#দ্বিতীয়_বউ
#পর্ব_১১
#আলভিয়া_সামরিন_রায়া
আরিফ চলে যাওয়ার পর হালিমা খালা নিচু গলায় বললেন,
— মা… একটা কথা বলি?
আয়েশা একটু এগিয়ে এসে বললো,
— বলুন।
বৃদ্ধা মহিলার চোখে যেন হালকা ভয় ভেসে উঠলো।
— এই বাড়িটা যতটা শান্ত দেখছো ততটা শান্ত না মা। এই বাড়িতে একটা বিরাট ঘটনা ঘটে গেছে।
আয়েশা অবাক হয়ে তাকালো,
— মানে?
হালিমা খালা চারদিকে একবার তাকিয়ে খুব আস্তে বললেন,
— আরিফ বাবুর মা খুব খারাপ মানুষ মা। ওই মহিলা যদি জানতে পারে যে এই বাড়িতে অন্য কেউ এসে থাকছে। তাহলে..
আয়েশার বুকের ভেতর হালকা কেঁপে উঠলো,
— আপনি কী বলতে চাইছেন?
ঠিক তখনই পেছন থেকে আরিফের গম্ভীর গলা ভেসে এলো,
— খালা!
দুজনেই চমকে তাকালো। আরিফ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বললো,
— আয়েশা, আপনি রুমে গিয়ে রেস্ট নিন। আপনার শরীর এখনো পুরোপুরি ঠিক হয়নি।
আয়েশা কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। তার মনে হাজারটা প্রশ্ন জমে আছে।কিন্তু এখন আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না।
আয়েশা ধীরে ধীরে নিজের রুমে চলে গেল।
রুমে ঢুকে দরজা লাগাতেই আয়েশা গভীর নিঃশ্বাস ফেললো। এই বাড়ির পরিবেশটা কেমন যেন অদ্ভুত।
কিন্তু হালিমা খালা যে বললো কী অজানা কথা রয়েছে।
বিছানায় বসে সে ভাবতে লাগলো,
—”আরিফ এর মায়ের সাথে কি সমস্যা?কেনে উনি পরিবার ছেড়ে আলাদা থাকে। তার জীবনে কী এমন ঘটেছে যার জন্য সে এখনো বিয়ে করেনি?”
“আয়েশার বুকের ভেতর অজানা একটা ভয় আর কৌতূহল একসাথে কাজ করতে লাগলো।”
—
রায়হাম চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে।অফিসের কাজে মন বসাতে পারছে না।অফিসে বসেও তার মন বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছিল।
ফাইলের দিকে তাকিয়ে থাকলেও চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে রোহিনীর মুখটা, চোখে পানি জমে থাকা ছোট্ট মেয়েটা। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠলো।
রায়হান মনে মনে ভাবলো,
—“আমি কি খুব বেশি রেগে গেলাম ওর ওপর?”
তারপরই আয়েশার কথা মনে পড়লো। এই একই পরিস্থিতিতে আয়েশা থাকলে কী করতো?
হয়তো রোহিনীকে কোলে তুলে নিতো। হাসিমুখে বলতো
—“চলো, আমার সাথে যাবে। তোমাকে বাইরে থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবো।আর রোহীনি ও হাসি মুখে আয়েশার হাত ধরে চলে যেতো।”
রায়হান চোখ বন্ধ করে ফেললো এক মুহূর্তের জন্য।
মনের ভেতর অদ্ভুত একটা অপরাধবোধ কাজ করতে লাগলো।
বিকেলে বাসায় ফিরতেই রায়হান একটা অস্বাভাবিক নীরবতা টের পেল। ড্রইংরুম ফাঁকা। রান্নাঘর থেকেও কোনো শব্দ আসছে না। রায়হান ভ্রু কুঁচকে ভেতরে ঢুকলো।
দেখলো, সাহেরা বেগম একা চুপচাপ বসে আছেন।
— কী হয়েছে মা?
