#ছোটো গল্প
#সন্দেহের চোরকাঁটা
মাহবুবা বিথী
মাহিন নিজের ভাগ্যের উপর প্রচন্ড বিরক্ত হয়। যতবার মিরাকে মারার প্লান করে ততবারই কোনো না কোনো বাঁধা এসে ওর সামনে দাঁড়ায়। কিন্তু ও ঠিক করে, একদম মাথা গরম করবে না। ঠান্ডা মাথায় এসব জটিল কাজ সমাধা করতে হবে। নিজেকে একথা বলে মাহিন সান্তনা দেয়। ওর মাথায় একটা বুদ্ধি আসে। সাথে সাথে দরজা লক করে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর একটা গোপন ক্যামেরা কিনে এনে বেডরুমের একটা জায়গায় সেট করে রাখে। যেখান থেকে পুরো ঘরটাকে নজরে রাখা যায়। এই কাজটা করতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। এ ছাড়া আর কোনো অপশন এই মুহুর্তে মাহিনের হাতে নেই। কেননা ও মনে মনে বিশ্বাস করে মাহিন যেহেতু আজ বাসায় থাকবে না সুতরাং মিরা এই সুযোগটা পুরোপুরি কাজে লাগাবে। নিশ্চয় ঐ লুইচ্ছাটাকে নিয়ে মিরা আজ এই বাসায় রাত কাটাবে। যদি এরকম কিছু ঘটে তাহলে ঐ আরহামের বারোটা ও বাজিয়ে দিবে। হোক নিজের বউ তাও ও ওদের মিলনের দৃশ্য ক্যামেরা থেকে ধারণ করে নেটে ছড়িয়ে দিবে। তখন আর কষ্ট করে ওকে আর খুন করতে হবে না। মিরা এমনিতেই খুন হয়ে যাবে।
মনে মনে মাহিন হাসতে থাকে। নিজের বুদ্ধিতে মাহিন অবাক হয়ে যায়। নীচে এসে একটা উবার নিয়ে মাহিন সন্ধা ছ’টায় রেডিসনের উদ্দেশ্য রওয়ানা দেয়। মিরপুর বারো নম্বর থেকে রেডিসনে পৌঁছাতে খুব বেশী সময় লাগে না। সাতটা বাজার আগে রেডিসনে পৌঁছে যায়।
এদিকে মিরার চোখ মাহিনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। ঘড়ির কাঁটায় সাতটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে মাহিন অনুষ্ঠানস্থলে এসে মিরাকে চমকে দেয়। ওকে দেখে আরহাম এবং উনার স্ত্রী মহুয়া চৌধুরী এসে ওয়েলকাম জানায়। মাহিন সবার সাথে হাসি মুখে কুশল বিনিময় করে। এরপর মিরার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,
—বেবিজান,আমি কিন্তু সাতটা বাজার আগেই চলে এসেছি। তুমি খুশী হয়েছো?
