#বেলীফুলের_ইতিকথা (২৬)
#মীরাতুল_নিহা
বেলীর বুকফাটা আর্তনাদ আর গগনবিদারী চিৎকারে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। সে ফিওনার রক্তাক্ত, নিথর শরীরটা বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে পাগলের মতো হাসপাতালের দিকে ছুটল। জরুরি বিভাগের ডাক্তাররা ফিওনার অবস্থা দেখেই শিউরে উঠলেন। বাচ্চার এমন ভয়াবহ ক্ষত আর রক্তপাত দেখে তারা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় থানায়, পুলিশে খবর দিলেন। হাসপাতালের সাদা ঠান্ডা করিডোরের মেঝেতে বসে বেলী তখনো উন্মাদের মতো কাঁদছে। তার গায়ের শাড়িতে মেয়ের তাজা রক্ত লেগে শুকিয়ে আসছে। আয়েশা নিজের সাত মাসের ভারী শরীর নিয়েও বেলীর পাশে বসে তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু বেলীর কানের ভেতর তখন কোনো কথাই ঢুকছে না।
কিছুক্ষণ পর আয়েশার স্বামী আরিফ হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালে এসে পৌঁছাল। সে বাইরে থেকে কিছু খাবার আর পানির বোতল কিনে এনেছিল। আরিফ অত্যন্ত যত্ন করে খাবারগুলো প্রথমে তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আয়েশার দিকে এগিয়ে দিল, তারপর বড় বোন সমতুল্য বেলীর সামনেও ধরল। বেলী শূন্য দৃষ্টিতে আরিফের দিকে তাকাল, কিন্তু কোনো খাবার স্পর্শ করার মতো মানসিকতা তার ছিল না। ঠিক তখনই আদনান ধীরপায়ে করিডোরে এসে দাঁড়াল। সে এতক্ষণ দূর থেকে নির্বাক হয়ে এই পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। তার চোখেও ছিল এক অদ্ভুত থমথমে ভাব। সে বেলীর একদম কাছাকাছি এসে বসল এবং অত্যন্ত নরম ও সান্ত্বনা জড়ানো গলায় বলল,
“ মন শক্ত করো। ভেঙে পড়ো না। আমাদের ফিওনা অনেক শক্ত মেয়ে, ও ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে! তোমরা না আসলে হয়ত এসব হতো না। আমাকে ক্ষমা করো, আমার জন্যই এতকিছু!”
কথাটা বলেই আদনান আর সেখানে দাঁড়াল না। কারো কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে দ্রুত পায়ে হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেল। তার এভাবে হুট করে চলে যাওয়া দেখে আয়েশা বেলীর দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
“আজ তো নিজের বোনের বিয়ে। বাড়িতে কত মেহমান! মনে হয় সেই তাগিদেই চলে গেছে। তুই কিছু খেয়ে নে।”
এরই মধ্যে জরুরি বিভাগের ওটি (OT) থেকে ডাক্তাররা গম্ভীর মুখে বেরিয়ে এলেন। বেলী এক লাফে উঠে গিয়ে ডাক্তারের হাত দুটো চেপে ধরল। ডাক্তার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত দুঃখিত গলায় বললেন
, “বাচ্চার ওপর প্রচন্ড রকমের পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। গলায় মুখে নখের আঁচড়ের দাগ। বাচ্চাটা হয়ত ছুটে পালানোর চেষ্টা করছিল। গলায় বেশ লাল দাগ! ওকে ধর্ষনের চেষ্টা করা হয়েছিল। সফল না হওয়ায় অতিরিক্ত ব্লিডিং হওয়ার কারণে সে শকে চলে গেছে। আমাদের ধারণা, যন্ত্রণার তীব্রতায় একপর্যায়ে ফিওনা যখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল, তখন হয়তো ধর্ষক ভয় পেয়ে মাঝপথে তাকে ওই জঙ্গলে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। বর্তমানে আমরা রক্তপাত বন্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। চিকিৎসা চলছে।”
ডাক্তারের মুখ থেকে ‘ধর্ষণ’ ‘অতিরিক্ত ব্লিডিং’ কথাগুলো শোনামাত্রই বেলীর মাথার ভেতর সব ওলটপালট হয়ে গেল। সে আবারও করিডোরের মেঝেতে আছড়ে পড়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।এই পৃথিবীর মানুষগুলো এত নিষ্ঠুর? এত পৈশাচিক হত পারে একটা রক্তমাংসের মানুষ? মাত্র চার বছরের একটা নিষ্পাপ, অবুঝ বাচ্চা—তাকেও একটু দয়া করল না পাষণ্ডরা! তাকেও ধর্ষণ করতে ছাড়েনি! তার চার বছরের পুতুলটার সাথে এই দুনিয়ার মানুষ এমন নরকীয় কাণ্ড করতে পারল, এই সত্যিটা সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। কান্না যেন থামছেই না এটা ভেবে ফিওনা কত যন্ত্রণা সহ্য করেছে!
