পরিবার
পর্ব ০৪
লেখক The Story Haven
সবার উৎসুক চোখগুলো তখন আমার ওপর এসে থমকে গেছে। রেখা ভাবির ঠোঁটে বিজয়ের ক্রূর হাসি, আর শাশুড়ি মা মারিয়াকে জড়িয়ে ধরে এমন এক ভাব করছেন যেন এখনই আমার ফাঁ*সির রায় হবে। রাফির চোখের সেই অসহায় চাউনি আমার বুকটা কাঁপিয়ে দিচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই যখন আমার শাড়ির আঁচল আঁকড়ে ধরে থাকা আয়রার ছোট্ট কাঁপা কাঁপা হাতটার দিকে তাকালাম, আমার ভেতরের দ্বিধা কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
আজ যদি আমি মাথা নত করি, তবে মারিয়া আর রেখা ভাবি শুধু আমাকে নয়, আমার নিষ্পাপ মেয়েটাকেও সারাজীবন পায়ের নিচে পিষে রাখবে।
আমি সোজা ভাসুর সাহেবের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। গলার স্বর যতটা সম্ভব শান্ত আর দৃঢ় রেখে বললাম, “আমি মাফ চাইব না, ভাইয়া।”
আমার কথা শেষ হতেই ড্রয়িং রুমের নীরবতা ভেঙে যেন একটা বো*মা ফাটল।
“কী! এত বড় স্পর্ধা!” ভাসুর সাহেব রাগে সোফা থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন।
রেখা ভাবি হাত নেড়ে বলে উঠলেন, “দেখলেন তো মা? দেখলেন তো ওনার তেজ? বড় ভাসুরের মুখের ওপর কীভাবে না বলে দিল! ছোট জাতের মেয়েরা এমনই অবাধ্য হয়।”
আমি ভাবির কথার পিঠে কোনো কথা না বাড়িয়ে ভাসুর সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললাম, ভাইয়া, আপনি এই বাড়ির অভিভাবক। মারিয়া যখন একটা পাঁচ বছরের বাচ্চার গায়ে হা’ত তুলল, তখন কি আপনার মনে হয়নি বড় ভাই হিসেবে ওকে একটু শাসন করা দরকার ছিল? অন্যায়টা আগে ও করেছে। নিজের মেয়ের আ*ত্মসম্মান রক্ষা করা যদি অপরা*ধ হয়, তবে আমি সেই অপ*রাধ বারবার করব। কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে আমি আমার মেয়েকে কাপুরুষ হওয়া শেখাতে পারব না।”
রাফি আমার দিকে তাকাল। ওর চোখের সেই করুণ ভাবটা কেটে গিয়ে সেখানে এক চিলতে গর্বের আলো ফুটে উঠল। সে বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাইয়া, মায়া কোনো ভুল কথা বলেনি। ও মাফ চাইবে না।”
ভাসুর সাহেব রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “ঠিক আছে! তবে আজ থেকে তোদের রান্না আলাদা। এই বাড়িতে তোরা থাকবি নিজেদের মতো, আমাদের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। রাফি, তুই যদি তোর বউয়ের এই অহংকার নিয়ে থাকতে চাস, তবে আজ থেকে তুই আমার ভাই নোস।”
রাফি আর কোনো কথা বলল না। সে এগিয়ে এসে আমার হাত ধরল, আর অন্য হাতে আয়রাকে কোলে তুলে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল। পেছন থেকে শাশুড়ি আর রেখা ভাবির অভিশাপ আর চিল-চিৎকার তখন বাতাসে ভাসছে।
এই ঘটনার পর কেটে গেল চারটে দিন।
আমাদের রান্না আসলেই আলাদা হয়ে গেল। ঘরের এক কোণে একটা ছোট ইলেকট্রিক চুলা বসিয়ে আমি আর রাফি আমাদের সংসারটুকু টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছি। এই চার দিনে কেউ আমাদের সাথে একটা কথাও বলেনি। মারিয়া আর রেখা ভাবি যখনই আমাদের সামনে দিয়ে যায়, মুখ বাঁকিয়ে বিষাক্ত কোনো মন্তব্য ছুড়ে দেয়। রাফি অফিস থেকে ফিরে চুপচাপ ঘরে বসে থাকে। ভাই আর মায়ের এই দূরত্বের কষ্টটা ওকে ভেতরে ভেতরে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, আমি সেটা বুঝতে পারি। কিন্তু ও মুখে কিছু বলে না।
পঞ্চম দিনের দিন সকালবেলা হঠাৎ করেই নিচতলা থেকে একটা হট্টগোল শোনা গেল। মারিয়ার গগনবিদারী চিৎকার আর রেখা ভাবির কান্নার আওয়াজ।
“ও আল্লাহ গো! মা একী হলো তোমার! চোখ খোলো মা!”
