#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ৯
আয়জা আরহানের গাওয়া গানের লাইন গুলো শুনেও না শোনার মতো ভাব করে সামনের দিকে এগিয়ে যায় । আরহান পিছন থেকে বলে উঠে,
আমিও দেখে নিবো তুমি কয়দিন আমার থেকে পালাই পালাই করে বেড়াও। আমার প্রেমের জালে তোমাকে আটকা পড়তেই হবে।
সেদিন সেই মুহূর্ত থেকেই আয়জার জীবনে শুরু হয় যাতনা। সেদিন থেকে রাত দিন এক করে আরহান আয়জার মন গলানোর কাজে লেগে পড়ে। সেদিনের পর থেকে প্রতিদিন স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে সে আরহানকে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। আরহানের এসব ব্যবহারে সে বেশ অতিষ্টই বটে। বিকেলে মেহেরুন্নেসার চিল্লাচিল্লিতে পড়তে বসে আয়জা। ব্যাগ থেকে বই বের করতে গিয়ে সে থতমত খেয়ে যায়। তার ব্যাগ ভর্তি চিরকুট। এত চিরকুট এলো কই থেকে? সে একটি চিরকুট হাতে নিয়ে খুলে দেখে সেখানে লিখা,
আমার হৃদয়ের প্রেয়সী আর কতদিন জ্বালাবে আমায়? তোমার দহনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছি।
সে আরেকটি চিরকুট খুলে দেখে সেখানে লিখা,
আর কত বছর এক তরফা ভালোবাসা নিয়ে বাঁচবো? আমাকে একটা সুযোগ দিয়েই দেখো না। এভাবে আমায় দূরে ঠেলে দিও না।
এরকম প্রত্যেকটি চিরকুটে কিছু না কিছু লিখা। আয়জার ভয়ে হাত পা কাপা শুরু হয়ে যায়। মেহেরুন্নেসা এই রুমেই আছেন। ভুলেও যদি তিনি এগুলো দেখে ফেলেন তাকে কিছু বলার সুযোগ ও দিবেন না সোজা মারা শুরু করবেন। আয়জা ভয়ে ঢোক গিলে। বুক সেলফের উপর থেকে তার শেষ হয়ে যাওয়া পুরোনো কিছু খাতা নিয়ে সেগুলোর ভেতরে চিরকুট গুলো লুকিয়ে দাঁড়ায় আয়জা। ঘরের থেকে বের হতে নিলেই মেহেরুন্নেসা তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন,
কই যাচ্ছিস?
_ আ আম্মা এই খাতা গুলো অনেকদিন ধরে জমে আছে। ফেলে দিয়ে আসি বাহিরে।
_ তো এখন যেতে হবে কেনো? শুধু পড়ায় ফাঁকি দেওয়ার ধান্দা তাই না? চুপচাপ পড়তে বসো। কাল সকালে ফেলো ।
_ আম্মা সকালে খেয়াল থাকে না। আর স্কুল থেকে এসে ভুলেও যাই এগুলোর কথা। সেই কবে থেকে পড়ে আছে।
_ আচ্ছা টেবিলে এক কিনারে রেখে দাও আমি কাল সকালে ফেলে দিবো নি।
_ তুমি কেনো কষ্ট করতে যাবে আমিই ফেলে দিয়ে আসি। এই যাবো আর আসবো।
_ ঠিক আছে যাও।
আয়জা রুম থেকে বের হয়ে জোরে শ্বাস নেয়। এতক্ষণ তার কাছে মনে হচ্ছিলো যেনো শ্বাস আটকে আছে। ভয়ে বেগতিক অবস্থা তার। বিন্ডিং এর নিচে ময়লার ঝুড়ির কাছে যেতে যেতে সে ফিসফিসিয়ে বলে,
এই আরহান ভাই জন্মের জ্বালান জ্বালাচ্ছে। কচুর প্রেমিক পুরুষ। একা আছি ভালো আছি। এই নাই ঝামেলার কোনো দরকার নেই আমার। কিন্তু সে বুঝতে চাচ্ছে কই? এই লোক আমাকে আম্মার হাতে ঝাড়ু পেটা না করা পর্যন্ত থামবে না বোধহয়।
আয়জা খাতার থেকে চিরকুট গুলো বের করে সেগুলোকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ঝুড়িতে ফেলে দেয় এবং এক পাশে খাতা গুলো রেখে বাসায় ফিরে এসে পড়তে বসে। সন্ধ্যায় সবাই বসে টিভি দেখছিলো এমন সময় হঠাৎ টেলিফোনটি বেজে উঠে। মেহেরুন্নেসা আয়জাকে বলেন,
আয়জা দেখো তো কে ফোন দিচ্ছে।
আয়জা মনোযোগ দিয়ে টিভি দেখছিলো এমন সময় তার উঠে যাওয়াতে বেশ বিরক্ত হয়। কল ধরতেই সে বেশ বিরক্ত হয়েই বলে,
আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?