________________________________
ফারহান চাইলে পারতো বেলীকে ডিভোর্সের পর টাকাগুলো না দিয়ে ফাঁকি দিতে, আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে বেড়াতে। কিন্তু তার ভেতরের সুপ্ত বিবেক আর অতীতে করা পাপের তীব্র অপরাধবোধ তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। সে চেয়েছে যেকোনো মূল্যেই হোক বেলীর এই দেনমোহরের পাওনা টাকা শোধ করে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে। সেই মরিয়া ভাব থেকেই ফারহান দ্রুত তার নিজের গ্রামে ফিরে যায়। বাপদাদার আমলের যেটুকু মাথা গোঁজার শেষ ভিটেমাটি অবশিষ্ট ছিল, নিজের কোনো ভবিষ্যতের কথা না ভেবেই সেটুকু একরকম পানির দরে, তাড়াহুড়ো করে বিক্রি করে দেয়। সব মিলিয়ে মাত্র তিন লাখ টাকা হাতে পায় সে। গ্রামে থাকার মতো শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়ে ফারহান ঢাকায় ফিরে আসে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বেলীর দেনমোহরের সেই দু লাখ টাকা সে শোধ করে দেয়। কিন্তু দেনমোহরের টাকার বাইরেও তার ঘাড়ে আরও ত্রিশ হাজার টাকার একটা দেনা ছিল। সেই অবশিষ্ট টাকাটা শোধ করার জন্য সে নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, এদিক-ওদিক হন্যে হয়ে ঘুরছিল। কিন্তু নিয়তির মার বোধহয় একেই বলে! ফারহান আর এক কদমও সামনে এগোতে পারল না, তার চলার সব পথ যেন একসাথে বন্ধ হয়ে গেল।
টাকার অভাবে ঢাকার সেই জীর্ণ ছোট ঘরটার বাড়ি ভাড়াও সে সময়মতো দিতে পারেনি। কয়েক মাসের ভাড়া বাকি পড়ায় বাড়িওয়ালা একদিন চরম অপমান করে তাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়। রাস্তায় এসে দাঁড়ায় ফারহান। একটা সাধারণ কাজের জন্য সে চেনা-পরিচিত সবার দুয়ারে দুয়ারে ঘুরল, কিন্তু তার অতীত রেকর্ড আর এই বর্তমান দুর্দশা দেখে কেউ তাকে বিশ্বাস করল না, কোনো কাজেও নিল না।
চরম নিরাশ আর নিঃস্ব হয়ে একদিন ফারহান রাস্তার এক মোড়ে এসে ধপাস করে বসে পড়ল। ক্ষিদে আর অপমানে তার শরীর তখন কাঁপছিল। গত কয়েক মাসের মানসিক ঝড় আর অনাহারে তার পরনের পোশাকটা হয়ে গিয়েছিল জীর্ণ, ময়লা আর ছেঁড়া। মাথার চুলগুলো উসকোখুসকো, মুখের দাড়ি-গোঁফ বড় হয়ে জট পাকিয়ে গিয়েছিল।
