#দ্বিতীয়_বউ
#পর্ব_১৮
#আলভিয়া_সামরিন_রায়া
রায়হানকে হাসপাতালে আনা হয়েছে।ইতিমধ্যে ট্রিটমেন্ট শুরু হয়েছে। রায়হানের ফোন থেকে কয়েকজন কল দেওয়া হয়েছে। তবে কেউ কল রিসিভ করে নি। অনেক ক্ষন চেষ্টা করার পর একজন ফোন রিসিভ করেছে তাকে জানানোর পর তিনি দ্রুত আসবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।
—পেশেন্টের সাথে উনার বাড়ির লোক কে আছেন?”
কয়েকজন লোক অপারেশন থিয়েটারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে একজন বলে উঠলো,
—আমরা তো উনার বাড়ির লোক না। রাস্তা থেকে উনাকে নিয়ে এসেছি।”
নার্স বলে উঠলো,
—উনার বাড়ির লোক কে খবর দেওয়া হয়েছে?”
মধ্যবয়স্ক একজন লোক বলে উঠলো,
—উনার খালা কে বলা হয়েছে। আসছেন বললো।
নার্স কঠিন স্বরে বললো,
—আরেকবার কল দিন। উনার অবস্থার অবনতি হচ্ছে।”
এই বলে নার্স চলে গেলো।একজন লোক বলে উঠলো,
—এখন তো কল যাচ্ছে না। কি মানুষ রে বাবা এই খবর শুনার পর তো হাজার বার কল করার কথা। আর উনার মোবাইলে একটা ও কল আসছে না।কী অদ্ভুত!”
সেটাই তো দেখছি। লোকটা মনে হয় বাঁচবে না।আর বাঁচলে ও সারাজীবন অন্যর কাঁধে ভর দিয়ে চলতে হবে।কয়েক মিনিটের মধ্যে কী হয়ে গেলো।হায় আল্লাহ…”
লোকগুলো নিজেরা হা-হুতাশ করতে লাগলো। আরো এক দেড় ঘন্টা পর মুনতাহা বেগম এসে উপস্থিত হলেন। একজন নার্সকে জিজ্ঞেস করতেই নার্স অপারেশন থিয়েটারের সামনে যেতে বললো।”
মুনতাহা বেগম ছুটে এলো। মধ্যবয়স্ক লোকটি বলে উঠলো,
—আপনি উনার খালা?”
মুনতাহা বেগম উদ্বিগ্ন গলায় বললো,
—হ্যাঁ। এখন কেমন আছে রায়হান?”
আরেকজন লোক বলে উঠলো,
—ডাক্তার সব বলবে আপনাকে। আমরা এতক্ষণ ধরে আপনার অপেক্ষা করছিলাম।এই ধরুন উনার মোবাইল।রাস্তায় আরো অনেক খাবার পড়ে ছিলো। ওগুলো আনা হয় নি।
মুনতাহা বেগম বলে উঠল,
—আমার বাড়ি দূরে কি-না।আর আপনাদের ধন্যবাদ ওকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। এখন রায়হান সুস্থ হবে কি-না কে জানে।”
বলতে বলতে মুনতাহা বেগম ঠুকরে কেঁদে উঠলেন।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি বলে উঠলো,
—এখন কেঁদে লাভ নেই। উনার ও দোষ ছিলো না। বাইক হঠাৎ করে চলে আসায় উনি ঘাবড়ে গেছে। বাইকের ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলে হুট করে ট্রাক চলে আসে। উনার ভাগ্য এটা লিখা ছিলো। ডাক্তারে কি বলে দেখুন। আর এই উনার মোবাইল আর ম্যানিব্যাগ রাখুন আপনার কাছে। আমাদের ও এবার যেতে হবে।”
মুনতাহা বেগম হাত বাড়িয়ে জিনিসগুলো নিলেন। উনারা আরো কিছুক্ষন কথা বলে বেরিয়ে গেলেন। মুনতাহা বেগম মাথায় হাত দিয়ে টেবিলের উপর বসে রইল। নিজের মোবাইল থেকে কয়েকবার মেহরিন এর কাছে কল দিলেন। কিন্তু মেহরীন একবার ও ফোন উঠালেন না।
—আপনি কী রায়হান সাহবের বাড়ি থেকে এসেছেন?”
