#দ্বিতীয়_বউ
#পর্ব_২০(সমাপ্তি পর্ব)
#আলভিয়া_সামরিন_রায়া
মেহরিন একটু আগে রান্না শেষ করে গোসল করতে ঢুকেছে। গোসল সেরে ভেজা চুল কাঁধে ছড়িয়ে ধীর পায়ে সে এগিয়ে গেল সাহেরা বেগমের ঘরের দিকে। চারপাশে একবার তাকিয়ে দেখলো।রুমটা থেকে কেমন ভ্যাবসা গন্ধ ভেসে আসছে।
মেহরিন নাক-মুখ কুঁচকে সাবধানে বালিশের নিচে হাত ঢুকাতেই খুঁজে পেল ছোট্ট একটা চাবি। চাবিটা হাতে নিয়ে আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে মুহূর্তের জন্য থমকালো, তারপর নিঃশব্দে দরজা খুললো।
আলমারির ভেতরে চোখ বুলাতেই একটি পুরনো বাক্স চোখে পড়লো। মেহরিন হাত বাড়িয়ে সেটি নামিয়ে আনল। বাক্স খুলতেই ঝলমল করে উঠল বহুদিনের সঞ্চিত গয়না,পুরনো তবু-ও বেশ মূল্যবান। কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল মেহরিন। তারপর মনে মনে দৃঢ় হয়ে আওড়ালো,
—রায়হানের মতো পঙ্গু মানুষকে সারাজীবন সেবা করে সে বাঁচতে পারবে না। নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের নিরাপত্তা সবকিছুই এখন তাকে নিজেকেই গুছিয়ে নিতে হবে। কোনো চাকরি নেই, নির্ভর করার মতো কেউ নেই… সামনে যে দিনগুলো আসছে, সেগুলো পার করতে এসবই ভরসা।
এই ভাবনা থেকেই তোশকের নিচে রাখা একটি শপিং ব্যাগ বের করে আনলো। এরপর দ্রুত হাত বাড়িয়ে গয়না গুলোকে একে একে ব্যাগে ভরে নিল।
তারপর নিজের ঘরে ফিরে এসে ব্যাগটা খুলে গয়নাগুলো নিজের ব্যাগে যত্ন করে গুছিয়ে রাখল।
আপাতত মেহরিনের পরিকল্পনাটা একদম স্পষ্ট। হাসপাতালে গিয়ে খাবার দিয়ে আসবে। এখন না গেলে পরিস্থিতি মেহরিনের অনূকূলে থাকবে না। হাসপাতাল থেকে মাকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবে সে, নতুন করে শুরু করবে সবকিছু।”
মেহরিনের ভাবনার মাঝে তখনই ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল মুনতাহা বেগমের নাম।
ফোন কানে দিতেই ওপাশ থেকে উৎফুল্ল কণ্ঠে ভেসে এলো,
—রায়হানের জ্ঞান ফিরেছে, তুমি তাড়াতাড়ি এসো।
খবরটা শুনেও ভেতরে কোনো আনন্দের সাড়া জাগল না মেহরিনের। তবু নিজেকে সামলে শান্ত গলায় বলল,
—আসছি।”
ফোন কেটে দিয়ে দ্রুত নিজের মাকে কল করলো।ওপাশ থেকে হ্যালো বলতেই মেহরিন বলে উঠলো,
—মা,তুমি জামা কাপড় গুছিয়ে নাও।বাড়িতে তালা দিয়ে হাসপাতালে সামনে এসে দাঁড়াও।”
মেহরিনের মা কিছু বলতে যাবে তার আগেই মেহরিন রাগী গলায় বললো,
—মা এখন কিছু জিজ্ঞেস করো না।পরে বলবো এখন যা বলছি তা করো।”
এই বলে মেহরিন ফোন রেখে দেয়। জামা পাল্টে ব্যাগ টা সাবধানে তুলে নেয়।
তারপর রান্নাঘরে গিয়ে দুটো বক্সে আলুর তরকারি। আর ভাত ভরে নিল। সবকিছু ঠিকঠাক করে নিয়ে একবার চারপাশে তাকালো।এরপর নিঃশব্দে দরজা পেরিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল মেহরিন
এক অজানা সিদ্ধান্ত আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভার নিয়ে।”
–
আয়েশা আজকে দ্রুত কাজ শেষ করে রোহিনীকে আনতে গেছে। মেয়েটার মন খারাপ। আয়েশার ও ভালো লাগছিলো না। আয়েশা রোহিনীকে নিয়ে বাসার সামনে আসতেই আরিফ কে দেখতে পেলো।”
—আপনি?
