#অন্তঃকরণে_তুমি
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ৬
ক্লাসে বেঞ্চের উপর মন খারাপ করে বসে আছে আয়জা। তার পাশে বসে নীলিমা সেই কখন থেকে একা একা বকবক করেই যাচ্ছে। আয়জার কোনো হেলদোল না দেখে সে আয়জাকে গুতো দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
কি ব্যাপার এমন অন্যমনস্ক হয়ে আছিস কেনো? সেই কখন থেকে আমি একাই বকবক করে যাচ্ছি। কি হয়েছে বলবি তো।
_ কি যে জ্বালায় আছি আমিই বুঝতে পারছি।
_ আরে না বললে বুঝবো কিভাবে?
_ ওই লোক কাল টেলিফোনে কল দিয়েছিলো।
_ কোন লোক?
_ আরে যে লোক চিঠি দিয়েছে।
_ হায় হায় বলিস কি? তোদের বাড়ির নাম্বার পেলো কই?
_ আমি কিভাবে বলবো? ভাগ্যিস আম্মা ব্যস্ত থাকায় আমি কল ধরেছিলাম। আম্মা ধরলে তো আমি শেষ হয়ে যেতাম।
_ হুম।
_ আমি খুবই বিরক্ত হচ্ছি। চিনি না জানি না কই থেকে যত্তসব উটকো প্রেমিক এসে জুটেছে। ভালো লাগে না এসব ঝামেলা।
_ এক কাজ করতে পারিস।
_ কি?
_ তাহমিদ ভাইয়াকে বলে দেখ। সে সাহায্য করতে পারবে।
_ মাথা খারাপ নাকি তোর? ও তো আমার কথা শুনবেই না বরং আম্মাকে বলে আরও ভেজাল বাড়াবে।
_ তাহলে আরহান ভাইয়া কে বলি সাহায্য করতে?
_ ভাইয়া কিভাবে সাহায্য করবে?
_ ভাইয়া কে বলবো ছেলেটাকে খুঁজে বের করে ভয় দেখাতে যাতে তোকে আর ডিস্টার্ব না করে।
_ বুদ্ধিটা খারাপ না।
_ স্কুল ছুটির পর আমাদের বাসায় যাবো নি আজকে।
_ ঠিক আছে।
~~~~~~~~~~~~~
স্কুল ছুটির পর দুই বান্ধবী পৌঁছায় নীলিমাদের বাসায়। বাড়িতে প্রবেশ করে তারা দেখতে পায় আরহান টেবিলে খেতে বসেছে। নীলিমার মা তাকে খাবার বেড়ে দিচ্ছেন। নীলিমার সাথে আয়জাকে দেখে তিনি মুচকি হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
আরে কি খবর আয়জা?
_ জ্বি আন্টি ভালো। আপনি ভালো আছেন?
_ হ্যাঁ আলহামদুলিল্লাহ। খুব ভালো সময় এসেছো খেতে বসে পরো।
_ না আন্টি আজ খাবো না। আরেকদিন এসে খেয়ে যাবো। আজকে আমি নীলিমার থেকে কিছু নোটস নিতে এসেছি।
নীলিমা তার মাকে বলে,
আম্মু এক কাজ করো তুমি ঠান্ডা পানি দিয়ে আয়জাকে শরবত বানিয়ে দাও।
আয়জা পাশ থেকে বলে,
না না আন্টি কষ্ট করার দরকার নেই । আমি কিছু খাবো না।
নীলিমা আয়জাকে চিমটি কেটে ফিসফিস করে বলে,
চুপ থাক তুই। আমি আম্মুকে অন্যরুমে পাঠানোর জন্য এগুলো করছি। তুই কি আম্মুর সামনে আরহান ভাইকে এসব কথা বলবি? আম্মু যদি তোর আম্মাকে বলে দেয়?
_ ওহ তাই তো! আমি খেয়াল করি নি।
_ করবি কিভাবে ? তুই তো এক নাম্বার বোকা। ।
নীলিমার মা বলেন,
কিছু না খেলে কিন্তু শরবত তো খেয়ে যেতেই হবে। এভাবে খালি মুখে আমি যেতে দিবো না। তোমরা বসো আমি শরবত বানিয়ে আনছি।
উনি চলে যেতেই আয়জা এবং নীলিমা আরহানের দুইপাশের চেয়ারে বসে পড়ে। আরহান খাওয়া বন্ধ করে একবার নীলিমার দিকে তো একবার আয়জার দিকে তাকায়। নীলিমা বলে,
ভাইয়া তোমার একটা সাহায্য দরকার।
আরহান খেতে খেতে জিজ্ঞেস করে,
কি সাহায্য?
আয়জা পাশ থেকে বলে,
আসলে ভাইয়া আমাকে না একটা ছেলে প্রচন্ড বিরক্ত করছে। চিঠি দিচ্ছে, টেলিফোনে কল দিচ্ছে।
এই কথা শুনে আরহানের কাশি উঠে যায়। নীলিমা সাথে সাথে তাকে পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়। আরহান দেরি না করে পানিটুকু খেয়ে নেয়। সে মনে মনে ভাবে,
আয়জা কি তাহলে বুঝে গেলো ছেলেটা আমি?
সে নিজেকে শান্ত করে জিজ্ঞেস করে,
তো?
নীলিমা পাশ থেকে উত্তর দেয়,
তো তুমি ঐ ছেলেটাকে খুঁজে বের করে তোমার বন্ধুদের সাথে নিয়ে ভয় দেখাও যাতে সে আর আয়জাকে বিরক্ত না করে।
আরহান মনে মনে ভাবে,
কি দিন আসলো। নিজেকে নিজেরই ভয় দেখানোর কথা বলা হচ্ছে। হায় রে কপাল।
আরহান শান্ত গলায় প্রশ্ন করে,
ওই ছেলেকে কোথায় খুঁজে পাবো? তাকে তোমরা দেখেছো? বা তাকে খোঁজার জন্য কিছু আছে তোমাদের কাছে?
