#হঠাৎ #দেখা (পর্ব ২)
সৌরনীল শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।ট্রেনের জানলার বাইরে কলকাতার আলোগুলো যখন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিল, ও বারবার ভাবছিল— “তিয়াসার ফোন নম্বর টা নিলে কী এমন ক্ষতি হতো?” মানুষের জীবন বোধহয় এই ছোট ছোট ভুলেরই এক বিশাল খতিয়ান। শিলিগুড়িতে পৌঁছে ও যখন কাজে যোগ দিল, উত্তরবঙ্গের শান্ত পরিবেশ ওকে আরও বেশি একা করে দিল। ডালহৌসির হাজারো মানুষের ভিড়, ট্রামের শব্দ আর রাস্তার ধারের চা— সবকিছু নিয়ে ব্যস্ত একটা শহর।
সৌরনীল অফিস থেকে ফিরে যখন ওর ছোট কোয়ার্টারের বারান্দায় বসত, সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘার আবছা ছায়া দেখা যেত। ও ডায়েরির পাতায় লিখত, “তিয়াসা, এই পাহাড়ের নিঃসঙ্গতা আমাকে পাগল করে দেয়। তুমি কি আজও কলকাতায় সেই একই পথে হাঁটো?” ও মাঝে মাঝে ভাবত কলকাতায় ফিরে যাবে, কিন্তু নতুন দায়িত্বের চাপে ছুটি পাওয়া ছিল খুব মুশকিল । ওর অফিসের সহকর্মীরা যখন জিজ্ঞেস করত, “সৌরনীল, তুমি এত আনমনা কেন থাকো সবসময়?” ও শুধু হেসে এড়িয়ে যেত। কীভাবে বোঝাবে, একঘণ্টার একটা পরিচয় কীভাবে ওর পুরো অস্তিত্ব দখল করে নিয়েছে!
এদিকে কলকাতার ছবিটা ছিল একদম আলাদা। তিয়াসা তখন পাগলের মতো সৌরনীলকে খুঁজছে। প্রথম প্রথম ও ভেবেছিল, হয়তো কয়েকদিন পর ডালহৌসিতে গেলেই দেখা হবে। ও অফিসের ছুটির সময়গুলোতে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সামনে, কারেন্সি বিল্ডিংয়ের মোড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত। প্রতিটি লম্বা গড়নের ছেলের দিকে একবার করে তাকিয়ে দেখত— যদি সেই চেনা চাউনিটা ধরা পড়ে। কিন্তু কলকাতার এই লক্ষ মানুষের মেলায় সৌরনীল যেন কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে।
একদিন তিয়াসা সেই ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মে গিয়ে একা একা বসে রইল। যেখান থেকে সে শেষবার সৌরনীলকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়েছিল। ও ভাবত, সৌরনীল কি ইচ্ছে করেই ওর সাথে আর যোগাযোগ করেনি? নাকি ও কোনো বিপদে পড়েছে?
তিয়াসার মা-বাবা ওর জন্য সম্বন্ধ দেখছিলেন। তিয়াসা জেদ ধরে বলত, “এখন বিয়ে করব না।” ও তো কাউকে বলতে পারছিল না যে ও একটা ছায়ার প্রেমে পড়েছে। এমন একটা মানুষ, যার ঠিকানা নেই, ফোন নম্বর নেই— আছে শুধু একরাশ কথা আর অনুভূতির টান। তিয়াসার এক বান্ধবী একদিন রেগে গিয়ে বলল, “তুই কি পাগল হয়েছিস তিয়াসা? ওই একদিনের আলাপকে আঁকড়ে ধরে জীবন নষ্ট করবি? কলকাতায় ওরকম কত মানুষ আসে আর যায়।” তিয়াসা শান্ত গলায় বলেছিল, “সবাই আসে আর যায় রে, কিন্তু ও তো আমায় খুঁজে নিয়েছিল। সেই চাউনিটা মিথ্যে হতে পারে না।”
সময় যত গড়াচ্ছিল, বিরহ তত গভীর হচ্ছিল। দুই বছর কেটে গেল। তিয়াসা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চুপচাপ। ওর গানের চর্চাও কমে গেছে। মাঝেমধ্যে গুনগুন করে গায় সেই একই গান— ‘এ পথে আমি যে চলি’। একদিন অফিসে কাজের চাপে তিয়াসা খুব হাঁপিয়ে উঠছিল। ওর বন্ধুরা মিলে ঠিক করল একটা লম্বা ট্রিপে যাবে। সবাই নর্থ বেঙ্গলের কথা বলল। তিয়াসার প্রথমে একদম ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু ওর বন্ধুরা ছাড়লো না- তাই বাধ্য হয়ে যেতেই হলো তাকে।
সৌরনীলও তখন খবর পেল তার এই ট্রান্সফারের মেয়াদ আরও বাড়ছে। ও হাল ছেড়ে দিয়েছিল। ও ভেবেছিল তিয়াসা হয়তো এতদিনে কারো ঘরণী হয়ে গেছে। হয়তো সে আর সৌরনীলকে মনেই রাখেনি। এই যে না পাওয়ার যন্ত্রণা, আর একই সাথে ফিরে পাওয়ার এক ক্ষীণ আশা— এই দোটানাতেই দুই বছরের বসন্ত কেটে গেল। তিয়াসা যখন শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে টিকিট কাটল, তখন সে জানত না যে ঠিক দুশো কিলোমিটার দূরেই কেউ একজন তার জন্য আজও ডায়েরির পাতা ভর্তি করে কবিতা লিখে চলেছে।
কলকাতার সেই মায়াবী সন্ধের অসমাপ্ত আলাপটা এবার এক পাহাড়ী প্রেক্ষাপটে নতুন করে ডানা মেলার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু দুজনের মাঝখানে তখনও ছিল এক বিশাল দূরত্বের দেওয়াল, যা কেবল বিধাতার এক ইশারাতেই ভাঙা সম্ভব।
চলবে……. (পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে)
কলমে -#SupriyaGhosh
