#ঝুমুর_বিয়ে
পর্ব ২
#মুজাহিদ_শেখ
গালে থাপ্পড় পড়তেই অবাক চোখে ছেয়ে দেখলো ঝুমুর। ফার্সা গালে পাঁচ আঙুলের দাগ ভেসে উঠেছে। ঝুমুর অবাক চোখে মাথা তোলে তাকাতেই দেখে নিশা চোখ গরম করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আর থাপ্পড়টা সেই মেরেছে। থাপ্পড়ের শব্দে রুম থেকে ততক্ষণে ছুটে এসেছেন কবির শেখ আর সালমা জাহান। কবির শেখ জিজ্ঞেস করলেন,
‘কি হয়েছে এখানে?’
ঝুমুর বাবার দিকে অসহায় চোখে তাকালো। তখনই নিশা দাঁত কিড়মিড় করে বাবার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য সুরে বলে,
‘তোমার প্রিয় মেয়ে প্রেম করে বেড়ায়। একটু আগেই প্রেমিক ফোন দিয়েছিলো।’
কবির শেখ বিশ্বাস করলেন না। তবে সালমা জাহান করলেন। এগিয়ে এসে টিপে ধরলো তার গলা। দাঁত কটমট করে বলে,
‘আমাদের মানসম্মান সব নষ্ট করতে উঠে পড়ে লেগেছিস হারামজাদি।’
ঝুমুর চোখ বেয়ে পানি গাড়িয়ে পড়লো। সালমা জাহানের হাত সরানোর চেষ্টা করলো। তবে পারলো না। দম বন্ধ হতে শুরু হলো। কবির শেখ এসে সরালেন হাত।
‘খবরদার ঝুমুর গায়ে যদি একটা আঘাত করেছো। আর ফোনটা প্রলয় করেছিল তার প্রেমিক নয়।’
সালমা জাহান গরম চোখে তাকালেন স্বামীর দিকে। নিশা কাঁদো কাঁদো ভাব নিয়ে বলল,
‘বাদ দাও আম্মু। আব্বুর কাছে ঝুমুরই সব দেখো না কিভাবে দোষ ঢাকার চেষ্টা করছে।’
নিশা চলে গেলো। সালমা জাহানের রাগটা যেন আরও তরতর করে বাড়লো। এগিয়ে এসে থাবা দিয়ে ধরলো ঝুমুরের চুলের মুঠি। ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো ঝুমুর।
‘আহ্ ছাড়ো।’
এবার সহ্য করতে পারলো না কবির শেখ। নিজের স্ত্রীকে সরিয়ে সজোরে থাপ্পড় মারলেন তার গালে। সালমা জাহান অবাক চোখে দেখলেন কবির শেখের দিকে। এই প্রথম কবির শেখ তার গায়ে হাত তুলল। কবির শেখের পুরো শরীর কাঁপছে। রাগে ফুলে উঠেছে ঘাড়ের রগ।
‘আর কত জ্বালাবে। একটা মুহূর্তও তো আমার মেয়েটাকে মায়ের সুখ দিতে পারোনি। বিয়ে হয়ে যাবে চলে যাবে বাড়ি ছেড়ে। এই কয়টা দিন একটু শান্তি দাও তোমরা।’
কবির শেখ চলে আসতে নিয়েও আবার ফিরে আসে। ঝুমুরের হাত ধরে তাকে নিয়ে যায় সেখান থেকে। তার মাথায় ভীষণ রকম চিন্তা ঢুকে গেছে। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। তবে ঝুমুরকে এভাবে রাখাও যাবে না মেরে ফেলবে সালমা জাহান। কবির শেখ উপায় না পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলো ঝুমুরকে রেখে আসবে তার মামার বাসায়। তাকে বলল,
‘তৈরি হ জলদি।’
ফোলা ফোলা চোখে তাকালো ঝুমুর বাবার দিকে। ধরে আসা গলায় বলল,
‘কেন আব্বু কোথায় যাবো?’
‘তোর মামার বাসায়।’
ব্যস্ত কন্ঠে কথাটা বলে ফোন বের করে কল দিলো ঝুমুরের মামা খোরশেদ আলমকে। ঝুমুর আর কোন কথা বলল না। তৈরি হয়ে নিলো। সে বরাবরই মা-বাবার বাধ্য সন্তান। তাই আজকেও তার কথা ফেলতে পারে নি ঝুমুর। কোন কথা ছাড়াই তৈরি হয়ে নিলো সে।
___
গাড়ি এসে থামলো একটা বাড়ির সামনে। বাড়িটা দোতালা। ঝুমুর একবার দেখলো বাড়িটার দিকে তাকিয়ে। আজ বারো বছর পর সে এ বাড়িতে এসে পা রেখেছে। বোন মারা যাওয়ার পর কবির শেখের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে ঝামেলা হয় খোরশেদ আলমের সাথে। তিনি মানতে পারেননি তার এই বিয়ে। সেদিন ঝামেলার পর আর মামা বাড়ি আসতে দেন নি কবির শেখ। তবে মামা-মামী দুজনেই তাকে ভালোবাসে অনেক। তার মামাতো বোন রুমাও যেন সে বলতে পাগল ছিল। বয়সে তার থেকে দুই বছরের বড়। বিয়ে হয়েছে নাকি এক মাস হলো।
‘দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ভিতরে চল।’
বাবার কথা কর্ণপাত হতেই সে তাকালো। দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে ‘কিছু না’ বলে এগুলো সামনের দিকে। কলিং বেল চাপতেই দরজা খুললেন ঝুমুরের মামি নীলিমা। ঝুমুরকে দেখেই খুশিতে জড়িয়ে ধরলেন নীলিমা বেগম।
‘কেমন আছিস মা?’