আরিফ শান্ত স্বরে বললো,
—কালকে তো বলেছি আসবো।আমি আসাতে আপনার অসুবিধা হয়েছে?”
আয়েশা ধীর কন্ঠে বললো,
—এই সময়ে আপনাকে আশা করে নি।তাই জিজ্ঞেস করেছি।ভিতরে চলুন।”
আরিফ রোহিনীর দিকে তাকালো। মেয়েটা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক সময়ে বিয়ে করলে হয়তো রোহিনীর মতো একটা মেয়ে থাকতো। ভাবতেই ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আরিফ এগিয়ে গিয়ে বললো,
—আমার কাছে আসবে তুমি?”
রোহিনী তাকালো। আরিফ হাত বাড়িয়ে রেখেছে। ছোট মেয়েটা সাই জানালো। আরিফ হালকা হেঁসে রোহিনীকে কোলে তুলে নিলো।”
আয়েশা অবাক হয়ে তাকালো। রোহিনী সবার সাথে সহজে মিশতে চাই না। আরিফের কাছে এক বারে চলে গেলো?তবে আর কিছু না বলে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো।”
ভেতরে ঢুকতেই আয়েশা রোহিনীকে বললো,
—চলো মা জামা পাল্টে দেই।”
রোহিনী চুপচাপ মাথা নেড়ে আয়েশার সাথে রুমে চলে গেলো।কিছুক্ষণ পর হালকা গোলাপি ফ্রক পরে বের হলো রোহিনী। চুলে ছোট্ট ক্লিপ লাগানো। আরিফ তাকিয়ে মৃদু হাসলো।
আয়েশা বললো,
—আপনি বসুন।আমি চা নিয়ে আসছি।
কিছুক্ষণ পর আয়েশা ট্রেতে করে চা এনে টেবিলে রাখলো। তারপর ব্যাগ থেকে কিছু টাকা এনে আরিফের সামনে এগিয়ে দিলো।
—এগুলো রাখুন। বাকি গুলো তাড়াতাডি দিয়ে দিবো।”
আরিফ আয়েশার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলো।
—টাকার বদলে আমার অন্য কিছু চাই।”
আয়েশা ভ্রু কুঁচকে বললো,
—কী?
আরিফ এবার গভীর চোখে তাকালো। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বললো,
—আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই আয়েশা।
আয়েশার হাত কেঁপে উঠলো। মুহূর্তেই মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।
—অসম্ভব!
—কেনো অসম্ভব?
—আমার একটা মেয়ে আছে। আমার অতীত আছে। আমি ভাঙা মানুষ।”
আরিফ ধীর স্বরে বললো,
—ভাঙা মানুষরাই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে জানে।”
আয়েশা তিক্ত হেসে বললো,
—সমাজ এসব মানে না।”
—আমি সমাজকে মানি না।আমি আপনাকে চাই। আর সাথে রোহিনীকে ও।”
আয়েশা চুপ করে রইলো। বুকের ভেতর অদ্ভুত কাঁপুনি হচ্ছে।একটু থেমে বলে উঠলো,
—আপনি অবিবাহিত। আর রোহিনীকে চাইলে ও আপনি আপন করতে পারবেন না।কারন রোহিনী আপনার নিজের রক্ত না।”
আরিফ উঠে দাঁড়ালো। কঠিন গলায় বললো,
—তাহলে আপনি ও কী রোহিনীকে মন থেকে আপন মানতে পারেন নি?রোহিনী তো আপনার-ও নিজের রক্তের না।”
মুহুর্তের মধ্যে আয়েশার মুখ লাল হয়ে উঠলো,
—ঠিক করে কথা বলুন। রক্তের সম্পর্ক থাকা লাগবে এমন কথা নেই। সেই ছোট থেকে আমি ওকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি।ওকে নিয়ে হাসতে হাসতে আমি সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবো।”
আরিফ কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো মুনতাহা বেগমের নাম।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে তাড়াহুড়ো কণ্ঠ ভেসে এলো,
—আয়েশা,রায়হানের জ্ঞান ফিরেছে।ও বারবার রোহিনীকে দেখতে চাইছে।তাড়াতাড়ি এসো মা।”
আয়েশা চোখ বন্ধ করে বললো,
—আসছি খালা।”
ফোন রেখে আয়েশা রোহিনীকে ডাকতে যাবে তখনই আরিফ আয়েশার হাত চেপে ধরলো। আয়েশা অবাক হয়ে আরিফের দিকে তাকালো।
—আপনি আবার ফিরে যাবেন ওর জীবনে?
