#দ্বিতীয়_বউ
#পর্ব_১৯
#আলভিয়া_সামরিন_রায়া
—আমি আপনার সাথে কালকে দেখা করতে আসবো।কিছু কথা বলার আছে আপনাকে।”
আয়েশা ছোট করে বললো,
—আচ্ছা,আমি রাখছি এখন।
আরিফ আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। আয়েশা ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখলো। চুলোর ওপর ভাত টগবগ করে ফুটছে। আয়েশা নীরবে আঁচটা কমিয়ে দিলো। তারপর ধীর পায়ে হেঁটে সামনে রাখা মোড়াটিতে বসে দু’হাতে মাথা চেপে ধরলো।
চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, অথচ ঠোঁটের কোণে লেগে আছে এক অদ্ভুত হাসি বেদনামিশ্রিত, তৃপ্তির। ইচ্ছে করছে রায়হানের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে,
—দেখো, তুমি শাস্তি পেয়েছো।আমার বাচ্চাটাকে তুমি পৃথিবীর আলো দেখতে দাও নি।এই পাঁচ বছরে এমন দিন যায় নি যেদিন আমি চোখের পানি ফেলিনি। এখন সারাজীবন অন্যর দারস্থ হয়ে থাকতে হবে তোমাকে। এর থেকে বড় শাস্তি আর কি হতে পারে?”
আয়েশা আরো কিছুক্ষন পাথরের মতো বসে রইলো।ভেতর থেকে রোহিনীর গলার স্বর শুনা গেলো।”
আয়েশাকে উঠে দাঁড়ালো।ভাত নরম হয়ে এসেছে।চুলা থেকে নামিয়ে মা’র গলাতে বসিয়ে দিয়ে আয়েশা রুমের দিকে পা বাড়ালো।”
—মা,দেখো এগুলো হয়েছে কি-না?”
আয়েশা রোহিনীর হাত থেকে খাতা নিয়ে লেখা গুলো পড়লো।
—হয়েছে।এসো খাবে আসে।”
রোহিনী হাত বাড়িয়ে দেয়। আয়েশা অল্প হেঁসে রোহিনীকে কোলে তুলে নেই।”
আয়েশা রোহিনীকে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়। দরজার কাছে মাদুরা বিছিয়ে রোহিনীকে বসিয়ে দেয়।প্লেটে করে দু’জনের পরিমান ভাত-তরকারী নিয়ে নিজে ও রোহিনীর পাশে এসে বসে।”
আয়েশা এক লোকমা ভাত রোহিনীর দিকে এগিয়ে দিলো। রোহিনী খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলো,
—মা,তুমি টেবিল কবে কিনবে?”
আয়েশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
—কিনবো মা। মা সব কিছু একটু গুছিয়ে নেই তারপর।”
রোহিনী কি বুঝলো কে জানে। আর কিছু না বলে চুপচাপ খেতে লাগলো।”
খাওয়ার শেষ করে সবকিছু গুছিয়ে আয়েশা রোহীনি কে নিয়ে রুম চলে এলো।
—ঘুমাও,রোহিনী। কালকে স্কুলে যেতে হবে।”
রোহিনী আয়েশা কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আয়েশা রোহীনি মাথার হাত বুলিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বললো,
—কি হয়েছে?”
—বাবার কাছে যাবো না।তুমি আমাকে একবার ও নিয়ে যাচ্ছো না।”
আয়েশা কি বলবে বুঝতে পারছে না। নিয়ে যাবে কি করে রায়হান তো আর কল দেয় নি। তবু ও ছোট করে বললো,
—নিয়ে যাবো মা।”
রোহিনী শুনলো না। হঠাৎ করে জোরে জোরে কাঁদতে আরম্ভ করলো। আয়েশা হকচকিয়ে গেলো। উঠে বসে রোহিনী কে কোলের উপর বসালো।কোমল স্বরে বললো,
—এভাবে কাঁদে না সোনা।চুপ করো মা।”
রোহিনীর কান্না বন্ধ হলো না।আয়েশা বুঝতে পারলো,
—ছোট মেয়ের মন বুঝে গেছে বাবার কিছু হয়েছে। না-হয় এরকম তো রোহিনী করে না।”
রোহিনী কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো,
—মা,বাবাকে কল দাও।আমি কথা বলবেো।”
—আচ্ছা দিবো।তুমি আগে কান্না বন্ধ করো।”
রোহিনী চুপ করে গেলো।তবুও একটু পর পর হেঁচকি দিচ্ছে।আয়েশা বালিশের তলা থেকে ফোন নিয়ে রায়হানের মোবাইলে কল দিলো।”
দু’বার রিং হওয়ার পর রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে কর্কশ আওয়াজে কেউ একটা বলে উঠলো,
—কে?”
