#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৬
ভোর চারটে। আকাশটা এখনো গাঢ় ধূসর রঙের চাদরে ঢাকা। শহরের ব্যস্ততা শুরু হতে আরও কিছুটা দেরি। কিন্তু বনি আমিনের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের ভেতরে সময় যেন থমকে গেছে। ড্রয়িংরুমের সেই দামী ঝাড়লণ্ঠনটা নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে অনেক আগেই, কিন্তু অন্ধকারের মধ্যেও ইরার শরীরের নীলচে দাগগুলো যেন জ্বলজ্বল করছে। বনি এখন পাশের ঘরে অঘোরে ঘুমাচ্ছে অত্যাচার করার পর তার এক ধরণের পৈশাচিক ক্লান্তি আসে, যা তাকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে ফেলে।
ইরা মেঝেতে বসে আছে। তার কপালে একটা ক্ষত, যেখান থেকে র-ক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে। সে ভাবছে, মানুষের সহ্যক্ষমতার একটা সীমা থাকে। সেই সীমাটা বোধহয় আজ সে অতিক্রম করে ফেলেছে। তার মনে পড়ছে তার ছোটবেলার কথা, যখন সামান্য হাত কেটে গেলে তার বাবা পুরো পাড়া মাথায় তুলতেন। সেই বাবা আজ কোথায়? তিনি কি জানেন তার আদরের মেয়েটি আজ একটা সরকারি অফিসারের ঘরে ‘মানুষ’ থেকে ‘বস্তু’তে পরিণত হয়েছে?
বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে মেয়েদের বড় করা হয় ত্যাগের মন্ত্র শিখিয়ে। ইরাকেও শেখানো হয়েছিল “শ্বশুরবাড়ি হলো আসল ঘর, সেখানে ম-রে গেলেও মুখ খোলা যাবে না।” এই তথাকথিত ‘সম্মান’ রক্ষার নেশায় ইরা এতদিন চুপ ছিল। কিন্তু আজ সে বুঝতে পারছে না, সম্মানটা কার? বনির? নাকি তার বাবার? তার নিজের সম্মান তো অনেক আগেই ধুলোয় মিশে গেছে।
ইরা যখন বিয়ের আগে আরিফের হাত ধরে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল, তখন তার মা বলেছিল, “তোর ছোট বোনটার কথা ভাব ইরা। তুই এমন করলে ওর বিয়ে হবে না। সমাজ আমাদের একঘরে করে দেবে।”
সমাজ! এই সেই সমাজ যারা আজ ডিনার টেবিলে বসে ইরার হীরা জহরতের প্রশংসা করে, কিন্তু কেউ তার চোখের কোণের আতঙ্কটা পড়ে দেখে না। এই সমাজ আসলে এক দল অন্ধ মানুষের ভিড়, যারা শুধু জৌলুস চেনে, যন্ত্রণা নয়।
অন্যদিকে, আরিফ তার ডায়েরিটা নিয়ে বসে আছে। সে এখন বিসিএস ক্যাডার, বড় অফিসার। লোকে তাকে দেখে সালাম দেয়, সম্মান করে। কিন্তু আরিফ জানে, এই সম্মানের আড়ালে সে কতটা নিঃস্ব। তানিয়া যখন তাকে টাকার খোঁটা দেয়, তখন তার মনে হয় সেই বেকার জীবনটাই ভালো ছিল। তখন অন্তত তার পকেটে টাকা না থাকলেও বুকে একটা পবিত্র প্রেম ছিল।
আরিফ ভাবছে “আমি কেন বিসিএস দিলাম? কেন এই পদমর্যাদার পেছনে ছুটলাম? যদি শেষ পর্যন্ত প্রিয় মানুষটাকেই বাঁচাতে না পারলাম, তবে এই পদের মূল্য কী?”
আরিফ কাল ডিনার টেবিলে বনির চোখে যে হিংস্রতা দেখেছে, তা তাকে স্থির থাকতে দিচ্ছে না। সে একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে অনেক টক্সিক কেস হ্যান্ডেল করেছে, সে জানে বনির মতো মানুষরা কতটা ভয়ংকর হতে পারে। এরা বাইরে ভদ্রলোকের মুখোশ পরে থাকে, আর ঘরের ভেতরে পশুর চেয়েও অধম হয়ে ওঠে।
সকাল হতেই তানিয়া আবার শুরু করল। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলে ব্রাশ করতে করতে বলল, “আরিফ, কাল বনি ভাইয়ার বাসার ইন্টেরিয়র ডিজাইনটা দেখেছ? আমাদের এই ফ্ল্যাটটা কত সেকেলে লাগে না? আমি ভাবছি আব্বুর কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে ঘরটা ডেকোরেট করব। তোমার ওই সামান্য বেতন দিয়ে তো আর ডেকোরেশন হবে না!”
আরিফ আজ আর চুপ থাকল না। সে শান্ত গলায় বলল, “তানিয়া, তুমি কি জানো বনি তার স্ত্রীকে প্রতিদিন মা-রে? তুমি কি জানো ওই দামী পর্দার আড়ালে মারজিনা মেহেরিন ইরা প্রতিদিন কান্নাকাটি করে?”
