#নীল_ধ্রুবতারা [৫]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা
এরপর কেটে গেল তিনটে দিন। ভদ্রলোকের সাথে আমার সম্পর্ক খুব ঠান্ডা যাচ্ছে। আজকাল আমার কোনো কাজেই হাত লাগাতে ইচ্ছে করে না। চুপচাপ এক স্থানে বসে কাটিয়ে দিতে পারি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখনো বা আকাশ দেখে, কখনো বা জানালা দিয়ে বাতাসে দুলতে থাকা ছাতিম গাছটা দেখে। আমার মোটেও ক্লান্ত লাগে না। বিরক্তি আসে না। গতকাল রাতে মাকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বিস্তারিত জানিয়েছি। বলা বাহুল্য, এই সিস্ট নামক রোগের কথা আমার মা নাকি জীবনে কখনো শোনেননি। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেছেন, এমন আজেবাজে চিন্তা না করতে। ওষুধ খেয়ে পিরিয়ড হবার পর আমাকে বাড়ি যেতে বললেন। কোনো কবিরাজের থেকে হারবাল ওষুধ এনে দেবেন। এই ওষুধ খাবার নাকি আবার নিয়মও আছে অনেক। ঋতুস্রাবের দ্বিতীয় দিন ভোরবেলা, অভুক্ত পেটে, ভেজা কাপড়ে খেতে হয় গাছগাছালির শেকড়বাকড়ের রস। আমি এসব বিশ্বাস করি না। তবে এসবের ওপর আমার মায়ের অগাধ ভরসা। হতাশ হয়ে কল কেটে দিয়েছি। এরপর থেকে আমার মনে হচ্ছে এই পৃথিবীতে এমন কেউ কি নেই, যে আমার কথা মন দিয়ে শুনবে? বুঝবে আমাকে?
আজকাল আমার ভালো লাগছে না কিছু। প্রায়ই তলপেটের বাম পাশে চিনচিন ব্যথা হয়। ওষুধ খেয়েও পিরিয়ড হলো না। তবুও খাচ্ছি।
ভদ্রলোক আমার খুব যত্ন করছেন। রোজ সকালে সে রান্নাবান্না করে অফিসে যায়। ফিরে এসে আবার রান্না করে। আমার মন ভালো করার জন্য উদ্ভট সব গল্প করে। সেই সবের কিছুই আমি মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারি না। আমার সামনের দৃশ্য, মানুষ—সব ঝাপসা হয়ে আসে। আমার খালি সারাক্ষণ কাঁদতে মন চায়। ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে, ঠিক কতটুকু কাঁদলে মনের পাষাণভার হালকা হবে? আমার যত্ন করে গুছিয়ে রাখা সংসারটার পরতে পরতে জমেছে ধুলোর আস্তরণ। অতি কষ্টে কেনা টাকার জিনিসগুলো অবহেলিত হয়ে তিন দিনেই বিবর্ণ হয়েছে। যেন হারিয়ে গেছে তাদের রূপ, সৌন্দর্য। আজ সকালে সে হঠাৎ খেতে খেতে বলল,
“তুমি এমন রসকষহীন হয়ে গেছ কেন নবনী? এমন ম্যারম্যারে সম্পর্ক ভালো লাগে না আমার। আগে আমরা কত হাসিখুশি ছিলাম। অথচ এখন?”
তার কণ্ঠে আক্ষেপের সুর টের পেলাম। সে কি ভাবছে আমি ইচ্ছে করেই এমন করছি? বিবর্ণ আমাকে ভালোবাসতে ভীষণ বিরক্ত লাগছে তার? আমার মনটা বিক্ষিপ্ত হলো। মেজাজ বিগড়ে গেল। চেঁচিয়ে উঠে বললাম,
“তোমার জন্য সারাক্ষণ হা হা-হি হি করব আমি? আমার হি হি দেখলে তোমার খুব ভালো লাগবে? মনে সুখ না থাকলেও দাঁত কেলিয়ে হাসতে হবে আমায়? আমি কি রোবট? মানুষের চামড়া নেই আমার শরীরে? রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে এমন অমানুষের মতো ব্যবহার করব কী করে?”
