#দ্বিতীয়_বউ
#পর্ব_১৩
#আলভিয়া_সামরিন_রায়া
আয়েশা রোহিনীকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। আরিফ পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। একটু পর পর কঠিন দৃষ্টিতে রায়হানের দিকে তাকাচ্ছে।
রোহিনী দাদুর জন্য হাউমাউ করে কাঁদছে। আয়েশার চোখেও পানি জমে আছে। যতই হোক, এত বছর মায়ের মতো সম্মান করেছে মানুষটাকে।
মারিয়াম বেগম ছুটে এসে আয়েশার হাত ধরে বললো,
—বউ, আমার বোন তোমার কাছে মাফ চাওয়ার জন্য অনেক ছটফট করছে। বিশ্বাস করো। ওরে তুমি মাফ কইরা দাও। নাহলে ও কবরে গিয়াও শান্তি পাইবো না। তুমি আমারেও মাফ কইরা দাও। অনেক সময় তোমারে নানান ভালো-মন্দ কথা কইছি।
আয়েশা খানিকটা চমকে গেলে ও শান্ত স্বরে বললো,
—খালা, আমার মায়ের প্রতি কোনো রাগ নেই। আমি তাকে সম্মান করতাম। আর আপনার প্রতিও আমার কোনো রাগ নেই।
মারিয়াম বেগম চুপ হয়ে গেলেন। ঠিক তখনই কয়েকজন লোক বলে উঠলো,
—জানাজার সময় হয়ে গেছে। উনাকে নিয়ে যেতে হবে।
রায়হান উঠে দাঁড়ালো। চোখের পানি মুছে লাশের খাটিয়ার একপাশ ধরলো। আশেপাশের লোকজন এগিয়ে এলো। সবাই মিলে খাটিয়া কাঁধে তুলে মসজিদের দিকে রওনা দিলো।
রোহিনী “দাদু… দাদু…” বলে চিৎকার করে কাঁদছে। মারিয়াম বেগম মেঝেতে বসে মাথায় হাত দিয়ে বিলাপ করছে।
আরিফও তাদের সাথে মসজিদের দিকে চলে গেল।
আয়েশা রোহিনীকে কোলে নিয়ে এদিক-ওদিক হাঁটছে, কিন্তু কোনোভাবেই তাকে থামাতে পারছে না।
ঠিক তখন একজন মহিলা মেহরিনকে বললো,
—নতুন বউ, চা বানিয়ে দাও। বউ মানুষ এগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হয়।
মেহরিন বিরক্ত হয়ে বললো,
—আপনারা মরা বাড়িতে এসেছেন, বিয়ে বাড়িতে না। এত খাই-খাই কেন করছেন?
মহিলাটা থমথমে মুখে তাকিয়ে রইলো। আরেকজন মহিলা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
—আগের বউ ভালো ছিলো।
কথাটা শুনে মেহরিনের মুখ শক্ত হয়ে গেল। কিন্তু আশেপাশের মানুষের দৃষ্টি বুঝে সে নিজেকে সামলে নিলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নরম গলায় বললো,
—আমি চা করে দিচ্ছি।
তার আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখে সবাই একটু অবাক হলো। একজন মহিলা আয়েশা কে বলে উঠলো,
—বউ,তুমি ওই ছেলেটা কে বিয়ে করেছো?
আয়েশা টু শব্দ ও না করে অন্য সাইডে সরে গেলো।
সময় গড়িয়ে যায়। জানাজার নামাজ শেষ করে রায়হান আর আরিফ বাড়িতে ফিরে এলো। মারিয়াম বেগম আবার কেঁদে উঠলেন। আশেপাশের মানুষ নিজের বাড়িতে চলে গেছন। কয়েকজন আছে যারা নিজেদের মতো কথা বলছেন।
আয়েশা রোহিনীকে শক্ত করে ধরে রায়হানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
—আমি রোহিনীকে নিয়ে যেতে চাই।
রায়হান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তারপর ঠান্ডা গলায় বললো,
—ও কোথাও যাবে না।
আয়েশা অবাক হয়ে বললো,
—কেনো? ও আমার সাথে থাকলে ভালো থাকবে।
—আমি বলছি যাবে না মানে যাবে না। ও আমার মেয়ে।
আয়েশার বুকটা কেঁপে উঠলো।
—আমি কি ওর খেয়াল রাখি নি? এতবছর ধরে কে মানুষ করেছে ওকে?
