#দ্বিতীয়_বউ
#পর্ব_১৫
#আলভিয়া_সামরিন_রায়া
আয়েশা ভোরেই উঠে পড়েছে। ছোট্ট একটা ব্যাগে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে। প্রতিটা কাপড় ভাঁজ করার সময় তার হাত কেঁপে উঠছে, যেন প্রতিটা ভাঁজে একটা করে স্মৃতি আটকে আছে। এই দিনগুলো আয়েশার জীবনে সবচেয়ে ভালো দিন ছিলো।”
রুমের দরজায় হালকা শব্দ হতেই আয়েশা ঘুরে তাকালো।
আরিফ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চোখেমুখ দেখে মনে হচ্ছে সারারাত ঘুমায় নি। চোখে ক্লান্তি আর অদ্ভুত একটা শূন্যতা ভেসে আছে।
আরিফ ছোট করে বলে উঠলো,
—আপনি এত সকালে চলে যাবেন?”
আয়েশা নরম গলায় বললো,
—হ্যাঁ। যত তাড়াতাড়ি চলে যাবো, ততই ভালো।”
—আপনি কি মনে করেন, আপনি এখান থেকে চলে গেলে আপনার জীবনের সব সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে?”
আয়েশা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
—সব ঠিক হবে না। কিন্তু আপনার সমস্যাটা অন্তত কমবে।”
আরিফ মৃদু হেসে মাথা নাড়লো,
—সমস্যা তো মনে হয় বাড়বে, যখন…”
—যখন কী?”
—যখন আপনি থাকবেন না।”
আয়েশার স্থির দৃষ্টিতে আরিফের দিকে তাকিয়ে রইলো।আরিফ তাকাতেই আয়েশা দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিলো,
—একজন অচেনা মানুষ কারো বাড়িতে এতো দিন থাকা শোভা পায় না। দশজন মানুষে দশ রকমের কথা বলবে।”
আরিফ এবার একটু কাছে এগিয়ে এসে নরম গলায় বললো,
—আপনি চাইলে সারাজীবন এখানে থাকতে পারেন।”
কথাটা শুনে আয়েশার বুকটা হালকা কেঁপে উঠলো। কিন্তু নিজেকে শক্ত করে বললো,
—না, এই জায়গা আমার না। এই জায়গায় আমার থাকার অধিকার নেই।”
আরিফ আর কিছু বললো না। শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো।
আয়েশা বলে উঠলো,
—আমাকে বাসার ঠিকানা টা দিন। আমি চলে যেতে পারবো।”
—আমি যাবো আপনার সাথে।”
আয়েশা ছোট করে বললো,
—লাগবে না। আপনার তো কাজ আছে।”
—আজ না-হয় কাজে যাবো না।’
আয়েশা বলে উঠলো,
—কিন্তু আপনার কাজে না গেলে..
একটু জোর করেই হাসলো আরিফ।
—সব কাজের চেয়ে ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ থাকে…”
আয়েশা আর বাধা দিলো না। ছোট করে বললো,
—ঠিক আছে। একটু পর বেরিয়ে যাবো।
—
আরিফের ঠিক করা বাসায় পৌঁছাতো দুপুর হয়ে এলো।
আরিফ ছোট্ট একটা বাসা পছন্দ করছে আয়েশার জন্য। দুই রুম, ছোট বারান্দা। খুব সাধারণ, কিন্তু পরিবেশটা বেশ শান্ত। আয়েশার বেশ পছন্দ হলো বাড়িটা।
বাড়িওয়ালা কথা বলে চলে যাওয়ার পর, আয়েশা ধীরে ধীরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। হালকা বাতাস বইছে।
—বাসা পছন্দ হয়েছে?”
আরিফ আয়েশার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো।
—ভালো… অন্তত নিজের মতো করে থাকা যাবে।”
—একা থাকতে পারবেন?”
