#দ্বিতীয়_বউ
#পর্ব_১৭
#আলভিয়া_সামরিন_রায়া
রায়হান তৈরি হয়ে নিচে নেমে এলো। মেহরিন এখনো ঘুম থেকে উঠে নি। রায়হান রান্নাঘরে গিয়ে দেখলো। তবে খাওয়ার মতো কিছু খুঁজে পেলো না।হতাশ হয়ে টেবিলে এসে বসলো। টেবিলের এককোনায় প্যাকেটের মধ্যে দুটো পাউরুটি পড়ে আছে। রায়হান হাত বাড়িয়ে প্যাকেট টা নিলো।প্যাকেট খুলে পাউরুটি বের করলো। পাউরুটি ছিঁড়ে অল্প মুখে দিলো।সাথে সাথে রায়হানের গা গুলিয়ে উঠলো। রায়হান দ্রুত উঠে বেসিনে গিয়ে বমি করা শুরু করলো।
কী বিশ্রি গন্ধ!”
রায়হান মুখে পানি দিয়ে আবার টেবিলে এসে বসলো।
আজকে কত গুলো দিন একটু ভালো করে খেতে পাচ্ছে না। আয়েশা থাকাকালীন টেবিলে কয়েকরকম খাবার সাজানো থাকতো। তখন রায়হান কত নাক সিঁটিয়েছে। এটা মজা হয় নি। এটাতে লবন বেশী হয়েছে,ওটাতে ঝাল হয়েছে। আর এখন খেতে অবধি পারছে না।
এসব ভাবতেই ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। অবশ্য এখন আর কিছু করার নেই। আয়েশা কে ফিরে আসার কথা বললেও আয়েশা আর আসবে না। কেনো যে ও-ই দিন আয়েশা ডির্ভোস দিতে গেলাম?”
রায়হানের মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। মাথা চেপে ধরে নিজে নিজে বলে উঠলো,
—একটু চা খেতে পারলে ভালো হতো। এতটা পথ যাবো কি করে?”
মেহরিন সবে উঠেছে। রায়হান কে এভাবে বসে থাকতে দেখে ও কিছু বললো না। রায়হান বলে উঠলো,
—মেহরিন, তুমি জানোও না আমি অফিস যাবো?এতক্ষণ হয়েছে তুমি নাস্তা বানাও নি কেনো? আর বাড়িঘরের এই অবস্থা কেনো করে রেখেছো?আমায় বেরুতে হবে তাড়াতাড়ি করে চা বানিয়ে দাও।”
মেহরিন ত্যাড়া কন্ঠে বললো,
—পারবো না। নিজে বানাও গিয়ে। আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে মস্ত বড় ভুল করেছি। এখন কোথাও আর চাকরি ও পাচ্ছি না। আর আমি তোমার চাকর না যে তুমি বসে বসে অর্ডার করবে আর আমাকে তা মানতে হবে।”
—বাড়ির কাজ করলে কেউ চাকর হয়ে যায় না মেহরিন।এটা তোমার দায়িত্ব।”
মেহরিন ক্ষিপ্ত স্বরে বললো,
—দায়িত্ব?তুমি স্বামী হিসেবে কোন দায়িত্ব পালন করছো শুনি?” আবার আমাকে জ্ঞান দিতে আসছো?আরেক জনকে বলতে মুখে বাঁধে না?”
রায়হান চেঁচিয়ে উঠে বললো,
—মেহরিন..ভদ্র ভাবে কথা বলো।”
মেহরিন বলে উঠলো,
—ভদ্র ব্যবহার পেতে চাও তো আগে তোমার স্বভাব ঠিক করো গিয়ে। আর একটা কথা আমাকে টাকা দিয়ে যাও কিছু কেনাকাটা করতে হবে। আমাদের বাড়িতে যাবো আজকে।”
রায়হান মেহরিন এর দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল। কিছু বলতে আর ইচ্ছে করলো না। চেয়ারে পড়ে থাকা নিজের ব্যাগ তুলে নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্য বেরিয়ে গেলো।”
রায়হানকে এভাবে চলে যেতে দেখে মেহরিন রেগে গেলো।টেবিল থেকে গ্লাস নিয়ে ফ্লোরে ছুঁড়ে মারলো। মুহূর্তে গ্লাসটি ঝনঝন শব্দে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেলো।
**
আয়েশা রোহিনীকে তৈরি করে নিজে ও তৈরি হয়ে নিল। আয়েশা প্রথমে রোহিনীকে স্কুলে দিয়ে আসবে সেখান থেকে নিজের কাজে চলে যাবে।”
—আর একটু খেয়ে নাও সোনা।”
—আর খাবো না মা”
—মা।”
আয়েশা খেতে খেতে রোহিনীর দিকে তাকালো।”
—কী হয়েছে?”
রোহিনী বলে উঠলো,
—আমার বাবার কথা মনে পড়ছে। বাবা আসবে না?আমরা আবার আগের মতো এক বাড়িতে থাকবো না?”
কথাটা শুনে আয়েশা থমকে গেলো। কিছুক্ষন চুপ থেকে বললো,
—তোমার বাবা আসবে।আর তুমি স্কুল থেকে ফিরে জামা কাপড় পাল্টে নিবে।আমি বিছানার ওপর জামা রেখেছি ওগুলো পড়ে নিবে। আর খাবার টেবিলের উপর আছে এগুলো নিয়ে খাবে। পারবে?”
রোহিনী নিচের দিকে তাকিয়ে বললো,
—পারবো মা।”
আয়েশা একটু কষ্ট পেলো। ছোট মেয়েটা এসব কাজ এখনো করতে পারে? আয়েশার কাছে ও তো উপায় নেই? চাকরি না করলে বাসা ভাড়া দিবে কি করে?