রায়হানের চোখে কঠিন দৃষ্টি নেমে এলো।
—এখন থেকে আমি রাখবো। তোমার আর দরকার নেই।
এই কথা শুনে আয়েশার চোখ ভিজে উঠলো। রোহিনী তার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।
এদিকে মেহরিন ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। সবার সামনে শান্ত স্বরে বললো,
—আপা, আপনি চাইলে মাঝে মাঝে এসে দেখতে পারবেন। আমি ওকে নিজের মেয়ের মতোই রাখবো।
তার কণ্ঠে মায়া মিশ্রিত, মুখে নরম হাসি। যেন সে সত্যিই ভালো হতে চাইছে। নাকি অন্য কিছু পরিকল্পনা করেছে?
একজন মহিলা ফিসফাস করে বলতে লাগলো,
—নতুন বউটা তো ভালোই মনে হচ্ছে…
আয়েশা চুপ করে সব শুনছে। হঠাৎ মেহরিন নিচু হয়ে রোহিনীর গালে হাত বুলিয়ে দিলো। খুব মিষ্টি গলায় বললো,
—আমার কাছে থাকবে তো মা?
রোহিনী ভয়ে আরও শক্ত করে আয়েশাকে জড়িয়ে ধরলো। সেই মুহূর্তে আয়েশার চোখ মেহরিনের চোখের দিকে পড়লো। মেহরিনের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠলো।
আয়েশার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো।
সে বুঝতে পারলো,
রোহিনীকে ছেড়ে গেলে বড় একটা ভুল করে ফেলবে সে।কিন্তু কী করবে আয়েশা।
রায়হান ওকে যেতে না দিলে তো আয়েশা নিয়ে যেতে পারবে না।
আয়েশা রোহীনি কে নিয়ে আরেকটু হাঁটলো। রোহীনি ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পেরে সোফার উপর শুইয়ে দিলো।
আরিফ আয়েশার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মুখ বেশ গম্ভীর। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সবকিছু পর্যবেক্ষন করছে।
আয়েশা কিছু একটা ভেবে রায়হানের সামনে গিয়ে বলে উঠলো,
—আমি রোহিনীর সাথে প্রতিদিন দেখা করতে আসবো।
রায়হান কিছু বললো না। আয়েশা কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলো। রোহিনী সোফার উপর ঘুমাচ্ছে। আয়েশা রোহিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। ফিসফিস করে বললো,
—মা তোমাকে খুব তাড়াতাড়ি নিয়ে যাবো। মা একটা বাসা ঠিক করে নিয়ে তোমাকে নিয়ে যাবো। কয়েকটা দিন অপেক্ষা করো তুমি। আয়েশা রোহীনি কপালে চুমু দিয়ে উঠে পড়লো।
আয়েশা মেহরীন এর দিকে তাকিয়ে বললো,
—আপনি ওকে একটু দেখে রাখবেন।
মেহরিন ভীষন বিরক্ত তবে মুখে মেকি হাসি ঝুলিয়ে উওর দিলো,
—রাখবো।
আয়েশা আর কিছু না বলে আরিফের সামনে এসে দাঁড়ালো। শান্ত স্বরে বললো,
—চলুন।
আরিফ কোনো শব্দ না করে বেরিয়ে গেলো। আয়েশা ও পিছনে না তাকিয়ে বাইরের দিকে অগ্রসর হলো। কিন্তু, রায়হান তাদের যাওয়ার পথে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
রায়হান বুকে হাত দিয়ে উঠে বসলো।সোফার কাছে এসে রোহিনী কে কোলে তুলে নিয়ে সাহেরা বেগম এর রুমের দিকে এগিয়ে গেলো।
রায়হান রুমে এসে রোহিনী কে শুইয়ে দিলো। নিজে ও পাশে শুয়ে পড়লো।
রায়হান ছটপট করছে। কালকে তো এই সময়ে ও মা সাথে ছিল আজ এক দিনের ব্যবধানে মা কবরে শুয়ে আছে ভাবতেই বুকের ভেতর টা ভারী হয়ে উঠে।
রায়হান পাশ ফিরে রোহিনী কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।রায়হান মনে নানান চিন্তা ভাবনা আসে। রায়হান বিড়বিড় করে বলে উঠে,
রোহীনিকে কী আয়েশার কাছে গিয়ে দিবো?আয়েশা কে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যাবে। কিন্তু মেহরীন? ও তো শুরু থেকে রোহিনীকে পছন্দ করে নি।বাচ্চা মেয়েটার গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেছে।আর মেহরীন যদি অফিসে চলে যায় তাহলে রোহিনী বাড়িতে একা একা কী করে থাকবে।
এসব চিন্তা করতেই রায়হানের মাথা ঘুরে উঠে। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করে তবে ঘুম ধরা দেয় না।
–
আরিফের পূর্ণ মনোযোগ রাস্তার দিকে। তখন থেকে একটা সাউন্ড ও করেনি।আয়েশা চিন্তিত হলো।হঠাৎ কী হলে?