আয়েশা মৃদু হেসে বললো,
—একা থাকতে শিখে গেছি অনেক আগেই।”
আরিফ তাকিয়ে রইলো আয়েশার দিকে। মৃদু স্বরে বললো,
—সবাই একা থাকতে পারে না…”
আয়েশা এবার চুপ হয়ে গেল। আরিফ আবার বলে উঠলো,
—আপনি চাইলে…
আয়েশা থামিয়ে দিলো,
— আপনি আর কিছু বলবেন না। এমনিতে ও অনেক করেছেন আমার জন্য।”
আরিফ দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
—আপনি কি কখনো নিজের জীবনকে আরেকটা সুযোগ দেওয়ার কথা ভাববেন?”
— সুযোগ তো দিলাম।সবসময় অন্যের কথাই ভেবেছি… এই প্রথম নিজের জন্যই একটা সিদ্ধান্ত নিলাম।দেখি কী হয়..
আরিফ মাথা নেড়ে বললো,
—তাহলে একটা কথা মনে রাখবেন…”
—কী?
—আপনি একা না। কখনো যদি মনে হয় আমার দরকার… আমি আছি। প্রয়োজন পড়লে ডাকবেন।”
আয়েশার চোখ ভিজে উঠলো। ছোট করে বললো,
—ধন্যবাদ…
আরিফ আর কিছু বললো না।দু’জনেই চুপ হয়ে গেল।
হঠাৎ আয়েশা হেসে বললো,
—আপনি জানেন? আপনার সাথে কথা বললে মনে হয়… সব ঠিক হয়ে যাবে।”
আরিফ মৃদু হাসলো। কোমল স্বরে বললো,
—তাহলে আমার সাথে থাকুন না… সব ঠিক হয়ে যাবে।”
আয়েশা উত্তর দিলো না। বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলো। একটু পর বলে উঠলো,
—সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে রোহিনীকে আনতে যাবো। আসতে দিবে কি না বুঝতে পারছি না।
আরিফ ছোট করে বললো,
—গিয়ে দেখুন কী হয়।”
—আপনার টাকা আমি অল্প অল্প করে দিয়ে দিবো।”
আরিফ কিছু বললো না। আয়েশা আবার বলে উঠলো,
—আপনি এখন চলে যাবেন?”
আরিফ আয়েশার দিকে তাকিয়ে বললো,
—চলে যেতে বলছেন?”
—না। আমি তো শুধু..”
আরিফ সামান্য হেঁসে বললো,
—চাপ নেবেন না। আমি এমনিতে বলেছি। আসছি আমি।”
আরিফ আয়েশার সাথে আরো কিছু দরকারী কথা বলে বেরিয়ে গেলো।”
—
মেহরীন ফোনে মায়ের সাথে কথা বলছে।
—রায়হান অফিসে চলে গেছে?”
—হুম। একটু আগে।”
ওপাশ থেকে মেহরীন এর মা বলে উঠলো,
—তোকে কে বলেছে চাকরি ছাড়তে? আর মেয়েটা কে ওর আগের বউ নিয়ে যেতে চাইছিলো নিতে দিলি না কেনো?”
মেহরিন তেজী গলায় বললো,
—আমি তো ভেবেছিলাম যদি রোহিনীকে নিয়ে যায় তাহলে রায়হান তো বারবার রোহিনীকে দেখতে যেতো। ওদের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে ভেবেই তো নিতে দিলাম না। এখন তো এই মেয়েকে আমার দেখা লাগছে। সব কিছু ছেড়ে এখন অন্যর মেয়েকে দেখাশুনা করা লাগছে।”
মেহরীন এর মা একটু চুপ থেকে ঠান্ডা গলায় বললো,
—বাচ্চা নিয়ে নে দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। রায়হান তোর হাতের কাছে থাকবে।আর রোহিনীকে আগের বউয়ের কাছে দিয়ে দে।”
মেহরিন ক্ষিপ্ত স্বরে বললো,
—বাচ্চা হবে কী করে মা।রায়হান তো আমার কাছে আসতে চাই না। আজকে কতগুলো দিন মেয়ের সাথে থাকে। আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে রায়হান ওই আয়েশার কাছে আবার ফিরে যেতে চাইছে।”
মেহরিন এর মা বলে উঠলো,
—রোহিনী কোথায়?”