আয়েশা সাথে সাথে উওর দিলো,
—না।আমি শুধু রোহিনীকে তার বাবার কাছে নিয়ে যাচ্ছি।”
আরিফ কাতর গলায় বললো,
—আমি ভয় পাই আয়েশা।আপনি যদি আবার ফিরে যান।”
আয়েশা ধীরে বললো,
—আমরা হাসপাতাল থেকে ফিরে এই বিষয়ে কথা বলবো।
আরিফ মাথা নাড়লো।
—না।আমি আর অপেক্ষা করতে পারবো না। এই মুহূর্তে আপনাকে আমার বিয়ে করতে হবে। আপনি তো বলেছেন আমার ঋন শোধ করবেন। এই মুহুর্তে আপনাকে শোধ করতে হবে। আর এটাই আমার শেষ কথা।”
আয়েশা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো।
—আপনার বাড়ির লোক মানবে না?”
আরিফ বলে উঠলো,
—বাড়ির লোককে আমি মানি না। আমি আমার ফ্যামেলি সম্পর্ক ছোট করে সব খুলে বলছি।কোনো প্রশ্ন করবেন না।
আরিফ ধীর কন্ঠে বলতে আরম্ভ করলো,
—আমার পড়ালেখা চলাকালীন আমি বিদেশে চলে যায়।ওখানে পড়ালেখার পাশাপাশি কাজ করে বাড়িতে টাকা পাঠাতাম। কাউকে না বলে একদিন বাড়িতে এলে সবাই আমাকে দেখে ঝামেলা শুরু করে।কেনো এসেছি? আরো কয়েকবছর পরে এলে জায়গা কিনতে পারতো এসব নিয়ে।”
—আমার আগে আমার ছোট ভাই বিয়ে করে ফেলেছে। অথচ আমি জানি না। আমার পাওনা টাকার কথা বললে বলে আমি নাকি এক টাকা ও দেয় নি। অথচ আমার টাকা দিয়ে বাড়ি করেছে।সেই বাড়ির লোক মানলো কি না মানলো তাতে আমার কিছু যায় আসে না।”
আয়েশা হতবাক হয়ে গেলো?নিজের মা-বাবা এমন হয়? আয়েশা মাথায় হাত দিয়ে থম মেরে চেয়ারের উপর বসলো। কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না। রোহিনী এখন রুমে আছে।খাতার মধ্যে ফুল এঁকে রং করছে।আরিফ শান্ত চোখে আয়েশার দিকে তাকিয়ে আছে।”
–
এক ঘণ্টা পর দরজায় টোকা পড়লো। দরজা খুলতেই আয়েশা অবাক হয়ে গেলো। সাথে দুইজন লোক আর একজন বয়স্ক করে পাঞ্জাবি পরা লোক দাঁড়িয়ে আছে।
আরিফ এগিয়ে এসে বললো,
—ওরা আমার বন্ধু। ভেতরে আয়।”
আরিফের বন্ধুর হাতে কয়েকটা শপিং ব্যাগ।
—এসব কী?”
