#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ১০
আয়জার হাসি যেনো থামার নামই নিচ্ছে না। তার আশেপাশে সবাই তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। সেদিকে তার কোনো খেয়ালই নেই। সে তো তার মতো হাসতে ব্যস্ত। মেহেরুন্নেসা মেয়ের সামনে এসে জোরে তার কান ধরে টান দেন। আয়জা ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে। সে মায়ের হাত থেকে তার কান ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলে,
আহ্ আম্মা ব্যাথা লাগছে অনেক।
_ লাগুক। ব্যাথা লাগার জন্যই তো ধরেছি। তুই এত ফাজিল হয়েছিস কেনো সেটা বল আগে? তুই দেখছিস মেয়েটা ভয় পাচ্ছে তাও কেনো ওকে ভয় দেখালি?
_ আমি তো ওর সাথে মজা করছিলাম আম্মা। ও যে এত পরিমাণ ভয় পাবে আশা করি নি।
_ আর যদি তোকে এমনটা করতে দেখেছি আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না।
মেহেরুন্নেসা রেশমা কে সাথে নিয়ে হাটা দেন । বাকিরাও তার পিছে পিছে ঘরে চলে আসে। রুমানা বেগম ঘরের দরজা ভালো মতো আটকে দেন। বড়রা সবাই যার যার বিছানা বেছে নেয়। এদিকে ছোটরা কে কিনারে শুবে এবং কে মাঝখানে শুবে এ নিয়ে ঝগড়া বাঁধিয়ে ফেলে। বেশ কিছুক্ষণ ঝগড়া করার পরও তাদের মধ্যে মিটমাট হচ্ছে না দেখে বড়রা গিয়ে তাদের বিছানা ঠিক করে দেন । যেহেতু রেশমা বেশি ভীতু তাই তাকে মাঝখানে দেওয়া হয় এবং বাকিদের তার দুই পাশে। এবার হারিকেনটা বন্ধ করে দিয়ে রুমানা বেগম শুয়ে পড়েন। বড়রা যেহেতু সারাদিন ব্যস্ত ছিলেন তাই ক্লান্তির কারণে কিছুক্ষণের মাঝেই তারা ঘুমিয়ে পড়েন। আয়জারা শুয়ে শুয়ে টুকটাক গল্প করছিলো । কিছুসময় পর তারাও ঘুমিয়ে পড়ে। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার এবং আশপাশ থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।
ফজরের আযান শুনে একে একে সবাই ঘুম থেকে উঠে পড়ে। বাড়ির ছেলেরা ওযু করে মসজিদে চলে যায় এবং মেয়েরা ওযু করে ঘরে নামাজ পড়ে নেয়। বাচ্চারা সবাই গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। তাদেরকে বেশ কয়েকবার নামাজের জন্য ডাক দেয়া হয়েছে কিন্তু ঘুমের প্রভাবে তারা উঠতে পারে নি। ধীরে ধীরে আকাশ আলোকিত হতে শুরু করেছে। চারিদিক থেকে মোরগের ডাক শোনা যাচ্ছে । মেহেরুন্নেসা মাটির চুলায় আগুন জ্বালিয়ে ভাজি রান্না শুরু করেন। অন্যদিকে তার পাশে রুমানা বেগম রুটি বানানো শুরু করেন। আরেকদিকে আয়জার ফুপু সুফিয়া বাড়ির আঙিনা ঝাড়ু দিচ্ছেন। ছেলেরা নামাজ পড়ে আসার পর তাদেরকে নাস্তা খেতে দেওয়া হয় । নাস্তা করে তারা নিজেদের জমি দেখার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। তারা চলে যাওয়ার পর আয়জার দাদী, মেহেরুন্নেসা, রুমানা এবং সোফিয়া নাস্তা খেয়ে নেন। নাস্তা করে আয়জার দাদী বিশ্রাম নিতে চলে যান। আঙিনায় বসে তারা তিনজন গল্প করছিলেন এরই মাঝে একে একে সব বাচ্চারা ঘুম থেকে উঠে যায়। সকলে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে নাস্তা খেয়ে নেয়। নাস্তা খেয়েই তাদের দৌড় ঝাঁপ আবার শুরু হয়। ছেলেগুলো মাঠে খেলতে চলে যায় এবং মেয়েরা বাড়ির আশেপাশে ঘুরাঘুরি করে। তাদের বাড়িতে বেশ কয়েকটা আম গাছ রয়েছে। বেশ আম ধরেছে গাছগুলোতে। যদিও আম