খুশীতে মিরার চোখদুটো পানিতে ভরে উঠে। মাহিন আঙ্গুল দিয়ে চোখের পানিটা মুছে দিয়ে বলে,
—আজকে তোমার কাঁদার দিন নয়। একদম কাঁদবে না।
এরপর মাহিন দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলে,
—মিরা একটা গুরুত্বপূর্ন কাজে আমাকে এয়ারে করে কক্সবাজার যেতে হচ্ছে। এয়ারপোর্টে প্রটোকল অফিসার অপেক্ষা করছে। আমি খুবই দুঃখিত।
মিরার মুখটা সাথে সাথে বিষাদে ঢেকে যায়। কিন্তু কিছু করার নেই। অগত্যা মাহিনকে বিদায় দেয়। মাহিন সবার কাছে বিদায় নিয়ে এয়ারপোর্টে চলে আসে। আসিফ আগে থেকেই এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে ছিলো। মাহিন উবার থেকে নেমে আসিফকে দেখে বলে,
—আমি যেন একটু দেরী করে ফেললাম।
—না স্যার,আজ প্লেন আধ ঘন্টা ডিলে হবে।
মাহিন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। ওরা বোডিংপাস নিয়ে যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে লাউঞ্জে অপেক্ষা করতে থাকে। ফোনটা বেজে উঠে। স্ক্রীনে তাকিয়ে মিরা ফোন দিয়েছে। রিসিভ করে মাহিন বলে,
—আমি পৌঁছে গিয়েছি। আর একটা কথা আরহাম ভাইকে বলো তোমাকে বাসায় নামিয়ে দিতে। এই রাতে একা উবার নিয়ে বাসায় যেও না। আমার খুব টেনশন হয়।
মাহিনের এই কেয়ারিং দেখে মিরার চোখে পানি চলে আসে। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
—আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না। আমি ঠিকমতো বাসায় পৌঁছে যাবো। তুমি দোয়া পড়ে প্লেনে উঠবে।
—ওকে জান,তোমার আদেশ শিরোধার্য।
ফোনটা রেখে মাহিন প্লেনে উঠে। এদিকে মিরা ভাবে,মাহিন আবার আগের মাহিন হয়ে গিয়েছে। একটু খিঁটখিটে স্বভাবের হলেও বিয়ের পর মিরাকে খুব আগলে রাখতো। বাবা মায়ের মতের বাইরে গিয়ে ওকে বিয়ে করেছে। সেই থেকে ওদের সাথে মাহিনের কোনো সম্পর্ক নেই। সেই কারণে মিরাও এতো কিছুর পরে মাহিনকে ছেড়ে যেতে পারে না। এসব নানা ভাবনায় মিরার চোখদুটো পানিতে ভরে উঠে। আজ ও খুব আবেগপ্রবন হয়ে আছে। একটুতেই চোখে পানি চলে আসছে। ফোনটা রাখার সাথে সাথে মহুয়া আর আরহাম এসে মিরাকে বলে,
—গেস্টদের খাওয়া প্রায় শেষ। চলো আমরা খেতে বসি।
ওরা এসে খাবার টেবিলে বসে। কিন্তু খাবারের গন্ধে মিরার গা গুলিয়ে উঠে। ও দৌড়ে বাথরুমে চলে যায়। বেসিনের উপর সাথে সাথে বমি করে ফেলে। আরহাম মহুয়াকে পাঠিয়ে দেয়। মিরা বমি করে মাথা ঘুরে পড়ে যাবার উপক্রম হয়। মহুয়া তড়িৎ গতিতে মিরাকে ধরে ফেলে। মিরা খুব নার্ভাস হয়ে যায়। কিন্তু মহুয়া চৌধুরী মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
—আলহামদুলিল্লাহ, নিশ্চয় আল্লাহপাক তোমার দোয়া কবুল করেছেন।
সাথে সাথে মিরার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠলো। চোখের পাতাটা আনন্দে অশ্রুতে ভরে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই মনটা বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
—কি ব্যাপার মনটা খারাপ করলে কেন?
মহুয়া চৌধুরীর কথার প্রেক্ষিতে মিরা বলে,
—আসলে টেস্ট না করা পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না।
মিরা বেসিনে পানি ঢেলে পরিস্কার করতে থাকে। মহুয়া ওকে বারণ করলো। কিন্তু মিরার অস্বস্তি হচ্ছে। মহুয়া চৌধুরী এদিক ওদিক তাকিয়ে একজন ক্লিনার দেখতে পেলো। তাকে কিছু বখশিস দিয়ে বেসিনটা ক্লিন করতে বলে মহুয়া মিরাকে নিয়ে হলরুমে চলে আসে। মিরা শুধু পানি খেল। আর একটু জুস মুখে দিলো। আর কিছু খেতে পারলো না। খাবারের গন্ধটা ভালো লাগছে না।
এখানকার সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রেডিসন থেকে মিরা বের হয়ে আসে। ওর পিছু পিছু আরহাম চৌধুরী এসে মিরাকে বলে,
–+তোমার আজ একা যাওয়া ঠিক হবে না। আমরা বাসায় নামিয়ে দিবো। কি বল মহুয়া?