আরিফ শান্ত গলায় বললো,
—আমি আগেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম। শুধু আপনার উওরের অপেক্ষায় ছিলোম।
আরিফের বন্ধু হালকা হেসে ব্যাগ গুলো আয়েশার হাতে দিলো।
ব্যাগের ভেতরে গাঢ় লাল রঙের গর্জিয়াস একটা শাড়ি।সাথে কাজ করা ডুপাট্টা। লাল কালারের দুই জোড়া চুড়ি রয়েছে। সাথে কিছু সাজগোজের জিনিস।
আয়েশার বুকটা ধক’ধক করে উঠলো।
—শাড়িটা পড়ে আসুন আয়েশা।”
আয়েশা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে রুমে চলে গেলো।
আয়েশা আবার বউ সাজলো।রায়হানের সাথে বিয়ের দিন বাড়ির জামা পড়েই কবুল বলেছিলো। আয়েশার অবশ্য অনেক ইচ্ছে ছিলো লাল শাড়ি পড়ে বউ সাজার। আজ অনাকাক্ষিত ভাবে আয়েশার ইচ্ছে টা পূরন হতে যাচ্ছে। তবে আয়েশা খুশী হতে পারলো না।রোহিনীর কথা ভাবতেই বুকটা ভারী হয়ে উঠলো।”
লাল শাড়ির আঁচলটা কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে।চোখে হালকা কাজল।চুল আধখোলা।ম্লান মুখটার মাঝেও আজ অন্যরকম মায়া ফুটে উঠেছে।”
আরিফ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। মনে হচ্ছিলো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটা দেখছে সে।
ছোট্ট রুমটার মাঝখানে বসেছে কাজি। বিছানার একপাশক আরিফ, আয়েশা অন্যপাশে। আর ওদের মাঝখানে বসে আছে ছোট্ট রোহিনী।
মেয়েটা খুশিতে বারবার বলছে,
—মা তোমাকে আজকে রাজকুমারীর মতো লাগছে!”
সবাই এক যোগে হেসে উঠলো। কাজি সাহেব কবুল বলতে বলায় আয়েশা থমকে গেলো। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
ভবিষ্যতের ভয়, সমাজের ভয়,রোহিনীর ভবিষ্যৎ। সব মিলিয়ে বুকের ভেতর কেমন অস্থির লাগছে।
চোখ বেয়ে টুপটাপ পানি ঝরতে লাগলো।”
রোহিনী ছোট্ট হাতে মায়ের চোখ মুছে দিয়ে বললো,
—মা কাঁদছো কেনো…
আয়েশা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বললো,
—কবুল…কবুল…কবুল…
আরিফ চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। অবশেষে মানুষটা তার আপন ঠিকানা পেলো।
–
হাসপাতালের কেবিনে ছটফট করছে রায়হান।শরীরটা কাঁপছে তার। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মেহরিন খাবার এর ব্যাগটা সাইডে রেখে কিছুক্ষণ বসে রইলো।”
তারপর আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
—আমি ডাক্তার ডেকে আনছি।”
এই বলে যে কেবিন থেকে বের হলো। কিন্তু সে আর ফিরে এলো না।”
মুনতাহা বেগম অস্থির হয়ে এদিক-ওদিক ছুটছে।
—ডাক্তার! ডাক্তার আসছে না কেনো!
রায়হান কষ্টে ফিসফিস করে বললো,
—খালা… আমার মেয়েটাকে একবার দেখবো… রোহিনীকে নিয়ে আসেন… আমার খুব কষ্ট হচ্ছে খালা…রোহিনী আমার মেয়ে…
মুনতাহা বেগম চোখের পানি মুছে বললো,
—বলেছি আসছে।তুই শান্ত হ। কেনো এমন করছিস? ডাক্তার টাও আসছে না।
রায়হানের চোখ উল্টে আসছে। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগলো,
—আমার মেয়ে… আয়েশা… আমাকে ক্ষমা করে দাও… খালা আমার মেয়েটার কি হবে..রোহিনী…
রোহিনী…
তারপর ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে গেলো সব।
রায়হানের হাতটা বিছানার পাশে ঝুলে পড়লো।
মুনতাহা বেগম থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলো।
—রায়হান…?