আয়েশা একটু নড়েচড়ে বসলো। আরিফের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলে উঠলো,
—কী হয়েছে আপনার?
আরিফ না তাকিয়ে উওর দিলো।
—কিছু না।
আয়েশা আবার বলে উঠলো,
—আমি বলছিলাম যে বাসা ঠিক করে..
আয়েশার কথা শেষ হওয়ার আগে আরিফ বিরক্তি নিয়ে বলে উঠলো,
—করেছি।কালকে সকালে বাসায় যেতে পারবেন।
আয়েশা থমথমে মুখে তাকিয়ে রইল। আর কিছু না বলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। আরিফ কপাল কুঁচকে ড্রাইভ করছে।
আরিফ কয়েকবার আঁড়চোখে আয়েশার দিকে তাকিয়েছে। তবে আয়েশা বাইরের দিকে তাকিয়েছিলো বিধায় বুঝতে পারে নি।
আরিফ নিজেও বুঝতে পারছে না কেনো এমন করছে।শুধু এতটুকো জানে রায়হানের দৃষ্টি ভালো লাগে নি।আয়েশার দিকে একটু পর পর কেমন যেন অদ্ভুত ভাবে তাকাচ্ছিলো।
বাড়ির সামনে এসে আরিফ গাড়ি থামালো। শান্ত স্বরে বললো,
—চলে এসেছি। নামুন।
আয়েশা চুপচাপ নেমে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লো।
আরিফ গাড়ি সাইডে রেখে ভিতরে ঢুকতে যাবে তখনই আয়শা এসে আরিফের উপর পড়লো।
আরিফ দুই হাত দিয়ে আয়েশাকে জড়িয়ে ধরে সামলে নিলো। আয়েশার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—কী হয়েছে…?
চলবে….?
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
#দ্বিতীয়_বউ
#পর্ব_১৪
#আলভিয়া_সামরিন_রায়া
আরিফ আয়েশাকে ঠিকভাবে দাঁড় করিয়ে বললো,
—আপনি ঠিক আছেন, আয়েশা?
আয়েশা হাঁপাতে হাঁপাতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
—উনি…
আরিফ কপাল কুঁচকে বললো,
—কে? ভেতরে আসুন।
আরিফ তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকে দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো, তার মা ( মমতা বেগম) দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ-মুখ শক্ত, ঠোঁট বাঁকা করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন ঝড় শুরু হওয়ার অপেক্ষা করছে।
আরিফ সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গলায় চাপা রাগ নিয়ে বললো,
—আপনি উনাকে ধাক্কা মেরেছেন কেনো?
মমতা বেগম তেড়ে এলেন,
—তুই এই মেয়ের জন্য আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিস, তাই না?
আরিফ দাঁত চেপে গর্জে উঠলো,
—মুখ সামলে কথা বলবেন। কেনো যোগাযোগ বন্ধ করেছি, সেটা আপনি ভালো করেই জানেন। আর কারও নামে মিথ্যা অপবাদ দিতে চিন্তা করবেন।
মমতা বেগম এবার আয়েশার দিকে ফিরলেন। চোখে ঘৃণা, কণ্ঠে বিষ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—এই তোর লজ্জা করো না? অন্যের বাড়িতে এসে উঠেছো! দেখে তো মনে হচ্ছে বিয়ে হয়েছে।স্বামী থাকতে অন্য পুরুষের বাসায় থাকছিস। লাজ লজ্জা নেই?
