#যাঁতাকল (পর্ব ২)
রাত আড়াইটে। নীলাদ্রিকে কালকের মিটিংয়ের জন্য এক্সেল শিটে পনেরোটা নতুন ‘লিড’ তৈরি করতে হবে। কিন্তু ওর মন পড়ে আছে পাশের ঘরে। মা বোধহয় এখনো ঘুমাননি, থেকে থেকে ওনার কাশির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। নীলাদ্রি জানে, মা এই কাশিটা একটু বাড়িয়েই দেন যখন উনি চান ওনার অস্তিত্বের কথা সবাই মনে রাখুক।
পরদিন সকাল। কলকাতায় তখন ট্রাম-বাসের চেনা ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। নীলাদ্রি সকালে এক কাপ চা চেয়েছিল, কিন্তু রিয়া রান্নাঘরে চড়চড় করে সর্ষের তেলের ওপর ফোড়ন দিতে দিতে বলল, “তোমার মা তো আজ আবার নতুন বায়না ধরেছেন। বললেন শরীর ভালো নেই, ঠাকুরসেবাটা যেন আজ আমিই করি। একদিকে আমার অফিস যাওয়ার তাড়া, তার ওপর রান্নাবান্না, ঘর মোছা— এখন কি আমি ওনার সেবা করতে বসবো ?”
নীলাদ্রি ব্রাশ করতে করতে বেসিন থেকেই উত্তর দিল, “মা তো অসুস্থ বললে,তুমি একটু করে দিলে কী হয়? মা তো রোজই করেন।”
“মা রোজ করেন কারণ মায়ের আর কোনো কাজ নেই! কিন্তু আমার তো বাইরে বেরোতে হয়,” রিয়ার গলায় ঝাঁজ। ও একটা বেসরকারি স্কুলে পড়ায়, বেতন খুব একটা বেশি নয়, কিন্তু খাটুনি প্রচুর।
নীলাদ্রি ডাইনিং টেবিলে বসতেই মা থপ থপ করে এলেন। মুখটা শুকিয়ে আমসি। নীলাদ্রির পাতে রুটিটা দিতে দিতে বললেন, “কাল রাতে জলটুকু পর্যন্ত কেউ দিলো না নীলু। তুই ঘরে ঢুকে দরজা দিলি, আর তোর বউ ওদিকে মুখ ভার করে বসে থাকল। শেষমেশ রাতে বিস্কুট খেয়ে ওষুধটা খেলাম। আজ আমার শরীরটা বড়ই ম্যাজম্যাজ করছে, তাই বললাম যদি ও একটু সাহায্য করে। তা ভগবানকে ডাকা নিয়েও যদি ওর অত আপত্তি থাকে, তবে আর কী হবে!”
রিয়া হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল, ব্যাগটা কাঁধে ঝোলাতে ঝোলাতে বলল, “আপত্তি ভগবানকে নিয়ে নয় মা, আপত্তি আপনার এই ‘আমি ভুক্তভোগী’ সাজা নিয়ে। কাল রাতে আমি যখন আপনাকে ডাকলাম ডিনারের জন্য, আপনি উত্তর দিয়েছিলেন? দেননি। আপনি চান সবাই আপনার পায়ে পড়ে থাকুক।”
“আমি পায়ে পড়তে কেন বলব? আমি তো শুধু একটু সম্মান চেয়েছিলাম…” মায়ের গলা ধরে এল।
নীলাদ্রি হাত তুলে থামাল দুজনকে, “প্লিজ! সকালবেলা অন্তত ঝগড়া করো না। রিয়া, তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, তুমি যাও। মা, তুমি একটু বিশ্রাম নাও, আমি ঠাকুরকে সেবা দিয়ে বেরোচ্ছি।”
নীলাদ্রি যখন বাসে উঠল, ওর মনে হলো বাসের এই ভিড়, ঘামের গন্ধ আর কন্ডাক্টরের সাথে খুচরো নিয়ে বচসা— এগুলো বাড়ির ওই গুমোট পরিবেশের চেয়ে ঢের ভালো। অন্তত এখানে লড়াইটা স্পষ্ট, সম্পর্কের কোনো প্যাঁচ নেই।
অফিসের চেম্বারে ঢুকতেই বড়বাবুর হাঁকডাক শোনা গেল। নীলাদ্রিকে নিজের কেবিনে ডেকে বস রীতিমতো তর্জনী উঁচিয়ে শাসালেন, “নীলাদ্রি বাবু, আপনার ফাইলগুলো দেখলাম। কাস্টমার কল ব্যাক করছে না কেন? আপনি কি ফিল্ডে গিয়ে শুধু চা খেয়ে আড্ডা মারেন? আগামী সাত দিনের মধ্যে যদি তিনটে বড় পলিসি ক্লোজ না হয়, তবে কিন্তু রেজিগনেশন লেটারটা তৈরি রাখবেন। উই নিড পারফর্মারস, নট প্যাসেঞ্জার্স!”