সে আশ্চর্য হয়ে গেল আমার ব্যবহারে। খাওয়া থামিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল কয়েক পল। চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে ইতিমধ্যে। বিয়ের পর প্রায়ই তার সাথে ঝগড়াঝাঁটি করেছি আমি। সেই ঝগড়ার স্থায়িত্ব ছিল সর্বোচ্চ মিনিট দশেক। এরপর সব স্বাভাবিক। রাতে প্রচণ্ড ঝগড়ার পর কান্নাকাটি করে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছি তাকে। সেই আলিঙ্গনের বাঁধন এতটাই তীব্র থাকত যে—ভাষায় সেটার প্রকাশ বাহুল্য মাত্র। অতঃপর রাতটা পরম শান্তিতে তার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছি। ঝগড়াঝাঁটি হলে সে প্রতিবাদ অবশ্য কখনোই করেনি। আমিই করেছি ভিত্তিহীন অভিযোগ। কখনো বাজারের ফর্দে যা লিখেছিলাম তা আনেনি বলে। কখনো বা বাড়তি জিনিস নিয়ে এসেছে বলে। কখনো আবার কিনে আনা মাছ নরম বলে। আবার কখনো খেতে বসে ফোনে অতিরিক্ত কার্টুন দেখার কারণে। মানুষটার প্রতি আমার অভিযোগের শেষ নেই। এসবই ঝগড়াঝাঁটির প্রধান কারণ। আরও আছে বহু অকারণ। দিনশেষে সে পরাজিত সৈনিকের ন্যায় মাথা নত করে নিত। আমার তীব্র তিরস্কারে যখন লাল হয়ে উঠত মুখ, তখন সে কেঁদে ফেলত। লোকটা একদম বাচ্চাদের মতো। হাউমাউ করে কাঁদতে জানে। কাঁদলে চোখ, নাক, গাল টকটকে লাল হয়ে যায়। ওহ! এখনো বোধহয় বলিনি, আমার ভদ্রলোক মারাত্মক সুদর্শন পুরুষ। মেয়েদের গায়ের রঙকে দুধে-আলতা উপমা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। পুরুষেরও কি যায়? গেলে এই উপমাটি একদম মানানসই আমার ভদ্রলোকের ক্ষেত্রে।
আমার আজও মনে পড়ে সেদিনের কথা, যেদিন আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল।
সেদিন ঝুম বৃষ্টি নেমেছিল শহর জুড়ে। দেখা হবার ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যায় পরে যাই। আগে বলি প্রণয়ের সূচনার কথা। ভদ্রলোকের সাথে আমার মধুর আলাপন চলছিল আপন গতিতে। পরিচয়ের তখন পাঁচ মাস। ততদিনে আমাদের সম্বোধনে পরিবর্তন এসেছে। আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছি দুজনেই। মনের কথা কেউ এখনো স্পষ্ট করে বলিনি যদিও। তবে দুজনেই ব্যাকুল, দুজনেই উদগ্রীব দুজনার মুখ থেকে ‘ভালোবাসি’ শব্দটা শোনার অপেক্ষায়। যা বুঝলাম, এই ছেলে আমাকে প্রপোজ করতে পারবে না এ জন্মে। ভিতুর ডিম। গম্ভীরমুখো। মন চায় কানটা ছিঁড়ে হাতে ধরিয়ে দিই। অসহ্য! আমাদের তখন রাত-দিন কথা হয়। ভালোবাসি শব্দটা কি অতিরিক্ত কঠিন কিছু? সে কেন একবার বলে না আমায়? রাত-দিন কী যে কথা হতো আমি জানি না। আজও বিয়ের এত বছর পর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তা যদি প্রশ্ন করি,
“প্রেমের সময় দিন-রাত এত কী কথা বলতাম আমরা? এত কী কথা ছিল আমাদের?”
সে বলে,
“জানি না। আমার মনেই পড়ে না কিছু।”
তার যে মনে পড়বে না তা আমি জানি। সে খুব ভুলোমনা মানুষ। এই গম্ভীর স্বভাবের ভুলোমনা মানুষটার নাম দিয়েছিলাম, ‘মিস্টার গুরুগম্ভীর মশাই’। সে আমায় নাম দিয়েছিল, ‘অপরিচিতা’।
একজন অপরিচিতার সাথে একজন গুরুগম্ভীর মশাইয়ের প্রেমের পর্বটার সূচনাই হচ্ছে না কোনোভাবে। একবার সূচনা হয়ে গেলে চুটিয়ে প্রেম করা কোনো ব্যাপার না। সূচনাতেই সমস্যা যত। কিন্তু কী আর করা! সমস্যার একটা সমাধান বের তো করতেই হবে। একদিন কথা বলতে বলতে গভীর রাতে তাকে বললাম,
“আসো গানের কলি খেলি।”
সে ইনোসেন্ট ইমোজি দিয়ে বলল,
“সেটা আবার কেমন খেলা?”
