#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ১২
আয়জা আমতা আমতা করে উত্তর দেয়,
তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে বই নিতে ভুলে গিয়েছি আম্মা।
মেহেরুন্নেসা মেয়ের দিকে সন্দিহান চোখেই চেয়ে থাকেন। তিনি ঠান্ডা গলায় বলেন,
তোমার হাব ভাব আমার আজকে সুবিধার লাগছে না। যাও বই নিয়ে এসো।
আয়জা দৌঁড়ে টেবিল থেকে একটি বই হাতে নিয়ে মায়ের সামনে এসে জিজ্ঞেস করে,
তাহলে আমি যাই আম্মা?
_ দাঁড়াও আমি সাফওয়ানকে ডাক দিচ্ছি ওকে সাথে করে নিয়ে যাও।
_ সাফওয়ান কেনো?
মেয়ের করা প্রশ্নে উনি উল্টো প্রশ্ন করেন,
_ কেনো ওকে নিলে কি সমস্যা? তুমি তো নীলিমার বাসায়ই যাচ্ছো।
_ আচ্ছা নিয়ে যাবো।
মেহেরুন্নেসা সাফওয়ানকে ডেকে তৈরি হতে বলেন। সে তৈরি হওয়ার পর দুই ভাই বোন নীলিমাদের বাসায় চলে যায়। আয়জাকে দেখেই নীলিমা দৌঁড়ে তার কাছে গিয়ে চিল্লিয়ে জিজ্ঞেস করে,
এসে গেছিস?
আয়জার পাশে সাফওয়ানকে দেখে নীলিমা হঠাৎ চমকে উঠে। সে জিজ্ঞেস করে,
আরে সাফওয়ান যে। কেমন আছো?
_ আলহামদুলিল্লাহ আপু ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।
_ তুমি আপুকে দেখে এমন চিল্লিয়ে উঠলে কেনো? আপুর সাথে না তোমার আজকে স্কুলে দেখা হয়েছে?
সাফওয়ানের কথা শুনে নীলিমা এবং আয়জা একজন আরেকজনের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। নীলিমা আমতা আমতা করে বলে,
ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড না? ওকে ছাড়া আমার এক মুহুর্ত ও ভালো লাগে না। তাই খুশিতে চিল্লিয়ে ফেলেছি। ভিতরে এসে বসো।
নীলিমার মা রান্নাঘর থেকে বাহিরে এসে তাদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে আবার রান্নাঘরে চলে যান নাস্তা আনার উদ্দেশ্যে। সাফওয়ান দুই বান্ধবীকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করে,
কি ব্যাপার আপু তোমরা দাঁড়িয়ে আছো কেনো? বই দাগাবে না?
নীলিমা কিছু না বুঝে আয়জার দিকে তাকায়। আয়জা সাথে সাথে বলে,
হ্যাঁ দাগাবো তো। নীলিমা তোর বই না ম্যাডাম দাগিয়ে দিয়েছে? সেটা দাগানোর জন্যই এসেছি। বইটা নিয়ে আয় তো।
নীলিমা আয়জার কথা বুঝতে পেরে ঘর থেকে বই এনে আয়জার পাশে বসে। সে ফিসফিস করে তাকে জিজ্ঞেস করে,
কিরে তুই সাফওয়ানকে সাথে করে এনেছিস কেনো?
_ আম্মা ওকে সাথে পাঠিয়ে দিয়েছে ।
_ হঠাৎ?
_ কি জানি । আম্মা আজকে বারবার কেমন করে যেনো তাকাচ্ছিল আমার দিকে।
_ কেমন করে তাকিয়েছে?
_ সন্দিহান চোখে।
_ যেভাবে সেজেগুজে এসেছিস সন্দেহ করাটাই স্বাভাবিক।
_ আজাইরা প্যাচাল বাদ দিয়ে তোর ভাই কই সেটা বল।
_ ভাইয়া তার ঘরে পড়ছে।
_ বাহিরে আসবে না?