ঝুমুরও ধরলো তাকে জড়িয়ে। হালকা হেসে জবাব দিলো,
‘ভালো আছি৷ তুমি কেমন আছো, মামি?’
নীলিমা বেগম তাকে ছেড়ে দাঁড়ালেন। পা থেকে মাথা অব্দি ঝুমুরকে দেখে কপালে চুমু খেলেন।
‘ভালো আছি। কতদিন পর দেখলাম। ছোট্ট ঝুমুর বড় হয়ে গেছে যে।’
কথাটা শেষ করে গলা হাঁকিয়ে ডাকতে লাগলেন স্বামীকে। নীলিমা বেগম ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করলেন কবির শেখকে। তাকে ভিতরে আসতে বলে ঝুমুরকে নিয়ে ভিতরে ঢুকলো।
খোরশেদ আলম ততক্ষণে রুম থেকে বেরিয়ে আসেন। সামনে ঝুমুর আর কবির শেখকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুখে একটা হাসি লাগলো। এতদিন পর ভাগ্নিকে দেখে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরেন। ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করলেন।
সোফায় বসে আছেন কবির শেখ। তার পাশেই মাথা নত করে বসে আছে ঝুমুর। আর সামনে বসেছেন খোরশেদ আলম আর তার স্ত্রী। বসার রুমে এক প্রকার নিরবতা বিরাজ করছে। কবির শেখ নিজের গলা পরিষ্কার করে অপরাধ গলায় বলল,
‘তোমার কথায় ঠিক ছিল খোরশেদ। আমার দ্বিতীয় বিয়ে করাটা কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার মেয়ের জন্য। বিয়ের আগে অব্দি এখানেই থাকবে ঝুমুর। এখান থেকেই তুলে দিবো মেয়েকে।’
কবির শেখের কথায় অনেকক্ষণ নিরব হয়ে বসে রইলেন খোরশেদ আলম। এক পলকে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। কবির শেখ অপ্রস্তুত হয়ে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলেন মেঝেতে।
‘আমার ভাগ্নি আমার বাড়ি থাকবে তা বলার কি আছে। তার যতদিন ইচ্ছে থাকবে।’
খুশি হলেন কবির শেখ। একটা কৃতজ্ঞতার হাসি হাসলেন তাদের দিকে ছেয়ে। খুশি খুশি মনে বললেন,
‘কালকে ছেলোর বাড়ি যাবো তৈরি থেকো আজ আসি।’
কবির শেখ উঠতে নিলেন। তবে বাঁধা দিলেন নীলিমা বেগম। বিচলিত হয়ে বলল,
‘একি ভাই আপনি কিছু মুখে না দিয়েই উঠে পরছেন যে। এত বছর পর এলেন কোন কিছু মুখে না দিয়েই চলে যাবেন এটা কি করে হয়? দুপুরে খেয়ে যাবেন।’
কবির শেখ না করতে নিবে। তখনই নীলিমা বেগম আবারও বললেন,
‘না করবেন না। আমি শুনবো না।’
কবির শেখ আর কিছু বললেন না। হালকা হেসে মাথা নাড়ালেন। নীলিমা বেগম চলে গেলেন ভিতরে। তার পিছন পিছন ঝুমুরও গেলো। বসার রুমে বসে কথা বলতে লাগলো কবির শেখ আর খোরশেদ আলম।
___
‘মামি রুমা আপুকে বলো না আসতে।’
ঝুমুর তার আঁচল ধরে বায়না ধরলো। নীলিমা বেগম তার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলো। আবারও মাংস নাড়াতে নাড়াতে বলল,
‘সে তো তোর আসার কথা শুনলে সেই কখনই চলে আসতো। দাঁড়া রান্না শেষ করে কল দিবো তাকে।’
ঝুমুর মাথা নাড়ালো। নিজেকে যেন ভীষণ ফ্রি লাগছে। ফ্রেশ লাগছে তার মন। মুক্ত পাখির ন্যায় যেন ডানাঝাপটাতে পারছে। চোখ বন্ধ করে কয়েকবার শ্বাস নিলো।
এর মাঝে ঝুমুরের কলটা বেজে উঠে। অপরিচিত সেই নাম্বার। কপালে ভাঁজ পড়লো তার। সে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলো রুমার ঘরে। বেলকনিতে গিয়ে কল রিসিভ করে কানে ধরতেই। ওপাশ থেকে ভেসে আসলো একটা পরিচিত পুরুষালী কন্ঠ। সে চিনে এ কন্ঠ। একবার শুনেই তার মনে গেঁথে গেছে। প্রলয় কল দিয়েছে তাকে।
‘হ্যালো ঝুমুর কথা বলছো না কেন?’
প্রলয়ের কথায় ধ্যান ফিরলো ঝুমুরের। প্রলয় উত্তরের অপেক্ষায় আছে বলে ঝুমুর বলে উঠলো,
‘জি বলুন।’
অত্যন্ত মোলায়েম সেই গলা। মনে এসে যেন গাঁথল প্রলয়ের। বুকের ধুকপুকানি বাড়লো তার। ঠিক একই রকম হলো ঝুমুরের। অস্বাভাবিক ভাবে তার বুকেও ধিরিম ধিরিম শব্দ হচ্ছে। ঝুমুরের কাছে মনে হচ্ছে সেই শব্দটা ফোন পেরিয়ে অপাশের মানুষটাও শুনতে পাচ্ছে। শব্দটা থামানোর জন্য হাত দিলো নিজের বুকে। কিন্তু বৃথা সেই চেষ্টা। কমলো না ধুকপুকানি বরং আরও বাড়লো সেই শব্দ। ঠোঁট কামড়ে চ০খ বন্ধ করে নিলো সে।
চলবে?