ফারহান যখন শূন্য দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে নিজের ভাগ্যকে দোষছিল, ঠিক তখনই এক পথচারী তার সেই মলিন দশা, ছেঁড়া পোশাক আর বড় চুল-দাড়ি দেখে তাকে একজন সাধারণ ভিখারি ভেবে বসল। লোকটা দয়া করে ফারহানের ওপর একটা টাকার নোট ছুড়ে দিয়ে চলে গেল। কোলের ওপর পড়া সেই টাকাটার দিকে ফারহান স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তার চোখ ফেটে জল চলে এল। আজ পরিস্থিতি তাকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে! টাকাটার দিকে তাকিয়ে সে চরম এক সত্য আবিষ্কার করল—দুনিয়ার মানুষ তাকে এখন ভিক্ষুক ছাড়া আর কিছু ভাবছে না। ভেতরের সব আত্মসম্মান আর অহংকার বিসর্জন দিয়ে সেই দিন থেকেই ফারহান পুরোদস্তুর ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিল। ওই রাস্তার মোড়টাই হলো তার নতুন ঠিকানা। এভাবেই ভিক্ষা করে তার একেকটা দিন কাটতে লাগল। মানুষের কাছে হাত পেতে যে কয়টা টাকা জোটে, তা দিয়ে কোনোদিন কিছু কিনে পেটের ক্ষুধা মেটায়, আর যেদিন টাকা জোটে না, সেদিন ক্ষুধার্ত পেটে রাস্তার ফুটপাতে, চটের ওপর ধপাস করে শুয়ে পড়ে। ঘুমানোর জন্য ছাঁদটুকুও নেই তার মাথায়। ফারহান বড় রাস্তার ধারের এক কোণেই আস্তানা গেড়েছিল। হঠাৎ করেই তার কানের কাছে মানুষের শোরগোল আর একটা তীব্র জটলার আওয়াজ এলো। চারপাশ থেকে লোকজন চিৎকার করতে করতে ছুটে যাচ্ছে। পিচঢালা মেইন রোডের মাঝখানে ততক্ষণে বেশ বড় একটা মানুষের ভিড় জমে গেছে। কেউ একজন বলাবলি করল,
“আহারে! এক্কেবারে বাসের তলায় পইড়া শ্যাষ!”
ফারহান সহজে হাঁটতে পারে না। তার সেই পুরনো, ভাঙা ক্র্যাচটার ওপর ভর দিয়ে সে অনেক কসরত করে কোনোমতে শরীরটাকে টেনে তুলল। কৌতূহল আর অবশ পা দুটো নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সে জটলার একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভিড় ঠেলে উঁকি দিতেই দেখল, রাস্তার মাঝখানে রক্তাক্ত অবস্থায় একটা মেয়ে পড়ে আছে। চারপাশের লোকজন আফসোস করতে করতে বলাবলি করছে,
“মাথায় বড্ড বেশি চোট লাগছে ভাই। মেয়েটা আর বেঁচে নেই, অন স্পট ডেড!”
রক্তে ভেজা সেই নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে ফারহানের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবল—এমন একটা এক্সিডেন্ট যদি তারও হতো! যদি একটা বাস এসে তাকেও পিষে দিয়ে চলে যেত, তবে সে এই নরকযন্ত্রণা আর দুর্দশার জীবন থেকে চিরতরে মুক্তি পেত। প্রতিদিন হাত পেতে ভিক্ষা করার চেয়ে এই মরণও যে অনেক ভালো ছিল! এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ফারহান একটু ভালো করে লক্ষ্য করল মেয়েটার দিকে। মাথার চুলগুলো জট পাকিয়ে ধুলোবালিতে একাকার হয়ে আছে, হাতের আর পায়ের নখগুলো অযত্নে কত বড় বড় হয়ে গেছে! পরনে নোংরা, ছেঁড়াফাটা তালি দেওয়া এক টুকরো কাপড়। চারপাশের মানুষজন বলাবলি করতে লাগল, এটা কোনো সাধারণ মেয়ে নয়, নির্ঘাত কোনো পথের পাগল!