গুলো এখনো পাকে নি তবে কাঁচা আম মসলা মাখিয়ে খেতে বেশ মজা লাগবে। কিন্তু কথা হলো আমগুলো তাদের পেড়ে দিবে কে? ছেলেগুলো তো মাঠে খেলতে চলে গেলো। আয়জা ঠিক করে সে গাছে উঠে আম পারবে। কারণ সে গাছে উঠতে পারে। বাকিরা তাকে বাধা দিচ্ছিলো কারণ গাছগুলো বেশ উঁচু এখান থেকে পড়লে হাড়গোড় আর আস্ত থাকবে না। কিন্তু সে কি কারো কথা শোনার মানুষ? সে তো চঞ্চলতার সাথে গাছে উঠে যায়। গাছের ডালে বসে আম ছিঁড়ে নিচে বাকিদের কাছে ছুঁড়ে মারতে থাকে। বাকিরা খুশি হয়ে আম কুড়ানোর কাজে লেগে পড়ে। তাদের এই কান্ডের মাঝেই মেহেরুন্নেসা এবং বাকি সবাই এসে পড়েন। মেহেরুন্নেসা আয়জাকে গাছে চড়তে দেখে বেশ রেগে যান। তিনি রাগে গজগজ করতে করতে বলেন,
এই তোকে না বলেছি এসব লাফালাফি না করতে? তুই কি ছেলে যে লাফাতে লাফাতে গাছে চড়ে উঠলি? কত উঁচু গাছ পড়লেই তো হাড়গোড় ভেঙে গুড়ো হয়ে যাবে। এরপর তোকে বিয়ে করবে কে?
_ আম্মা আমি পড়বো না। আমি তো গাছে উঠতে পারি।
_ তোকে আমি এত কথা বলতে বলিনি তুই তাড়াতাড়ি নিচে নাম।
_ না নামবো না। নামলেই তুমি আমাকে মারবে।
_ না মারবো না তুই নাম।
_ সত্যি তো?
_ হ্যাঁ।
আয়জা গাছ থেকে সাবধানে নিচে নেমে আসে। সে গাছ থেকে নামতে দেরি কিন্তু মেহেরুন্নেসার তাকে মারার জন্য দৌড় লাগাতে দেরী হয় নি। মাকে নিজের দিকে এভাবে ধেয়ে আসতে দেখে আয়জা দৌঁড়ে দাদির পিছনে গিয়ে লুকায়। মেহেরুন্নেসা চিল্লিয়ে বলেন,
লুকাচ্ছিস কেনো? বের হ। আজকে চিরদিনের মত তোর গাছে উঠার সাধ আমি মিটিয়ে দিবো।
_ আম্মা তুমি কিন্তু বলেছিলে আমি নামলে তুমি মারবে না।
আয়জার দাদি নাতনিকে আড়াল করে বলেন,
বউমা থাক আর বকা দিও না ওকে। আমি ওকে বুঝিয়ে বলবো । ও আর এমনটা করবে না।
শাশুরির সামনে মেহেরুন্নেসা আর কিছু বলেন না। তবে আয়জাকে চোখ রাঙিয়ে বুঝিয়ে দেন যে তাকে সে পড়ে দেখে নিবে।
আম মাখিয়ে সবাই বেশ মজা করে খায়। দুপুরে পুকুর পাড়ে সবাই জড়ো হয় গোসলের জন্য। সবাই সাঁতার জানলেও আয়জা সাঁতার জানে না। কিন্তু তারপর ও সে পুকুরে নামবেই। সবাই সাঁতার কেটে গোসল করলেও সে পুকুরের পাড়ের কাছাকাছি থেকে গোসল করে কারণ সেখানে পানির গভীরতা বেশ কম।
এভাবে খুব আনন্দের সাথে তিনদিন গ্রামের বাড়ি থেকে ঘুরে আসে তারা। কিছুক্ষণ আগেই বাসায় এসে পৌঁছেছে তারা। আয়জা গোসল করে ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া করে নেয়। এরপর নিজের রুমে এসে ব্যাগ থেকে জামাকাপড় বের করতে থাকে। সে হঠাৎ খেয়াল করে তার রুমের জানালায় অনবরত টুং টুং শব্দ হচ্ছে। সে রুমের বারান্দায় এসে দেখে আরহান দাঁড়িয়ে আছে। আয়জা আরহানকে দেখে বেশ বিরক্ত হয়। এই কয়দিনের আনন্দে সে এই আপদের কথা তো ভুলেই গিয়েছিলো। গ্রামে থাকতে কি আনন্দে ছিলো সে । কোনো ঝামেলা ছিলো না। আর এখানে আসতে না আসতেই আপদ এসে হাজির । আয়জা ইশারায় তাকে চলে যেতে বলে। কিন্তু আরহান যাবে না জানায়। সে আয়জাকে ইশারায় তাদের ঘরের টেলিফোনের কাছে যেতে বলে সে টেলিফোন বুথ থেকে কল দিবে। আয়জা কিছু বলার আগেই সে পাশে থাকা টেলিফোন বুথে প্রবেশ করে। উপায় না পেয়ে আয়জাকে বাধ্য হয়ে টেলিফোনের কাছে যেতে হয়। টেলিফোনটি বাজার কয়েক সেকেন্ড পর আয়জা কল ধরে। ওপাশ থেকে আরহান জিজ্ঞেস করে,
কেমন আছো?
