#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ৮
আয়জা আরহানের কথা শুনে থতমত খেয়ে গেছে। কি বলবে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না সে। সব কিছু যেনো মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে তার। আয়জার মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে যেনো সে বাক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না তার। আরহান যে তাকে নিয়ে এমন ভাবে সে কল্পনাও করে নি।
আয়জা হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
আপনার কি মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছে? কিসব উল্টা পাল্টা বলছেন। আপনাকে আমি ছোট থেকে ভাই বলে আসছি। আপনাকে আমি তাহমিদের মতোই মনে করি।
_ কেনো মনে করো? আমি তো তাহমিদ না। আমি তোমার আপন ভাই না বান্ধবীর ভাই।
_ আমি কখনো আপনাকে অন্য চোখে দেখি নি।
_ সেটা তো আমিও জানি। নাহলে নীলিমা পর্যন্ত আমার হাবভাব দেখে আন্দাজ করতে পেরেছে কিন্তু তুমি পারো নি। যাই হোক এখন তো তুমি আমার মনোভাব জানো। তোমার মতামত কি?
_ আমার কোনো মতামত নেই।
_ তুমি আমাকে ভালোবাসো না।
_ না। বললাম তো আপনাকে আমি ওই নজরে কখনো দেখি নি। আর তাছাড়াও এসব প্রেম ভালোবাসার মধ্যে আমি নেই। আম্মা জানলে আমাকে জানে মেরে ফেলবে।
_ তোমার মনে আমি আমার জন্য জায়গা তৈরি করেই ছাড়বো। এর জন্য আমার যা করার তাই করবো কিন্তু হার মানবো না। আমার ভালোবাসাকে আমি চিরকাল এক তরফা হয়ে থাকতে দিবো না। খুব শীঘ্রই তুমিও আমাকে ভালবাসবে যতটা আমি তোমায় বাসি তার থেকেও বেশি।
_ কখনোই না।
_ কথা মিলিয়ে নিও।
আয়জা আর কথা বাড়ায় না। দৌঁড়ে গিয়ে আরহানকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায়। সিঁড়ি দিয়ে নামার পথে তার নীলিমার সাথে দেখা হয়। নীলিমা উপরে উঠছিলো। আয়জাকে এমন তাড়াহুড়া করে নামতে দেখে সে জিজ্ঞেস করে,
কিরে এত তাড়াহুড়ো করে কই যাচ্ছিস?
আয়জা নীলিমাকে কোনো উত্তর দেয় না দৌঁড়ে তাদের বাসা থেকে বের হয়ে যায়।
নিজের বাসায় এসে হাঁফাতে থাকে আয়জা। আয়জার এই অবস্থা দেখে মেহেরুন্নেসা খুন্তি হাতে তার দিকে এগিয়ে এসে ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করেন,
তুই আবার দৌড় ঝাঁপ করেছিস? তোকে না মানা করেছি আমি দৌড় ঝাঁপ করতে? আমি কথা বললে কি তোর কানে কথা যায় না? এখন বড় হয়েছিস এখন কি তোকে এসব লাফালাফি করাতে মানায়? মানুষ কি বলবে? আস্তে ধীরে হাটা যায় না?
_ …..
_ কি হলো কথা বলছিস না কেনো?
_ …..
_ ঘরে যা। ঘরে গিয়ে হাতমুখ ধো। তোর বাবা আসুক তারপর দেখছি তোকে।
আয়জা আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ ঘরে গিয়ে আলনা থেকে এক সেট থ্রিপিস নিয়ে বাথরুমে যায়। শাড়ি পাল্টে থ্রিপিস পড়ে নেয় এবং হাতমুখ ধুয়ে বাহিরে আসে। ঘরে আনমনা হয়ে চুপচাপ বসে থাকে সে। আজ সাফওয়ান তার সাথে দুষ্টুমি করলেও কোনো প্রতিবাদ করে না আয়জা। এতে সাফওয়ান বেশ অবাক হয়। তার বোন তো এত ঠান্ডা স্বভাবের না। তারা দুই ভাই বোন পিঠাপিঠি হওয়ায় তাদের মধ্যে খুনসুঁটি লেগেই থাকে। তাহলে আজকে তার বোন এত ঠান্ডা কেনো বুঝে আসছে না তার। কয়েক ঘণ্টা পর জাওয়াদ আহমেদ অফিস থেকে বাসায় ফিরেন। আয়জা তার দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়। জাওয়াদ আহমেদ পানি পান করে মেয়ের হাতে পানির গ্লাস ফেরত দিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
কি ব্যাপার আমার আম্মার কি মন খারাপ?