_ মনে তো হয় না। ইদানীং নিজের ঘরেই থাকে আর পড়ে।
_ তাহলে এখন কি করবো ?
_ কোনো বাহানায় আমার ঘরে যা। সেখান থেকে ভাইয়ার ঘরে গিয়ে দেখা করে আসিস। আমি এদিকে সাফওয়ানকে কথায় ব্যস্ত রাখি।
_ আমি উনার ঘরে যেতে পারবো না। আমার লজ্জা লাগে।
_ তাহলে তোর আর ভাইয়াকে দেখা লাগবে না।
_ কিন্তু…..
_ কোনো কিন্তু না।
এরই মাঝে নীলিমার মা তাদের জন্য নাস্তা নিয়ে আসেন। নীলিমা আয়জাকে বলে,
আমার ঘর থেকে খাতাটা নিয়ে আয় তো। আমি আনতে ভুলে গেছি। সেখানে সাজেশন লিখা আছে।
_ আচ্ছা।
আয়জা নীলিমার ঘরের দিকে এগিয়ে যায় অন্যদিকে নীলিমা সাফওয়ানকে নাস্তা খাওয়ানোর কাজে ব্যস্ত রাখে। আয়জা আরহানের ঘরের সামনে ঘুরপাক খাচ্ছে কিন্তু ভেতরে যাওয়ার সাহস করতে পারছে না। এভাবে কয়েক মিনিট ধরে ঘুরপাক করেও যখন সে সাহস করতে পারে না তখন সে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। এরমাঝেই আয়জার কানে আসে দরজা খোলার আওয়াজ। সে পিছনে ঘুরে দেখতে পায় আরহান দরজা খুলে ঘর থেকে বের হয়েছে। তার হাতে একটি খালি পানির বোতল। যা দেখে বুঝা যায় পানি নিতেই ঘর থেকে বের হয়েছে সে। আরহান চোখের সামনে নিজের প্রেয়সীকে দেখে বেশ অবাক হয়। সে যেনো নিজের চোখকে বিশ্বাসই করতে পারছে না। সে প্রশ্ন করে,
আয়জা এটা কি সত্যিই তুমি?
আয়জা কাপাকাপা গলায় উত্তর দেয় ,
হুম।
_ কখন এসেছো?
_ কিছুক্ষণ হলো।
_ এখানে কি করছো?
_ তেমন কিছু না।
আয়জা এক মনে আরহানের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকে নিজের দিকে এভাবে তাকাতে দেখে আরহান প্রশ্ন করে,
কিছু বলবে?
_ উহুম।
_ তাহলে আজ এভাবে তাকিয়ে আছো যে?
_ আপনাকে দেখছি। আপনি জানেন আপনি যখন সারাদিন আমার পিছনে পড়ে থাকতেন আমি অনেক বিরক্তবোধ করতাম । কিন্তু কাল আপনাকে সারাদিন না দেখে আমার অনেক ছটফট লাগছিলো।
_ তুমি কি আমাকে দেখার জন্য এসেছো।
আরহানের সরাসরি প্রশ্নে আয়জা লজ্জায় পড়ে যায় , যে লজ্জা তার চোখে মুখে ভেসে উঠে। আরহান মুচকি হেসে বলে,
না না করেও দিন শেষে তোমাকে আমার প্রেমে ফেলেই দিলাম তাই না?
আয়জা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। আরহান বলে,
তোমাকে না দেখে যে আমি নিজেও থাকতে পারছিলাম না। কিন্তু কী করবো বলো? পরীক্ষার জন্য তো পড়াশোনা করতে হবে। আমাকে একটা ভালো রেজাল্ট করতে হবে। একটা ভালো চাকরি পেতে হবে, তোমাকে দুনিয়ার সকল সুখ এনে দেওয়ার জন্য নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে। আমি যেমন এত বছর তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি তেমনি তুমি কি আমার জন্য একটি মাস অপেক্ষা করতে পারবে না প্রেয়সী?