“আমি একটা গানের প্রথম লাইন বলব, তুমি বলবে দ্বিতীয় লাইন। এভাবে খেলব, বুঝেছ?”
সে আমার প্রস্তাব নাকচ করার উদ্দেশ্যে বলল,
“আমি বেশি গান জানি না। তার চেয়ে এসো, আমরা লুডু খেলি।”
“না, আমি লুডু খেলব না।”
“তাহলে ক্যারামবোর্ড চলবে?”
“না।”
বলেই আমি অফলাইন হলাম। লুডু খেলায় আমরা দুজনে শেয়ানে শেয়ানে টক্কা দিতে পারলেও ক্যারামে আমি তাকে কোনোভাবেই হারাতে পারি না। সে জিতে যায় বলেই ওই খেলায় তার খুব আগ্রহ। আমি বিষণ্ণ মনে বেরিয়ে এলাম। তখন নাম্বার চালাচালির পর্বও শেষ হয়েছে। সে সিমে টেক্সট দিল,
“আরে অফলাইনে গেলে কেন? আচ্ছা, এসো গানের কলি খেলব।”
আমি অনলাইনে গেলাম আবার। সে লিখল,
“অপরিচিতা, তুমি বন্ড অভিমানী।”
আমি হাসলাম। একটা ঠোঁট বাঁকানো রিয়েক্ট দিয়ে বললাম, “শুধু আমি নই, মিস্টার গুরুগম্ভীর মশাই নিজেও মেয়েদের মতো অভিমানী পুরুষ। তার প্রমাণ আমি কয়েকবার পেয়েছি।”
“আচ্ছা, এসব কথা বাদ। খেলা শুরু করো।”
আমি খেলা শুরু করলাম আমার খুব প্রিয় একটা গান দিয়ে—
“আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো।
হারিয়ে যাবো তোমার সাথে…”
এরপরের লাইন সে লিখল,
“সেই অঙ্গীকারের রাখি পরিয়ে দিতে,
কিছু সময় রেখো তোমার হাতে।”
আমি লাভ রিয়েক্ট দিলাম সেথায়। সে সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য লিখল,
“দূর! এভাবে গানের কলি খেলায় মজা আছে নাকি? তার চেয়ে তুমি গাইবে, আমি শুনব—সেটাতেই শান্তি।”
“এ্যঁহ! আমি কেন তোমাকে গান গেয়ে শোনাব?”
“শোনাবে না?”
“নাহ!”
“কেন শোনাবে না?”
“দূর! এত কথা রাখো তো। খেলায় ফোকাস করো। পরবর্তী গান লিখছি।”
সে একটা থামস আপ দিল। আমি আবার লিখলাম,
“একটা ছেলে মনের আঙিনাতে,
ধীর পায়েতে, এক্কা-দোক্কা খেলে…”
“বন পাহাড়ি ঝর্ণা খুঁজে;
বৃষ্টি জলে একলা ভিজে।”
পরবর্তী চরণ সঙ্গে সঙ্গেই লিখল সে। আবার বলল,
“সেই ছেলেটা কে জানতে পারি?”
“না, পারো না।”
“কেন পারি না?”
“কারণ, আমি চাই না আমার মনে লুকায়িত মানুষটা সম্পর্কে সবাই সব কিছু জেনে যাক।”
“সবাই জানবে না তো! শুধু আমি জানব।”
“তোমাকেও জানাতে চাই না আমি। আর প্লিজ, তুমি বারবার ফোকাস থেকে সরে যাচ্ছ। এই খেলাটা মন দিয়ে খেলো প্লিজ। তোমাকে একটা চমৎকার জিনিস দেখাব তাহলে।”
কে জানে চমৎকার জিনিস দেখার লোভেই নাকি কেন, সে পরপর অনেকগুলো গানের চরণ মিলিয়ে দ্বিতীয় লাইন লিখে গেল। আমাদের এই গানের কলি চলল বহুক্ষণ। একটা সময় আমি লিখলাম,
“আমার সোনার বাংলা…”
সে দ্বিতীয় চরণ লিখল,
“আমি তোমায় ভালোবাসি।”
আমার ঠোঁট ভরে হাসি ফুটে উঠল। পৈশাচিক আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। কী আছে এই তিন শব্দের সংযোগে তৈরি এ বাক্যে? কেন আমার বুকটা অমন করে ধুকপুক করে? ধুরুধুরু বুক নিয়ে লিখে ফেললাম কঠিন কথা,
“কিন্তু আমি তো তোমাকে ভালোবাসি না।”
সে বোধহয় থতমত খেল প্রথমটায়। সঙ্গে সঙ্গে আনসেন্ট করে দিল বাক্যটা। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল হঠাৎ। এটা কি এমন কোহিনূর হিরে? ভালোবাসার একটা স্বীকারোক্তিমূলক বাক্য মাত্র। এটাকে এমন করে মুছে ফেলতে হবে কেন? তবে কি আমি ধরেই নেব সে আমাকে ভালোবাসে না? এজন্যই নিজের সবটুকু ভালোবাসা যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছে আমার হস্তক্ষেপের ভয়ে। সে লিখল,
“আমি তো গানের দ্বিতীয় লাইন বলেছি।”
আমি জোর দিয়ে লিখলাম,
“না। তুমি আমাকে ভালোবাসো, এটাই বলেছ। আমি স্পষ্ট দেখেছি।”
“গানের লাইন তো এটাই!”
