পরিবার
পর্ব ০৫ (শেষ পর্ব)
লেখক The Story Haven
টেবিলের ওপর পড়ে থাকা সোনার চেইনটার দিকে ঘরের সবাই কেমন যেন অসাড় হয়ে তাকিয়ে রইল। শাশুড়ি মা সোফা থেকে ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। ওনার যে ‘অজ্ঞান’ হওয়ার নাটকটা এতক্ষণ চলছিল, সেটা রেখা ভাবি আর বড় ভাইয়ার টাকার লোভের মুখে পড়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। ওনার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছিল, কিন্তু সেই পানিতে আজ কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক তীব্র আত্মগ্লানি আর লজ্জার ছাপ।
তিনি কাঁপতে কাঁপতে সোফা থেকে নেমে সোজা আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। রেখা ভাবি চড়া গলায় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু শাশুড়ি মা হাত তুলে ওনাকে থামিয়ে দিলেন। তারপর আমার হাত দুটো টেনে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
“আমাকে ক্ষমা করে দে মা! আমাকে তুই ক্ষমা করে দে।”
আটটা বছর এই বাড়িতে আছি, কখনো ওনার মুখে নিজের জন্য এতখানি আকুলতা শুনিনি। আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, “আম্মা, একী করছেন! আপনি মুরুব্বি মানুষ।”
“না রে মায়া, আমি মুরুব্বি নামের কলঙ্ক!” শাশুড়ি মা নিজের বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বললেন, “আমি ভেবেছিলাম বড় ছেলে আর বড় বউকে অনেক টাকা-পয়সা দিয়েছি, ওরাই আমার আসল আপন। আর তুই তো বাইরের মেয়ে! অথচ আজ আমার এই নকল বিপদের দিনে ওরা নিজের জমানো টাকার লস হিসেব করছে, আর তুই তোর শেষ সম্বলটা আমার পায়ের কাছে এনে দিলি? এই অহংকারই কি আমি এতকাল দেখিয়েছি?”
মারিয়া এতক্ষণ এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। মায়ের কান্না আর আমার এই ত্যাগ দেখে ওর ভেতরের জেদটাও যেন এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমা*র হয়ে গেল। ও গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়াল। ওর চোখে তখন অনুশোচনার অশ্রু।
“ভাবি… আমাকে মাফ করে দাও। আমি সত্যিই খুব বড় অন্যায় করে ফেলেছি। আয়রা ছোট মানুষ, ও তো বুঝেইনি। আসলে অহংকারে আমার চোখ অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তুমি আমাকে বড় বোনের মতো একটা শাস্তি দিয়েছ, আমার পাওনা ছিল ওটা।”
মারিয়া নিচু হয়ে সোফায় বসে থাকা ছোট্ট আয়রার দুই হাত ধরল, “মামণি, ফুপিকে মাফ করে দিবি? ফুপি আর কোনোদিন তোর গায়ে হা’ত তুলবে না।”
আয়রা প্রথমে ভয়ার্ত চোখে আমার দিকে তাকাল। আমি মৃদু হেসে মাথা নাড়তেই ও ওর ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে ফুপির চোখের পানি মুছে দিল। বাচ্চার ওই সরল স্পর্শে পুরো ঘরের গুমোট ভাবটা যেন এক নিমেষেই কেটে গেল।
রেখা ভাবি আর ভাসুর সাহেব তখন নিজেদের ঘরের কোণে এমনভাবে গুটিয়ে গেছেন, যেন তাদের লুকানোর কোনো জায়গা নেই। যাদের জোরে তারা এতক্ষণ তড়পাচ্ছিলেন, সেই শাশুড়ি আর মারিয়াই এখন আমার পাশে। ভাসুর সাহেব কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন, আর রেখা ভাবিও ব্যাগ হাতে ওনার পিছু পিছু কটমট করতে করতে চলে গেলেন। ওনাদের পরাজয়টা কোনো চিৎকারে হয়নি, হয়েছে ওনাদের নিজেদের স্বার্থপরতার আয়নায়।
রাফি এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিল। ও এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রাখল। ওর চোখের কোণে জমে থাকা জলবিন্দুটা রোদের আলোর মতো চকচক করে উঠল। ও মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আম্মা, রাগ-অভিমান তো পরিবারেরই অংশ। এখন চলো, সবাই মিলে একসাথে দুপুরের নাস্তাটা করি।”
শাশুড়ি মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মায়া, ওই ছোট চুলাটা আজই ওপরে তুলে রাখবি। এই ঘরের হাড়ি একটাই থাকবে, আর সেই হাড়ির চাবি আজ থেকে তোর কোমর বেঁধে রাখবি। তুই-ই এই বাড়ির আসল লক্ষ্মী।”
আমি হেসে চেইনটা কুড়িয়ে নিয়ে ওনার গলায় পরিয়ে দিলাম।
আজ দুপুরের ডাইনিং টেবিলটায় আবার সবাই একসাথে বসলাম। টেবিলে তরকারির বাটি এগিয়ে দিতে দিতে আমি জানালার বাইরে নীল আকাশটার দিকে তাকালাম। একটা থাপ্প*ড়ের শব্দে যে ঝড় উঠেছিল, তা এই পরিবারকে ভেঙে টুকরো করেনি, বরং ভেতরের সব ময়লা ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিয়ে গেছে।
কিছু কিছু ভাঙন আসলে নতুন করে গড়ার জন্য প্রয়োজন হয়। আজ থেকে আমাদের এই পরিবার শুধু রাফির রোজগারে নয়, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান আর ভালোবাসার শক্তিতে চলবে।
(সমাপ্ত)