সাহেরা বেগম ধীরে বললেন,
— কিছু না।
রায়হান চারদিকে তাকিয়ে বললো,
— রোহিনী কোথায়?
— নিজের রুমে।
রায়হান একটু থেমে বললো,
— আর মেহরিন?
সাহেরা বেগম নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
— ও রুমে আছে। দুপুর থেকে বেরই হয়নি।
রায়হানের মুখটা শক্ত হয়ে গেল।কিছু না বলে সোজা রোহিনীর রুমের দিকে গেল।
দরজা হাট করে খোলা।রোহিনী পুতুলটা কোলে নিয়ে চুপচাপ বসে আছে। আজ খেলছে না। শুধু পুতুল ধরে বসে আছে।
চোখদুটো লাল হয়ে আছে কান্নার কারনে।রায়হান ভালো করে খেয়াল করে দেখলো। রোহীনি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। রায়হানের গলা শুকিয়ে গেল।
রায়হান ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে বললো
— রোহিনী…
রোহিনী চমকে তাকালো। তারপর মাথা নিচু করে ফেললো।
— কী হয়েছে মা?
রোহিনী আস্তে বললো,
— কিছু না।
রায়হান এগিয়ে গিয়ে তার পাশে বসলো।
— আমার ওপর রাগ করেছো? রোহিনী কিছু বললো না।
শুধু মাথা নাড়লো, “না।” কিন্তু রোহিনীর চোখের পানি যেন সব বলে দিচ্ছে।
রায়হানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে মোচড় দিয়ে উঠলো।
সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে মাথায় হাত রাখলো।
রোহিনী একটু কেঁপে উঠলো কিন্তু সরে গেল না।
আজকে কত দিন পর এই ছোট মেয়েটা বাবার কাছ থেকে একটু আদর পেলো। এই ছোট্ট স্পর্শেই যেন তার ভেতরের জমে থাকা কষ্টটা ভেঙে পড়তে চাইছে।
__
আয়েশা বিছানায় শুয়ে আছে।কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই।
হঠাৎ করেই দরজায় হালকা শব্দ হলো। আয়েশা ছোট করে বললো,
—কে?
বাইরে থেকে উওর এলো।
—আমি।
আয়েশা উঠে বসলো।আরিফ এসে দরজার কাছে দাঁড়ালো। আয়েশা বললো
,
—আপনি ভেতরে আসতে পারেন।
না। আমি ঠিক আছি এখানে।আপনাকে একটা কথা জানাতে এলাম।
আয়েশা কৌতুহল নিয়ে তাকালো।
আরিফ বললো,
—আপনার জন্য একটা কাজের ব্যবস্থা করেছি। এনজিও তে। আপনি এই কাজটা করতে পারবেন?
