#পনেরো_টাকার_নোট (০২)
লেখা: ইফরাত মিলি
__________________
সামিরা ট্রেনে ওঠার অল্প ক্ষণ পরই ট্রেনটা স্টেশন ছেড়ে গেল। তাহমিদ চোখের সম্মুখে সব দেখলো, অথচ…
ফোন বেজে উঠলো হঠাৎ। বাবা কল দিয়েছে। নিশ্চয় এতক্ষণে টের পেয়েছে হবু পুত্রবধূ বাড়ি থেকে পালিয়েছে। কল রিসিভ করলো সে। বাবা জিজ্ঞেস করলেন,
“কোথায় তুমি? এখনো আসছো না কেন?”
তাহমিদ ভেবেছিল বাবা তাকে সামিরার পালিয়ে যাওয়ার খবরটা জানাতে কল করেছেন। কিন্তু বাবার কণ্ঠে অস্বাভাবিক কিছু টের পাওয়া গেল না। স্বাভাবিকই লাগলো কথা বলার ধরন। তবে কি সামিরা যে পালিয়েছে তা কেউ জানে না এখনো? এও কি সম্ভব? জিজ্ঞেস করলো,
“এখনো আশরাফ আঙ্কেলের বাড়িতে আছেন?”
“হ্যাঁ, এখানেই তো। তোমারও তো আসার কথা। তুমি কি আসছো না?”
তাহমিদ বুঝতে পারলো সামিরার পালানোর ব্যাপারে তারা এখনো পর্যন্ত কিছুই জানে না। কিন্তু বিষয়টা তো এতক্ষণ গোপন থাকার কথা না। তাহমিদের একবার বাবাকে সবটা জানিয়ে দিতে ইচ্ছা হলো, কিন্তু তারা কেউ কিছু টের পায়নি বলেও অবাক লাগছে। ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারছে না। তার নিজেকে গিয়েই ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে তো। সে ফোনে কিছুই জানালো না সামিরার পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে। বললো,
“হ্যাঁ, আমি পথেই আছি। পৌঁছে যাব শীঘ্রই।”
বাবা জলদি আসার তাড়া দিয়ে কল কাটলেন। তাহমিদ বাইক নিয়ে দ্রুত রওনা হলো শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে।
এ বাড়িতে এসে সদর দরজা খোলাই পেল। ভিতরে ঢুকে দেখলো মা-বাবা সোফাতে বসে আছে সামিরার মা-বাবার সাথে। এদের সাথে এই প্রথম সামনাসামনি দেখা হয়েছে তাহমিদের। এর আগে ফোনে কথা হয়েছে অবশ্য। তাহমিদ স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে সৌজন্য পর্ব সেরে নিলো তাদের সঙ্গে। এখানে সবকিছু ঠিকঠাকই আছে। এরা কেউ এখনো টের পায়নি যে সামিরা নেই, পালিয়েছে। মেয়েটা কীভাবে পালালো যে কেউ টেরই পেল না?
সামিরার মা, রাহিলা বেগম তাহমিদের জন্য নাস্তার প্লেটগুলো টেবিলে রাখতে রাখতে ডাকলেন তাহমিদকে।
তাহমিদ গেল না, জিজ্ঞেস করলো,
“সামিরা কোথায়? ওকে যে দেখছি না?”
সবার ঠোঁটে মিটি হাসি দেখা গেল।
এসেই নিজের হবু স্ত্রীর খোঁজ করাটা কি অদ্ভুত ব্যাপার হয়ে গেল? ঘটনাটা কি একটু বেশরম ধরনেরও? জানে না তাহমিদ। অত বাছবিচার করে কথা বলা সম্ভব নয় এখন।
রাহিলা বেগম বললেন,
“ও রুমে আছে। আগামীকাল ওর পরীক্ষা আছে তো, তাই পড়ছে। দাঁড়াও ওকে ডেকে আনছি। তুমি এসে বসো এখানে।”
রাহিলা বেগম ভিতরে চলে গেলেন মেয়েকে ডাকতে। তিনি গেলেন হাসি মুখে, তবে ফিরবেন মুখে অন্ধকার নিয়ে। এটা জানে তাহমিদ। কারণ, ভিতরে গিয়ে মেয়েকে পাবেন না। তার মেয়ে যে পালিয়েছে!
তাহমিদের ভাবনাই সত্য হলো, মিনিট কয়েক পর রাহিলা ফিরে এলেন মেয়ের রুম থেকে। চেহারায় ঘোর দুশ্চিন্তা। দিশেহারা হয়ে আছেন যেন। এসেই স্বামীকে ডাকলেন,
“এদিকে একবার এসো তো।”
আশরাফ হোসেন বুঝতে পারলেন কিছু একটা ঠিক নেই। তিনি কোনো প্রশ্ন না করেই ড্রয়িংরুম থেকে চলে গেলেন অন্দরে।
অস্বাভাবিক কিছু একটা যে ঘটেছে তা তাহমিদের মা-বাবাও বুঝতে পারলো। তারা এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে আলাপ শুরু করলো।
বেশ অনেকটা সময় পর সামিরার মা-বাবা ফিরে এলো। আশরাফ হোসেনের মুখখানি শুকিয়ে আছে। ঘটনা গুরুতর বুঝতে পারলো তাহমিদের মা-বাবা। তাহমিদের বাবা, হাফিজুর রহমান জিজ্ঞেস করলেন,
“কোনো সমস্যা হয়েছে ভাই?”