_ পারবো।
_ যদিও তোমার কষ্ট আমার সহ্য হয় না তবুও আমি চাই এই ক্ষণিকের দুরুত্বের কষ্ট তুমি পাও। আমি চাই তুমি উপলব্ধি করো ভালোবাসার মানুষের থেকে দুরত্ব মনটাকে কি পরিমান পোড়ায়। স্বর্ণ যেমন আগুনের তাপে পুড়ে আরও সুন্দর হয় নতুন রূপ নেয় তেমনি তুমি আমার ক্ষণিকের বিরহে নিজেকে আমার মনের মতো তৈরি করো। তোমার মনে আমার জন্য গড়ে উঠা ভালোবাসাকে আরও মজবুত করো। কি পারবে তো?
_ হুম।
আরহান আগে সেখান থেকে চলে যায় । আয়জা চলে যায় নীলিমার রুমে খাতা আনতে। আরহান সাফওয়ানকে দেখে তার কাছে এগিয়ে গিয়ে তার মাথায় টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
কিরে ছোটু কি খবর?
_ আহহ ভাইয়া এমন করো কেনো তুমি সব সময়? ব্যাথা লাগে না আমার?
_ কি একটা টোকা দিলাম এতেই ব্যাথা পেয়ে গেলি? ছেলে মানুষ হয়ে এত নাজুক শরীর তোর? ছি ! বড় ভাইদের মান ইজ্জত তো পুরাই ধুলোয় মিশিয়ে দিলি।
_ আমি যখন বড় হবো তখন আমিও শক্তিশালী হবো।
_ এখন থেকেই নিজেকে শক্তিশালী বানানোর জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দে।
তাদের কথার মাঝেই আয়জা এসে পড়ে। আয়জাকে দেখে সাফওয়ান প্রশ্ন করে,
কি করছিলে তুমি এতক্ষণ আপু? একটা খাতা আনতে এতক্ষণ সময় লাগে?
_ খাতা খুঁজে পাচ্ছিলাম না তাই দেরি হয়েছে। আর তুই আমার থেকে ছোট হয়ে এমন বড় ভাইদের মতো জিজ্ঞাসাবাদ করছিস কেনো?
_ ভাই তো ভাইই। সে ছোট হোক আর বড়। ভাইদের কাজই হলো বোনদের রক্ষা করা। আর তাছাড়াও আম্মা বলেছে তোমাকে চোখে চোখে রাখতে।
_ চুপ একদম আম্মার চামচামি করবি না।
_ কি এত বড় কথা? দাঁড়াও বাসায় গিয়ে আম্মাকে বলবো তুমি আমাকে কি কি বলেছো।
_ আচ্ছা সরি আর বলবো না। তাও আম্মাকে কিছু বলিস না।
_ একটা শর্তে বলবো না।
_ কি শর্ত?
_ বাসায় যাওয়ার সময় আমাকে ঠান্ডা কোক কিনে খাওয়াবে।
_ ঠিক আছে।
নাস্তা করে কিছুক্ষণ পর আয়জারা নীলিমাদের বাসা থেকে বেড়িয়ে আসে নিজেদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য। আয়জা পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে আরহান তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আয়জাও হাঁটছিলো আর একটু পরপর পিছনে তাকাচ্ছিল যার কারণে তাদের মধ্যে বেশ কয়েকবার চোখাচোখি হয়।
~~~~~~~~~~~~~
কোক খেতে খেতে দুই ভাইবোন বাসায় আসে। বাসায় এসে দেখে পাশের বিল্ডিং এর এক খালা এসেছেন মেহেরুন্নেসার সাথে গল্প করতে। দুই ভাই বোন তাকে সালাম দিয়ে ওপর পাশের সোফায় বসে। তাহমিদ বাসায় নেই। সে বাহিরে গিয়েছে। কিছু সময় পর ভদ্র মহিলা বলেন,
আচ্ছা তাহমিদের আম্মা আসি তাহলে।
_ আচ্ছা আপা। আবার আসবেন ।
_ হ্যাঁ তুমিও ওদের নিয়ে আমাদের বাসায় এসো।
_ আচ্ছা।
তিনি চলে যাবার পর সাফওয়ান মায়ের কাছে গিয়ে বলে,
আম্মা।
_ কি?