_ এতক্ষণ তো ভালোই ছিলাম । কিন্তু এখন আপনার চেহারা দেখে ফেলেছি এখন আর ভালো নেই।
_ মজা করছো?
_ মোটেই না।
_ কোথায় গিয়েছিলে?
_ দাদুবাড়ি।
_ একবার বলেও গেলে না।
_ আপনাকে কেনো বলতে যাবো?
_ নীলিমাকেও তো বলো নি।
_ ওর সাথে আমার কথা হয় নি তাই বলাও হয় নি।
_ তুমি জানো তোমাকে তিনটা দিন দেখতে না পেয়ে কতটা ছটফট করেছি?
_ কেনো করেছেন? আমি তো আপনাকে ছটফট করতে বলি নি।
_ তুমি মানুষটা বড্ড নিষ্ঠুর আয়জা ।
_ হয়তো।
_ নাহলে আমার উপর তোমার মায়া হতো।
_ ফোন রাখলাম।
_ শোনো।
_ বলুন।
_ ভালোবাসি।
আয়জা কিছু না বলে কল কেটে দেয়। হঠাৎ সে খেয়াল করে তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে। সে এসবে পাত্তা না দিয়ে ঘরে গিয়ে আবার কাপড় গুছাতে লাগে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
স্কুল থেকে আসার পথে প্রচন্ড গরমে আয়জার গলা শুকিয়ে যায়। তার বোতলের পানি শেষ হয়ে গিয়েছে সেই কখন এমনকি নীলিমার কাছেও পানি নেই। এই তপ্ত গরমে হেঁটে হেঁটে বাসায় যাচ্ছে তারা দুজন। একটু ঠাণ্ডা পানি খেতে পেলে শান্তি লাগতো। এসব মনে মনে ভাবছিলো আয়জা। হঠাৎ কেউ তার সামনে পানির বোতল এগিয়ে ধরে। আয়জা তাকিয়ে দেখে আরহান মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে তার দিকে ঠান্ডা পানির বোতল এগিয়ে দিচ্ছে। আয়জা সেটি নিতে চায় না। আরহান জোর করে আয়জার হাতে পানির বোতলটি দেয় এবং বলে,
নাও না প্রেয়সী আমার। তোমার কষ্ট যে আমার সহ্য হয় না। আমি থাকতে তোমাকে কি কষ্ট পেতে দেখতে পারি বলো?
