#দ্বিতীয়_বউ
#পর্ব_১৬
#আলভিয়া_সামরিন_রায়া
মেহরীন কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। যেন বুঝতেই পারছে না ঠিক কী করে ফেলেছে সে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ফুলের টবের ভাঙা টুকরো আর রক্তে ভেজা মেঝের সবকিছু মিলিয়ে দৃশ্যটা যেন ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।
মেহরিন কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
—এই… এই ওঠ! নাটক করছিস কেনো?
রোহিনী কোনো সাড়া দিলো না। ছোট্ট শরীরটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। মাথা থেকে এখনো ধীরে ধীরে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
মেহরীনের বুক ধকধক করতে লাগলো। ভয় যেন এবার পুরোপুরি তাকে গ্রাস করলো। তাড়াহুড়ো করে রোহিনীকে কোলে তুলে নিলো।
—ওঠ…ওঠ… আমি তো ইচ্ছে করে মারতে চায় নি.। রাগের মাথায়..
মেহরিনের গলা কেঁপে উঠলো। চোখে মুখে আতঙ্ক স্পষ্ট।
তড়িঘড়ি করে ওড়না দিয়ে রোহিনীর মাথার রক্ত চাপা দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো।
বাড়ির বাইরে এসে চিৎকার করে উঠলো,
—কেউ আছেন? একটু সাহায্য করুন!”
পাশের বাসার একজন লোক আওয়াজ পেয়ে এগিয়ে এলো। পরিস্থিতি দেখে আর দেরি না করে বললো,
—হাসপাতালে নিতে হবে এখনই!”
লোকটা একটু পর একটা সিএনজি নিয়ে এলো। মেহরীন দ্রুত গতিতে রোহিনীকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। চেচিয়ে বলে উঠলো,
—তাড়াতাড়ি করে চালান। মেহরিন রোহিনীর থেকে বেশী চিন্তা রায়হান কে নিয়ে হচ্ছে। রায়হান কে কী জবাব দিবে?”
—
এদিকে,আয়েশা নিজের নতুন বাসায় সব গুছিয়ে নিচ্ছিলো। ছোট্ট বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটু আগের কথাগুলো মনে পড়ছে তার। হঠাৎই বুকের ভেতর অকারণে অস্বস্তি কাজ করতে লাগলো।”
—কেন যেন মনে হচ্ছে কিছু একটা ঠিক নেই…
নিজের মনেই বলে উঠলো আয়েশা। আরো কিছুক্ষন পুরো রুম জুড়ে পায়চারি করলো। বুকের ভেতর টা কেমন যেন ধড়ফড় করছে। কোনভাবে নিজেকে শান্ত করতে না পেরে ব্যাগ থেকে বোরকা বের করে পরে নিলো। ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো,
—আজই রোহিনীকে নিয়ে আসবো।”
এই ভেবে আয়েশা রুম লক করে করে রোহিনীকে আনার উদ্দেশ্য বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো।”
আয়েশা দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তার সামনে এসে দাঁড়ালো। সেখান থেকে একটা গাড়িতে উঠে বসলো। ঘন্টা খানিকের মধ্যে আয়েশা রায়হানের বাড়ির সামনে এসে পৌঁছালো।”
আয়েশা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়তেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন অদ্ভুতভাবে ধকধক করে উঠলো। দরজার সামনে এসে কলিংবেল চাপলো। কয়েকবার আওয়াজ দেওয়ার পর ও ভিতর থেকে কোনো সাড়া নেই। আয়েশার একটু অবাক হয়ে গেলো।”
—এত চুপচাপ কেনো?”
আয়েশা দরজাটা ঠেলে দিতেই কিঞ্চিত খোলা পেয়ে গেলো। ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকতেই চারপাশে অস্বাভাবিক নীরবতা টের পেলো। ড্রইংরুমে চোখ পড়তেই আয়েশা থমকে দাঁড়ালো।”
মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভাঙা ফুলের টবের টুকরো। সোফার পাশে জমাট বাঁধা রক্তের দাগ।”
আয়েশার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলো।”
—রোহিনী…?”
আয়েশা কাঁপা গলায় কয়েকবার ডেকে উঠলো। তবে কোনো উত্তর পাওয়া গেলো না।আয়েশা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এল।”
ঠিক তখনই আয়েশা গেটের কাছে সেই পাশের বাসার লোকটার সামনে পড়ে যায়।”
আয়েশা লোকটা কে দেখে একটু থমকে গেলো, তারপর বললো,
—রোহিনী কোথায় গেছে জানেন? বাড়িতে কেউ নেই যে!”