মুনতাহা বেগম উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে গিয়ে বললো,
—হ্যাঁ।আমি ওর খালা। রায়হান এখন কেমন আছে?”
নার্স শান্ত স্বরে বললো,
—উনার তো জ্ঞান নেই। পা দুটো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।উনার মানিব্যাগ থেকে ডকুমেন্টস নিয়ে আমরা ফর্ম ফিলাপ করে দিয়েছি।আপনি এখানে সাইন করে দিন।”
মুনতাহা বেগম কাঁপা কাঁপা হাতে সাইন করে দেয়। নার্স কাগজ টা নিয়ে মুনতাহা বেগম কে বললো,
—আপনি আসুন আমার সাথে স্যার উনার টিট্রমেন্ট নিয়ে কথা বলবে।’
মুনতাহা বেগম কাতর স্বরে বললো,
—আমি একবার ওকে দেখবো।”
নার্স সামনে এগিয়ে বললো,
—আসুন।”
রায়হানের গলা অবধি চাদর টানা। হাঁটুর নিচে ফাঁকা। এখনো রক্ত পড়ছে। সাদা চাদর লাল হয়ে আছে।কপালের উপর কালো হয়ে আছে। রায়হানের এমন নিস্তেজ দেহ দেখে মুনতাহা বেগম শব্দ করে কেঁদে উঠলেন।
—রায়হান শুনতে পাচ্ছিস? উঠ না বাবা।তোর কিছু হয়ে গেলে তোর মেয়েটাকে কে দেখবে? তোর মা ও চলে গেছে এখন তোর কিছু হলে মেয়েটা তো একদম শেষ হয়ে যাবে। রায়হান।”
নার্স বলে উঠলো,
—আপনি এখানে কাঁদবেন না। আসুন আমার সাথে।”
মুনতাহা বেগম চোখের পানি মুছে বেরিয়ে এসে ডাক্তারের চেম্বারে গেলো।
—উনার ওয়াইফ নেই?”
মুনতাহা বেগম ছোট করে বললো,
—আছে।”
ডাক্তার আর বেশি ঘাঁটলেন না। মুনতাহা বেগম কে বলে উঠলো,
—দেখুন উনার অবস্থা সময়ের সাথে অবনতি হচ্ছে। উনার অপারেশন করাতে হবে।”
মুনতাহা বেগম বলে উঠলো,
—অপারেশন করে কী পা লাগিয়ে দিবেন?”
ডাক্তার মাথা নাড়লো।
—আপনাকে আমি বুঝিয়ে বলছি উনার মা হাঁটুর নিচ থেকে নেই। উনার বাম পায়ে হাঁটুর নিচে হাড্ডি বেরিয়ে আছে। এখন এটা অপারেশন করে ফেলে দিতে হবে। না-হয় এটা থেকে ইনফেকশন পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়বে। যত দ্রুত করা হবে উনার জন্য ভালো হবে।”
মুনতাহা বেগমের মাথা ঘুরে উঠলো।
—রায়হানের তো এখনো জ্ঞান ফিরে নি। আর কত টাকা লাগতে পারে?
ডাক্তার একটু ভেবে বললো,
—তিন বা চার ধরে রাখুন। আর জ্ঞান ফিরলে উনার বাকি ট্রিটমেন্ট শুরু করা হবে। আপনাদের আগে জানিয়ে রাখলাম আর কি।”
মুনতাহা বেগম শান্ত স্বরে বললো,
—আপনারা টাকার চিন্তা করবেন না। আমি দেবো টাকা। আমার ছেলেটাকে সুস্থ করে দিন।”
ডাক্তার মুনতাহা বেগম কে আশস্ত করে বললেন,
—আপনি চিন্তা করবেন না। ধৈর্য ধরুন।
মুনতাহা বেগম মাথা নাড়লো।আর কিছু না বলে ধীর পায়ে হেঁটে বাইরে বেরিয়ে এলো।
**
—মা। বাবা আজকে আসবে না?”