আয়েশা খুশী হয়ে গেলো। হাসি মুখে বললো,
—পারবো। আর না -পারলে আমি শিখে নিবো।আপনাকে ধন্যবাদ।
আরিফ মাথা নেড়ে বললো,
—তাহলে ঠিক আছে। কালকে সকালে একটু তাড়াতাড়ি বের হতে হবে।আপনাকে ওখানে নিয়ে যেতে হবে আর আমার ও কাজ আছে। আপনি একটু তাড়াতাড়ি উঠে পড়বেন।
আয়েশা যে ভীষণ খুশী হয়েছে তার চেহারার আদল বলে দিচ্ছে। আয়েশা বললো,
—ঠিক আছে।
আরিফ আর কিছু না বলে বেরিয়ে গেলো।
–
রায়হান রুমে আসতেই দেখলো মেহরীন আলমারির জামা কাপড় গুলো একটা একটা ধরে নিচে ফেলছে।
রায়হান জিজ্ঞেস করলো,
—এসব কী করছো।
মেহরীন বিরক্ত গলায় বললো,
—তোমার আগের বউয়ের শাড়ি এখানে কেনো থাকবে। এগুলো ফেলে এসো।
রায়হান অবাক হয়ে যায়।
—আমি কেনো ফেলবো?তুমি বের করেছো।তুমি কোথায় রাখবে রেখে আসো।
মেহরীন তেজী গলায় বললো,
—শোনো তুমি আমাকে তোমার আগের বউ মনে করো না।যে তোমার সব কথা বিনা শব্দে মনে নিবে! আমার অধিকার আমি আদায় করে নিতে পারি।আর হ্যা কালকে সকালে আমাকে নিয়ে মার্কেটে যাবে। কিছু জামা কাপড় নিতে হবে।
রায়হান হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইল।কিছু না বলে ফেলে রাখা জামা কাপড় গুলো উঠিয়ে সাইডে রাখতে যাবে তখনই জামা কাপড় গুলোর ভেতর থেকে একটা ডায়েরি বেরিয়ে এলো।
রায়হান কৌতূহল বসত ডায়েরি টা খুলে দেখলো। ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠায় নাম লেখা,
—আয়েশা!
——
আয়েশা সকাল সকাল তৈরি হয়ে আরিফের সাথে বেরিয়ে গেলো। আরিফ প্রথমে আয়েশাকে এনজিও তে নামিয়ে দিলো। আয়েশা কে বললো,
—আপনি সব কিছু বুঝে নিন।আমি কয়েকঘন্টা পর এসে আপনাকে নিয়ে যাবো।
আয়েশা মাথা নাড়লো। আরিফ চলে যাওয়ার পর আয়েশা ভাবলো,
—আমি উনার এত ঋন কি করে শোধ করবো?
–
আমাদের সাথে রোহিনী কে নিয়ে গেলো কী সমস্যা মেহরীন? ও ছোট। এমনিতে তো আমার অফিসের জন্য ওকে কোথাও নিয়ে যেতে পারি না। মেয়েটা আজকে কয়েকদিন ধরে কেমন যেন হয়ে আছে।আজকে যদি যায় তো একটু ঘুরে আসবে। ওর ভালো লাগবে।
মেহরীন বিরক্ত গলায় বললো,
—দেখো,ওকে অন্য দিন নিয়ে যেও।আজকে আমরা আমাদের মতো যাবো। ও আমাদের সাথে গিয়ে কী করবে?
কিন্তু..
মেহরীন রায়হানকে আর কোনো কথা বলতে না দিয়ে বললো,
—আমি বাইরে আছি। তাড়াতাড়ি আসো।
এই বলে মেহরীন বেরিয়ে গেলো।রায়হান এর চোখে-মুখে অসহায়ত্ব ফুটে উঠলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজে ও রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
আয়েশার কাজ শেষ হওয়ার আগেই আরিফ চলে এসেছে।
আয়েশা চুপচাপ বসে আছে। আরিফ কয়েকবার আঁড়চোখে আয়েশা তাকিয়ে দেখছে। হঠাৎ আরিফ বললো,
—আপনার তো মনে হয় জামা কাপড় নেয় তেমন। সামনে একটা শপিংমল আছে।যাবেন?