_ তোমার প্রেমিক পুরুষ।
আয়জার হাত থেকে রিসিভারটি পড়ে যেতে নেয় কিন্তু সে ধরে ফেলে। সে মিনমিন করে বলে,
আপনি কল দিয়েছেন কেনো?
_ তোমার গলার স্বর শুনতে মন চাচ্ছিলো প্রচুর।
_ আপনি কি এসব করা বন্ধ করবেন? আমি কিন্তু প্রচুর বিরক্ত হচ্ছি।
_ তুমি রাজি হয়ে যাও আমি বিরক্ত করা বন্ধ করে দিবো।
_ আমি বলেছি তো রাজি হবো না।
_ আমিও বলেছি তো তুমি রাজি না হওয়ায় পর্যন্ত হার মানবো না।
মেহেরুন্নেসা চিল্লিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
কে কল দিয়েছে?
_ রং নাম্বার আম্মা। ভুলে দিয়েছে।
আয়জা আরহানকে বলে ,
খবরদার আর কল দিবেন না।
এই কথা বলে আরহানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আয়জা কল কেটে দেয় । এরপর আবার সে বসে টিভি দেখায় মনোযোগ দেয়। কিছুক্ষণ বাদে আবার টেলিফোনটি বেজে উঠে। আয়জা আবার বিরক্ত হয়ে কল রিসিভ করে। ওপাশ থেকে আরহান বলে,
একটু কথা বলো না। এমন করছো কেনো?
_ আপনার কি মনে হয় না আপনি বাড়াবাড়ি করছেন? আপনি যে এমন করছেন আপনি বুঝতে পারছেন আম্মা জানলে আমার কি হাল হবে? এবার একটু থামুন প্লীজ।
আয়জা এবার কল কেটে রিসিভার উপরে তুলে রাখে যাতে আর কল না আসে । সে এসে বসতেই মেহেরুন্নেসা জিজ্ঞেস করেন,
আবার কে কল দিলো?
_ সেই রং নাম্বারই।
_ রং নাম্বার হলে আবার কেনো কল দিবে?