_ সবাই তোমাকে তাহমিদের আম্মা বলে ডাকে কেনো?
_ তাহলে কি বলে ডাকবে?
_ সাফওয়ানের আম্মা বলে ডাকবে।
পাশ থেকে আয়জা বলে উঠে,
তাহলে আমি কি দোষ করলাম? আয়জার আম্মা বলে ডাকলে কি সমস্যা?
সাফওয়ান উত্তরে বলে,
আমার নামই বলবে আমি কিছু জানি না।
_ মাঝারি বাচ্চাদের কোনো দাম নেই। সব আদর তো বড় জন আর ছোট জন পায়। মাঝখান দিয়ে আমি দুধভাত।
চলবে।
#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ১৩
সাফওয়ান এবং আয়জার তর্কবিতর্কের মধ্যেই দরজায় টোকা পড়ে। মেহেরুন্নেসা গিয়ে দরজা খুলে দেন। জাওয়াদ আহমেদ অফিস থেকে বাসায় ফিরেছেন। তিনি ঘরে ঢুকে ছেলেমেয়েদের ঝগড়ার কারণ জিজ্ঞেস করেন। আয়জা তাকে সব ঘটনা খুলে বলে। তিনি ছেলেমেয়েদের এমন ছেলেমানুষই দেখে মুচকি হাসেন। তিনি দুই ছেলে মেয়েকে তার দুই পাশে বসিয়ে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলেন। তারাও বাবার কথা মতো ঝগড়া বন্ধ করে দেয়। জাওয়াদ আহমেদ তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
তোমাদের কি কালকে স্কুল আছে?
তারা উভয়ে উত্তর দেয়,
না আব্বা কালকে স্কুল বন্ধ।
জাওয়াদ আহমেদ বলেন,
ঠিক আছে কালকে সকালে তৈরি হয়ে থেকো।
_ কেন আব্বা?
_কালকে তোমাদের দুজনকে আমার অফিসে নিয়ে যাব ঘুরতে।
আয়জা এবং সাফওয়ান খুশিতে লাফিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করে,
সত্যি?
_ হ্যাঁ।
তাদের দুই ভাই বোনের খুশি আর দেখে কে? মেহেরুন্নেসা পাশ থেকে বলেন,
খুশির ঠেলায় আজকে দুই ভাই বোনের রাতে ঘুম আসবে না।
জাওয়াদ আহমেদ প্রায় সময়ই তার ছেলেমেয়েদেরকে তার অফিসে ঘুরতে নিয়ে যান। সেখান থেকে তাদের নিয়ে আশেপাশে হেঁটে তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের খাবার খাইয়ে তারপর বাসায় নিয়ে আসেন। তাহমিদ ছোট থাকতে সেও তাদের সাথে যেত। কিন্তু এখন বড় হওয়ার পর সে আর যেতে চায় না। ঘুরাঘুরি তার একদমই পছন্দ না। জাওয়াদ আহামেদ কয়েকবার তাকে জোর করেছেন কিন্তু সে যেতে চায় না। এর জন্য তিনি ছোট দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে সব সময় অফিসে ঘুরিয়ে আনেন।
পরদিন বেশ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছে আয়জা এবং সাফওয়ান। বাবার সাথে ঘুরতে যাবে বলে কথা। দুজনেই বেশ পরিপাটি ভাবে তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছে কখন বাবা তাদেরকে নিয়ে বের হবেন। জাওয়াদ আহমেদ নাস্তা করে অফিসের জন্য তৈরি হয়ে দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে রওনা হোন। দুপুর পর্যন্ত অফিসে ঘুরে তারা বেরিয়ে পড়েন। অফিসের কাছাকাছি একটি নামকরা হোটেলে তারা দুপুরের খাবার খান। যেহেতু আয়জা এবং সাফওয়ান উভয়েরই বিরিয়ানি খুব পছন্দ তাই তারা বিরিয়ানি অর্ডার করেন। তারা সকলে পেট ভরে খাওয়ার পর আরও দুই প্যাকেট পার্সেল নিয়ে নেন মেহেরুন্নেসা এবং তাহমিদের জন্য। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তাদের চোখের সামনে আইসক্রিমের গাড়ি পরে। সাফওয়ানের আইসক্রিম খুবই পছন্দ যার কারণে সে বাবার কাছে অনবরত বায়না করতে থাকে। তিনি সাফওয়ান এবং আয়জাকে আইসক্রিম কিনে দেন এবং নিজের জন্যও একটি কিনে নেন। বাবা এবং ছেলে মেয়ে আইসক্রিম খেতে খেতে গল্প করতে করতে রাস্তার কিনার দিয়ে হাঁটতে থাকেন। তাদের মন মত ঘুরাঘুরি শেষ হওয়ার পর বাসে করে আবার বাসার পথে রওনা হন। ঘরে ঢুকেই আয়জা এবং সাফওয়ান মেহেরুন্নেসার হাতে দুই প্যাকেট বিরিয়ানি দেয়। মেহেরুন্নেসা এবং তাহমিদ বিরিয়ানি খেতে বসে এবং জাওয়াদ আহমেদ এবং তার দুই ছেলে মেয়ে একে একে ফ্রেশ হয়ে নেয়।
সারাদিন ঘুরাঘুরি করে আয়জার মন আজ বেশ ফুরফুরে। সে গুনগুন করে গান গাচ্ছে এবং নিজের ঘর গোছাচ্ছে। এমন সময় তার জানালায় টুংটাং আওয়াজ হয়। তার আর বুঝতে বাকি থাকে না যে আরহান এসেছে। সে খুশি মনে বারান্দায় দৌড়ে যায়। বারান্দা দিয়ে ঝুঁকে উকি মেরে দেখে আরহান বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আয়জা তাকে দেখে মুচকি হাসি দেয়। আরহান একটি ছোট ইটের টুকরো কাগজের মধ্যে পেঁচিয়ে সেটি আয়জার বারান্দার দিকে ছুড়ে মারে। আয়জা সেটিকে তুলে নেয়। আয়জা কাগজটি খুলে দেখে সেখানে আরহান তাকে চিঠি লিখেছে। উক্ত চিঠিটি পড়ে আয়জা লজ্জায় লাল হয়ে যায়। সে দৌড়ে তার ঘরে গিয়ে খাতার খালি পেজ বের করে সেখানে চিঠির উত্তর লিখে এবং আবার দৌড়ে বারান্দায় যায়। বারান্দায় পড়ে থাকা সেই ইটের টুকরোটি আবার হাতে নিয়ে চিঠির ভিতরে মুড়ে আরহানের দিকে ছুড়ে মারে। আরহান সেটিকে কুড়িয়ে হাতে নিয়ে চিঠিটি পড়ে। চিঠি পড়ে সেও এক মুচকি হাসি দেয়। আরহান তাকে বিদায় জানিয়ে বাইকে করে চলে যায়। যে পর্যন্ত আরহানকে দেখা যাচ্ছিল আয়জা সেই দিকে তাকিয়ে থাকে।