আয়েশা তাকালো। একটু ভেবে বললো,
—না।আমার কাছে অত টাকা নেই। বাসায় উঠতে হবে। তাছাড়া আপনি তো কয়েকটা কিনে দিয়েছেন। আর লাগবে না।
আরিফ শান্ত স্বরে বললো,
—সমস্যা নেই। এখন আমার থেকে নিন।পরে বেতন পেলে আমায় না-হয় ফেরত দিয়ে দিবেন।
আয়েশা যাবে না যাবে না বলে শেষ পর্যন্ত রাজি হলো।তবে একটা শর্তে আরিফ কে টাকা ফেরত নিতে হবে। আরিফ অল্প হেঁসে মাথা নাড়লো।
আরিফ একটা শপিংমলের সামনে গাড়ি থামালো। আয়েশা আর আরিফ গাড়ি থেকে নেমে শপিংমলের ভিতরে গেলো।
আয়েশা কয়েকটা শাড়ি দেখতে লাগলো কম দামের মধ্যে। আরিফ পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের থেকে খানিকটা দূরে রায়হান আর মেহরিন জামা পছন্দ করছে।
রায়হনা বলে উঠলো,
—মেহরীন তুমি পছন্দ করো আমি বাচ্চা দের কালেকশন এর দিকে যাচ্ছি।রোহিনীর জন্য কয়েকটা জামা কাপড় নিয়ে আসি।
মেহরিন বিরক্ত হলো তবে কিছু বললো না। রায়হান আর কিছু না বলে বেবি কালেকশন এর দিকে অগ্রসর হলো।
রায়হান সামনের দিকে এগুতেই হঠাৎ থেমে গেল।
তার চোখ গিয়ে আটকে রইলো শপিংমলের কাঁচের দরজায়। স্বচ্ছ কাঁচে ভেসে উঠছে ভেতরের দৃশ্য। আর সেই দৃশ্যটাই যেন মুহূর্তে তার বুকটা কাঁপিয়ে দিল। রায়হান স্পষ্ট দেখতে পেলো….
চলবে…?
ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
#দ্বিতীয়_বউ
#পর্ব_১২
#আলভিয়া_সামরিন_রায়া
রায়হান কাঁচের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে স্থির হয়ে গেল। স্বচ্ছ কাঁচের ওপারে স্পষ্ট ভেসে উঠছে একটা পরিচিত অবয়ব… শাড়ি পরা, মাথা নিচু করে কাপড় দেখছে!
তার বুকটা হঠাৎ ধক করে উঠলো। চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেল সে।
—আয়েশা…?
অজান্তেই পা এগিয়ে গেল সামনে। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না যে মানুষটাকে সে নিজের জীবনের বাইরে ঠেলে দিয়েছিল, কয়েকমাস আগে যার মৃত্যুর খবর পেয়েছে, সে আজ ঠিক তার সামনে!
রায়হান দুকদম এগুতেই পিছন থেকে কেউ তার হাত শক্ত করে ধরে ফেললো।
—কোথায় যাচ্ছো?
রায়হান চমকে উঠে পিছনে তাকালো।
—আমি… আমি ওখানে…
মেহরিন ভ্রু কুঁচকে বললো,
—কি হয়েছে তোমার? এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন?
মেহরিন এর দিকে তাকালো রায়হান তবে সাথে সাথে নজর ফিরিয়ে আবার সামনে তাকালো।
কিন্তু… সেখানে কেউ নেই। শুধু ফাঁকা দোকান, কিছু অচেনা মানুষ।
রায়হানের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো।
—আমি কি ভুল দেখলাম…?
একটা অদ্ভুত খুচখুচানি তার মনের ভেতর রয়ে গেল।
মেহরিন বিরক্ত হয়ে বললো,
—আর কতক্ষন ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে।চলো ওদিকে।
রায়হান ছোট করে বললো,
—হুম..চলো..”
—
আয়েশা আর আরিফ শপিং শেষ করে গাড়িতে উঠে বসেছে।
গাড়ি ভেতরে নীরবতা বিরাজ করছে।আরিফ নিজেই বললো,
—আজকে আপনার দিনটা কেমন গেল?
আয়েশা হালকা হাসলো,
—ভালো। অনেকদিন পর মনে হলে আমি একটু ভালো থাকতে পারবো।
আরিফ মাথা নাড়লো।
—আপনি পারবেন। আপনার ভেতরে সেই শক্তি আছে।
আয়েশা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
—আপনি আমার জন্য যা করছেন… আমি কোনোদিন ভুলবো না।
আরিফ হালকা গলায় বললো,
—সব কিছুর একটা কারণ থাকে।
আয়েশা তাকালো তার দিকে।
—কারণ?