_ না তো।
_ তাহলে এত চুপচাপ কেনো তুমি? আমার চঞ্চল হরিণী তো সব সময় দৌড় ঝাঁপের মধ্যেই থাকে আজকে এত চুপচাপ কেনো?
পাশ থেকে মেহেরুন্নেসা বলেন,
বিকেলে এই লাফালাফির জন্য আমার কাছে বকা খেয়েছে তাই আপাতত চুপচাপ আছে। সকালে আবার আগের মতো হয়ে যাবে । বকলে কয়েক ঘণ্টা লাফালাফি বন্ধ থাকে তারপর যেই লাউ সেই কদু।
জাওয়াদ আহমেদ দীর্ঘ স্বাস নিয়ে বলেন,
আমার মেয়েটা কে সারাদিন এত বকাঝকা কেনো করো বলোতো। এটা তো ওর চঞ্চলতার বয়সই। বড় হলে এমনি ঠিক হয়ে যাবে।
_ এই তোমার লাই পেয়ে পেয়ে এমন হচ্ছে ও। বেশি লাই দিও না। মেয়েদের এত লাই দিতে নেই। পরে আফসোস করবে।
_ আমার নিজের মেয়ের প্রতি পুরো বিশ্বাস আছে। সে তার বাবার বিশ্বাস কখনো ভাঙবে না। তাই না আম্মা?
আয়জা উপর নিচ মাথা দোলায়। যার মানে সে বিশ্বাস ভাঙবে না। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তিনি রুমে প্রবেশ করেন।
মেহেরুন্নেসা জাওয়াদ আহমেদকে টেবিলে খাবার পরিবেশন করে দিচ্ছেন। অন্যদিকে তার তিন ছেলে মেয়ে বই নিয়ে পড়তে বসেছে। এক পর্যায়ে মেহেরুন্নেসা জাওয়াদ আহমেদকে বলেন,
একটা কথা বলার ছিলো।
_ হুম বলো।
_ পাশের বিল্ডিং এর সুমনা আপা এসেছিলেন আজ। উনি বললেন উনার কাছে ভালো কয়েকটা সম্বন্ধ আছে আমাদের আয়জার জন্য।
_ তুমি কি বলেছো?
_ আমি বলেছি আমি তোমার সাথে কথা বলে তাদেরকে জানাবো।
_ না করে দাও।
_ কেনো?
_ আমার মেয়ের এখনো বিয়ের বয়স হয় নি। ওকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিবো না।
_ এখনই তো সময়। আর তাছাড়াও আমার তোমার সাথে ওর থেকেও ছোট বয়সে বিয়ে হয়েছিলো।
_ হুম। সময় এখন পাল্টাচ্ছে। আমার মেয়েকে আমি আরও কয়েক বছর পর বিয়ে দিবো। এখন ও পড়াশোনা করবে।
_ কি এমন পড়াশোনা করে ও? টেনে টুনে পাশ করে। পড়ালেখায় একদম ডাব্বা।
_ সে যাই হোক। যতটুকু পারে ততটুকুই পড়বে।
_ কিন্তু…..
_ কোনো কিন্তু নয়। এটাই আমার সিদ্ধান্ত। এই বিষয়ে আর কোনো কথা শুনতে চাই না।
_ ঠিক আছে।
আয়জা চুপচাপ পুরো কথা গুলো শুনলো। হঠাৎই জীবনটা তার কেমন জানি হয়ে গেলো। সব কিছু কেমন বিষাদ লাগছে তার। আজ একদিনে তার জীবনে কতগুলো ঘটনা ঘটে গেলো। সে একটা হতাশার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।
~~~~~~~~~~
মাত্রই স্কুলে এসে পৌঁছেছে আয়জা। আজ নীলিমার জন্য অপেক্ষা ও করে নি একাই চলে এসেছে। নিজের সিটে চুপচাপ বসে আছে আয়জা। তার আশেপাশে কত হইহুল্লোড় করছে বাকিরা কিন্তু সে নীরব। কিছু সময় পর নীলিমা এসে তার পাশে বসে এবং তার পিঠে একটি চাপড় মেরে জিজ্ঞেস করে,
সমস্যাটা কি তোর? গতকাল থেকে এত অদ্ভুত ব্যবহার করছিস কেনো? কাল কিছু না বলে হুট করে বাসা থেকে চলে গেলি , আজ আমাকে ছাড়া একাই স্কুলে এলি? আমি কি করেছি? আমার কি দোষ?