আয়েশা রান্না করছিলো এই কথাটা শুনে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখালো না।”
রোহিনী মোড়ায় বসে নুডুলস খেতে খেতে আবার জিজ্ঞেস করলো,
—মা।তুমি তো বলেছো বাবাকে বলবে আসতে। বলেছো?”
আয়েশা ধীর কন্ঠে বললো,
—কালকে আসবে তোমার বাবা। আমি জানিয়ে দিবো।”
রোহিনী ছোট করে বললো,
—আচ্ছা।”
তোমার হোমওয়ার্ক শেষ হয়েছে?”
রোহিনী বললো,
—হ্যাঁ।”
আয়েশা শান্ত স্বরে বললো,
—তাহলে এখন রুমে গিয়ে বাকি পড়া পড়ো। আরেকটু পরে আমি তোমাকে ভাত খাইয়ে দিবো। যাও।”
রোহিনী মাথা নেড়ে চলে গেলো। আয়েশা চুলার আঁচ কমিয়ে দিয়ে পাশ থেকে মোবাইল হাতে নিলো। কিছু একটা ভেবে আরিফের কাছে কল করলো। প্রথম বার কল কেটে গেল।আয়েশা মোবাইল সাইডে রেখে দিলো। পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে আয়েশার ফোন বেজে উঠলো। আয়েশা কল রিসিভ করে শান্ত স্বরে বললো,
—আসসালামু আলাইকুম।”
ওপর পাশ থেকে সাথে সাথে উওর এলো,
—ওয়ালাইকুমুস আসসালাম।”
এরপর আয়েশা কিছু বললো না। আয়েশা কিছু বলছে না দেখে আরিফ বলে উঠলো,
—আয়েশা আপনি কিছু বলবেন?”
আয়েশা একটু ইতস্ততভাবে বললো,
—না আসলে আপনাকে অনেক দিন ধরে কল দিবো ভাবছিলাম। আপনার টাকা..
আরিফ গম্ভীর স্বরে বললো,
—কত টাকা দিবেন তা একসাথে জমিয়ে রাখুন আমি একদিন এসে নিয়ে যাবো?”
আয়েশা ক্ষীণ স্বরে বললো,
—ঠিক আছে। আপনাকে বিরক্ত করা…
আয়েশার কথা শেষ হওয়ার আগেই আরিফ বলে উঠলো,
—আমি বিরক্ত হয় নি।”
আয়েশা ছোট করে বললো,
—রাখছি।”
আয়েশা কল কাটার আগেই আরিফ ডেকে উঠলো,
—আয়েশা।”
—বলুন শুনছি।”
আরিফ বলে উঠলো,
—আপনি কি হাসপাতালে?”
আয়েশা বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো।
—আমি হাসপাতালে কেনো থাকবো?”
আরিফ একটু থেমে বললো,
—আপনার এক্স হাসবেন্ড এক্সিডেন্ট করেছে।দু’টো পা বিছিন্ন হয়ে গেছে। তাই ভাবলাম… ”
আরিফ আর আয়েশার আওয়াজ শুনতে পেলো না।কেমন যেন নীরব হয়ে গেছে। আরিফ আয়েশাকে ডেকে যাচ্ছে। আয়েশা এখনো কলে আছে তবে কোনো সাড়া দিচ্ছে না।
অনেকক্ষণ কেটে যাওয়ার পর আয়েশা ছোট করে বললো,
—আচ্ছা।ফোন রেখে দিচ্ছি।”
—আপনার কষ্ট হচ্ছে?”
আয়েশা হালকা হেঁসে বললো,
—আমার বাচ্চার খুনীর জন্য আমার কষ্ট হবে?আমি তো নিজেই মারতে চেয়েছিলাম।আমার আল্লাহ শাস্তি দিয়ে দিয়েছে। জানেন, আমার ভীষণ শান্তি লাগছে।”
আরিফ ছোট করে বললো,
—রোহিনী?”
আয়েশা গম্ভীর স্বরে বললো,
—রোহিনী আমার মেয়ে। আমি যতদিন বাঁচবো রোহিনী ততদিন আমার সাথে থাকবে।”
আরিফ চুপ করে শুনলো। একটু পর ঠান্ডা গলায় বললো..
চলবে…?
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
