#ছোট গল্প
সন্দেহের চোর কাঁটা
মাহবুবা বিথী
এরপর মিরা সেই ডাক্তারের কাছে যায়। উনি মিরাকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বলেন,মিরার ওজন কমাতে হবে। ঘরে বসে থাকলে তো ওজন কমবে না। অতএব জিমে ভর্তি হলো। মিরার ফোনটা বেজে উঠে। বারান্দায় বসে মাহিন সাথে সাথে নিজের কান খাড়া করে কথাগুলো শোনার চেষ্টা করে। মিরা নিজেকে সামলে নিয়ে ফোনটা রিসিভ করে বলে,
—হ্যা বলুন,
ওপাশ থেকে ডাক্তার সানজীদা বলে,
—আপু,আপনার রিপোর্টগুলো ভালো এসেছে। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহপাকের রহমতে খুব শীঘ্রই ভালো খবর পাবেন।
মিরা মনে মনে বলে,”ততদিন আমার সংসারটা টিকলে হয়।”
মিরা আর কথা বাড়ায় না। কিংবা কথা চালিয়ে যাবার মতো এই মুহুর্তে মানসিক অবস্থা নেই। ফোনটা রেখে মিরা নিজের অবসন্ন দেহটা টেনে নিয়ে ওয়াশরুমের ভিতরে চলে যায়। এবারও ফোনটা নিয়ে যায়। আয়নায় নিজেকে দেখে ওর বিদ্ধস্ত লাগে। গলার কাছে মাহিনের কামড়ের দাগগুলো স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। হাত দিতে মিরা যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠে। বুকে পিঠে কালশিটে দাগ ছড়িয়ে আছে। পুরো শরীর জুড়ে তীব্র যন্ত্রণা। মিরা শাওয়ার ছেড়ে গরমপানির ধারা দেয়। বেশ আরাম লাগে। দ্রুত গোসল শেষ করে বের হয়ে এসে পাশের রুমে চলে যায়। ওষুধের বাক্স থেকে প্যারাসিটামল বের করে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে আসে। গ্লাসে পানি ঢেলে আগে ট্যাবলেট দুটো খেয়ে ফেলে। তা,না হলে তীব্র ব্যাথায় শরীরে জ্বর চলে আসতে পারে।
আজ থেকে মাহিনের সাথে ও নিজের বিছানা আলাদা করে ফেলে। ওর সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। পোশাক চেইঞ্জ করে ক্লসেট থেকে কাপ্তান বের করে পরে নেয়।ওয়াশরুম থেকে ওজু করে আসে। আসরের নামাজ আদায় করে দরজা লক করে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। কিছুক্ষণ আগের ধাক্কাটা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে। দুচোখের পাতা সিক্ত হয়। মনে মনে নিজেকে বলে,ওর জন্য এই শাস্তিই প্রাপ্য ছিলো। যে সন্তান নিজের বাবা মায়ের মুখে চুনকালি মাখায় সেই সন্তানের এমন শাস্তিই প্রাপ্য।
মাহিন রুমে এসে দেখে মিরা দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছে। সাথে সাথে সন্দেহের বিষ ওর শরীরের রক্ত বিন্দুতে ছড়িয়ে পড়ে। ও মিরার রুমের দরজার কাছে কান খাড়া করে দাঁড়ায়। ও এপাশ থেকে ফোনের শব্দ শুনতে পায়। মাহিনও ওর সপ্ত ইন্দ্রিয় সজাগ করে মিরার কথাগুলো শোনার চেষ্টা করে। ফোন রিসিভ করে মিরা বলে,
—ভাইয়া বলেন,
–তোমার গলার স্বর এমন শোনাচ্ছে কেন? তুমি ঠিক আছো তো?
—জ্বী ভাইয়া আমি একদম ওকে আছি।
–কালকের প্রেজেন্টেশনের কথা তোমার মনে আছে।
–+জ্বী ভাইয়া,আমার মনে আছে।
–+রাতে একবার হোমওয়ার্ক করে নিও।
—জ্বী ভাইয়া,আমি খুব সকালেই অফিসে যাবো।
—আমি গাড়ী পাঠিয়ে দিবো।
—তার দরকার ছিলো না ভাইয়া।
—দরকার আছে। মাহিনও তো অফিসে যাবে। তুমি অফিসের গাড়ীতেই এসো।
ফোনটা রাখার সাথে সাথে মাহিন মিরার রুমের দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। নিজের ঘরে এসে দাঁত চিবিয়ে বলে,
—এতো কিছুর পরও মাগীর পীরিত কমলো না। নাহ্ ঐ মাগীকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। হয় তুই বেঁচে থাকবি না হয় আমি। তাও তোকে আমি অন্য কারোও হতে দিবো না।
সাথে সাথে মাহিনের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যায়। ও বাসা থেকে বের হয়ে লিফট দিয়ে বেইসমেন্টে নেমে পড়ে। এরপর গাড়ীর সামনের দুটো চাকার নাট ঢিলা করে রাখে। যাতে গাড়ী চালানোর সময় চাকা দুটো খুলে যায়। ও আবার বাসায় চলে আসে।