পুরো দিনটা নীলাদ্রি পাগলের মতো কলকাতার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটল। চড়া রোদে ভবানীপুর থেকে সল্টলেক, তারপর আবার হাতিবাগান। ঘামে ভেজা পিঠের ওপর দিয়ে বারবার ব্যাগটার ফিতে ঘষা লেগে জ্বালা করছে। দুপুরের খাওয়া বলতে শুধু একটা রাস্তার ধারের দোকান থেকে পাউরুটি আর জল। প্রতিটা কাস্টমারের কাছে ও যেন করুণা ভিক্ষা করছে। কেউ বলছে, “পরে ভাবব,” কেউ তো মুখের ওপর ফোন কেটে দিচ্ছে।
বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধে হলো, নীলাদ্রি ধর্মতলার মোড়ে একটা চায়ের দোকানে বসে ছিল। ওর ফোনের ইনবক্সে রিয়ার মেসেজ এল— “আজ ফেরার পথে এক কেজি চিনি আর সাবান নিয়ে এসো।” তার ঠিক পাঁচ মিনিট পর মায়ের মেসেজ— “নীলু, আসার সময় আমার ক্যালসিয়ামের ওষুধটা নিয়ে আসিস। তোর বউকে বলতে ভয় লাগে, যদি আবার খোটা দেয় যে ওষুধের পেছনে অনেক টাকা যাচ্ছে।”
নীলাদ্রি ফোনের স্ক্রিনটা নিভিয়ে দিল। ওর মনে হলো ওর চারপাশটা যেন সংকুচিত হয়ে আসছে। অফিসের সেলস টার্গেট যেন একটা দড়ি হয়ে ওর গলায় চেপে বসছে, আর বাড়ির দুই নারীর এই টানাপোড়েন দড়িটার দুই প্রান্তে টান দিচ্ছে। মা-ও ভুল নন, রিয়াও হয়তো পুরোপুরি ভুল নয়। দুজনেই নিজের নিজের জায়গায় একা, আর সেই একাকিত্বের ঝাল তারা মেটাচ্ছে নীলাদ্রির ওপর।
ও ভাবল, আজ যদি ও বাড়িতে না ফেরে? যদি কোথাও নিরুদ্দেশ হয়ে যায়? কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল মায়ের ওষুধের স্ট্রিপ আর রিয়ার মাসের শেষে এলআইসি প্রিমিয়ামের কথা। মধ্যবিত্তের পলায়নের কোনো পথ নেই।
রাত নটা নাগাদ ও যখন বাড়ির দরজায় পৌঁছাল, দেখল দরজার বাইরে থেকেই রিয়ার উঁচু গলা শোনা যাচ্ছে, “আপনি আমার আলমারি খুলেছিলেন কেন মা? আমার পার্সোনাল ডায়েরি পড়ার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?”
মায়েরও পালটা জবাব, “আমি আবার কখন আলমারি খুললাম? আমি তো শুধু একটা চাদর খুঁজছিলাম। তোমার এত কিসের লুকোছাপা যে শাশুড়ি আলমারি ছুঁলেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়?”
নীলাদ্রি কলিং বেলটা বাজালো।ও জানে আজ ভেতরে ঢুকলে আবার একটা নতুন যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হবে। ওর পা যেন চলতেই চাইছে না। সিঁড়ির অন্ধকারে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ও বুকভরে একটা শ্বাস নিল। এই লড়াইয়ে জেতার কোনো উপায় নেই, শুধু হার স্বীকার করে নেওয়াটাই যেন নিয়তি।রিয়া দরজা টা খুলে দিলো।সামনেই দেখল রিয়া আর মা দুজনেই রণংদেহী মূর্তিতে দাঁড়িয়ে আছে ওর দিকেই তাকিয়ে । নীলাদ্রি কোনো কথা না বলে নিজের জুতোটা সশব্দে মেঝের ওপর ছুঁড়ে দিল। ওর ধৈর্যের বাঁধ যেন একটু একটু করে ভাঙতে শুরু করেছে।
চলবে……. (পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে)
কলমে -#SupriyaGhosh