লোকটা বলে উঠলো,
—রোহিনীর মাথা ফেটে গেছে। রায়হানের বউ হাসপাতালে নিয়ে গেছে। আমি গাড়ি ঠিক করে দিছি।মেয়েটা অনেক কষ্টে আছে। ছোট মেয়েটার শরীরে এক ফোঁটা ও মাংশ নাই। দেখার তো কেউ নেই। সৎ মা কী আর আপন মায়ের মতো হয়?”
আয়েশার বুক ধড়ফড় করতে লাগলো। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
—কী হয়েছে ওর?”
লোকটা গম্ভীর মুখে আবার বললো,
—মাথা ফেটে গেছে মেয়েটার। মেয়েটার শরীরের অবস্থা ভালো না। শরীর থেকে অনেক রক্ত চলে গেছে। এবার কী হয় কে জানে।”
কথাটা শুনে আয়েশা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে যায়। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
—কো… কোন হাসপাতালে?”
লোকটা হাসপাতালের নাম বলতেই আর কিছু না শুনেই ছুট লাগালো আয়েশা। রাস্তার মাঝেই একটা সিএনজি থামিয়ে উঠে পড়লো।
—ভাই,… দ্রুত চালান!”
গাড়ি ছুটছে… কিন্তু আয়েশার মনে হচ্ছে সময় থেমে গেছে। চোখ দিয়ে অঝোরে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
বিড়বিড় করে বলছে,
—রোহিনীকে ছাড়া আমি কি নিয়ে থাকবো? সেদিন কেনো ওকে আমার সাথে নিয়ে এলাম না?রোহিনীর কিছু হলে আমি নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবো না।”
—
হাসপাতালের সামনে পৌঁছাতেই প্রায় দৌড়ে ভেতরে ঢুকে গেলো আয়েশা। রিসেপশনে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
—রোহিনী… একটা ছোট মেয়ে… একটু আগে এনেছে…”
নাম শুনেই একজন নার্স ইমারজেন্সির দিকে ইশারা করলো।আয়েশা ছুটে সেখানে গিয়ে দেখলো বাইরে বেঞ্চে বসে আছে মেহরীন। মাথা নিচু করে মোবাইল দেখছে।
আয়েশা ছুটে গিয়ে তার সামনে দাঁড়ালো,
—কোথায় রোহিনী? কী হয়েছে ওর?”
মেহরীন মাথা তুলে তাকালো। আয়েশাকে এখানে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মেহরিন উঠে দাঁড়ালো। কিছু বলতে যাবে তখনই রায়হান এসে উপস্থিত হলো। চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠেছে। রায়হান এসেই মেহরিন কে জিজ্ঞেস করলো,
—রোহিনী কোথায়? কী করে হলো এসব।”
মেহরিনের চোখে পানি জমে আছে, কিন্তু সেই পানিতে যেন কেমন কৃত্রিমতার ছাপ রয়েছে।
—আমি.. আসলে। আমি তো কিছু বুঝতেই পারিনি… রোহিনী খেলছিল। হঠাৎ সোফা থেকে পড়ে গেলো…
কথা বলতে বলতে মেহরিন ঠুকরে কেঁদে উঠলো।”
আয়েশা থমকে গেলো।ভেতরে যেন কিছু একটা ঠিক মিলছে না।
আয়েশা কঠিন স্বরে বললো,
—সোফা থেকে পড়ে গেলে এত রক্ত হয়?”
মেহরীন চোখ নামিয়ে ফেললো,
—আমি তো দেখিনি ঠিকভাবে।আমি রান্নাঘরে ছিলাম। শব্দ পেয়ে এসে দেখি রোহিনী মেঝেতে পড়ে আছে। আমি তো দেখার সাথে সাথে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।”
রায়হান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেহরীনের দিকে।
—পড়ে গেলো?
রায়হানের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হলো। মেহরিন শান্ত স্বরে বললো,
—হ্যাঁ… সোফা থেকেই তো।”
—সোফা থেকে পড়ে গেলে মাথা ফেটে যায় এভাবে? এত বেশি আঘাত পাওয়ার তো কথা না!”
রায়হানের চোখ রক্তিম হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।
মেহরীন থমকে গেলো। কিছু বলতে গিয়ে আটকে গেলো।”
ঠিক তখনই কেবিন থেকে একজন নার্স বেরিয়ে এলেন।
—বাচ্চাটার গার্ডিয়ান কে?”