আমি আর রাফি ধড়ফড় করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। ড্রয়িং রুমে গিয়ে দেখি শাশুড়ি মা সোফায় শুয়ে আছেন, চোখ দুটো বন্ধ। উনি হাত-পা শক্ত করে কাঁপছেন।
রেখা ভাবি মাথায় হাত দিয়ে কাঁদছেন আর বলছেন, “ছোট বউয়ের ওই অভিশপ্ত রান্না আলাদার পর থেকেই মায়ের বুকটা ধরফর করছিল। আজ সকালে নাস্তা খেতে গিয়েই মা অজ্ঞান হয়ে গেলেন। ওনার যদি কিছু হয়ে যায়, তবে ওই ছোট বউই দায়ী!”
ভাসুর সাহেব হন্যে হয়ে ডাক্তারকে ফোন করছেন। মারিয়া আমার দিকে তেড়ে এসে বলল, “তোর জন্য আজ আমার আম্মার এই অবস্থা! তুই ডা*ইনি! এই বাড়ি থেকে দূর হ!”
রাফি আর থাকতে না পেরে শাশুড়ির কাছে গিয়ে বসল, “আম্মা! আম্মা চোখ খোলো! কী হয়েছে তোমার?”
কিন্তু শাশুড়ি মা চোখ খুলছেন না, শুধু মুখ দিয়ে একটা অদ্ভুত গোঙানির আওয়াজ করছেন।
ডাক্তার আসার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গম্ভীর মুখে বললেন, “উনার প্রেশার অনেক হাই। স্ট্রো*কের মতো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ওনাকে এখনই হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। অনেক টাকার প্রয়োজন হতে পারে।”
হাসপাতালের নাম শুনতেই রেখা ভাবির কান্না যেন অলৌকিকভাবে একটু কমে গেল। তিনি ভাসুর সাহেবের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “হ্যাঁ গো, হাসপাতালে নিলে তো লাখ খানেক টাকা শেষ হয়ে যাবে। আমাদের জমানো টাকাটা তো ফিক্সড ডিপোজিট করা, ওটা ভাঙলে তো লস হবে।”
ভাসুর সাহেবও আমতা আমতা করে বললেন, “আমার ব্যবসার টাকাটাও তো আটকে আছে। রাফি, তুই কিছু কর।”
ঠিক তখনই আমি লক্ষ করলাম, শাশুড়ি মায়ের বন্ধ চোখের কোণটা সামান্য একটু কাঁপল। উনি রেখা ভাবি আর বড় ছেলের এই টাকা নিয়ে দ্বিধাবোধের কথাগুলো খুব ভালো করেই শুনছেন। নাটকটা উনি করেছিলেন আমাদের দুজনকে অপ*রাধী বানিয়ে পায়ে ধরাতে, কিন্তু নিজের বড় ছেলে আর বড় বউয়ের আসল রূপটা যে ওনার সামনে এভাবে প্রকাশ পেয়ে যাবে, সেটা বোধহয় উনিও ভাবেননি।
আমি রাফির দিকে তাকালাম। রাফি ওর মানিব্যাগ হাতড়াচ্ছে। আমি আর কিছু না ভেবে নিজের ঘরে গেলাম। আলমারি খুলে আমার বিয়ের শেষ সম্বল, মায়ের দেওয়া সোনার চেইনটা হাতে নিয়ে ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়ালাম।
রেখা ভাবি আর ভাসুর সাহেবের সামনে চেইনটা টেবিলে রেখে শান্ত গলায় বললাম, “ভাইয়া, মায়ের চিকিৎসার জন্য টাকার অভাব হবে না। এই চেইনটা বিক্রি করে ওনাকে ভালো হাসপাতালে নিয়ে যান। টাকার জন্য মায়ের চিকিৎসা আটকে থাকবে, এই শিক্ষা আমার মা আমাকে দেননি।”
আমার কথা শুনে সোফায় শুয়ে থাকা শাশুড়ি মা হঠাৎ করেই চোখ মেলে তাকালেন। ওনার চোখে তখন আর রাগের আগুন নেই, আছে এক তীব্র লজ্জার আভাস
চলবে…
