#অ_সময় (৩)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
নিলু খুব বোকা ছিলো। আমার ভাবনা অনুযায়ী সে বোকা। সরল মানুষ। কিন্তু তাও কিভাবে যেন সে শিউলি ভাবীর স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করলো। আমি কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি নিলু এতদূর যেতে পারে। এটা তার পক্ষে সম্ভব। অথচ সে শিউলি ভাবীর স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। আমাদের বিষয়ে তাকে জানিয়ে দেয়। জানি না নিলু কোন উদ্দেশ্য তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। হয়তো ভেবেছিলো লোকটা তার বউকে শায়েস্তা করবে। আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বারণ করবে। হয়তো এই উপায়ে আমি শিউলি ভাবীর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবো। এই আশায় বোধহয় নিলু এসব করেছে। কিন্তু এটা সম্ভব হয়নি। বোকা নিলু তো জানতোই না, শিউলি ভাবীর স্বামী অন্ধ প্রেমিক। বউয়ের প্রতি তার অন্ধ প্রেম, বিশ্বাস। সে নিলুর কথা বিশ্বাস তো করলোই না উল্টা তাকে বকা দিয়েছে।
তবে হ্যাঁ শিউলি ভাবীকে এসব কথা বলে দিয়েছে। আর শিউলি ভাবীর মাধ্যমে আমি জানলাম, নিলু আমার অগোচরে এমন কান্ড ঘটিয়েছে। নিলু কতটা কষ্ট হাহাকার নিয়ে শিউলি ভাবীর স্বামীকে বলেছে,“ভাই আমি আপনার ছোট বোনের মতো, দয়া করে আমার স্বামীকে একটু আমাকে ফিরিয়ে দেন। একটু দয়া করুন। আপনার স্ত্রীকে সামলান।”
নিলুর এই কথা জানার পর আমার খুশি হওয়া উচিত ছিলো। তার প্রতি সহানুভূতি জাগা উচিত ছিলো। কিন্তু তা হয়নি। বরং হয়েছে রাগ। আমি রেগে গেলাম। খুব রেগে গেলাম। কিভাবে আমার অগোচরে এতবড় কান্ড ঘটালো নিলু? শিউলিকে জীবন থেকে সরানোর চেষ্টা করেছে। নিলু খুব খারাপ কাজ করেছে। তার উপর শিউলি ভাবী কেঁদে কেঁদে বললো,“আমার স্বামী আজ যদি নিলুর কথা বিশ্বাস করতো, তাহলে তো আজ আমি শেষ হয়ে যেতাম। আমি তো তোমাকেও হারিয়ে ফেলতাম। সুজয় আমি তোমাকে হারাতে চাই না। আমি তোমায় খুব ভালোবাসি। কতবড় সর্বনাশ না তোমার বউ করতে যাচ্ছিলো আজ।”
তার এই কান্না, ভালোবাসা আমার রাগ বাড়িয়ে দিলো। আর সেদিন বাসায় এসে আমি নিলুর উপর খুব রাগ দেখালাম। টুকটাক হাত তোলা হয়ে গিয়েছে বড়সড় আঘাত। পুরো এক ঘন্টা কু কুরের মতো তাকে পিটালাম। বেল্ট খুলে ইচ্ছামতো দিলাম পিটানি। নিলু এত মার সহ্য করতে পারছিলো না। সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কিন্তু তার কান্না আমার কানে গেলো না। আমি তো গালাগালি দিতে ব্যস্ত ছিলাম। সঙ্গে আঘাত করতে। এক সময় নিলু আমার পা জড়িয়ে বলে,“আমার মাফ করে দাও। দয়া করে আর মেরো না। আমাকে মাফ করো। আমি আর কখনো তোমার আর তার জীবনে বাঁধা হবো না। ক্ষমা করো।”