_ না।
_ তাহলে আমি কিভাবে খুঁজবো?
_ ভাইয়া আপনি কোনো একটা উপায় বের করুন না। কয়দিন ধরে ভয়ে আমার খাওয়া , ঘুম সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
_ ভয়ের কি আছে এখানে?
_ কি বলেন আপনি ভাইয়া এটা ভয়ের বিষয় না? আম্মা যদি জানে আমাকে মেরেই ফেলবে। চিনি না জানি না কই থেকে এক উটকো প্রেমিক এসে জুটেছে। সামনে পেলে চড় দিয়ে প্রেমের ভূত ঘাড় থেকে নামিয়ে দিতাম।
আরহান পানি খাচ্ছিলো । আয়জার উক্ত কথা শুনে তার আবার কাশি উঠে যায়। নীলিমা আবার তাকে পানি এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
আজকে কি হয়েছে তোমার? বারবার এমন কাশছো কেনো?
_ কি জানি।
_ শোনো না ভাইয়া । একটু সাহায্য করো না। দেখো আমি তোমার আদরের বোন। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ও তো তোমার বোনের মতোই।
আরহান হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলে উঠে,
আয়জা আমার বোন না।
আয়জা এবং নীলিমা তার এই ব্যবহারে চমকে উঠে প্রশ্ন করে,
কি?
আরহান কি বলেছে বুঝতে পেরে বলে,
আচ্ছা আমি দেখছি বিষয়টা।
এই কথা বলে তাদের কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আরহান সোজা তার ঘরে চলে যায়। নীলিমা বলে,
আমার সত্যি সন্দেহ হয় ভাইয়া তোকে পছন্দ করে।
_ তুই আবার এসব আবোল তাবোল বলা শুরু করেছিস?
_ তুই এটা কেনো বিশ্বাস করতে চাস না?
_ কেনো করবো? সে আমার ভাইয়ের মতো। আমি তাকে তাহমিদের মতোই মনে করি। ছোট বেলা থেকে আমি তাহমিদকে যেমন শ্রদ্ধা করি আরহান ভাইয়াকেও তেমন শ্রদ্ধা করি। আমি বিশ্বাসই করতে পারি না উনি আমাকে অন্য চোখে দেখবেন।
নীলিমা আর কথা বাড়ায় না। শরবত খেয়ে আয়জা নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। তাহমিদ তার ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আয়জাকে চলে যেতে দেখে এবং বলে,
আর কোনো লুকোচুরি নয়। খুব শীঘ্রই তোমার কাছে ধরা দিতে হবে। তোমার মনে আমার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে হবে। আর কত বছর এক তরফা ভালোবেসে যাবো?
তাহমিদ ঘরে এসে আলমারির ড্রয়ার থেকে ছবির এলবাম বের করে। সেখান থেকে তার তোলা আয়জার একটি ছবি বের করে। ছবিটি সে আয়জার অজান্তে লুকিয়ে তুলেছিলো ক্যামেরা দিয়ে। ছবিটি তোলা হয়েছিলো এক বছর আগে আয়জা এবং নীলিমার বান্ধবীর হলুদের অনুষ্ঠানে । ছবিটিতে আয়জা বাসন্তী রঙের শাড়ি পড়ে আছে। কোমর অবধি চুলগুলো মাঝখানে সিতি কেটে ছেড়ে রেখেছে। চোখে গাঢ় কাজল এবং ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দিয়েছে। হাত ভর্তি বাসন্তী রঙের চুড়ি পড়েছে। পায়ে তার নূপুর পড়া। ছবিটিতে সে নীলিমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। প্রথমে তার আয়জার প্রতি ভালো লাগা ছিলো। কিন্তু সেই দিন আয়জার এই রূপ দেখে সেই ভালো লাগা ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়েছে। ধীরে ধীরে সেই ভালোবাসা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ছবিটি হাতে নিয়ে সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে এবং পাশের টেবিলে রাখা রেডিওটি চালু করে। রেডিওতে নজরুল গীতি চলছিলো। গানের লাইন গুলো যেনো তার প্রেয়সী আয়জার সাথে মিলে যায়।
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে
নাচিছে ঘুর্ণিবায়
জল তরঙ্গে ঝিল্মিল্ ঝিল্মিল্
ঢেউ তুলে সে যায়॥
দীঘির বুকে শতদল দলি’ঝরায়ে
বকুল-চাঁপার কলি
চঞ্চল ঝরনার জল ছল ছলি
মাঠের পথে সে ধায়।
বন-ফুল আভরণ খুলিয়া ফেলিয়া
আলুথালু এলোকেশ গগনে মেলিয়া
পাগলিনী নেচে যায় হেলিয়া দুলিয়া ধূলি-ধূসর কায়॥
আরহানের মনে হয় প্রত্যেকটি লাইন যেনো তাকে আয়জার কথাই স্মরণ করাচ্ছে। আয়জার চঞ্চলতা যেনো পুরোপুরি লাইনগুলোর সাথে মিলে যাচ্ছে। সে সিদ্ধান্ত নেয় খুব শীঘ্রই সে সামনা সামনি আয়জাকে নিজের মনের কথা বলে দিবে। আয়জা যদি রাজি না হয় সে হার মানবে না । সে বার বার চেষ্টা করেই যাবে। যে পর্যন্ত আয়জা তাকে ভালো না বাসছে।
চলবে।
