#অ_সময় (২)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
নিলু খুব শান্ত গলায় জানতে চায়,“শিউলি ভাবীর শোবার ঘর অবধি যাবার অনুমতি কবে থেকে পেয়েছো তুমি?”
সেদিন নয় ছয় বোঝাতে পারলাম না। আমার কন্ঠ দিয়ে কোন কথাই বের হলো না। নিলুর শান্ত চোখ, তার কন্ঠে গভীর কিছু ছিলো। যা আমাকে বাঁধা দিলো মিথ্যা বলতে। সত্যি বলতে সেদিন আমি স্পষ্ট বুঝে গেলাম, নিলুকে আর মিথ্যে বলা সম্ভব নয়। সে সত্য জেনে গিয়েছে। তাই মিথ্যা বলা সম্ভব নয়। তবুও ভয়ে ভয়ে বললাম,“ভুল ভাবছো তুমি।”
“ভুল নয়।”
নিলু খুব শান্ত গলায় বলে। অতঃপর আমার দিকে তাকায়। তার চোখ দুটো ছলছল। এই বুঝি কান্না করে দিবে। তবে কাঁদে না। সে খুব শান্ত গলায় বলে,“বাবু হওয়ার আগে তোমার কত এক্সাইটেডমেন্ট ছিলো। কত স্বপ্ন ছিলো। অথচ তার জন্মের পর তোমার মধ্যে আমি কিছুই পাচ্ছিলাম না। বাবা হিসাবে সন্তানের প্রতি যে একটা ভালোবাসা থাকে, তোমার মধ্যে সেই ভালোবাসাটা ছিলো না সুজয়। শুধু তাই নয়, তোমার আমার প্রতিও কেমন অনীহা দেখা দিচ্ছিলো। ধীরে ধীরে কেমন যেন দূরে সরিয়ে দিচ্ছিলে আমায়। হ্যাঁ মুখে বলোনি। মুখে তো ভালোবাসি বলেছো। কিন্তু আচরণে সেই ভালোবাসাটারই অভাব ছিলো। যা আমার মধ্যে অনেক অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। যে প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে আজ আমি শেষ হয়ে গেলাম সুজয়। পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে গেলাম।”
নিলু আমাকে তার হৃদয়ে কষ্ট, তার ভালোবাসার বেঈমানী মানতে না পারার যন্ত্রণা ব্যখা করছিলো। সে আমার জন্য কতটা আঘাত পেয়েছে। কত গভীর ক্ষত জন্ম নিয়েছে তার মধ্যে, সেসব বলছিলো। কিন্তু আমি। আমি সেসব শুনেও শুনলাম না। আমার মধ্যে তো তখন অন্য ভয় ছিলো। নিলু সব জেনে গিয়েছে। এবার কি আমাকে নিলু বা শিউলি ভাবী একজনকে বেছে নিতে হবে? কিন্তু আমি একজনকে বাছতে পারছিলাম না।
আমি জানি না, তখন আমার মধ্যে কি হচ্ছিলো। আমার মধ্যে মানুষের বৈশিষ্ট্য ছিলো কি-না। তবে হ্যাঁ আমি নিলুর কষ্ট অনুভব করতে পারিনি। শুধু এটাই মাথায় চলছিলো, আমার নিলুকে দরকার। তাই তখনই তার হাত ধরে বললাম,“নিলু স্যরি। ভুল হয়ে গিয়েছে। অজান্তে হয়ে গিয়েছে ভুলটা। এটা ভুল করে হয়ে গিয়েছে।”
আমার এই কথা শুনে নিলু খুব রেগে যায়। খুব কড়া গলায় বলে,“ভুল? এটা ভুল? তুমি আমার বিশ্বাস, আমার ভালোবাসা সব ভেঙে দিয়েছো। আর এখন বলছো এটা ভুল? এটা আদৌ ভুল বলো?”
নিলু এবার হুহু করে কেঁদে দেয়। তার কান্না মনে আঘাত করছিলো কি-না জানি না। তবে তাকে হারাতে চাইনি। তাই তাকে জড়িয়ে ধরে মাফ চাচ্ছিলাম। একবার নয় বহুবার। নিলু কাঁদতে কাঁদতে বলে,“তোমায় ভালোবেসে সব ছেড়ে তোমার কাছে এসেছিলাম সুজয়। আর সেই তুমি। তুমি কিভাবে পারলে এটা করতে? বলো কিভাবে?”