এভাবেই দিনগুলো বেশ ভালই কাটছিল আয়জার। স্কুল থেকে ফেরার পথে আরহানের সাথে দেখা হওয়া, মাঝে মাঝেই তার বাসার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বারান্দায় দেখা হওয়া, নীলিমাদের বাসায় গেলে দেখা হওয়া এভাবেই দিনগুলো পার হচ্ছিলো। আরহান এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছে। প্রথম বর্ষে সে বেশ ভালো ফলাফল অর্জন করেছে যার কারণে তার পরিবার তার উপর খুবই সন্তুষ্ট । আয়জা বেশ কয়েক মাস ধরেই তার ছোট মাটির ব্যাংকে টাকা জমাচ্ছে। তার অন্যতম কারণ হলো আরহানকে কিছু উপহার দেওয়া। আরহান সব সময় তাকে কিছু না কিছু উপহার দিতেই থাকে। আরহান এই পর্যন্ত তাকে অফুনন্ত পরিমান চকলেট এবং কয়েক জোড়া কানের দুল উপহার হিসেবে দিয়েছে। কিন্তু এই পর্যন্ত সে তাকে উপহার হিসেবে কিছুই দেয়নি। তাই সে বেশ কয়েক মাস ধরেই টাকা জমিয়ে যাচ্ছে। এবার যেহেতু আরহান অনেক ভালো একটি ফলাফল অর্জন করেছে এই উপলক্ষে তাকে একটা উপহার দেয়াই যায়। যেমন ভাবনা তেমন কাজ আয়জা নীলিমাকে নিয়ে বের হয়েছে উপহার কেনার উদ্দেশ্যে। কি কিনবে বুঝতে পারছে না সে। বেশ অনেকক্ষণ মার্কেটে ঘুরাঘুরির পর তার মনে হয় আরহানকে একটি ঘড়ি উপহার দেওয়া যায়। হাতে ঘড়ি পড়লে তাকে বেশ সুন্দর লাগবে। আয়জা এবং নীলিমা একটি ঘড়ির দোকানে যায়। সেখান থেকে অনেক খুঁজে আয়জা আরহানের জন্য একটি ঘড়ি পছন্দ করে। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ঘড়িটির দাম তার জমানো টাকার তুলনায় একটু বেশি। বেশ কিছুক্ষন দোকানদারের সাথে দামাদামির পর অবশেষে উক্ত ঘড়িটি কিনতে সফল হয় আয়জা। ঘড়িটিকে সুন্দর বক্সে গিফট পেপার দিয়ে রেপিং করে নেয় আয়জা।
নীলিমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছে আয়জা । নীলিমার মায়ের সাথে বেশ সময় ধরে আড্ডা দিয়েছে সে। তাদের আড্ডার মাঝেই আরহানও এসে পাশের সোফায় বসে। নীলিমার আম্মা তাদের জন্য চা বানানোর উদ্দেশ্যে রান্নাঘরে প্রবেশ করেন। নীলিমা আয়জার পাশে বসে ছিল। আরহান তাকে চোখে ইশারা করে এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য। নীলিমা ভাইকে মুখ ভেংচি দিয়ে সেখান থেকে উঠে চলে যায়। আরহান তার সোফা ছেড়ে আয়জার সোফার মধ্যে এসে বসে তার সাথে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে। আয়জা আরহানের দিকে উপহার এগিয়ে দেয়। আরহান প্রথমে উপহার দেখে অবাক হয়ে যায়। তারপর সেটিকে হাতে নিয়ে অবাক হয়ে আয়জাকে জিজ্ঞেস করে,
উপহার? আমার জন্য?
আয়জা মাথা নিচু করে লাজুক ভঙ্গিমায় উত্তর দেয়,
হুম।
_ তুমি নিজে কিনে এনেছো?
_ হুম।
আরহান গিফট র্যাপার খুলে অবাক হয়ে যায়। সে জিজ্ঞেস করে,
তুমি আমার জন্য ঘড়ি কিনেছো? দেখেই তো বুঝা যাচ্ছে এটার অনেক দাম। তুমি এত টাকা পেলে কোথায়?