তার ক্ষমা, তার ভেঙে পড়া আমার ভেতরে থাকা পশুটাকে পৈশাচিক আনন্দ দিচ্ছিলো। সে এক অন্যরকম আনন্দ। মন আপন তালে বলে উঠলো,“মা…. পোষ মানবি না তো যাবি কোথায়? আমার সঙ্গে গরম। দেখলি মজা।”
অথচ তার এই পোষ মানার মধ্যে যে অসহ্য যন্ত্রণা লুকিয়ে ছিলো তা আমি না দেখে রইলাম। তার শরীর, মনের যন্ত্রণা আমাকে ছুঁতেই পারছিলো না। কারণ আমি যে অমানুষে রূপান্তিত হয়ে গিয়েছিলাম। সে রাতে নিলু হুহু করে শুধু কাঁদতেই ছিলো। এর আগেও অনেক রাত সে কেঁদেই কাটিয়েছে। তবে এই রাতের কান্না অন্যরকম ছিলো। অন্যরকম যন্ত্রণার। কিন্তু আমি সে কান্নার গভীরতা অনুভব করতে পারিনি। উল্টো আমার মনের পশুটা সুখ পাচ্ছিলো। আমার সুখ দ্বিগুন বেড়ে যায় যখন নিলু কেঁদে কেঁদে তার মাকে ফোনে বলছিলো,“মা আমায় নিয়ে যাও। আমাকে আর মুন্নাকে একটু নিয়ে রাখো। তোমরা আমাকে খাওয়াতে না পারো, একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিও। আমরা নাহয় আমাদেরটা সে থেকে চালিয়ে নিবো। প্লীজ।”
জবাবে তার মা বলে,“তোর বাবা হার্টের রোগী। এখন সংসার ছেড়ে এসে তাকে মারতে চাস? একবার তো সম্মান সব শেষ করলি, এখন আবার। দেখ মা, সংসার জীবনে ওমন ঝামেলা হয়। একটু মানিয়ে নে।” তার মায়ের এসব কথা আমাকে খুশি করে দেয়। তার কথা আমাকে বুঝিয়ে দেয় সে আমার কাছে বন্দী। তার বাবা, মা সমাজ মিছে সম্মানের ভয়ে কখনো তাকে ঘরে জায়গা দিবে না। নিলুর যাবার কোথাও জায়গা নাই। আর না আছে তেমন শিক্ষাগত যোগ্যতা যা তাকে স্বাবলম্বী করতে পারে। তাই তার সঙ্গে আমি যাই করি না কেন তাকে আমার কাছেই থাকতে হবে। মাটি কামড়ে। আর এটা বোঝার পর থেকে আমার আচরণ আরও বদলে যায়। এরপর থেকে তাকে জোরালোভাবেই আঘাত করা শুরু করি।
কখনো বেল্ট, কখনো হাতুড়ি, কখনো বা কাঠ দিয়ে আঘাত করে বসি তাকে। মাথা কেটে যায়, কোমড় নাড়াতে পারে না। সেই অবস্থায় বিছানায় পড়ে থাকে। তাও চিকিৎসা করাই না। কখনো ভাবিনি তার চিকিৎসা দরকার। তবে আস্তে আস্তে মুন্না বড় হয়। তার মুখে কথা ফোটে। তার বাবা ডাকটা মাঝে মাঝে অনেককিছু ভাবায়। আমার মধ্যে নূন্যতম বেঁচে থাকা মানুষটা অমানুষ থেকে বেরিয়ে আসার কথা ভাবে। সেটা ঐ ভাবা অবধিই। যখনই শিউলির কাছে যাই। তার মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনে মনে হয়, এটাই আমার দুনিয়া। জানি না কি ছিলো তার কাছে। তবুও সে আমার কাছে অনেক