মেহরিন বিরক্ত গলায় বললো,
—আছে কোথাও। অনেকদিন তো স্কুলে যাচ্ছে না। রায়হান বললো আমাকে দিয়ে আসতে। আমি সোজা না করে দিয়েছে। এবার যা খুশী করুক। সারাদিন এই মেয়ে খাবে। একটু পর খিদে পেয়েছে খিদে পেয়েছে বলবে। যতসব।”
মেহরিন এর মা আরো কিছু কথা বলে ফোন রেখে দেয়।মেহরিন রুমের বাইরে বের হয়ে দেখতে পায়,
রোহিনী চুপচাপ বসে আছে। চোখ গুলো লাল হয়ে আছে।
মেহরীন বিরক্ত হয়ে একপাশে ফোন ছুঁড়ে রেখে বললো,
— সারাদিন এইভাবে বসে থাকলে চলবে? তুই তো এত ছোট ও না। ঘর টা ঝাড়ু দিয়ে দে।”
রোহিনী আস্তে বললো,
—আমি তো পারি না।”
—কি পারবি তুই।সারাদিন খাওয়া ছাড়া। আমি রান্না করবো নবাবজাদি বসে বসে খাবে তাই না? এটা আর হবে না।”
মেহরিন রান্নাঘর থেকে ঝাড়ু নিয়ে এলো। রোহিনীর হাত ধরে টান দিয়ে দাঁড় করালো। রোহিনীর হাতে দিয়ে বললো,
—ভালো করে ঝাড়ু দিবো। কোথাও যাতে ময়লা না দেখি।”
—আমি পারবো না”
কথাটা শেষ করার আগেই মেহরীন চিৎকার করে উঠলো,
—এত সাহস তোর? আমার কথার উপর কথা বলছিস? মেহরীন এগিয়ে এসে রোহিনীর গাল চেপে ধরলো।”
রোহিনী কাঁপতে কাঁপতে পিছিয়ে গেল।
—আমি করছি..”
মেহরিন বলে উঠলো,
—যা।”
রোহিনী ছোট হাত দিয়ে ভালো ভাবে ঝাড়ু ধরতে পারছে না।অল্প একটু করে হাঁপিয়ে পড়লো। মেহরীন পাশে দাঁড়িয়ে আদেশ দিচ্ছে।
—টেবিলের পাশে ফুলের টব গুলো মুছে দে।এর পর জায়গাটা ঝাড়ু দিয়ে দে।”
রোহিনী ঝাড়ু নিয়ে এগিয়ে গেলো। পাশে ঝাড়ু রেখে ফুলের টবে হাতে নিলো। সবে ফুলের টব টা সাইডে রাখতে যাবে তখনই রোহিনীর হাত ফসকে ফ্লোরে পড়ে গেলো।
শব্দ শুনে মেহরীনের চোখ লাল হয়ে উঠেছে। এগিয়ে গিয়ে বললো,
—তুই কী করেছিস? এটার দাম কত জানিস? তোকে তো…
রোহিনী ভয়ে কাঁপতে লাগলো।
—আমাকে মেরো না। ইচ্ছে করে ফেলেনি।”
মেহরিন গর্জে উঠে বললো,
—মারবো না! দেখ তোকে কী করি। তুই আমার সুখ শান্তি শেষ করে দিয়েছিস। তোকে তো..
মেহরীন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে টেবিলের ওপর থাকা ফুলের টবটা তুলে নিলো।
রোহিনী সাথে সাথে ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো।
—সব তোর জন্য হয়েছে! তোর জন্য রায়হান আমার সাথে থাকে না। রায়হান কে আমার থেকে তুই দূরে সরিয়ে দিয়েছিস।
এই বলে এক ঝটকায় মেহরীন ফুলের টবটা রোহিনীর মাথা বরাবর ছুঁড়ে মারলো। ছোট্ট শরীরটা দুলে উঠে মেঝেতে পড়ে গেল।”
রোহিনীর মাথা থেকে ধীরে ধীরে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সাদা ফ্লোর রক্তে লাল হয়ে গেছে।
মেহরীন প্রথমে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর হঠাৎ যেন হুঁশে ফিরে এলো।
—এই… এই ওঠ। নাটক করছিস কেনো?
চলবে…