কফারহান যখন লোকজনের কথা শুনছিল তখন তার চোখ গিয়ে পড়ল মেয়েটার মুখের ওপর। রক্তের ছোপ ছোপ দাগ মাখা সেই ফ্যাকাশে চেহারার দিকে তীক্ষ্ণ নজর দিতেই ফারহানের পুরো শরীর যেন এক নিমেষে জমে পাথর হয়ে গেল!
আর অন্য কেউ নয়! এ যে সেই অতি পরিচিত মুখ… এ যে তৃষ্ণা! লোকেরা তখনো আফসোস করে বলছে,
“আহারে! খেয়াল না কইরা রাস্তা পার হইতে গেছিল, এক্সিডেন্টেই মরে গেল।”
ফারহান ধীরপায়ে আরেকটু কাছে এগিয়ে গেল। কিন্তু সে তৃষ্ণার সেই রক্তাক্ত দেহটা আর স্পর্শ করল না। হাত দুটো তার কাঁপছিল। এক তীব্র শূন্যতা আর বিষাদ এসে তাকে গ্রাস করল। এই একটা নারীর চক্করে পড়েই তো আজ তার জীবনের এই চরম অধঃপতন! তার এই ভিখারি হওয়ার পেছনে তৃষ্ণার ভূমিকাও তো কম ছিল না। আজ এই দৃশ্য দেখে সে হাসবে নাকি কাঁদবে, তা নিজের মনকেও জিজ্ঞেস করে বুঝতে পারল না। যে তৃষ্ণার রূপের মোহে অন্ধ হয়ে সে নিজের সাজানো সংসার, লক্ষ্মী একটা বউ, ফুটফুটে কন্যাসন্তানকে এক নিমেষে ছেড়ে দিয়েছিল, সেই তৃষ্ণাই তাকে চরম অবহেলায় ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আর আজ? আজ অবশেষে সেই তৃষ্ণাকেই এই নিষ্ঠুর দুনিয়া ছেড়ে একেবারে শূন্য হাতে চলে যেতে হলো।
পরক্ষণেই ফারহানের মনে হলো, এখন তৃষ্ণার ঘাড়ে দোষ চাপিয়েই বা তার কী লাভ? সে নিজে কি ধোয়া তুলসী পাতা? সে নিজেও তো এক চরম পাপী! বেলীর মতো একটা মেয়ের জীবন ধ্বংস করার মূল কারিগর তো সে নিজেই। প্রথমে প্রেম করে পালিয়ে এনে বিয়ে করলো। মেয়েটাকে পরিবার থেকে আলাদা করে নিলো। সংসার পাতলো, সন্তান হলো শেষমেশ সে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে আরেকটা বিয়ে অব্দি করেছে! যে মেয়েটা তার জন্য সব ছেড়েছিল সে মেয়েটাকেই সে ছেড়ে দিয়েছে!
ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল—ভালোই হয়েছে, তৃষ্ণা অন্তত এই দুনিয়া থেকে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু সে নিজে কবে মুক্তি পাবে? আত্মহত্যা করা মহাপাপ, আর জীবনে সে এমনিতেও কম পাপ করেনি যে নতুন করে আরেকটা পাপের বোঝা মাথায় নেবে! সেই ভয়ে সে নিজের জীবনটা নিজ হাতে শেষ করতেও পারছে না।
ফারহান ঝাপসা চোখে তৃষ্ণার লাশের দিকে তাকিয়ে রইল। আজ সে নিজের চোখ ভরে প্রকৃতির সেই নিষ্ঠুর বিচার দেখল। প্রকৃতি কাউকেই ছাড়ে না! প্রকৃতি তৃষ্ণাকেও ছাড়েনি, আবার ফারহানকেও মাফ করেনি। তৃষ্ণা তো এক নিমেষেই সব কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে চলে গেল, কিন্তু ফারহানের জন্য প্রকৃতি যে আরও বড় শাস্তি তুলে রেখেছে—সে মরতেও পারছে না, বাঁচতেও পারছে না; প্রতিটা মুহূর্তে ধুঁকে ধুঁকে মরছে!
#চলবে