এরপর আয়জার হাতে একটি ছাতা ধরিয়ে দিয়ে বলে,
এই রোদে ছাতা ছাড়া বের হয়েছো কেনো? এই গরমে যদি মাথা ঘুরে পড়ে যাও? নিজের যত্ন নিতে শিখো। আর যদি নিজে নিজের যত্ন নিতে না চাও তাহলে এই দায়িত্বটা আমাকে দাও। আমি সারাজীবন তোমার যত্ন করতে চাই, তোমাকে আগলে রাখতে চাই।
আয়জা কিছুক্ষণ আরহানের দিকে তাকিয়ে থাকে। আজ প্রথম সে আরহানকে ভালো মতো দেখছে। এর আগে কখনো এভাবে দেখা হয় নি। বলতেই হয় আরহান দেখতে খুবই সুদর্শন। তার ঘন ভ্রু, গভীর দুই জোড়া চোখ, ঘন কালো হালকা কোকড়ানো চুল, সরু নাক, ফর্সা গায়ের রং সবই যেনো তাকে সুদর্শন যুবক বানাচ্ছে। সাদা প্যান্টের সাথে কালো শার্ট ইন করে পড়েছে সে । শার্টের হাতা হাতের কনুই পর্যন্ত গুটানো এবং হাতে ঘড়ি। গরমে ঘেমে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। তাকে আমির খানের সাথে তুলনা করলে মন্দ হয় না। আমির খানের থেকে সৌন্দর্যে কোনো অংশে কম নয় সে। আরহান আয়জাকে ডেকে বলে,
কি এত দেখছো ?
_ কিছু না।
আয়জা আরহান এবং নীলিমাকে পিছে ফেলে একাই সামনে হেঁটে এগিয়ে যায় । হেঁটে যেতে যেতে মুচকি হাসে আয়জা। কয়দিন আর কিশোরী মনকে বেঁধে রাখা যায়? বয়সটাই তো তার এমন। এর মধ্যে বারবার যদি কেউ ভালোবাসা এবং যত্ন প্রকাশ করে নিজের কিশোরী মনকে কি তখন আটকে রাখা সম্ভব?
চলবে।
#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ১১
নীলিমা আয়জার যাওয়ার পানে চেয়ে আরহানকে উদ্দেশ্য করে বলে,
আয়জার মন তো কিছুতেই গলছে না ভাইয়া।
_ গলেছে।
_ কই ? আমি তো দেখলাম না। তোমার এমন মনে হলো কেনো?
_ ওর চোখের চাহনি দেখে।
_ মানে?
_ একটু আগে খেয়াল করিস নি ও আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো? আজ অবধি ও কখনো আমার দিকে এভাবে তাকায় নি। তার চাহনি ছিলো আজ ভিন্ন। সেখান থেকেই বুঝলাম সে ধীরে ধীরে আমার প্রতি আসক্ত হচ্ছে। তার মন আমার জন্য গলছে।
_ কিন্তু আমার কাছে তো ওর চাহনি স্বাভাবিকই মনে হলো।
_ ওসব তুই বুঝবি না। এই চাহনি শুধু প্রেমিকরাই বুঝে।
_ আজ সিঙ্গেল বলে এভাবে অপমান করলে? আমারও দিন আসবে।
নীলিমার এই কথা শুনে আরহহান ভ্রু কুঁচকে ফেলে জিজ্ঞেস করে,
তোর দিন আসবে মানে? তুই কি প্রেম ট্রেম করার চিন্তা করছিস?
নীলিমা দায়সারা ভাবে উত্তর দেয়,
করতেই পারি।
_ একদম মেরে হাড়গোড় ভেঙে ফেলবো। কতবড় সাহস প্রেম করার পরিকল্পনা করিস?
_ বাবাহ! তুমি করলে দোষ নেই আমি করলেই দোষ।
_ হ্যাঁ। তুই প্রেম করতে পারবি না।
_ আমি না পারলে তোমাকেও প্রেম করতে দিবো না। দাঁড়াও এখনই আম্মুকে তোমার প্রেমের কাহিনী বলে দিবো।
এই কথা বলে নীলিমা তাদের বাড়ির দিকে দৌড় লাগায়। আরহানও তার পিছন দৌড় লাগায় তাকে আটকানোর জন্য। রাস্তায় ভাইবোনের হাসির ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে।
___________
আয়জা বাসায় এসে গোসল করে চুল মুছতে মুছতে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। নিজেকে কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সে। সে মনে মনে ভাবে,
আচ্ছা আরহান ভাই কি দেখে তাকে এত পছন্দ করেছে? আরহান ভাই কি সত্যিই তাকে ভালোবাসে? তাকে বিয়ে করতে চায়?
সে আরও ভাবে,
আচ্ছা ভাইয়ারা যদি বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় আম্মা আব্বা কি রাজি হবেন?
কিছু সময় পর আয়জা নিজেকে ধমক দিয়ে বলে,
এসব আমি কি ভাবছি? কেনো ভাবছি? আমি কি তাহলে……….