_ আমি কয়েক মাস ধরে টাকা জমাচ্ছিলাম সেই টাকা দিয়েই কিনেছি।
_ তুমি তোমার জমানো টাকা দিয়ে নিজের জন্য কিছু না কিনে আমার জন্য কেন গিফট কিনতে গিয়েছো?
_ এটা আপনি কেমন কথা বললেন? আমার কি সখ হতে পারে না আপনাকে উপহার দেয়ার? আমি কত শখ করে আপনার জন্য কিনে এনেছি। আপনি সেটা হাতে পড়বেন আর যখন এটার দিকে তাকাবেন আপনার আমার কথা মনে পড়বে। আপনি খুশি হয়ে সেটা হাতে পড়া তো দূরের কথা উল্টো আপনি আমাকে সেই কখন থেকে বকেই যাচ্ছেন।
_ আরে আজব তো আমি কখন বকলাম?
_ ওই একই হলো । বকা না দিলেও কথা তো শোনাচ্ছেন।
_ আচ্ছা সরি । আমারই ভুল হয়েছে।
_ এখন কথা না বাড়িয়ে ঝটপট ঘড়িটা হাতে পড়ে ফেলুন তো।
আয়জার কথামত আরহান নিজের হাতে ঘড়িটি পড়ে নেয়। আয়জা মুগ্ধ হয়ে তার হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। আসলেই তার হাতে ঘড়িটি বেশ মানিয়েছে। আয়জা আরহান কে প্রশ্ন করে,
আপনার কি পছন্দ হয়েছে?
_ কোনটার কথা বলছো?
_ উপহারের কথা জিজ্ঞেস করছি।
_ হ্যাঁ অনেক পছন্দ হয়েছে। তুমি পছন্দ করে কিনেছো বলে কথা।
_ আপনি তখন কোনটার কথা বলছিলেন?
_ আমি তো ভাবছিলাম উপহার দেওয়ার মালিকের কথা জিজ্ঞেস করছো।
আয়জা লজ্জা পেয়ে যায়। আরহান বাকা হেসে বলে,
আমার দুটোই পছন্দ হয়েছে উপহারও এবং উপহার দেওয়ার মালিককেও।
আয়জার গাল এবং কান লজ্জায় লাল আভা ধারণ করে। আরহান বলে,
শোনো
_ হুম।
_ তুমি কিন্তু আমাকে এখনো বলো নি।
আয়জা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করে,
কি বলি নি?
_ তুমি যে আমায় ভালোবাসো।
_ বলার কি আছে আপনি বুঝতে পারেন না? আপনি কি আমার মত জানেন না?
_ জানি তবুও আমি তোমার মুখে ভালোবাসি শব্দটি শুনতে চাই।
_আমি পারবো না । আমার লজ্জা লাগে।
_ প্লীজ বলো। তোমার মুখে ভালোবাসি শব্দটি শোনার জন্য আমি যে ছটফট করছি।
_ ভালোবাসি।
এই কথা বলেই আয়জা ছুটে রান্না ঘরে চলে যায়। আরহান তার যাওয়ার পানে চেয়ে কেবল মুচকি হাসে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~
একটি চুড়ির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরহান । তার উদ্দেশ্য হলো আয়জার জন্য কাচের চুড়ি কেনা। দোকানদার তাকে বেশ কয়েক কালারের বেশ কয়েকটি ডিজাইন দেখিয়েছে। এর মধ্য থেকে তার কয়েকটি পছন্দও হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো চুড়ির মাপ নিয়ে। আরহান আয়জার চুড়ির মাপ জানে না। দোকানদার অনেকক্ষণ ধরে আরহানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাকে জিজ্ঞেস করে,
কি হলো ভাইজান চুড়ির ডিজাইন পছন্দ হয় নাই আপনার?
_ হয়েছে তো।
_ তাহলে কোনটা দিবো?
আরহান তার সামনে কয়েকটি ডিজাইন রেখে বলে সেগুলো দিতে। দোকানদার জিজ্ঞেস করে,
হাতের মাপ বলেন?
