________
ফোন হাতে নিয়ে মেসেঞ্জার এ ঢুকলে রাহাতের পাঠানো মেসেজ চোখে পড়ে শুভ্রতার। আজ সারা দিন ফোন দেখার সময় হয়নি তার। রাতের খাওয়া দাওয়া শেষে নিজের রুমে এসে ফোন চেক করছিল সে। রাহাতের কথা মাথা থেকে উধাও হয়ে গেছিল তার। সিলেটে ঠিক মত পৌঁছেছে কিনা খবর নেওয়া হয়নি, তাই হয়তো রাহাত শুভ্রতার ওপর রেগে আছে। দেরি না করে শুভ্রতা রাহাত কে কল দেয়। প্রথম বার রিং বেজে কল কেটে যায়, তারপর আবার কল দিলে ফোন রিসিভ হয়।
– হেলো রাফাত, ঠিকমতো পৌঁছেছিস? সরি রে, আমি সময় পাইনি তোকে কল করার।
রাহাত বাসায় না থাকায় চৈতি কল ধরে। ওপাশ থেকে এক মেয়েলি কন্ঠ শুনে থতমত খায় চৈতি, সেই সাথে কিছুটা অভিমান ও জমে। মেয়েটা কে প্রশ্নটা তার মাথায় ঘুরপাক খায়, হয়তো সে রাহাতের ভালবাসার কেও কথাটা মাথায় আসতেই মুখটা কালো হয়ে যায় চৈতির। ছেলেটার ওপর তার অধিকারবোধ জন্মেছে অজান্তেই আর সেখান থেকেই এই একরাশ অভিমান।
– রাহাত বাসায় নেই, আপনি পরে কল দিয়েন।
ওপাশ থেকে এক কমবয়সী মেয়ের গলা শুনতেই চমকে উঠে শুভ্রতা। রাহাতের ফোন এক মেয়ের কাছে কিভাবে গেলো বুঝে উঠতে পারে না সে।
– আপনি কে? আর রাহাতের ফোন আপনার কাছে কি করছে?
চৈতি শোনে কিন্তু কিছুই বলে না। ফোন কেটে দেয় সে। চোখ দুটো তার ঝাপসা হয়ে আসে, সেকেন্ডে সেকেন্ডে তার জল্পনা কল্পনা বেড়েই চলেছে। রাহাত প্রথমে তাকে বললেই পারত তার জীবনে অন্য কেও আছে। তাহলে হয়তো চৈতির এত অধিকারবোধ জন্মাতো না।
কিছুক্ষণ পর রাহাত বাসায় আসে। ছয় তলা সিঁড়ি উঠতে উঠতে হাঁপিয়ে উঠে সে, বোধ করে সিঁড়ি উঠতে উঠতেই কিছুদিনের মধ্যে হাঁটুতে ক্ষয় ধরবে তার। ঠিক তখনই আগমন ঘটে চৈতির। রাহাতের দিকে তার ফোনটা এগিয়ে দিয়ে মুখটা কালো করে চৈতি বলে,
– আপনাকে একটা মেয়ে কল দিয়েছিল, শুভ্রতা নাম।
– ওহ আচ্ছা।
রাহাত ফোনটা নিয়ে নেয়। চৈতী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,
– শুভ্রতা কে হয় আপনার?
রাহাত এক শ্বাসে বলে দেয়,
– বন্ধু।
– শুধুই বন্ধু নাকি অন্য কিছু।
রাহাত এবার অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকায় চৈতির দিকে। মেয়েটা মুখটা নীচু করে রেখেছে, এমনকি চোখ দুটো ও দেখা যাচ্ছে না। রাহাত অবাক, হয়তো সে বুঝতে পারছে চৈতির মনে কিছু অবাঞ্ছিত অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে। রাহাত দেখতে সুদর্শন, নম্র ভদ্র ছেলে, তার প্রতি এমন আকর্ষণ অনুভব করা স্বাভাবিক। কিন্তু রাহাত এটা বুঝতে পারে না যে চৈতির মত তার মনের একই অনুভূতি বিরাজ করছে।
– কি বলতে চাচ্ছেন আপনি?
– কিছু না।
এই বলে চৈতি চলে যায় অন্য রুমে। জানালার গ্রিল ধরে আকাশের দিকে চায়, তারপর আনমনেই এক বিন্দু অশ্রু বেয়ে পড়ে তার গাল বেয়ে।
চলবে………………