আরিফ সরাসরি উত্তর দিলো না। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো। যেন কিছু বলতে চেয়েও থেমে গেল।
–
বাড়িতে ফিরে মেহরিনের মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল। ছোট একটা ব্যাপার নিয়ে রোহিনীর উপর চড়াও হলো সে।
—কতবার বলেছি আমার জিনিসে হাত দিবি না!
কথা শেষ হতেই ঠাস করে একটা থাপ্পড় পড়লো রোহিনীর গালে।
রোহিনী হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।
সাহেরা বেগম দৌড়ে এসে বললেন,
—মেহরিন! তুমি কী করছো?
মেহরিন তেড়ে এসে বললো,
—আপনি চুপ থাকেন! আপনার নাতনিকে সামলাতে পারেন না, আবার আমাকে শেখাতে আসেন!
সাহেরা বেগম অবাক হয়ে বললো,
—ও ছোট মেয়ে! এভাবে মারতে পারো?
মেহরিন বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,
—ছোট বলে মাথায় উঠিয়ে রাখবো?
দুজনের মধ্যে তীব্র তর্ক শুরু হয়ে গেল। কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। রায়হান একটু আগে এসেছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সব কিছু দেখে চুপ করে রইলো। তার ভেতরে যেন কিছু একটা ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু সে কিছু বলার শক্তি পাচ্ছে না।
—
রাতে খাওয়া শেষ করে সবাই নিজ নিজ রুমে চলে গেছে।
রোহিনী কে জোড় করে ও খাওয়াতে পারে নি। সাহেরা বেগমের চোখে ঘুম এলো না। বিছানায় বসে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—আমি কী করে এত অন্যায় করলাম আয়েশার সাথে। তার চোখ ভিজে উঠলো।
—মেয়েটা কত ভালো ছিল… আর আমি? মেয়েটার অভিশাপ লেগেছে।
সাহেরা বেগম এর মনে বারবার ভেসে উঠতে লাগলো আয়েশার শান্ত মুখ, চুপচাপ সব কষ্ট সহ্য করা।
তারপর হঠাৎই রোহিনীর কথা মনে পড়লো।
—এই মেয়েটার ভবিষ্যৎ কী হবে…? কে দেখবে ওকে। বাবা থেকে ও অনাথ এর মতো দিন কাটাচ্ছে।মেয়েটা কে আগলে রাখবে?
সাহেরা বেগম এর বুকের ভেতর হঠাৎ করে তীব্র ব্যথা শুরু হলো।
—আহ…! তিনি বুকে হাত চেপে ধরলেন। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।জোরে শব্দ করে তিনি মেঝেতে পড়ে গেলেন।
শব্দ শুনে পাশের রুম থেকে রায়হান দৌড়ে এলো।
রায়হান রুমে এসে থমকে গেল সাহেরা বেগম কে দেখে। সাহেরা বেগম নিথর হয়ে পড়ে আছেন।
রায়হান সাহেরা বেগমের কাছে গিয়ে ডেকে উঠলো,
—মা,কি হয়েছে?