_ সেটা তো জানি না।
_ কার জন্য নিচ্ছেন ?
_ আমার প্রেয়সীর জন্য।
_ তাহলে মাপ জানেন না কেনো? কখনো তার হাত ধরেন নাই?
_ না।
_ তাহলে কেমনে চুড়ি কিনবেন?
_ আপনি আন্দাজ মতো একটি দিয়ে দেন। ওর হাত চিকন।
অবশেষে আরহান চুড়ি কিনে আয়জাকে উপহার দেয়। আয়জার হাতে চুড়ি গুলো সুন্দর লেগেও যায়।
এভাবে আরও কিছু সময় পার হয়। দেখতে দেখতে আয়জার মেট্রিক পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসে। যত দিন ঘনিয়ে আসছে মেহেরুন্নেসার চিন্তা ততটাই বেড়ে যাচ্ছে। উনি তো জানেন উনার মেয়ের পড়ালেখার হাল কেমন। আয়জা নিজেও বেশ চিন্তায় রয়েছে। সে যদি ভুলেও ফেল করে তার আম্মা তাকে আস্ত রাখবে না। আয়জা ইদানিং তার সম্পূর্ণ মনোযোগ পড়াশোনার মধ্যে দিচ্ছে। সে বই নিয়ে পড়ছিল এমন সময় মেহেরুন্নেসা তাকে এসে বলেন,
তোমার দ্বারা ভালো রেজাল্ট তো আমি আশা করি না। ধরতে গেলে এটা এক প্রকার অসম্ভবই বলা চলে। আমি চাই তুমি যেন পাশ করো। আমাদের মান ইজ্জত টুকু রেখো। তোমার বাবা একজন সরকারি চাকরিজীবী, তোমার চাচা ফুপুরাও সবাই শিক্ষিত, তোমার বড় ভাই তাহমিদও পড়াশুনায় অনেক ভালো। তুমি যে কেন এরকম ব্যাক্কল হলে আমার বুঝেই আসেনা। যাই হোক আমি চাই তুমি অন্তত পাশ টুকু করো। কথা যেন মাথায় থাকে।
আয়জা বেশ ভয়ে ভয়ে পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষার দুই মাস পর তার রেজাল্টের দিন চলে আসে। জাওয়াদ আহমেদ নিউজ পেপারে আয়জার রোল নাম্বার দিয়ে রেজাল্ট খুঁজছেন। এদিকে মেহেরুন্নেসা এবং আয়জা উভয়ই দোয়া করছে সে যেন পাস হয়ে যায়। অবশেষে রেজাল্ট মিলিয়ে দেখা যায় আয়জা পাস করেছে। মেহেরুন্নেসার খুশির কোন কমতি নেই। তার মেয়ে যে পাস করেছে এটাই অনেক। সবাইকে টেলিফোন করে করে সে এই খুশির সংবাদ জানিয়ে দিচ্ছেন। আয়জাও কয়েক মাস পর শান্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার দুই মাস আগে থেকে ধরে এই রেজাল্ট পাওয়া পর্যন্ত চিন্তায় চিন্তায় তার দিনরাত কেটেছে। সে পাশ করেছে এখন সে নিশ্চিন্ত।
বিকেলে তাদের বাড়ি থেকে এক গলি সামনে আয়জা আরহানের সাথে দেখা করে। আরহান তার জন্য কয়েক জোড়া চুরি এবং কানের দুল নিয়ে এসেছে । তার সাথে রয়েছে চকলেটের বক্স। আয়জা এবং আরহান যখন একে অপরের সাথে কথা বলছিল সেই মুহূর্তে তাহমিদ তাদের দুইজনকে একসাথে দেখে ফেলে। তাহমিদ রাগান্বিত স্বরে জোরে বোনকে ডাক দেয়,
আয়জা !
ভাইয়ের আওয়াজ পেয়ে আয়জার ভয়ে আত্মা কেঁপে উঠে।
চলবে।