নিলু সেদিন রাতে খুব কান্না করলো। বিছানায় শোয়া মুন্নাও জেগে গিয়ে কান্নাকাটি করছিলো। তবে নিলু তাকে ছুঁয়েও দেখলো না। নিলুকে দেখে মনে হচ্ছে তার এই দুনিয়ার প্রতি এখন কোন আগ্রহই নাই। আর আমি? তার দুঃখ আমি আদৌ বুঝেছি। না হয়তো। আমার তো শুধু তাকে দরকার। তাই তো তার পায়ের কাছে পড়েছিলাম। ক্ষমা চেয়েছি। সেবার টানা দু’দিন তার হাতে পায়ে পড়ার পর সে ক্ষমা করে। বিনিময়ে শর্ত দেয়। কখনো শিউলি ভাবীর সঙ্গে দেখা করা যাবে না। কথা বলা যাবে না। শুধু তাই নয় আমাদের এখান থেকে বাসা বদলাতে হবে। আমি তার সব শর্ত মেনে নেই। সত্যি তখন শিউলি ভাবীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেই। কিন্তু আমি তখন ভালো ছিলাম না। তার সংস্পর্শে আমি যে সুখটা পেতাম, সেটা হারিয়ে আমি শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। তবুও নিলুর জন্য মেনে নেই। ওদিকে শিউলি ভাবীও আমাকে হারিয়ে পাগল হয়ে যায়। আমাদের বাড়ি আসে। কিন্তু নিলু দরজা খোলে না। তাকে ঘরে প্রবেশ করতে দেয় না। আর আমাকে বাসা পাল্টানোর জন্য চাপ দেয়।
সপ্তাহ খানেকের মধ্যে বাধ্য হয়ে নিলুর জন্য বাসা বদলাতে হয়। তবে এই খবর শিউলি ভাবী পেয়ে সে পাগল হয়ে যায়। আমাকে ফোন দিয়ে প্রচুর কান্নাকাটি করে। সে আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। আমিও তাকে চাই। তবে নিলুকে হারিয়ে নয়। তাই বাসাটা বদলেই ফেললাম। কিন্তু মন? পুরুষ মনের কামনা সেটা কি বদলাতে পারলাম? তাই তো নিলুর মন জয় করতে না করতে শিউলি ভাবীর সঙ্গে আবার দেখা করা শুরু করে দেই। তবে বেশিদিন পারিনি। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে নিলুর কাছে আবার ধরা খাই। তবে এবার ক্ষমা চেয়েও লাভ হয়নি। নিলু বাচ্চাকে নিয়ে সোজা বাবার বাড়ি চলে যায়। আমার কোন কথাই শোনেনি।
নিলু চলে যাবার পর কয়েকবার ফোনেও যোগাযোগ করি। কিন্তু পারিনি। ব্যর্থ হই। তিনদিনের মাথায় তাকে নিয়ে আসতে যাই। তবে নিলু আসেনি। তখন রাগ করে মাস খানেক ছিলো নিলু বাবার বাড়ি। আমি মাত্র সাতদিন তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। তাকে ফেরানোর। তবে সে না আগানোতে আর চেষ্টা করি না। বাদ দিয়ে দেই। কারণ তখন যে আমার জন্য শিউলি ভাবী ছিলো। হ্যাঁ নিলুর জন্য সাময়িক কষ্ট হয়েছে৷ তবে সেটা গাঢ় ছিলো না। আর না স্থায়ী হয়েছে সেই কষ্ট। তাই তো খুব সহজেই তার চিন্তা বাদ দিয়ে শিউলি ভাবীতে মজে যাই। সত্যি বলতে, পাপ এমন এক জিনিস যেটা একবার করার পর বারবার করতেই মন চায়। আর বারবার করার পর মনের মধ্যে থাকা পাপবোধ, সংকোচ, ভয় সব কেটে যায়। তখন সেটা শুধু মনকে আনন্দই দেয়। আমার ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। নিলু আমার ভালোবাসা ছিলো। তবে সেই ভালোবাসায় তো নিষিদ্ধ কাম ছিলো না। তাই তো সেটা আমায় জোরালো ভাবে আটকাতে পারেনি।