—হুম,অবশ্যই।
—আপনাদের দেরী হয়ে যাবে না? ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁই ছুঁই।
মিরার কথা শুনে মহুয়া বলে
—আমাদের নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। গাড়িতে উঠে বসো।
এরপর আরহাম চৌধুরী ড্রাইভিং সীটের পাশের সীটে বসে পড়ে। মহুয়া আর মিরা পিছনের সীটে বসে পড়ে। ড্রাইভার বাবুলকে আরহাম চৌধুরী মিরপুর বারো নাম্বারে যেতে বলে। মিরাকে ওর এপার্টমেন্টের নীচে নামিয়ে দিয়ে আরহাম চৌধুরী আর মহুয়া চৌধুরী নিজেদের বাড়ীর পথে রওয়ানা দেয়। ওদিকে মাহিন হোটেলে পৌঁছে নিজের মোবাইল অন করে। সেখানে ঐ ক্যামেরার লিংক দেওয়া আছে। লিংক ওপেন করে দেখে মিরা ঘরে ঢুকে ওয়াশরুমে গিয়ে ড্রেস চেইঞ্জ করে এসে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দেয়। এরপর মোবাইলটা নিয়ে কাকে যেন ফোন করে। তার সাথে অনেক্ষণ ধরে হেসে হেসে কথা বলে। মিরাকে খুব আর্কষণীয় লাগছে। পাতলা নাইটি পরিহিত মিরাকে দেখে বুঝা যাচ্ছে শরীরের কোথাও বাড়তি মেদ নেই। নিয়মিত জিম করা সাথে অফিসের উজ্জ্বল পারফর্মেন্স মাহিনকে উদ্বিগ্ন করে তুলে। ইদানিং মিরাকে হারানোর ভয় ওকে পেয়ে বসে।মিরার উন্নতি দেখে মাহিন নিজের মাঝে আত্মবিশ্বাসের অভাব বোধ করে। আরহাম চৌধুরীর সময় অসময়ে কল করা এরসাথে যোগ হয়। মিরা বলে অফিসের বিষয়ে ওরা কথা বলে। কিন্তু মাহিনের বিশ্বাস হয় না। তবে মাহিনের সামনে ওরা অফিসের কাজ নিয়েই কথা বলে। যাইহোক মাহিন যতক্ষণ জেগে ছিলো মোবাইলে মিরার দিকে দৃষ্টি রাখছিলো। একসময় মোবাইল অন রেখেই মাহিন ঘুমিয়ে পড়ে।
পরদিন ভোরে উঠে মাহিন মিটিং এ অংশ নেয়। এদিকে মিরার শরীরটা খারাপ থাকাতে আরহাম চৌধুরী ওকে ছুটিতে থাকতে বলে। মিরাও খুব ক্লান্ত অনুভব করে। তারপরও সকালে একটু বের হয়। ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে রক্ত আর ইউরিন দিয়ে আসে। নিজেও একটা প্রেগনেন্সি কীট নিয়ে বাড়ী চলে আসে। বাসায় এসে ড্রেস চেইঞ্জ করে ওয়াশরুমে গিয়ে টেস্ট করে দেখে দুটো লাল দাগ ফুটে উঠেছে। মিরা আনন্দে কেঁদে ফেলে। তবে মনে মনে একটা শঙ্কা কাজ করে। মাহিন যদি বলে এই সন্তান ওর নয় তখন ও কি করবে? কারণ মাহিন ওকে সন্দেহ করে। ও খুব সন্দেহবাতিক মানুষ। রুমে আসতেই ফোনটা বেজে উঠে। স্ক্রীনে তাকিয়ে দেখে মাহিন ফোন দিয়েছে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মাহিন বলে,
—গোলাপী থ্রিপিস টা তোমাকে বেশ মানিয়েছে।
মিরা অবাক হয়ে বলে,
—তুমি কিভাবে জানলে আমি গোলাপী থ্রিপিস পড়েছি?
মাহিন ক্যামেরার মাধ্যমে সবই দেখতে পারছে। অট্টহাসি দিয়ে বলে,
—মনের টান বুঝেছো বেবিজান।
মিরা সহজ সরল মনে মাহিনের কথা বিশ্বাস করে।
চলবে
চতুর্থ পর্ব