না না এটা হতে পারে না। আমার নিজেকে সামলাতে হবে।
কয়েকদিন কেটে যায়। আরহান এখন প্রতিদিন আয়জার স্কুল ছুটির সময় সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে, প্রায় দিনই তাদের বাসার সামনে এসে জানালায় ছোট ইটের টুকরো ছুঁড়ে তাকে বারান্দায় ডাকে । এগুলো নতুন কিছু নয়। এগুলো সে সবসময়ই করে আসছে। নতুন বিষয় হচ্ছে যে আয়জা আগে এসবে বিরক্ত হতো কিন্তু ইদানীং সে বিরক্ত হচ্ছে না। সে টের ও পায় নি কখন সে এসবে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এমনকি আরহান কোন সময় আসে এটাও তার মুখস্ত হয়ে গেছে।
আয়জা পড়ার টেবিলে পড়তে বসেছে। কিছুক্ষণ পরপর সে দেয়ালে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। এই সময় আরহান তাদের বাড়ির নিচে এসে জানালায় ইটের টুকরো ছুঁড়ে মারে তাকে বারান্দায় ডাকার জন্য। আজ সময় পার হয়ে যাচ্ছে কিন্তু তার আসার খবর নেই।
সন্ধ্যার সময় তারা সবাই মিলে রেডিও শুনছিলো হঠাৎ করেই তাদের টেলিফোনটি বিকট শব্দে বেজে উঠে। আয়জার বুকে মোচড় দিয়ে উঠে। হয়তো আরহান ফোন দিয়েছে। মেহেরুন্নেসা ফোন ধরার জন্য উঠতে নিলে আয়জা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
তুমি বসো আম্মা আমি দেখছি।
আয়জা একপ্রকার দৌঁড়ে ফোনের কাছে যায়। ফোন হাতে নেওয়ার পর সে সালাম দেয় এবং জিজ্ঞেস করে,
আসসালামু আলাইকুম। কে?
ওপর পাশ থেকে উত্তর আসে,
ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি তোর ফুপু। কেমন আছিস?
ওপর পাশ থেকে কাঙ্ক্ষিত মানুষটির আওয়াজ না পেয়ে হতাশ হয়ে যায় আয়জা । তাকে কিছু বলতে না দেখে তার ফুপি হ্যালো হ্যালো করতে থাকে। আয়জা নিজেকে সামলিয়ে উত্তর দেয়,
আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি । তুমি কেমন আছো?
_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তোর আম্মু কোথায়?
_ এইতো বসে আছে ডাক দিয়ে দিচ্ছি।
আয়জা জোরে তার মাকে ডাক দিয়ে বলে,
আম্মা ফুপু ফোন দিয়েছে।
মেহেরুন্নেসা টেলিফোনের কাছে আসলে আয়জা তার হাতে ফোন দিয়ে নিজের ঘরে চলে যায়। মেহেরুন্নেসা ননদের সাথে কথায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আয়জা তার ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। আয়জা আরহান যেখানে প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকে সেখানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তার চোখে আরহানের দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে উঠার মুহূর্তটি ভেসে উঠে। আয়জা নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে,
আমি কি তাহলে শেষ পর্যন্ত আপনার প্রেমে পড়েই গেলাম? নাহলে আপনার অনুপস্থিতি আমাকে এত পোড়াচ্ছে কেনো?
~~~~~~~~~~~~~~
স্কুল শেষে বেড়িয়ে এদিক ওদিক তাকাতে থাকে আয়জা । কিন্তু যার একটি ঝলক দেখার জন্য সে উতলা হয়ে আছে তার দেখা মিললো না কোথাও। আয়জা হতাশ হয়ে হাটা শুরু করে। কিছুদূর হাঁটার পর আয়জা নীলিমাকে প্রশ্ন করে,
তোর ভাই কই রে?
_ বাসায়। কেনো?
_ কাল থেকে দেখছি না যে তাই জিজ্ঞেস করলাম।
নীলিমা বাকা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
কেনো ভাইয়াকে মিস করছিস বুঝি?
আয়জা প্রতিউত্তরে মুচকি হাসে। আয়জাকে মুচকি হাসতে দেখে নীলিমা লাফ দিয়ে বলে,
লার্কি হাসি তো ফাসি।
আয়জা লজ্জায় লাল হয়ে যায়। নীলিমা বলে,
ভাইয়া সেদিন ঠিকই ধরেছিলো তোর মন গলেছে।
_ তোর ভাই কি করে? হঠাৎ করে তার কোনো দেখা নেই কেনো?