তবে নিলু আমাকে ছেড়ে বেশিদিন থাকতে পারেনি। মাস খানেকের মধ্যে সে আমার সংসারে ফিরে আসে। সে যে কত কষ্ট, দুঃখ পেয়ে এই ঘর করতে এসেছে তা আমি জানতাম না। কখনো জানার চেষ্টা করেনি। আমি তো খুশি ছিলাম আমি মাফ না চাইতেই চলে এসেছে। আমি শিউলি ভাবীর সঙ্গে সম্পর্কে রয়েছি,সেটা জানার পরও সে ফিরে এসেছে। তার মানে সে সব মেনে ঘর করবে। এটা আমার জন্য খুশির ছিলো। কারণ এখন আর যে তাকে লুকিয়ে কিছু করতে হবে না। তবে সেদিন রাতে নিলু আমার পা জড়িয়ে ধরে বলেছিলো,“বাবা, মায়ের সম্মান নষ্ট করে তোমার হাত ধরে পালিয়ে এসেছিলাম। বাবা, মাকে কষ্ট দিয়ে। সেই কষ্টের ফল এখন পাচ্ছি গো সুজয়। তবুও দয়া চাচ্ছি তোমার কাছে। একটু দয়া করো। প্লীজ ঐ পাপ থেকে বেরিয়ে আসো। আমার জন্য না হোক আমাদের সন্তানের জন্য ফিরে এসো।”
‘সন্তান’। হ্যাঁ আমার একটা সন্তান আছে। কিন্তু তার প্রতি বাবা হিসাবে আমার যে একটা টান থাকার কথা সেটা আমি কখনো অনুভবই করিনি। করার সময় তো পাইনি। আমি তো অন্য দুনিয়ায় ব্যস্ত। তাই বাবা নামক সত্তাটা কখনো জাগেনি। তাই নিলুর কথায় গুরুত্ব দিলাম না। তবে এটা বুঝেছি নিলু তার বাবা, মায়ের ঘর থেকে কষ্ট পেয়েই এখানে এসেছে। হয়তো তারা মেয়ের পাশে ডিভোর্সি উপাধি চায়নি। এটা তাদের সম্মান আরও নষ্ট করবে তাই ভাবনা। তাছাড়া এই বিয়ে তো তাদের ইচ্ছায় নয়। নিলুর ইচ্ছায় হয়েছে। তাই এই স্বামী খারাপ হলে তাদের কি? দোষ তো নিলুর। হয়তো এমন কিছু খারাপ কথা শুনিয়েই নিলুকে ঘরছাড়া করেছে। বুঝতে পারছি আমি। তবে এসব বোঝার পরও নিলুর প্রতি সহানুভূতি নয় বরং আমার তিরস্কার ভেসে আসে। তাই তো খুব কড়া গলায় বললাম,“গেলি তো বাপের বাড়ি? তো বাপ রাখলো না এক মাসের বেশি? আরে কে রাখবে? বিয়ের পর মেয়ের স্বামীর ঘরই সব। তাই এখন থেকে আমি যা বলবো তাই মেনে চলবি। আমাকে কোন কাজে বাঁধা দিবি না। তোর সমস্ত ভরণপোষণ পেয়ে যাবি।”
আমার মুখ দিয়ে বের হওয়া এই কথাগুলো নিলুর জন্য কত ভারী ছিলো তা আমি জানতাম না। ইচ্ছা করেই জানতে চাইনি। কারণ তখন আমি নিলুর কষ্ট দেখতেই চাইনি। তাই তো নিলুর কোন ভালো কথা সহ্য হয়নি। অতঃপর আমাদের সংসার ওভাবেই চলতে থাকে। আমি রাতের পর শিউলির কাছে থাকতাম। প্রায় শেষ রাতে বাড়ি ফিরতাম। এসব নিলু মানতে পারতো না। প্রায়ই ঝগড়া করতো। আর সেই ঝগড়া থেকে আমি তার গায়ে হাত তুলি। তার মুখ বন্ধ করার মাধ্যম ছিলো এই হাত তোলা। যেটা দিনের পর দিন বাড়ে। কারণ ততদিনে আমার পুরুষ মন জেনে গিয়েছিলো, নিলুর যাওয়ার জায়গা নাই। তার বাবার ঘরে তার জায়গা হবে না। তারা ডিভোর্সি মেয়ে ঘরে তুলবে না। তাই বাধ্য হয়ে নিলুকে আমার সঙ্গেই থাকতে হবে। তাই তো নিলুর উপর অঘোষিত ভাবে হাত তোলার লাইসেন্স পেয়ে যাই। তুলতেও থাকি। তবে হ্যাঁ মাঝে মাঝে তার কাছে আসতাম। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতাম। কিন্তু নিলু সেভাবে সাড়া দিতো না। তাই মজা পেতাম না। তাই তো মিলন শেষে তাকে থাপ্পড় মেরে কড়া ভাষায় বুঝিয়ে দিতাম, তার এবং শিউলির পার্থক্য। সে কথার জবাবে অবশ্য নিলু বলতো,“তোমার জন্য এখন শুধু আমার মনে ঘৃণাই আছে সুজয়। আর যাকে ঘৃণা করা যায় তাকে মিলিত হতে সাহায্য করা যায় না। আর পারস্পরিক ইচ্ছা না থাকলে তো তৃপ্তি পাওয়া যায় না। এটা তুমি বুঝবে না।” যে কথা বলার পর অবশ্য নিলু চড় থাপ্পড় খেতো খুব। এভাবেই চলছিলো আমাদের সংসার। আমাদের ছোট সন্তান বাবা, মায়ের এই কলহ থেকেই বড় হচ্ছিলো। তবে একদিন আমি সব সীমা অতিক্রম করে ফেললাম। সেদিন মাত্রাটা ছাড়িয়েই ফেললাম৷ একটু বেশিই হয়ে যায়। হবে না কেন? নিলু কাজটাই করলো এমন। নিলু….
’
’
চলবে,
(ভুলক্রুটি ক্ষমা করবেন।)