কোনো উত্তর এলো না। মুনতাহা বেগম ধপ করে মেঝেতে পড়ে গেলো।”
–
হাসপাতালে পৌঁছে আয়েশার বুকটা ধক করে উঠলো। চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আছে। মুনতাহা বেগম করিডোরে বসে কাঁদছেন।
আয়েশা ভেতরে ঢুকতেই স্থির হয়ে গেলো।
সাদা কাপড়ে ঢাকা রায়হান। সব শেষ!
রোহিনী বাবাকে দেখে ছুটে গেলো।
—বাবা! বাবা উঠো!”
ছোট্ট মেয়েটা বাবার হাত ধরে ঝাঁকাতে লাগলো।
—বাবা কথা বলো…
রোহিনী কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—বাবা, তুমি না বলেছিলে আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে? বাবা চোখ খোলো… আমি আর দুষ্টুমি করব না… বাবা কথা বলো…
ছোট্ট হাত দিয়ে বাবার মুখ ছুঁয়ে বারবার ডাকতে লাগল।কিন্তু মানুষটা আর চোখ খুলল না।
রোহিনী এবার বাবার বুকের উপর মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
—মা… বাবা কেন কথা বলছে না…? বাবা আমাকে রেখে কোথায় যাবে…?
ছোট মেয়েটার কান্না শুনে চারপাশের সবাই মলিন চোখে তাকিয়ে রইল।
আয়েশার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। চোখের পানি আর আটকে রাখতে পারল না সে। যত অভিযোগই থাকুক…
একসময় এই মানুষটাকেই ভালোবেসেছিলো। আরিফ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো পাশে। আয়েশার চোখ ছলছল করছে, আরিফ সুক্ষ্ম চোখে সেটা খেয়াল করছে।
—
রায়হানের লাশ এম্বুলেন্সে করে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হলো।এরপর,রায়হানের কবর দেওয়া থেকে শুরু করে সব ব্যবস্থা আরিফ নিজ হাতে সামালা দিলো।”
মুনতাহা বেগম বারবার কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন,
—আল্লাহ তোকে শান্তি দিক বাবা…
পাপের শাস্তি আগে পরে ভোগ করায় লাগে। এই যে রায়হান শেষ সময়ে নিজের মেয়েকে একটা বার ও দেখতে পেলো না। অথচ এক সন্তানের জন্য রায়হান নিজের আরেক সন্তান কে পৃথিবীর আলো দেখতে দেয় নি। রায়হান ভেবেছিলো আয়োশা-র নিজের সন্তান হলে আয়েশা রোহিনী কে অবহেলা করবে।কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি হলো? রোহিনী এখন সারাজীবন আয়েশার কাছে থাকবে। হয়তো, রায়হানের কাছ থেকে ভালো থাকবে।”
কয়েকদিন পর,
বিকেলের নরম আলোয় রাস্তা ধরে হাঁটছে আয়েশা আর আরিফ। রোহিনী আরিফের কোলে।
—আমি একটা আইসক্রিম খাবো।
আরিফ হেসে বললো,
—দুইটা খাওয়াবো আমার মেয়েকে।
আয়েশা তাকিয়ে রইলো মানুষটার দিকে। জীবনটা সত্যিই অদ্ভুত। কিছু মানুষ কষ্ট দিতে আসে।
আর কিছু মানুষ ভাঙা মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়।
আরিফ ধীরে বললো,
—কি ভাবছো?
আয়েশা মৃদু হাসলো।
—ভাবছি… জীবনকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেওয়া যায়।
আরিফ আয়েশার হাতটা শক্ত করে ধরলো।
—আর আমি ভাবছি… আল্লাহ দেরি করলেও সুন্দর কিছু ঠিকই লিখে রাখেন।”
আয়েশা মুচকি হেসে আরিফের হাত শক্ত করে ধরলো
আকাশে তখন সন্ধ্যা নামছে। আর আয়েশার জীবনেও বহুদিন পর নেমে এলো এক চিলতে শান্তি।
—সমাপ্ত—