আয়েশা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। একটাও কথা বললো না। চোখের কোণে পানি জমলেও সে নিজেকে শক্ত রাখলো।
আরিফ হঠাৎ কঠিন গলায় বললো,
—আয়েশা, আপনি রুমে যান।
আয়েশা কারো দিকে না তাকিয়ে চুপচাপ রুমে চলে গেল।
আরিফ এবার মমতা বেগমের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো,
—আপনি এখানে কেনো এসেছেন?আপনি এখনই চলে যাবেন। আমি আর কোনো ঝামেলা চাই না।”
মমতা বেগম বলে উঠলো,
—এই মেয়ের জন্য তোর নিজের মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছিস? আমরা তোর কেউ না।তোর টাকা পয়সা দিয়ে বাড়ি করেছি বলে তোর এত রাগ। এখন অন্য মেয়ের পিছনে টাকা নষ্ট করছিস যে তার বেলায়?
আরিফ হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে এগিয়ে গিয়ে টেবিল থেকে ফুলের টব তুলে নিয়ে ফ্লোরে ছুড়ে ফেললো।
মমতা বেগম কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। ছেলের চোখের এই দৃষ্টি তিনি আগে কখনও দেখেননি।
তবুও নিজেকে সামলাতে না পেরে গর্জে উঠে বললো,
—ঠিক আছে, যাচ্ছি। কিন্তু মনে রাখিস, এই মেয়েই তোর সর্বনাশ করবে! কথা শেষ করে তিনি ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেলেন।
আরিফ কোমরে হাত দিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। এক হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
—
কিছুক্ষণ পর আরিফ ধীরে ধীরে রুমে ঢুকলো। আয়েশা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। নিঃশব্দে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে।
আরিফ খানিকটা কাছে এসে থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
—আমি… আমি দুঃখিত। আমার মায়ের জন্য…
আয়েশা ধীরে মাথা নেড়ে বললো,
—আপনাকে কিছু বলতে হবে না। আমি এসব শুনতে অভ্যস্ত।
কথাটা শুনে আরিফের বুকটা হালকা কেঁপে উঠলো।
আয়েশা একটু থেমে বললো,
—আমাকে কালকে বাসাটা দেখিয়ে দিবেন? আমি চলে যাবো।
আরিফ চমকে তাকালো,
—চলে যাবেন? কেনো? আরো কিছু দিন থাকলে..
—আপনার কাছে আমি এমনিতেই অনেক ঋণী। আপনাকে আর বিপদে ফেলতে চাই না।”
আরিফ কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা লাগলো।
—আপনি গেলে আপনার যদি কোনো অসুবিধা.. কথাটা শেষ করতে পারলো না আরিফ তার আগে
আয়েশা হালকা হেসে বললো,
—সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে যে কতটা কষ্ট লুকিয়ে আছে তা আরিফ ঠিকই বুঝতে পারলো।
—
সকালে ঘুম থেকে উঠে,
রোহিনী সোফার এক কোণে বসে আছে। মুখটা গম্ভীর, চোখে মুখ শুকনো।
রায়হান সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো।
—রোহিনী, তুমি আমার সাথে যাবে?
রোহিনী একটু নড়েচড়ে উঠলো।
—আমি মায়ের কাছে যাবো।”
রায়হান বলে উঠলো,
—নাহ। তুমি হয়তো আমার সাথে যাবে নাহলে বাড়িতে একা থাকবে।
রোহিনী যেতে চায় কিন্তু কিছু একটা তাকে থামিয়ে রাখছে। রোহিনী কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই মেহরিন এসে দাঁড়ালো। মিষ্টি গলায় বললো,
—না না, ও এখন কোথাও যাবে না। আমি ওর খেয়াল রাখবো।
আরিফ বেশ অবাক হলে ও শান্ত স্বরে বললো,
—আমি দেখে রাখতো পারবো রোহনীকে।
মেহরিন নরম স্বরে বললো,
—তুমি এত চিন্তা করছেন কেনো? আমি আছি না?
তারপর হঠাৎ বললো,
—আমি বরং চাকরি ছেড়ে দিবো। পুরো সময়টা রোহিনীর জন্য দেবো।”
আরিফ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
—তুমি চাকরি ছেড়ে দিবে?