“তা বলে কোনো মেয়ের ইনবক্সে এসে এটা লিখবে তুমি?”
“তুমিই যে বললে!”
“আমি তো তোমাকে শুধুমাত্র এই লাইন লিখতে বলিনি। তোমার উচিত ছিল একসাথে এর পরের লাইনসহ লেখা। যেমন,
আমার সোনার বাংলা,
আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ…”
সে একসাথে অনেকগুলো ইমোজি সেন্ট করল আমায়। লোকটার কি মাথাটা খারাপ হয়ে গেল? এরপর লিখল,
“সত্যিই ভালোবাসো না?”
“না।”
লিখেই আমি হাসতে লাগলাম প্রাণ খুলে। মানুষটা কি জানে, আমি তাকে ঠিক কতটা ভালোবাসি? জানে না। সে এটাও জানে না, তার সাথে অপার্থিব এক জগতে সুখী সংসার সাজিয়েছি আমি। সে সংসারে সুখ আর সুখ। সে একটা স্যাড রিয়েক্টের সাথে লিখল,
“আমার ভুল হয়েছে। প্লিজ ফরগিভ মি ফর এভার।”
“এত সহজে তো তোমাকে ক্ষমা করা যাবে না। তুমি একটা অপরিচিত মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছ। জানো এটা অন্যায়?”
সে আবারও স্যাড রিয়েক্ট দিল। সে আমার “অপরিচিতা” নিকনেম মুছে দিল। নতুন নাম দিল, ‘মাই লাইফ লাইন’। আমি অবাক হয়ে লিখলাম,
“মানেটা কী? আমি তোমার লাইফ লাইন কেন হতে যাব?”
“অপরিচিত মেয়েকে যেহেতু প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া যায় না, তাই লাইফ লাইনকে দিচ্ছি। এখন কি প্রেমের প্রস্তাবটাকে ন্যায়ের তালিকায় ফেলা যায়?”
“না, যায় না। তুমি এত বাজে ছেলে! আগে জানলে কখনো তোমার সাথে কথা বলতাম না। তুমি আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিচ্ছ? ছিঃ!”
আমার কথার ধরনে সে বোধহয় খুব অবাক হলো। সেই অনুভূতির জানান দিল আধুনিক যুগের আবিষ্কার রিয়েক্টের মাধ্যমে। বিস্ফোরিত চোখের একটা গোল মাথা। বিস্ময়ে দু-চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে যেন। সে লিখল,
“কেন, ছিঃ কেন? প্রেম তো ভালো জিনিস, এখানে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার কোনো বিষয় তো দেখছি না।”
“তুমি না দেখলেও আমি দেখছি। তুমি দয়া করে আর এই বিষয় নিয়ে কথা বলো না।”
“আচ্ছা, বলব না। তুমি তাতে খুব খুশি হবে, লাইফলাইন?”
আমি এংরি রিয়েক্ট দিয়ে লিখলাম,
“খবরদার! এই নামেও আমাকে ডাকবে না। অসহ্য ডং!”