আয়েশার পাশের বাসার ভাড়াটিয়ার মেয়ে রোহিনীর ক্লাসে পড়ে। আয়েশা উনাকে গিয়ে বলেছে উনার মেয়ের সাথে রোহিনীকে ও স্কুল থেকে নিয়ে আসতে। উনি বলেছে নিয়ে আসবে।রোহিনীর স্কুল ব্যাপার টা কিছুটা সামলে নিতে পেরে আয়েশা একটু সস্তি পেয়েছে।
আয়েশা খাওয়া শেষ করে রোহিনীর ব্যাগ নিয়ে বললো,
—উঠো।দেরি হয়ে যাবে।”
রোহিনী বললো,
—মা,আমি এতদিন যাই নি যে মেম বকা দিবে।”
আয়েশা ধীর কন্ঠে বললো,
—আমি বুঝিয়ে বলবো বকবে না। তুমি শুধু মন দিয়ে পড়ালেখা করবে। ঠিক আছে।”
রোহিনী খুশি হয়ে বললো,
—ওকে।”
আয়েশা হাসলো। এরপর রোহিনী সহ বাইরে বেরিয়ে আয়েশা দরজা বন্ধ করে স্কুলের উদ্দেশ্য বেরিয়ে গেলো।
–
অফিসের কাজ শেষ করে রায়হান ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাইরে বের হলো। রায়হানের তখন হালকা ক্ষুধা লাগছে। দুুপুরে ভালো করে খেতে পারে নি। রায়হান বাইরের খাবার তেমন খেতে পারে না। এখন তো প্রতিদিন খেতে হয়।
রায়হান একটু সামনে একটা ছোট দোকান দেখে ঢুকে পড়ল। বসে নাস্তা অর্ডার করল।
নাস্তা আসার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে হঠাৎই মনে পড়ল রোহিনীর কথা।
কেমন আছে মেয়েটা? অবশ্য আমার কাছে থাকার চাইতে ওখানে থাকলে হাজার গুণ বেশি ভালো থাকবে।
নাস্তা খেতে খেতেই দোকানদারকে বলল,
—ভাই, দশ প্যাকেট কেক দেবেন। আর কিছু বিস্কুট আর জুস ও দিন। আর কয়কেটা চিপস দিয়েন।
দোকানদার রায়হানের কথা মতো জিনিসগুলো প্যাকেট করতে লাগলো।
নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল,
“রোহিনীকে আজ না হলে কাল গিয়ে দেখে আসতে হবে…। একটু থেমে বিড়বিড় করে বললো,
—না-কি বাড়িতে নিয়ে আসবো?
সবগুলো জিনিস প্যাকেট করে নিয়ে বিল মিটিয়ে দোকান থেকে বের হয়ে গেল রায়হান।
রায়হান রাস্তার ধারে এসে দাঁড়াল। গাড়ির ভিড় একটু কমলেই পার হবে। হাতে খাবারের প্যাকেট, মাথায় হাজার চিন্তা জীবনটা যেন কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে!”
একটু ফাঁকা দেখে রাস্তা পার হতে গেল। ঠিক সেই সময় কোথা থেকে হঠাৎ করেই একটা বাইক দ্রুত গতিতে ছুটে এলো।
সবকিছু যেন এক মুহূর্তে ঘটে গেল।
রায়হান ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল। হাতে থাকা প্যাকেট ছিটকে রাস্তার ওপর পড়ে ছড়িয়ে গেল।
ওপাশ থেকে তখন একটা বড় ট্রাক দ্রুত গতিতে চলে আসছে। ড্রাইভার হঠাৎ সামনে পড়ে থাকা রায়হানকে দেখে ব্রেক কষল, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
গাড়ির চাকা থামানোর সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো।
মুহূর্তের মধ্যেই ট্রাকটা রায়হানের পায়ের উপর দিয়ে চলে গেল।
আকাশ ফাটানো আর্তনাদ বেরিয়ে এলো রায়হানের মুখ থেকে
“আআআহ…!”
তারপরই নিস্তেজ হয়ে গেল শরীর। চারপাশে মুহূর্তেই হৈচৈ পড়ে গেল। মানুষ দৌড়ে এসে ভিড় করল।
রাস্তার একপাশে পড়ে আছে রায়হান, আর একটু দূরে পড়ে আছে তার কাটা পা কী ভয়ংকর, বিভৎস এক দৃশ্য!”
কেউ কেউ সেই দৃশ্য দেখে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।
কেউ হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।কেউ হাহাকার করে উঠল।
একজন তাড়াতাড়ি বলল,
—কেউ এম্বুল্যান্সে ফোন দেন!
আরেকজন নিজের ফোন বের করে কাঁপা কাঁপা হাতে নম্বর ডায়াল করল।
কিছু সময়ের মধ্যেই সাইরেন বাজাতে বাজাতে এম্বুল্যান্স এসে পৌঁছাল।
দুইজন স্ট্রেচার নিয়ে নেমে এল। সাবধানে রায়হানের নিস্তেজ, রক্তাক্ত দেহটা তুলে গাড়িতে উঠালো।
চারপাশের মানুষ যেন নিঃশ্বাস আটকে সেই দৃশ্য দেখছিল।
রাস্তায় পড়ে রইল শুধু ছড়িয়ে থাকা খাবারের প্যাকেট যা একজন বাবা তার মেয়ের জন্য নিয়েছিলো।কিন্তু তা আর রোহিনীর খাওয়ার সৌভাগ্য হলো না…
চলবে….?