_ ভাইয়ার পরীক্ষা শুরু হয়েছে। তাই পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত।
_ পরীক্ষা শেষ হবে কবে?
_ এক মাসের মতো সময় তো লাগবেই।
এক মাসের কথা শুনেই আয়জার মুখটা শুকিয়ে যায়। একদিন না দেখেই সে পাগল হয়ে যাচ্ছে একমাস না দেখে সে থাকবে কি করে? নীলিমা আয়জার মনোভাব বুঝতে পারে। সে বলে,
এত চিন্তা করছিস কেনো? আমাদের বাসায় আয় তাহলেই তো দেখা পেয়ে যাবি।
_ ওহ তাই তো! আমার মাথায় এই চিন্তা আসলো না কেনো?
_ কারণ প্রেমে পড়লে মানুষের বুদ্ধি জ্ঞান লোপ পায়।
আয়জা বাকা চোখে চেয়ে নীলিমার পিঠে একটি কিল বসিয়ে দেয়। নীলিমা পিঠ ডলতে ডলতে বলে,
চল তাহলে যাই।
আয়জা নিজের দিকে তাকায়। ঘামে নাজেহাল অবস্থা তার। চুল গুলোও এলোমেলো হয়ে আছে। এই অবস্থায় সে কীভাবে আরহানের সামনে দাঁড়াবে? তাই সে বলে,
আমি বিকেলে যাবো।
_ কেনো এখন গেলে কি সমস্যা?
_ আমার অবস্থা দেখেছিস? ঘেমেটেমে নাজেহাল অবস্থা হয়েছে। বিকেলে পরিপাটি হয়ে তারপর যাবো।
_ বাবাহ! এখন আবার পরিপাটিও হওয়া লাগবে? ভাইয়া তো সব সময় তোকে এই অবস্থাতেই দেখেছে। এটা আর নতুন কি?
_ তখন আর এখন কি এক নাকি?
_ ওহহো ! তখন আর এখন এক না? তাই তো তখন তো ভাইয়ার চোখে দেখতি তাই পাত্তা দিতি না এখন তো ভাইয়া থেকে সাইয়া হয়ে গিয়েছে। তাই না ভাবি?
নীলিমার মুখে ভাবি ডাক শুনে আয়জার মুখ লাল হয়ে উঠে। পুরো রাস্তা নীলিমা তাকে ক্ষেপাতে ক্ষেপাতে যায়।
~~~~~~~~~~~~~~~~
বিকেলে আয়জা জামার আলনা থেকে সুন্দর একটি থ্রিপিস নিয়ে পড়ে নেয়। মাথার চুল গুলো চিরুনী দিয়ে আঁচড়িয়ে বেণী গেঁথে নেয় এবং কপালের সামনে কাটা চুল গুলো বের করে রাখে। চোখে হালকা কাজল দিয়ে নেয়। নিজেকে আয়নায় ভালোমতো দেখে নিয়ে আয়জা খুশি মনে হেলতে দুলতে নীলিমার বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হতে নেয় এমন সময় পিছন থেকে মেহেরুন্নেসা প্রশ্ন করেন,
এই বিকেলে হেলেদুলে কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি?
মায়ের আওয়াজ পেয়ে আয়জার সব খুশি হাওয়ায় উড়ে যায়। ভয়ে তার হাত পা কাপাকাপি শুরু করে। সে আমতা আমতা করে উত্তর দেয়,
নীলিমাদের বাসায় যাচ্ছি আম্মা।
_ এই সময়? আর এত সেজেগুজে?
_ আসলে ওর থেকে বই দাগিয়ে নিবো এর জন্য। ম্যাডাম ওর বই দাগিয়ে দিয়েছে কয়দিন পর তো পরীক্ষা।
_ বই দাগানোর জন্য যাচ্ছো?
_ হ্যাঁ।
_ বই কই?
আয়জা খেয়াল করে তার হাতে তো কোনো বই নেই। মেহেরুন্নেসা তার দিকে সন্দিহান চোখে চেয়ে থাকেন। তার চাহনি দেখে আয়জা আরও ঘাবড়ে যায়।
চলবে।