এর উত্তরে ও ঠিক কী বলেছিল মনে নেই। কিন্তু হ্যাঁ, প্রেমটা হয়েছিল আমাদের। এর অনেক পরে আমি জেনেছিলাম, সে আমাকে আরও অনেক আগেই ভালোবেসে ফেলেছিল। শুধুমাত্র ভয়ে বলতে পারেনি। যদি আমি মানা করে দিতাম! তবে যখন মজার ছলে আমি তাকে দিয়ে ‘ভালোবাসি’ বলিয়ে নিলাম, তখন সে আমার মনের খবর জেনে গেল। আর বলে দিল মনের লুকায়িত কথা। প্রকাশ করল নিজের মনের সমস্ত প্রেম। জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি রেখে স্মৃতিচারণ করতে করতে খেয়াল করলাম পরিচিত অবয়বটাকে দেখা যাচ্ছে। তাকে দেখেই খেয়াল হলো, সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ভদ্রলোক ফিরছেন নিজের নীড়ে। দেখতে পেলাম তার হাতে দুটো পলিথিন ব্যাগ। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম ব্যাগে কী আছে জানার জন্য।
সকালে ভদ্রলোকের সামান্য আবদারে যখন বাঁকা কটাক্ষে তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছিলাম, ভদ্রলোক তখন ব্যস্ত হাতে ভাতসুদ্ধ প্লেটে পানি ঢেলে দিয়েছিল। চুপচাপ চলে গিয়েছিল অফিসে। আমি শুধু নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে চেয়ে থেকেছিলাম আধখাওয়া ভাতের প্লেটের দিকে। বলিনি কিছুই। এরপর স্বাভাবিক নিয়মে সারাটা দিন চলে গেল। এখন ভদ্রলোক ফিরছেন। ওনার চোখ-মুখ স্বাভাবিক। মনে হয় না সকালের ঘটনার আহত ভাবটা এখনো আছে।
ভদ্রলোক ঘরে এসে পলিথিনের ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে আমার দিকে তাকালেন। আমিও তাকালাম তার দিকে। চোখাচোখি হলো আমাদের। পরনের শার্ট খুলতে খুলতে বললেন,
“কী অবস্থা? এমন উজবুকের মতো চেহারা করে বসে আছ কেন? চুলের এই অবস্থা কেন? দেখে মনে হচ্ছে পাবনা থেকে পালিয়ে এসেছ! গোসল করোনি?”
আমি কড়া চোখে তাকালাম। গোসল কিংবা চুল আঁচড়ানোর মতো জাগতিক কোনো কাজে আমার আজকাল আগ্রহ কাজ করে না। এমনকি খাওয়ার কাজেও আমার প্রচুর অবহেলা। আমার শুধু বসে থাকতে মন চায়। ভদ্রলোক ফ্যানের সুইচ দিয়ে এসে আমার পাশে বসলেন। বললেন,
“কথা বলছ না কেন? শরীর খারাপ?”
আমি এবারেও কিছু বললাম না। নিজেই বললেন,
“আসার সময় দেখলাম সাত্তার চাচা সিঙাড়া ভাজছে। তোমার জন্য নিয়ে এলাম। একটায় সিঙাড়া আর আরেকটায় রাতের জন্য পরোটা আর আলুভাজি নিয়ে এসেছি। আজকে আর রান্না করতে পারব না।”
আমি তাকিয়ে রইলাম। রাতের জন্য আনা পরোটা কিংবা প্রিয় সিঙাড়ার কথা শুনেও আমার মন প্রফুল্ল হলো না। হাসি ফুটল না ঠোঁটের কোণে। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম আমার প্রিয় স্বামীকে। এই পৃথিবীতে তার চেয়ে প্রিয় আমার আর কী আছে? কে আছে? অথচ তাকে আজকাল সহ্যই হয় না। রাগ লাগে তার ওপর। এই যেমন এখন লাগছে। কারণ সে এসেই আমার এলোমেলো অবস্থা দেখে একটা মন বিষণ্ণ করে দেওয়ার মতো কথা বলেছে। আমাকে আজকাল তার উজবুকের মতো লাগে? এই চেহারাটা দেখেই তো বিয়ে করেছিল। তবে আজ এই মন্তব্য কেন? অফিসের সুন্দরী কলিগদের দেখে আমার আর ভালো লাগছে না? আর লাগবেই বা কী করে, তাকে তো সন্তান সুখ দিতে পারব না আমি। তবে কেন ভালো লাগবে? কেন ভালোবাসবে?
এসব কারণ উল্লেখ করেই তার সাথে সেই রাতে প্রচণ্ড ঝগড়া করলাম আমি। বিবাহিত জীবনে এতবড় ঝগড়া আগে কখনোই করিনি। সেই প্রথম রাত্রি, যেদিন স্বামীর বুকে মাথা রাখা ছাড়া পার করলাম আমি। রাতভর কিছুক্ষণ পরপর আমাকে তার বুকে মাথা রাখার জন্য টেনেছিল সে, আমি বড় অবজ্ঞায় তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি। আমার অভিমান হয়েছে। খুব বেশী অভিমান হয়েছে…
—চলমান—