_ তুই কিছু করিস নি।
_ তাহলে আমার সাথে এমন করছিস কেন?
_ তোর ভাই করেছে।
_ মানে?
_ গতকাল ছাদে আরহান ভাইয়া আমাকে প্রপোজ করেছে।
_ কিহ! ( হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে যায় )
ক্লাসের বাকিরা তার দিকে তাকায়। সবাইকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে নীলিমা লজ্জায় পুনরায় নিজের সিটে বসে পড়ে এবং ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে,
সত্যি?
_ হুম।
_ দেখেছিস আমার কথাই দিন শেষে সত্য হলো। আমি বলতাম না তোকে ভাইয়া মনে হয় পছন্দ করে?
_ সেই চিঠি এবং টেলিফোনে কল ও তোর ভাইয়া করেছিলো।
_ আরে বাবাহ ! ভাই তো আমার বহুত এগিয়ে আছে। তাই তো সেদিন ভাবছিলাম হাতের লিখাটা চেনাচেনা লাগে। তুই কি উত্তর দিয়েছিস?
_ কি আর উত্তর দিবো। না বলেছি।
_ তুই কি পাগল? না কেনো বল্লি ?
_ তো বলবো না? তাকে আমি ছোট থেকে ভাইয়ের মতো দেখে এসেছি।
_ ধুর ঘোড়ার ডিম। বারবার শুধু একই কথা। ভাইয়া বলে ডাকিস বলেই কি ভাই হয়ে গেলো? আর তাছাড়াও আমার ভাইয়ের মধ্যে কি কমতি আছে?
_ কোনো কমতি নেই। সে আরও ভালো কাউকে পাবে। আমি এতে রাজি হতে পারবো না। আর তুই যদি আমাকে জোরাজোরি করিস তাহলে আমি তোর সাথেও কথা বলা বন্ধ করে দিবো।
নীলিমা আয়জার মন মেজাজ খারাপ দেখে আর কথা বাড়ায় না। স্কুল ছুটির পর দুইজন নিজেদের বাড়ির পথে হাটা শুরু করে। কিছু দূর আগাতেই তাদের সাথে দেখা হয়ে যায় আরহানের। আয়জা আরহানকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে আরহান তার পথ আটকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
আমার উত্তরটা?
_ গতকালই দিয়েছি।
_ উত্তর পরিবর্তন হয় নি?
_ না।
_ আমিও তোমায় গতকাল বলেছি আমি হার মানবো না। আজ এই মুহূর্ত থেকে তুমি আমার প্রেমিক পুরুষ রূপ দেখবে।
আয়জা তার কথায় পাত্তা না দিয়ে সামনের দিকে হেঁটে এগিয়ে যায়। নীলিমাও তার পিছে পিছে যায়। আরহান মুচকি হেসে তাদের থেকে একটু দুরত্ব রেখে হাঁটতে হাঁটতে গুনগুন করে গানের কয়েক লাইন গেয়ে উঠে,
আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি
আর মুগ্ধ এ চোখে চেয়ে থেকেছি
আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি
আর মুগ্ধ এ চোখে চেয়ে থেকেছি।
বাঁজে কিনকিনি রিনিঝিনি
তোমারে যে চিনি চিনি
মনে মনে কত ছবি একেঁছি
আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি
আর মুগ্ধ এ চোখে চেয়ে থেকেছি।
ছিল ভাবে ভরা দুটি আঁখি চঞ্চল
তুমি বাতাসে উড়ালে ভীরু অঞ্চল
ছিল ভাবে ভরা দুটি আঁখি চঞ্চল
তুমি বাতাসে উড়ালে ভীরু অঞ্চল
ঐ রুপের মাধুরী মোর সঞ্চয়ে রেখেছি
দূর হতে তোমারেই দেখেছি
আর মুগ্ধ এ চোখে চেয়ে থেকেছি।
চলবে।