আয়েশা একটু থেমে বললো,
—আয়েশা বলছি।রোহিনী ওর বাবার সাথে কথা বলার জন্য কান্না করছে।”
মুনতাহা বেগম সব শুনে কেঁদে উঠলেন,
—কী করে কথা বলবে মা?ওর বাবার তো এখনো জ্ঞান ফিরে নি।একটা কেউ নেই ওকে দেখার। আমি আর কতটুকু পারবো। ছোট মেয়েটা এতিম হয়ে যাবে মনে হয়।মেয়েটার মা তো নেই এখন বাবা ও বুঝি হারাবে।মেয়েটার ভাগ্য খারাপ। হায় আল্লাহ”
আয়েশা সব শুনলো। রোহিনীর দিকে তাকাতেই দেখলো মেয়েটা হাসি মুখে অধীর আগ্রহে বাবার সাথে কথা বলার জন্য বসে আছে।আয়েশার খারাপ লাগলো।ঠান্ডা গলায় বললো,
—যখন সব কিছু ঠিক হবে আমাকে একটা কল দিবেন আমি রোহিনীকে নিয়ে আসবো।”
মুনতাহা বেগম আয়েশার কথা বলার ধরন দেখে বুঝলো রোহিনী সামনে আছে। তিনি কোমল স্বরে বলে উঠলো,
—তুমি একবার আসবে মা?এলে উপকার হতো। একটু..
উনার পুরো কথা শেষ করার আগেই আয়েশা ফোন টা কেটে দিলো। এত কিছু হওয়ার পরে-ও আয়েশা যাবে এই ভাবনা আসে কি করে?”
—বাবার সাথে কথা বলবো না?”
আয়েশা রোহিনীকে টেনে বালিশে শুয়ে দিলো।আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
—তোমার বাবা এখন বাইরে গেছে। তোমার ছোট দাদু বললো বাবা এলে ফোন দিবে। তখন কথা বলবে ঠিক আছে?”
রোহিনী চোখে আবার ও ভরে উঠলো।আয়েশা দেখলো কিন্তু এই মুহুর্তে রোহিনীকে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”
রোহিনী আর কিছু বললো না আয়েশা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।কিছুক্ষনের মধ্যে রোহিনীর চোখে ঘুম ধরা দিলো। আয়েশা রোহিনীকে ঘুমাতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।চাদর টেনে নিয়ে রোহিনীকে জড়িয়ে ধরে নিজেও চোখ বন্ধ করলো।”
–
—তুমি মানুষ? কালকে দেখে কত’শত বার তোমাকে কল দিয়েছি। নিজের স্বামী এই অবস্থা আর তুমি রং ডং করে বেরুচ্ছো?”
মেহরিন সবটা শুনলো। মুনতাহা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
—আমি মায়ের কাছে ছিলাম। আর আমি মোবাইল হাতে নিয়ে বসে ছিলাম না যে আপনার কল পাওয়ার সাথে সাথে উড়ে চলে আসবো।”
মুনতাহা বেগম কটাক্ষ করে বললো,
—তুমি সারাদিনে একবার ও ফোন ধরো নি এটা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?”
মেহরিন বিরক্ত হয়ে বললো,
—আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে না। সকালে আমি আপনার থেকে সবটা জেনেছি। এখন তো আমি এসেছি। আপনার এত কথার মানে তো আমি বুঝতে পারছি না?”
—এসে উদ্ধার করে ফেলেছো?”