মাগরিবের আযান দেয়। চারিদিকে অন্ধকার নেমে আসে। মিরা ঘরের লাইটটা জ্বালিয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করে দরজা খুলে কিচেনে চলে যায়। কফি মেকারে কফি বানিয়ে আবার রুমে এসে দরজা লক করে ল্যাপটপ খুলে বসে। কালকের প্রেজেন্টেশনের কাজগুলো আবার রিচেক করে নেয়।
নিজের রুমে বসে মাহিন ভয়ঙ্করভাবে হাসে। মনে মনে বলে,শুধু তোর জন্য আজ পাঁচ বছর আমি ঘর ছাড়া। আমার বাবা মা থেকেও নেই। ভেবেছিলাম একটা সন্তান হলে বাবা মায়ের অভিমান ভেঙ্গে যাবে। অন্তত নিজের নাতি বা নাতনীর মুখের দিকে তাকিয়ে হয়তো তাদের মনটাও গলতে পারতো। সেদিক থেকে উনার কোনো হেলদোল নেই। উনি আছেন নষ্টামী করার নেশায়। পৃথিবীর এতো মানুষের সন্তান হচ্ছে। তোর হয় না কেন? কেমন করে হবে? কোথায় ঘরে বসে নামাজ কালাম পড়বে, দোয়া দরুদ পড়বে। নাহ্ সেদিকে উনার কোনো মনোযোগ নেই। বরং আমাকে বলে,”আমার পিছনে না লেগে তুমি নিজের টেস্ট করাও। তোমারও তো সমস্যা থাকতে পারে।”
মাগীর সাহস কত বড়! আমাকে উল্টো চাপে রাখার চেষ্টা করে। যাক কাল তোর মৃত্যু দিবস পালন করবো। তবে আজ ওর সাথে একটু নাটক করতে হবে।
রাতে মাহিন মিরা ঘরের দরজায় নক করে। প্রথমে মিরা পাত্তা দিতে চায় না। কিন্তু একসময় ওর কাজের ব্যাঘাত ঘটতে থাকে। তখন বিছানা থেকে নেমে মিরা দরজা খুলে বলে,
—সমস্যা কি তোমার? আমাকে কি একটু শান্তিতে থাকতে দিবে না?
মাহিন সাথে সাথে মিরা পায়ের কাছে বসে পড়ে। ওর পা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
—আমাকে এবারের মতো মাফ করে দাও মিরা। তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি।
মাহিন শক্ত করে মিরার পা দুখানা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। মিরা রেগে গিয়ে বলে,
—প্লিজ মাহিন উঠে দাঁড়াও। তোমার এসব নাটক দেখতে দেখতে আমি এখন ক্লান্ত। প্লিজ আমাকে একটু নিজের মতো থাকতে দাও।
এদিকে মাহিনের কান্নার বেগ বাড়তে থাকে। ও চোখের পানি আর নাকের পানি মুছে হাত জোড় করে বলে,
—আমাকে মাফ করে দাও মিরা। তুমি মাফ না করলে আমার জন্য আল্লাহপাক জাহান্নাম বরাদ্দ করবে।
—ঘটনা ঘটিয় যদি এতোই অনুশোচনায় ভুগো তাহলে ঐ ঘটনার পুনরাবৃত্তি কেন করো? যাও তোমাকে মাফ করে দিলাম।
বাঁদরের মতো লাফ দিয়ে দাঁড়ায় মাহিন। এরপর ওর দিকে তাকিয়ে বলে,
–তুমি আমার রুমে চলে আসলে ভাববো আমায় মাফ করেছো।
মিরা রেগে গিয়ে বলে,
—সেটা মনে হয় আর কখনও সম্ভব নয়।
মাহিন আবারও মাটিতে বসে মিরার পা দুটো জড়িয়ে ধরে কাঁদতে বসে। অগত্যা মিরা বাধ্য হয়ে বলে,
—ঠিক আছে। আমি কাজ শেষ করে রাতে আসবো। এখন আমাকে অফিসের কাজগুলো করতে দাও।
মাহিন আবার দাঁড়িয়ে তড়িৎ গতীতে মিরার ঠোঁটে চুমু খায়। মিরা আর ওর উপর রাগ করে থাকতে পারে না। হেসে বলে,
—পাগল একটা,
মাহিনও হাসতে হাসতে বলে,
–+পাগলে কিনা করে আর ছাগলে কিনা খায়,
কথাটা বলে একটা অদ্ভুত হাসি দিয়ে মিরার সামনে থেকে চলে যায়। ওর হাসিটা দেখে মিরার কেমন একটু খটকা লাগে। অনেকক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। এরপর ঘরে এসে ল্যাপটপে বসে পড়ে। এদিকে মাহিন একটু পর পর ওর রুমে যাওয়ার জন্য তাগাদা দিতে থাকে। এদিকে মাহিনের এরকম তাগাদা দেওয়াতে মিরা কাজে একটু ভুল হয়। সেটা সংশোধন করতে গিয়ে পুরো রাত পার হয়ে যায়। এদিকে মাহিন ওর জন্য অপেক্ষা করে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। রাত চারটার দিকে মিরার কাজ শেষ হয়। মিরা ল্যাপটপ বন্ধ করে বেডরুমে এসে দেখে মাহিন হাত পা ছড়িয়ে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। ওর মুখটা শিশুর মতো নিস্পাপ লাগছে। সেদিকে তাকিয়ে মিরা মনে মনে বলে,
—এই মানুষটাই আবার একসময় নরপিশাচের মতো ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিভাবে ওর পুরো শরীরটাকে ও আঘাত করতে থাকে। তখন দয়া মায়ার লেশ মাত্র থাকে না। ওযে কেন এভাবে খেপে উঠে মিরা বুঝতে পারে না।
দ্বিতীয় পর্ব
চলবে