_ বার বার উনি ভুল নাম্বারই ডায়াল করছেন।
_ ওহ।
টিভি দেখে আয়জা নিজের রুমে চলে আসে। পুরো রুম জুড়ে সে পায়চারী করছে। এভাবে বারবার আম্মাকে মিথ্যা কথা বলতে তার মোটেও ভালো লাগছে না। তার কি করা উচিত সেটাও বুঝতে পারছে না। এই বিষয়ে কি তার আব্বা আম্মাকে বলা উচিত? যদি বলে তারা তো তাকেই ভুল বুঝবে বিশেষ করে আম্মা। নাহ এভাবে চলতে থাকলে হবে না। তাকেই এটার কোনো সমাধান বের করতে হবে ।
হঠাৎ সে খেয়াল করে তার জানালায় টুং টাং শব্দ হচ্ছে। শব্দের উৎস খুঁজতে সে বারান্দায় চলে যায়। বারান্দা দিয়ে নিচে তাকিয়ে সে তো অবাকের শেষ পর্যায়ে চলে যায়। আরহান নিচে দাঁড়িয়ে আছে। সেই ছোট ছোট ইটের টুকরা জানালায় মারছিলো। আয়জাকে দেখে সে মিষ্টি করে হাসে। এদিকে আয়জার ভয়ে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। আশেপাশের খালাম্মারা যদি দেখে ফেলে আর আম্মাকে বলে দেয় তাহলে সে আজকে শেষ। আয়জা ইশারায় তাকে চলে যেতে বলে। আরহান তাকে চোখ টিপ মেরে বাইকে উঠে চলে যায় । আয়জা তাড়াতাড়ি নিজের রুমে এসে পড়ে। ভয়ে ঘেমে একাকার হয়ে গিয়েছে সে। সে মনে মনে ভাবে ,
নাহ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এর একটা বিহিত করতেই হবে তাকে।
রাতে জাওয়াদ আহমেদ জানান আগামীকাল সকালে তারা গ্রামে যাবেন আয়জাদের দাদু বাড়ি। বাকি সবাই ও আসছে। এই কথা শুনে আয়জা এবং সাফওয়ান খুশিতে হইহুল্লোড় শুরু করে। তাহমিদ ছোট দুই ভাইবোনকে খুশি হতে দেখে মুচকি হাসে। মেহেরুন্নেসা সবার জামাকাপড় গুছাতে শুরু করেন। সকালে তারা বাসে করে রওনা হন বাড়ির উদ্দেশ্যে। বিকেলের দিকে বাড়ি এসে পৌঁছান তারা। আয়জা দৌঁড়ে তার দাদির কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে এবং বলে,
আসসালামু আলাইকুম দাদী। কেমন আছো তুমি?
_ আলহামদুলিল্লাহ দাদু ভাই ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তোমাকে দেখে আরো বেশি ভালো হয়ে গিয়েছি।
_ যাও ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নাও আগে তারপর কথা বলবো।
এরই মধ্যে তার বাকি সব ফুপাতো মামাতো বোনরা এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। রিনা এবং ফারহানা তার বড় চাচার মেয়ে । রেশমা, নিলুফা এবং তাজরিন তার ফুপুর মেয়ে। তারা সকলেই পিঠাপিঠি। তাদের মধ্যে বয়সের দুরত্ব দুই থেকে তিন বছর। তাদের মধ্যে বেশ মিল। তারা সকলে ঘরে প্রবেশ করে। অন্যদিকে তাহমিদ এবং সাফওয়ান তাদের ছেলে কাজিনদের সাথে ঘরে প্রবেশ করে। সকলে একত্রে আসাতে বাড়িটা ভরে উঠেছে। আয়জার দাদা তার ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে বাজার থেকে প্রচুর জিনিসপত্র এনেছেন। ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে তাহমিদ, সাফওয়ান তাদের বাকি কাজিনদের সাথে মাঠে ফুটবল খেলতে চলে যায়। আয়জারা উঠানে দৌড় ঝাঁপ করছে। তাদের মা চাচীরা ঘরের আঙিনায় বসে একজন আরেকজনের মাথায় উকুন দেখে দিচ্ছেন এবং গল্প করছেন । অন্যদিকে আয়জার বাবা চাচারা চায়ের দোকানে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতে উঠেছেন।