এরপর শব্দ করে মেহরিন কে কয়েকবার ডাক দিলো।তবে মেহরিন এর ঘুম ভাঙে নি। রোহিনী চোখ ডলতে ডলতে রুমে এলো।
দাদু কে পড়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সাহেরা বেগমের কাছে গিয়ে কেঁদে উঠলো,
—দাদু,উঠো।কি হয়েছে? তুমি রাগ করেছো?আমি ভাত খাবো তো তুমি রাগ করো না।উঠো।
রায়হান অবুঝ বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে রইল।কিছু একটা ভেবে দৌড়ে বাইরে চলে গেলো।
একটু পর কয়েকজন লোককে নিয়ে ভেতর এলো।
সবাই তড়িঘড়ি করে সাহেরা বেগম কে নিয়ে হাসপাতালে নিয়ে গেলো।
রায়হান রোহিনী কে নিয়ে যেতে না চাইলে ও রোহিনী এক প্রকার জোর করে হাসপাতালে এসেছে।
—
হাসপাতালের করিডোরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন লোক।
একটু দূরে রায়হান রোহিনী কে কোলে নিয়ে বসে আছে।
কিছুক্ষন পর ডাক্তার বের হয়ে এসে গম্ভীর গলায় বললেন,
—আমরা দুঃখিত। উনি অনেকক্ষণ আগে মারা গেছে।
এক মুহূর্তে যেন সব কিছু থেমে গেল। রায়হান পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। তার মুখে কোনো শব্দ নেই, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
রোহিনী এত যত্নে আগলে রাখা মানুষটাকে হারিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো।
—দাদু …!
রোহিনীর কান্না পুরো পরিবেশটা ভারী করে দিল। একজন লোক এগিয়ে এসে রোহিনী কে কোলে তুলে নেয়।
রায়হান শক্ত হয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল।
আয়েশার বুকের ভেতরটা সারাদিন ধরে অস্থির লাগছে। কোনো কাজেই মন বসছে না। বারবার রোহিনীর মুখটা মনে পড়ছে।
শেষমেশ সে সিদ্ধান্ত নিলো,
—আমি একবার ওকে দেখে আসবো।
রাতের অন্ধকারে চুপিচুপি বের হতে যাবে,ঠিক তখনই পিছন থেকে আরিফের গলা ভেসে এলো।
—কোথায় যাচ্ছেন?
আয়েশা থমকে দাঁড়ালো।
—আমি… একটু বাইরে।
আরিফ সামনে এসে দাঁড়ালো।
—রোহিনী মানে আপনার মেয়ের কাছে যাচ্ছেন, তাই তো?
আয়েশা চমকে তাকালো।
—আপনি জানলেন কীভাবে?
আরিফ শান্ত গলায় বললো,
—আপনার চোখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
—চলুন, আমি নিয়ে যাই।
আয়েশা অবাক হয়ে বললো,
—আপনি যাবেন?
আরিফ কিছু না বলে আয়েশার সামনে দিয়ে বেরিয়ে গাড়িতে বসলো। আয়েশা ও একটু ভেবে গাড়িতে উঠে বসলো।
গাড়ি থামলো রায়হানদের বাড়ির সামনে। বাড়িটার সামনে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে আছে।ভেতর থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।
আয়েশার বুক কেঁপে উঠলো।
—কী হয়েছে!রোহিনী ঠিক আছে তো?
আয়েশার যেন পা চলছে না। ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে গেলো। ভেতরে ঢুকতেই সে থমকে গেল।
সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা নিথর দেহ… পাশে বসে কাঁদছে রোহিনী।
আয়েশার চোখ বড় হয়ে গেল।
—কে…!
আয়েশার পা যেন আর এগোতে চাইছে না।
ঠিক তখনই রোহিনী চোখ তুলে তাকালো। আয়েশাকে দেখে থমকে গেলো
তারপর হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো,
—মা…!
দৌড়ে এসে আয়েশাকে জড়িয়ে ধরলো সে।
আয়েশার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো।আয়েশা রোহিনীকে কোলে তুলে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগলো। এই দৃশ্যটা দেখে চারপাশের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। তারা তো জানে আয়েশা মারা গেছে, তাহলে!
মেহরিন অবাক হয়ে আয়েশার দিকে তাকিয়ে আছে। রায়হান ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকালো। তার চোখ গিয়ে থামলো আয়েশার উপর। আর তার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা আরিফের দিকে। রায়হানের চোখে বিস্ময়, কষ্ট আর অজানা এক প্রশ্ন একসাথে ভেসে উঠলো…
চলবে…..?
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
