#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ৭
বড় একটি বাটিতে চানাচুর দিয়ে মুড়ি মাখিয়ে তিন ছেলেমেয়েকে খেতে দিয়েছেন মেহেরুন্নেসা । তাহমিদ বরাবরের মতোই ঠান্ডা স্বভাবের। সে চুপচাপ বাটির এক কিনার থেকে মুড়ি নিয়ে খাচ্ছে। অন্যদিকে আয়জা এবং সাফওয়ানের মধ্যে এক প্রকার ঝগড়া শুরু হয়ে গিয়েছে মুড়ি নিয়ে। একজন আরেকজনকে দোষারোপ করছে কে বেশি খাচ্ছে বলে। তাদের এই খুনসুঁটির মাঝেই দরজায় টোকা পড়ে। মেহেরুন্নেসা দরজা খুলে দেখেন জাওয়াদ আহমেদ অফিস থেকে চলে এসেছেন। তিনি জাওয়াদ আহমেদের হাত থেকে অফিসের ব্যাগটি নিয়ে নেন। এরপর এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেন। জাওয়াদ আহমেদ তাকে জিজ্ঞেস করেন,
তুমি পানি দিচ্ছো আজ? আমার আম্মা কোথায়? আয়জা কোথায়?
মেহেরুন্নেসা কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তিনি আয়জাকে আম্মা আম্মা বলে ডাক দেন। আয়জা খাওয়া রেখে দৌঁড়ে গ্লাসে করে পানি এনে বাবাকে দেয়। তিনি হাসি মুখে গ্লাসটি নিয়ে সেখান থেকে পানি পান করেন । এরপর জিজ্ঞেস করেন,
কি ব্যাপার আম্মা আজ তুমি পানি নিয়ে আসো নি কেনো?
_ আমি খেতে বসেছিলাম আব্বা।
_ আমি অনেক দুঃখিত। আমি জানতাম না তুমি যে খেতে বসেছো জানলে ডাকতাম না।
_ আরে এটা কোনো ব্যাপার না। যাও হাত মুখ ধুয়ে এসো।
_ আচ্ছা। তুমি যাও খেতে বসো।
আয়জা পুনরায় ঘরে চলে যায়। মেহেরুন্নেসা বলেন,
বাহির থেকে আসলে মেয়ের হাতে ছাড়া অন্যকারো হাতে পানি খাও না। এটার কারণ কি?
_ আয়জা যে আমার বড্ড আদরের। আমার মনটা চায় দুনিয়ার সব সুখ আমি আমার আম্মাকে এনে দেই।
_ যাও হাতমুখ ধুয়ে এসো আমি খাবার বাড়ছি।
জাওয়াদ আহমেদ হাতমুখ ধুয়ে এসে নাস্তা করে নেন। আয়জা দৌঁড়ে এসে মেহেরুন্নেসাকে বলে,
আম্মা তোমার না আমাকে একটা শাড়ি বের করে দেওয়ার কথা ছিলো ? বের করেছো?
_ না খেয়াল ছিলো না। চল আমার সাথে এখন বের করে দিচ্ছি।
মেহেরুন্নেসা স্টিলের আলমারি খুলে সেখান থেকে আয়জাকে শাড়ি পছন্দ করতে বলে। আয়জা একটি রানী গোলাপী রঙের শাড়ি পছন্দ করে। মেহেরুন্নেসা তার চুড়ির আলনা থেকে আয়জাকে রানী গোলাপী রঙের চুড়ি বের করে দেন। তাদের মা মেয়ের চুড়ির সাইজ এক। যার কারণে আয়জা বেশির ভাগ সময়েই মায়ের চুড়ি পড়ে। আগামীকাল তাদের স্কুলে অনুষ্ঠান যার কারণে সবাই শাড়ি পড়বে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে আয়জা তৈরি হতে শুরু করেছে। মেহেরুন্নেসা তাকে সুন্দর করে কুচি দিয়ে শাড়ি পড়িয়ে দিয়েছেন। আয়জা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে গাঢ় করে কাজল একে নেয়। ঠোঁটে দেয় হালকা গোলাপী লিপস্টিক। কানে ছোট্ট ঝুমকা এবং হাত ভর্তি রানী গোলাপী কাচের চুড়ি। এলোমেলো চুল গুলো আঁচড়িয়ে কিনারে সিতি কেটে বেণী গেঁথে নেয়। ব্যাস! তার সাজ সজ্জা শেষ। এইটুকু সাজেও যেনো তাকে ভারী সুন্দর লাগছে। আয়জা তাদের বিল্ডিং এর নিচে নামতেই পাশের বিল্ডিং এর কয়েকজন ভদ্র মহিলা বলে উঠেন,
মা শা আল্লাহ আয়জাকে তো শাড়িতে বেশ সুন্দর লাগছে।
_ ধন্যবাদ খালাম্মা।
_ তোমার আম্মাকে বলতে হবে মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে। ছেলে দেখার জন্য।
আয়জা এই প্রসঙ্গে তাদের সাথে কিছু বলে না মাথা নিচু করে বেড়িয়ে পড়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে। এইসব বিয়ের কথাবার্তা বললেই তার রাগ উঠে যায়। কিন্তু বড়দের তো মুখের উপর কিছু বলাও যায় না তাই চুপ করে চলে যায়। অন্যদিকে ভদ্র মহিলা গুলো মনে করেন আয়জা বিয়ের কথা শুনে লজ্জা পেয়ে চলে গেছে। তারা আয়জাদের বাসায় গিয়ে মেহেরুন্নেসাকে বলেন,
মেয়ে তো বড় হয়েছে ওর জন্য ছেলে খুঁজছো না কেনো?