রায়হান তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলো,
—আমি ওর বাবা। কেমন আছে ও?”
নার্স একটু থেমে বললেন,
—মাথায় বেশ গভীর আঘাত লেগেছে। আমরা স্টিচ দিয়েছি, তবে এখনো অবস্থা পুরোপুরি স্থিতিশীল না। ২৪ ঘণ্টা অবজারভেশনে রাখতে হবে।”
আয়েশার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
রায়হান দাঁত চেপে বললো,
—কীভাবে হলো এটা? মানে আঘাত টা কীসের মানে..
রায়হানের কথা আটকে আসছে। নার্স বিরক্ত হলো রায়হান কে এভাবে অগোছালো কথা বলতে দেখে।
নার্স সরাসরি উত্তর না দিয়ে শুধু বললেন,
—ও যখন জ্ঞান ফিরে পাবে, তখনই জানা যাবে কী করে আঘাত পেলো। তবে আমার মনে হচ্ছে ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। আর একটু পর আপনি ডাক্তারের সাথে কথা বলতে আসবেন।”
এই কথা শুনে মেহরীনের মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। আয়েশা তীক্ষ দৃষ্টিতে সেটা লক্ষ্য করলো। আয়েশার সন্দেহ আরো গভীর হলো।”
—
কিছুক্ষণ পর রোহিনীকে কেবিনে শিফট করা হলো। মাথায় ব্যান্ডেজ, ছোট্ট মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
আয়েশা পাশে বসে হাত ধরে রাখলো। চোখ দিয়ে নিরবেই পানি ঝরছে।
মেহরিন দরজার কাছে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। রায়হান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তবে তার চোখ কিন্তু একবারও মেহরীনের দিক থেকে সরছে না। কেমন অদ্ভুত ভাবে মেহরিন কে দেখছে!”
হঠাৎ করে রায়হান বলে উঠলো,
—তুমি কিছু লুকাচ্ছো, তাই না?”
মেহরীন চমকে উঠলো,
—না! আমি কী লুকাবো?”
রায়হান কঠিন স্বরে বললো,
—কারণ তোমার কথা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।”
মেহরীন এবার জোরে কেঁদে উঠলো,
—তুমি আমাকে ভুল ভাবছো। আমি মিথ্যা কেনো বলবো? আমি তো রান্নাঘরে রোহনীর জন্য খাবার বানাচ্ছিলাম। পরে শব্দ শুনে এসে দেখি রোহিনী ফ্লোরে পড়ে আছে।”
এই নাটকীয় কান্না দেখে আয়েশার ভ্রু কুঁচকে গেলো। মেহরীন এর চোখ দিয়ে পানি তো পড়ছে।তবে মুখের আদল যেন অন্য কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। আয়েশা রোহিনীর দিকে নজর ফিরিয়ে নিলো। বাচ্চা মেয়েটাকে এমন নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে এটা আয়েশার সহ্য হচ্ছে না। একমাত্র রোহিনীর জন্য পাঁচটা বছর এত অবহেলা,অপমান সহ্য করে মাটি কামড়ে পড়ে ছিলো। আজকে কি না সেই ছোট মেয়েটার এই অবস্থা..! এসব ভাবতেই আয়েশার বুক ভারী হয়ে উঠে।”
মেহরিন মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
—মা,কল দিয়েছে। আমি একটু আসছি।”
এই বলে মেহরীন রুমের বাইরে বের হয়ে যায়। রায়হান এগিয়ে গিয়ে রোহিনীর পাশে দাঁড়ায়। একটু পর নজর ফিরিয়ে আয়েশার দিকে ফেলে। আয়েশা রোহিনীর হাত ধরে বসে আছে। রায়হান সরে যেতে গেলে আয়েশা বলে উঠলো,
—রোহিনীর হুঁশ ফিরলে আমি ওকে আমার সাথে নিয়ে যাবো। এই বাড়িতে থাকলে আমার মেয়েটা শেষ হয়ে যাবে। এখন থেকে ও আমার সাথে থাকবে।”
রায়হান থমকালো।তবে যেন জানতো আয়েশা এই কথাটা বলবে। একটু পর আয়েশার দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,
—রোহিনী তোমার সাথে থাকবে যদি তুমি..”
আয়েশা কৌতূহল দৃষ্টিতে রায়হানের দিকে তাকালো। আয়েশা তাকাতেই রায়হান বলে উঠলো,
—রোহিনী তোমার সাথে থাকবে যদি তুমি আমার সাথে বাড়ি ফিরে যাও…..
চলবে…?
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