—হ্যাঁ। একটা বাচ্চার জন্য মা হওয়াটাই তো সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। আমি নাহয় আজ থেকে সংসারী হয়ে উঠবো।”
এই কথা শুনে আরিফের মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠলো। মনে হলো হয়তো সে ভুল ভেবেছিল।
—তাহলে ঠিক আছে…
আরিফ রোহিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে অফিসের উদ্দেশ্য বেরিয়ে গেলো।
আরিফ চলে যাওয়ার পর মেহরিনের মুখের হাসিটা বদলে গেল। মেহরীন গিয়ে রোহীনীর পাশে সোফায় বসলো।
রোহিনী ধীরে ধীরে উঠে বললো,
—আমার খিদে পেয়েছে …
মেহরিন ফোনে ব্যস্ত থেকে বললো,
—রান্নাঘরে খাবার আছে। নিজে নিয়ে খাও।
রোহিনী থমকে দাঁড়ালো,
—আমি তো নিজে নিয়ে খেতে পারি না।
—তাহলে না খেয়ে থাকো।”
রোহিনীর চোখ ভিজে উঠলো। ছোট ছোট পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
চুলার পাশে গরম হাঁড়ি, ভারী প্লেট সবকিছু যেন ছোট রোহনীর জন্য যেন বিশাল ব্যাপার।
হঠাৎ রোহনীর হাত ফসকে একটা প্লেট পড়ে ভেঙে গেল। ঝনঝন শব্দে মেহরিন ছুটে এলো।
—এই! কী করেছো তুমি?
রোহিনী কাঁপতে কাঁপতে বললো,
—আমি… আমি…
একটা সজোরে থাপ্পড় এসে পড়ে রোহিনীর গালে।
—একদম অসহ্য মেয়ে! তোর মা পালালো তোকে নিয়ে যেতে পারলো না। আমার হয়েছে যত জ্বালা!
রোহিনী মেঝেতে বসে কাঁদতে লাগলো। মেহরিন নিচু হয়ে রোহিনীর কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
—শুন, কাউকে কিছু বলবি না। না হলে তোকে এমন জায়গায় পাঠাবো, যেখান থেকে আর কেউ তোকে খুঁজে পাবে না… বুঝেছিস?
রোহিনী স্তব্ধ হয়ে গেল মেহরীনের দিকে তাকিয়ে রইল।
–
রাত গভীর হয়ে এলো।
রায়হান ঘরে ঢুকে দেখলো রোহিনী চুপচাপ এক কোণে বসে আছে। চোখ লাল, গাল ফোলা।
—মা, কী হয়েছে? তোমার গালে লাল হয়ে আছে কেনো?
রোহিনী মাথা নিচু করে বললো,
—কিছু না…
দরজার পাশে মেহরীন দাঁড়িয়ে ছিলো। দ্রুত রুমে ঢুকে হালকা হেঁসে বললো,
—ও খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল। আমি সামলে নিয়েছি।”সামান্য ব্যাথা পেয়েছে। ঙ
রায়হান একবার তাকালো কিন্তু কিছু বুঝতে পারলো না।
খানিকক্ষণ রোহিনীর সাথে কথা বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
রায়হান ফ্রেশ হয়ে এসে রোহনীর রুমে যেতে লাগলো। তখনই মেহরীন এসে রায়হানকে জড়িয়ে ধরে বললো,
—কোথায় যাচ্ছো?
রায়হান বলে উঠলো,
—রোহিনীর রুমে যাচ্ছি।
ও তো ঘুমাচ্ছে? তাহলে কেনো যাচ্ছো?
রায়হান বিরক্ত হয়ে বললো,
—রোহিনী রাতে ঘুম থেকে উঠে গেলে ভয় পাবে।এখন মা নেই। কয়েকটা দিন আমাকে রোহীনির কাছে থাকতে হবে।
মেহরীন তেজী গলায় বললো,
—তাহলে আমার কী হবে?যদি মেয়ের সাথে থাকবে তাহলে আমাকে কেনো বিয়ে করেছো?
রায়হান অবাক হয়ে বললো,
—তুমি পরিস্থিতি বুঝতে পারছো না। এসময় দাঁড়িয়ে এই কথা বলতে বিবেকে বাঁধছে না?
না বাঁধছে না।আমি ভালো না থাকলে কাউকে ভালো থাকতে দিবো না।
রায়হান মেহরীন এর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,
—যা খুশী করো”
এই কথা বলে রায়হান রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।মেহরীন রায়হানের যাওয়ার পথে তাকিয়ে ক্ষিপ্ত স্বরে বললো,
—দেখো,তাহলে আমি কী করি।”
চলবে…
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