তানিয়া বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বলল, “আরে ধুর! বড় মানুষের ঘরে ওসব একটু-আধটু হয়ই। কিন্তু দেখো, মেয়েটা কত দামী শাড়ি-গয়না পরে আছে! আমার বাবা বলে ‘মা-র খেয়েও যদি সুখে থাকা যায়, তবে সেটাই ভাগ্য’।”
আরিফ স্তব্ধ হয়ে তানিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝল, তানিয়ার মতো নারীদের কাছে মানসিক শান্তি বা আত্মসম্মান বলে কিছু নেই। তাদের কাছে জীবন মানে হলো টাকার অংক আর প্রদর্শনী। তানিয়া আর বনি আসলে একই মুদ্রার দুই পিঠ একজন শারীরিক নির্যাতনকারী, অন্যজন মানসিক।
ইরা ধীরপায়ে বাথরুমে গেল। আয়নায় নিজের বিধ্বস্ত চেহারাটার দিকে তাকাল সে। আজ তার মনে এক ধরণের অদ্ভুত জেদ কাজ করছে। সে আলমারি থেকে তার ফোনটা বের করল। বনি গত রাতে নেশার ঘোরে ফোনটা আলমারিতে রাখতে ভুলে গিয়েছিল।
ইরা জানত তার প্রতিটি কদম এখন ম-রণফাঁদ। সে কাঁপাকাঁপা হাতে আরিফের নাম্বারটা বের করল। গত রাতে ডিনারের সময় আরিফ কৌশলে তার ভিজিটিং কার্ডটা ইরার পানির গ্লাসের নিচে রেখে গিয়েছিল। বনি সেটা দেখেনি।
ইরা মেসেজ টাইপ করল “আরিফ, আমি আর পারছি না। ও আমাকে মে-রে ফেলবে। আপনি কি আমাকে একবারের জন্য এই রাজপ্রাসাদ থেকে বের করতে পারবেন? আমি আর রানী হতে চাই না, আমি শুধু বাঁচতে চাই।”
মেসেজটা পাঠিয়েই ইরা দ্রুত ফোনটা আবার লুকিয়ে ফেলল। তার বুকটা ধকধক করছে। সে জানে, এই মেসেজটা যদি বনি দেখে ফেলে, তবে আজই হবে তার জীবনের শেষ দিন।
রান্নাঘরে চা বানাতে গিয়ে ইরা দেখল তার শ্বশুর সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আজও ইরার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে রইলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, “বউমা, গত রাতে যা হয়েছে আমি সব শুনেছি। আমি কাপুরুষ বাবা, ছেলেকে শাসন করতে পারিনি। কিন্তু তুমি যদি পালাতে চাও, আমি তোমাকে বাধা দেব না। বরং পেছনের গেটের চাবিটা আমি এখানে রেখে দিচ্ছি।”
ইরা অবাক হয়ে শ্বশুরের দিকে তাকাল। এই প্রথম এই পাথরের প্রাসাদে সে একজন মানুষের ছায়া দেখতে পেল। সে ধরা গলায় বললেন, “আমি চাই না তুমিও আমার মতো তিলে তিলে শেষ হয়ে যাও। বনি মানুষ নয়, ও একটা ক্ষমতা অন্ধ পশু।”
আমাদের সমাজে যখন একটা মেয়ে সংসার ভাঙার কথা ভাবে, তখন চারপাশ থেকে হাজারটা বাধা আসে। খালা, ফুফু, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই মনে করিয়ে দেয়, “বিচ্ছেদ হওয়া মেয়ের সমাজে কোনো স্থান নেই।” কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করে না, “মৃ-ত আত্মার সমাজে স্থান দিয়ে কী হবে?”
ইরা এখন সেই সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙার চূড়ান্ত পর্যায়ে। সে জানে, এই বাড়ি থেকে বের হওয়া মানেই তার বাবার সম্মান ধুলোয় মিশে যাওয়া। কিন্তু সে আজ ঠিক করেছে, অন্যের সম্মানের জন্য সে নিজের জীবন আর বিলিয়ে দেবে না।
আরিফ মেসেজটা পাওয়ার পর তার অফিসের চেয়ারে স্থির হয়ে বসতে পারল না। তার ভেতরে থাকা সেই পুরনো আরিফ জেগে উঠল, যে আরিফ এক সময় ইরার চোখের পানি সহ্য করতে পারত না। সে তার বিশ্বস্ত এক কলিগকে কল করল। আরিফ জানে, বনির বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালানো কঠিন, কারণ বনি নিজেও সরকারি প্রভাবশালী অফিসার। কিন্তু আরিফের কাছে এখন ক্ষমতা আছে, আর সেই ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার সে আজ করতে চায়।
বাস্তবতা হলো, বনি বা তানিয়ারা আমাদের আশেপাশে অসংখ্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। যারা মনে করে টাকাই জীবনের সব। যারা মনে করে জীবনসঙ্গী মানে হলো কেনা গোলাম। কিন্তু তারা জানে না, মানুষের মনের জেদ যখন একবার জেগে ওঠে, তখন পাথরের রাজপ্রাসাদও বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ে।
ইরা তার সেই ছোট্ট নীল রুমালটা বেনারসি শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে নিল। ওটাই তার সাহস। সে আজ রাতে বের হবে। কোনো গয়না নেবে না, কোনো দামী শাড়ি নেবে না। সে শুধু তার নিজেকে নিয়ে বের হবে।
আরিফ তার গাড়ির চাবিটা হাতে নিল। তার চোখে আজ আর কোনো দ্বিধা নেই। সে জানে, এই পথটা পিচ্ছিল। সমাজ তাকেও ছেড়ে কথা বলবে না। লোকে বলবে “পরের বউ ভাগিয়ে নিয়ে গেছে।” কিন্তু আরিফ জানে, সে কোনো বউ ভাগাচ্ছে না, সে একটা মুমূর্ষু প্রাণকে উদ্ধার করতে যাচ্ছে।
চলবে,,,,