গ্রামে সন্ধ্যা নামলেই চারিদিক ধীরে ধীরে নীরব হতে শুরু করে। ইশার নামাজের পর তো দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে যায় সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। শহরে বিদ্যুৎ থাকলেও তাদের গ্রামে এখনো বৈদ্যুতিক সংযোগ চালু হয় নি। যার কারণে সন্ধ্যার পর হারিকেন এবং মোমবাতির আলোয় শেষ আশ্রয়। সন্ধ্যা আটটায় সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হয়ে যায় । মা চাচীরা সব থালাবাটি ধুয়ে গুছগাছ করে আসেন। এবার শুরু হয়েছে পাল্লা ধরে বাথরুমে যাওয়া। ঘর পেরিয়ে আরও তিন চার মিনিট হাটলে একটি বাথরুম। এতগুলো মানুষ একের পর এক জন করে বাথরুমে যাচ্ছে। বাথরুমের কাছেই কল পার। সেখান থেকে চাপ কল থেকে মগে করে পানি নিয়ে বাথরুমে যেতে হয়। বাড়ির সব ছেলেরা একটি রুমে মাটিতে এক সারিতে ঢালা বিছানা করেছেন শোয়ার জন্য। তারা সকলে এক এক করে বাথরুমের কাজ শেষ করে এসে শুয়ে পড়েছেন যার যার বিছানায়। তাদের পাশের রুমেই ঠিক একই ভাবে মাটিতে ঢালা বিছানা করে শোয়ার ব্যবস্থা করেছেন বাড়ির মেয়েরা। তাদের মধ্যেও বেশ কয়েকজন বাথরুম থেকে চলে এসেছেন। আয়জার বড় চাচী রুমানা বলেন,
এই বাচ্চারা তোরা ঘুমানোর আগে বাথরুমে যাবি না? আয় আমার সাথে সবাই। একবার ঘরে ঢুকলে কিন্তু আর বের হবো না আমরা কেও।
সবাই চাচীর পিছনে পিছনে যেতে শুরু করে। সবার সামনে বড় চাচী তার হাতে হারিকেন এবং পিছনে মেহেরুন্নেসা তার হাতেও হারিকেন। মাঝখানে সব মেয়েরা গুটিসুটি হয়ে হাঁটছে। কেবল বাজে রাত সাড়ে আটটা। অথচ চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার এবং নিস্তব্ধ। এমন পরিবেশে সবার যেনো গায়ে কাটা দিয়ে উঠছে। রুমানা এক এক করে সবাইকে বাথরুমে যেতে বলেন । যাওয়ার সময় হাতে হারিকেন এবং এক মগ পানি দিয়ে দেন। এক এক করে সবাই এসে পড়ে এখন শুধু বাকি রেশমা। সে বড্ড ভীতু স্বভাবের। তাকে অনেক বুঝিয়ে বাথরুমে পাঠানো হয়েছে। সে বাথরুমের ভিতর থেকে একটু পর পর চিল্লিয়ে বলে,
মামী তোমরা বাহিরে আছো তো?
_ আরে হ্যাঁ রে বাবা আছি। বার বার একই কথা কেন জিজ্ঞেস করছিস? তোকে রেখে যাবো না আমরা। তুই তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে বের হ।
রেশমা বের হলে তারা আবার ঘরের দিকে রওনা হয়। চারিদিক এতটাই নীরব যে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর তাদের পায়ের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। রেশমা ভয়ে গুটিসুটি মেরে হাঁটছে। হঠাৎ সে তার কাঁধে ঠান্ডা একটি হাত অনুভব করে এবং ভয়ে চিল্লিয়ে উঠে,
ভূত ! ভূত! বাঁচাও বাঁচাও।
তার চিৎকার শুনে সবাই তার দিকে তাকায়। রুমানা এবং মেহেরুন্নেসা তার সামনে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেন,
কি হয়েছে?
_ বড় মামী ছোট মামী ভূত!
_ কই ভূত?
_ আমার কাঁধে আমি ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়েছি।
আয়জা জোরে জোরে হাসতে শুরু করে। তাকে এভাবে হাসতে দেখে সবাই তার দিকে তাকায়। সে হাসতে হাসতে বলে,
আরে ওটা আমার হাত ছিলো। তুই তো দেখছি অল্পতেই ভয় পেয়ে যাস।
চলবে।