_ কই আপা। ও তো এখনো ছোটই।
_ এটা একটা কথা বললে তুমি মেহেরুন্নেসা? ওর ষোলো বছর হয়ে গেছে। বিয়ের জন্য একদম উপযুক্ত সময়। ওর বয়সে তোমার নিজেরই তো বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো। এমনকি এই বয়সে তাহমিদ তোমার পেটে ছিলো। দেরী করো না। মেয়েদের বয়স বাড়লে ভালো ছেলে মিলে না।
_ সেটা ঠিক বলেছেন আপনি।
_ আমার কাছে কয়েকটা ভালো প্রস্তাব আছে। তুমি বললে আমি ওদের সাথে কথা বলতে পারি।
_ আমি আগে তাহমিদের বাবার সাথে কথা বলে নেই। উনি কি বলে দেখি। এরপর আপনাকে জানাবো।
_ আচ্ছা আমি অপেক্ষায় রইলাম তাহলে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
স্কুলে পৌঁছেই নীলিমার দেখা পেয়ে যায় আয়জা । কারণ নীলিমা তার অপেক্ষায় গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। নীলিমা জিজ্ঞেস করে,
এত দেরী করে আসে মানুষ? আমি কতক্ষন ধরে অপেক্ষা করে যাচ্ছি।
_ শাড়ি পড়ে হাঁটতে সময় লাগে না? এর জন্যই তো দেরী হয়েছে।
_ তোকে তো মারাত্মক সুন্দর লাগছে। তোর ওই চিঠি ওয়ালা প্রেমিক দেখলে তো বেহুশ হয়ে যেতো।
_ মন মেজাজ আপাতত ভালো আছে। এসব আজেবাজে কথা বলে মন মেজাজ খারাপ করিস না।
_ আচ্ছা সরি।
_ তোকেও শাড়িতে বেশ সুন্দর লাগছে।
_ ধন্যবাদ। আচ্ছা ওই লোক কি আর ফোন দিয়েছিলো?
_ না।
_ যাক ভালোই হয়েছে।
_ হুম। এইসব ছাড় । অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গিয়েছে তো। চল গিয়ে বসি।
_ চল।
অনুষ্ঠান শেষে সবাই নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় নীলিমা বলে,
আম্মু তোকে বাসায় নিয়ে যেতে বলেছে।
_ এখন?
_ হ্যাঁ। শাড়ি পড়ে আমাদের কেমন লাগছে দেখবে।
_ আগে বলিস নি কেনো? আমি তো আম্মাকে বলে আসি নি। সময় মতো বাসায় না পৌঁছালে আম্মা চিন্তা করবে।
_ আমাদের বাসায় গিয়ে খালাম্মাকে ফোন দিয়ে বলে দিস। আর আমরা তো ছবি ও তুমি নি। বাসায় গিয়ে ছাদে উঠে ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলবো নি। ভাইয়া পরশু দিন নতুন রিল নিয়ে এসেছে।
_ আচ্ছা।
নীলিমাদের বাসায় গিয়ে নীলিমার মায়ের সাথে দেখা করে দুই বান্ধবী ছাদে চলে যায় ক্যামেরা নিয়ে। এর মাঝে মেহেরুন্নেসাকে টেলিফোন করে সে যে নীলিমাদের বাসায় সেটা জানিয়েও দিয়েছে। দুই বান্ধবী মিলে বেশ কয়েকটি ছবি তুলেছে। উপরের তলার একটি আপুকে ক্যামেরা দিয়ে দুই বান্ধবী একত্রে কয়েকটি ছবি তুলেছে। হঠাৎ নিচ থেকে নীলিমাকে তার মা ডাক দেয়। নীলিমা আয়জাকে বলে,
তুই একটু দাঁড়া আমি শুনে আসি আম্মা ডাকছে কেনো।
_ আচ্ছা।
নীলিমা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায়। ছাদে আয়জা একা পায়চারী করছে এবং ফুল গাছ গুলো নেড়েচেড়ে দেখছে। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ তার নাম ধরে ডাকে। হঠাৎ এমন হওয়ায় আয়জা ভয়ে কেঁপে উঠে। পিছনে ঘুরে দেখে আরহান ছাদের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। আয়জা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে এবং জিজ্ঞেস করে,
আরে ভাইয়া কখন এলেন?
_ মাত্রই।
_ ওহ।
আয়জা আর কি বলবে খুঁজে পেলো না। অপরদিকে আরহান ও কিছু বলছে না। কিছুক্ষণ নিরবতা বিরাজ করলো ছাদে। কেমন এক থমথমে পরিবেশ তৈরি হলো। কয়েক মিনিট পর নীরবতা ভেঙে আরহান বলে,
তোমাকে একটা কথা বলার ছিলো।
_ জ্বি বলুন ভাইয়া।
_ তোমার ব্যাগে সেই প্রেম পত্রটা আমি রেখেছি।
_ কি? ( অবাক হয়ে। )
_ হ্যাঁ। তোমাকে টেলিফোনে সেদিন আমি কল দিয়েছি।
_ আপনি এসব কি বলছেন? ( অবাকের চরম পর্যায়ে )
_ সত্যি বলছি। আমি তোমার চিঠির সেই প্রেমিক পুরুষ। বহু বছর ধরে ভালোবাসি তোমায়।
আয়জা আরহানের কথা শুনে থতমত খেয়ে গেছে। কি বলবে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না সে। সব কিছু যেনো মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে তার। আয়জার মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে যেনো সে বাক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না তার। আরহান যে তাকে নিয়ে এমন ভাবে সে কল্পনাও করে নি।
চলবে।