প্রিয় ছিলো। নিলুর জন্য জীবনে যা কিনিনি তা সব শিউলির জন্য কিনেছি। বিবাহিত জীবনের প্রথমদিকে টানাটানি ছিলো। চাকরির বেতন ছিলো স্বল্প। তখন নিলুকে একজন ভালো স্ত্রীর মতো মুখ প্রসাধনী ব্যবহার করা বাদ দিতে হয়। সেই সঙ্গে আরও অনেককিছুই বাদ দিতে হয়। তাই সেভাবে মেয়েদের কোন পোডাক্ট চেনা হয়নি। কিন্তু শিউলির সংস্পর্শে এসে সব চিনেছি। তবে সেই চেনা শিউলির জন্য নিয়ে আসায় সীমাবদ্ধ ছিলো। নিলুর জন্য এসব কখনো যায়নি। এভাবেই চলছিলো জীবন। পাপ মানুষকে খুব আকর্ষণ করে। খুবই বিমোহিত করে রাখে। তাই তো শিউলি আমার দুনিয়া হয়ে উঠেছে। তবে ধীরে ধীরে শিউলির বাচ্চারা আরও বড় হয়। তারা কিছু একটা বুঝছিলো। ছেলেটা তো বলেই ফেলতো,“তোমার ঘরে চাচা কেন আসে মা? এসব তো খারাপ কাজ? সবাই তো বলে খারাপ। তুমি এসব করো কেন?” তবে আমার মতোই শিউলি অন্য জগতে মগ্ন ছিলো। তাই তার ছেলের এসব কথা গায়ে সইতো না। বরং ছেলেটাকে মারধর করে চুপ করিয়ে রাখতো। এসব বিষয়ে অন্ধের মতো থাকতে বলে দিতো। তবুও ছেলেটা কথা বলতো। তার এসব ভালো লাগতো না। মায়ের অধঃপতন সহ্য হতো না বোধহয়। তবে তাতে আমার বা শিউলির কিছুই যায় আসতো না।
এর মাঝে নিলু এসে শিউলির হাতে পায়েও ধরে। আমি জানি না নিলু নিজেকে এতটা ছোট কেন করছিলো। হয়তো এখানেই থাকতে হবে, তাই স্বামীর মনটা নিজের দিকে ঘুরানোর শেষ চেষ্টা। তবে শিউলির কি মন গলে? গলে না। সে তো মজা পাচ্ছিলো নিলুর আচরণে। তাই তো অহংকারের সঙ্গে বলে,“নিজের স্বামী ধরে রাখার মুরোদ নাই, আসছে আমাকে থামাতে। এই আমি কি তোর স্বামীকে ডেকে নিয়ে আসি?ও আসে। তুই তোর স্বামীকে ধরে রাখতে পারিস না। তুই ওকে আসতে মানা কর। তাহলেই হয়।”
এসব শোনার পরও নিলু তার সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলে। নরম গলায় বলে,“আপনিও তো একটা মেয়ে। মেয়ে হয়ে এভাবে অন্য এক মেয়ের ঘর ভাঙতে পারলেন ভাবী?”
নিলু নরম গলায় বলছিলো। কিন্তু শিউলি এটা নরম হিসাবে নেয়নি। এই সামান্য কথা মাইন্ডে নিয়ে নেয়। যা নয় তা বলে গালিও দেয়। শুধু কি তাই? নিলুর ক্ষমতা নাই ভালোবাসা পাওয়ার। শিউলির ক্ষমতা রয়েছে বলেই আমি এবং তার স্বামী দুজনেই তাকে ভালোবাসি। শিউলির মুখের ভাষায় সে কি অহংকার। অথচ বৈধ পবিত্র সম্পর্ক থাকা পরও নিলু এমন অহংকার নিয়ে কথা বলতে পারেনি। আমিই তাকে সুযোগ দেইনি।তবে নিলু সেদিন অনেক বেশিই ভেঙে পড়ে। যদিও প্রতি নিয়তই ভেঙে পড়েছে। তাও তার চেয়ে বেশি ভাঙা যাকে বলে। তবে সেদিনের ঘটনা এমন হলেও, আমার কানে সেটা ভিন্নভাবে এসে পৌঁছায়। অতঃপর…..
’
’
চলবে,