মেহরিন তেজী গলায় বললো,
—আপনি ভালো ভাবে কথা বলুন। রায়হান কোথায়?
মুনতাহা বেগম কিছু একটা বলতে যাবে তখনই একজন নার্স এসে বললো,
—এটা হাসপাতাল। আপনাদের বাড়ি না। ঝগড়া করতে হলে বাড়িতে চলে যান।”
এই কথা বলে নার্স টি নিজের মতো চলে গেলো। মেহরিন চাঁপা স্বরে বললো,
—দেখলেন আপনার জন্য কথা শুনতে হলো।”
মুনতাহা বেগম সবে মুখ খুলতে যাবে তার আগেই মেহরিন রায়হান কে দেখতে কেবিনের দিকে অগ্রসর হলো।”
মেহরিন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রায়হানের নিস্তেজ শরীরটা বেডে পড়ে আছে। চেহারার অবস্থা খারাপ।কপালের আঘাতের জায়গাটা কালচে হয়ে গেছে। একদিনেই শরীর শুকিয়ে জীর্ণ হয়ে পড়েছে।
পা না থাকায় হাঁটুর নিচের চাদরটা বাতাসে দুলে বিছানার সাথে লেগে যাচ্ছে।”
মেহরিন এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল। রায়হানের এই অবস্থায় দেখে কষ্ট লাগছে কি-না নিজে ও বুঝতে পারছে না। রুম থেকে বেরুতে যাবে তখনই মুনতাহা বেগম রুমে ঢুকলো।
—কোথায় যাচ্ছো?”
মেহরিন বললো,
—ডাক্তারের সাথে কথা বলতে।”
মুনতাহা বেগম ধীর কন্ঠে বললো,
—ডাক্তার একটু পর আসবে।নার্স বললো রায়হানকে দেখার পর জানাবে পরবর্তীতে কি করা লাগবে।
মেহরিন চুপ করা রইলো। মুনতাহা বেগম আবার বলে উঠলো,
—বাড়ি যাও। কাল থেকে আমি কিছু খাই নি। হাসপাতালের খাওয়ার মুখে দেওয়া যায় না-কি? তুমি খাবার রান্না করে নিয়ে এসো।যদি রায়হানের জ্ঞান ফিরে ওকে তো কিছু খেতে দিতে হবে।দেরি করবে না যাও।”
মেহরিন ছোট করে বললো,
—ঠিক আছে,আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
এই বলে মেহরীন রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।মুনতাহা বেগম হতবাক হয়ে মেহরিন এর যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল।বিড়বিড় করে বলে উঠলো,
—এই মেয়ের মাথায় কি চলছে? এত সহজে মেনে নিলো?”
–
মেহরিন বাসায় ফিরে ক্লান্ত ভঙ্গিতে জামা-কাপড় বদলে নিলো। তারপর ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলো।
রান্নাঘরে ঢুকতেই এক ধরনের অগোছালো অবস্থা চোখে পড়লো। সিঙ্কে জমে আছে ময়লা থালা-বাসন, কোথাও শুকিয়ে লেগে থাকা তরকারির দাগ, কোথাও আবার তেলচিটে পাত্র। চুলার আশপাশেও তেলের ছিটে জমে আছে, অনেকদিন ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয়নি।অবশ্য মেহরিন ইচ্ছে করেই করেনি।
মেহরিন একবার চারপাশে তাকালো, তারপর নির্বিকারভাবে ফ্রিজ খুললো। ভেতরে প্রায় কিছুই নেই খালি তাকগুলো দেখে ফ্রিজ বন্ধ করে দিলো।”
খাঁচার কোণে পড়ে থাকা কয়েকটা আলু চোখে পড়তেই সেগুলো তুলে নিলো।বেসিনের পানিতে ধুয়ে হাঁড়িতে দিয়ে চুলায় বসিয়ে দিলো। মেহরিন চুলার আঁচটা একটু কমিয়ে দিলো। চারপাশের নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠলো।
হঠাৎ, কী যেন মনে হতেই মেহরিন থমকে গেলো। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক অদ্ভুত রহস্যময় হাসি। এই হাসির আড়ালে কি লুকিয়ে আছে..?
চলবে…?
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
