পরিবার
পর্ব ০৩
লেখক The Story Haven
বড় জা রেখা ভাবির ওই বাঁকা হাসি আর গলার স্বরে যেন পুরো বাড়ির বাতাস মুহূর্তেই বিষিয়ে উঠল। তিনি ব্যাগগুলো সোফায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালেন। ভাসুর সাহেব (বড় ভাই) গম্ভীর মুখে রাফির ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। আমি তখনও দরজার পাশে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। মনে হচ্ছে, কালকের ওই ঝড়টা থামেনি, বরং আরও বড় কোনো ঘূর্ণিঝড় ডাকার প্রস্তুতি চলছে।
শাশুড়ি মা রেখা ভাবিকে দেখেই যেন হাতে স্বর্গ পেলেন। তিনি ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, “দেখরে রেখা, তুই আসছিস বড় ভালো করছিস! এই বাড়িতে আমার আর কোনো মান-সম্মান নেই। তোর ছোট জা আজ এই বাড়ির আদরের মেয়ের গায়ে হা’ত তুলেছে, আবার আমাকে মুখে মুখে তড়পিয়ে কথা শুনিয়ে দিচ্ছে!”
রেখা ভাবি আমার দিকে একপলক তাকিয়ে শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরলেন। সান্ত্বনা দেওয়ার স্বরে বললেন, “কেঁদো না মা। আমরা থাকতে এই বাড়িতে কারো এত সাহস হবে না যে আপনার ওপর কথা বলে। আসলে দিনকাল বেশি ভালো না তো, নিচু বংশের মেয়েরা একটু প্রশ্রয় পেলেই মাথায় চড়ে বসে।”
কথার বি’ষটা সোজা আমার কলিজায় গিয়ে বিঁধল। আটটা বছর এই রেখা ভাবিও আমাকে কম জ্বালাননি। তিনি এই বাড়ির বড় বউ, বাপের বাড়ি থেকে অনেক কিছু নিয়ে এসেছেন বলে নিজেকে ধরাকে সরা জ্ঞান করেন।
আমি আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলাম না। রান্নাঘরে গিয়ে সবার জন্য নাস্তা তৈরির তোড়জোড় শুরু করলাম। কিন্তু সেখানেও শান্তি নেই। একটু পর রেখা ভাবি রান্নাঘরে ঢুকলেন।
“কী গো ছোট বউ? খুব তো তেজ দেখাচ্ছো কাল থেকে। বলি, ভাই তোকে ভাত-কাপড় দেয় বলে কি বাড়ির মালিক হয়ে গেছিস? মনে রেখো, আমার স্বামী এই বাড়ির বড় ছেলে। সম্পত্তির হিসেব হলে কিন্তু তোমাদের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে।”
আমি রুটি বেলতে বেলতে শান্ত গলায় বললাম, “ভাবি, সম্পত্তির হিসেব করতে আসিনি। আমি শুধু আমার মেয়ের অপমা*নের বিচার করেছি। মা হিসেবে আপনি হলে কী করতেন জানি না, তবে আমি আমার বাচ্চার গায়ে হাত তোলা সহ্য করব না।”
রেখা ভাবি মুখ বাঁকিয়ে বললেন, “আহা! কী সতী সাধ্বী মা রে! শোনো মায়া, রাফিকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখছো তা ভেঙে চুরমা*র হতে সময় লাগবে না। আজ রাফির বড় ভাই তাকে বোঝাতে গেছে। দেখি কতক্ষণ সে তোমার আঁচলের নিচে লুকিয়ে থাকে।”
আমার হাতটা একটু থমকে গেল। রাফি কি পারবে তার বড় ভাইয়ের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে? এই বাড়িতে ভাসুর সাহেবকে সবাই য’মের মতো ভ’য় পায়।
ড্রয়িং রুম থেকে হঠাৎ উঁচু গলার শব্দ ভেসে এল। ভাসুর সাহেব রাফিকে ধমকাচ্ছেন, “তোর লজ্জা করে না রাফি? একটা মেয়ের জন্য তুই মা আর বোনের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করছিস? তোর বউকে বল মারিয়ার পায়ে ধরে মাফ চাইতে, নাহলে এই বাড়িতে তোদের জায়গা হবে না।”
আমি পর্দা সরিয়ে দেখলাম, রাফি সোফায় মাথা নিচু করে বসে আছে। ওর মুখটা যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেছে। একদিকে তার আদর্শ, অন্যদিকে তার বড় ভাই আর মায়ের চাপ।
শাশুড়ি মা টিপ্পনী কেটে বললেন, “মাফ না চাইলে আজ থেকে ওর রান্না আলাদা। এই চুলায় ও আর হাড়ি চড়াতে পারবে না।”
রাফি এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ওর চোখের দৃষ্টিতে গতকালের সেই দৃঢ়তা আজ কিছুটা মলিন। সে আমার দিকে একবার তাকাল, তারপর বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাইয়া, মায়া কেন মাফ চাইবে? মারিয়া যদি আগে আয়রাকে না মা*রত, তবে মায়া কোনোদিন ওর গায়ে হাত তুলত না। দোষ তো মারিয়ারও আছে।”
ভাসুর সাহেব টেবিল চাপড়ে বললেন, “একদম তর্ক করবি না! বড়দের মুখে মুখ দেওয়া তুই কবে থেকে শিখলি? আজ যদি তোর বউ মাফ না চায়, তবে আমার আর তোর কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তুই কি চাস আমাদের ভাইয়ে-ভাইয়ে বিচ্ছেদ হোক?”
রাফি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আমি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে নিজের নখ কামড়াচ্ছি। আমি জানি, রাফি তার ভাইকে কতটা সম্মান করে। এই ব্ল্যাক’মেইল ও সইতে পারবে না।
রেখা ভাবি আমার পাশে এসে ফিসফিস করে বললেন, “কী ছোট বউ? দেখলে তো? বাড়ির ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। এবার বলো, মাফ চাইবে নাকি ব্যাগ গুছিয়ে বাপের বাড়ি রওনা দেবে?”
আমি আয়রার দিকে তাকালাম। মেয়েটা ভ*য়ে আমার শাড়ির কোণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এই বাড়িতে টিকে থাকতে হলে কি আমাকে আজ অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে হবে? নাকি রাফির হাত ধরে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াতে হবে?
ঘরের ভেতর তখন থমথমে নীরবতা। সবাই আমার উত্তরের অপেক্ষায়। রাফিও আমার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে আছে, যেন সে মনে মনে বলছে—’মায়া, এবার একটু মানিয়ে নাও, নাহলে সব শেষ হয়ে যাবে।’
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
চলবে…