আশরাফ হোসেন কারো দিকে তাকাতে পারছেন না চোখ তুলে। এমন লজ্জায় পড়তে হবে কারো সামনে এ তিনি কখনো ভাবেননি। কথাটা তো আর লুকিয়েও রাখা যাবে না। বলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তিনি জানালেন,
“আসলে সামিরা বাড়িতে নেই!”
“বাড়িতে নেই মানে?” বিস্ময়ে জানতে চাইলেন তাহমিদের মা, “কিছুক্ষণ আগেও তো ওকে দেখলাম। এরপর রুমে গেল পড়াশোনা করবে বলে।”
তাহমিদ মনে মনে বললো, ‘পড়াশোনা না ছাই! পালাবে বলে রেডি হচ্ছিল।’
আশরাফ হোসেন বললেন,
“হ্যাঁ ছিল, কিন্তু কখন যেন বাড়ি থেকে চলে গেছে! পিছনের দরজা দিয়ে গিয়েছে সম্ভবত। আমরা এখানে কথা বলায় ব্যস্ত ছিলাম বলে টেরও পাইনি। আমি কী বলবো কী করবো কিছু বুঝতে পারছি না! ও কোথায় চলে গেছে কিছু জানি না! কল করেছিলাম। প্রথমবার কল ঢুকলো, কিন্তু এরপর ফোন বন্ধ।”
হাফিজুর রহমান দাঁড়িয়ে গেলেন। মাথার ভিতরটা ঘুরাচ্ছে তার। এলোমেলো লাগছে। বললেন,
“আপনার মেয়ে কি পালিয়েছে? এসব কী হচ্ছে আশরাফ ভাই? আর সাত দিন পর বিয়ে। দিন-তারিখ ঠিক, আত্মীয়স্বজন, পরিচিত যারা আছে সবাইকে জানানো শেষ, এখন এসব কী বলছেন? কী করবো এখন? আমার তো মান সম্মান খোয়া যাবে। আপনি এটা কী করলেন?”
আশরাফ হোসেন এতক্ষণে চোখ তুলে তাকালেন হাফিজুর রহমানের দিকে। বললেন,
“আরে আপনি তো এমনভাবে কথা বলছেন যেন আমিই আমার মেয়েকে ভাগিয়ে দিয়েছি। আমার কথাটাও একবার ভাবুন। আমি মেয়ের বাবা। আমার মেয়ে পালিয়ে গেছে, আমার অবস্থা কী হবে? আমি তো মানুষকে মুখই দেখাতে পারবো না!”
“সেটাই হওয়া উচিত আপনার সাথে।” হাফিজুর রহমান রেগে গিয়ে বললেন, “আপনার মেয়ে বিয়েতে রাজি ছিল না। অন্য ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিল, তার সাথে পালিয়ে গেল, আর আপনারা কিছু টের পেলেন না? কেন লুকালেন আমাদের কাছ থেকে এসব?”
“ও বিয়েতে রাজি ছিল না এ কথা ঠিক, কিন্তু ওর কারো সাথে সম্পর্ক ছিল না বিশ্বাস করুন। ও চায়নি কোনো প্রবাসী ছেলেকে বিয়ে করতে। যখন শুনলো ছেলে কাতার থাকে, ও সাথে সাথেই জানিয়ে দিলো বিয়ে করবে না। ও আসলে ভেবেছিল তাহমিদ বয়স্ক আর ওই দেশে হয়তো ও একজন কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করে।”
হাফিজুর রহমান বললেন,
“তো? কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার হলেই বা কী দোষ ছিল? এ কাজ করা কি খারাপ না-কি?”
“না না, তা হবে কেন? তবে প্রত্যেকেরই তো আলাদা পছন্দ-অপছন্দ থাকে। আমি ওকে তাহমিদের ব্যাপারে সব বলেছি, কিন্তু ও বিশ্বাস করেনি। ভেবেছিল মিথ্যা বলছি। ওর কারো সাথে সম্পর্ক ছিল না। থাকলে সে কথা আমি লুকাতাম না। হ্যাঁ ও রাজি ছিল না এ কথা হয়তো আমি আপনাদের জানাইনি। কারণ, আমার বিশ্বাস ছিল তাহমিদকে সরাসরি দেখলে ও কখনও অপছন্দ করতে পারবে না। বিয়েতে অমত করবে না। কিন্তু আজ তো ও দেখা না করেই চলে গেল।”
“এটা আপনারই ভুল ছিল।” তাহমিদ কথা বললো এতক্ষণে, “আপনার মেয়ে রাজি ছিল না, অথচ আমাকে দেখে এক সময় রাজি হয়ে যাবে এমন ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে আপনার কখনোই উচিত ছিল না বিয়ে পাকা করা। কী হলো এখন? আপনার ওই সিদ্ধান্তের ফল স্বরূপ আপনার মেয়ে পালিয়ে গেল। এখন আপনার মান সম্মান তো যাবেই, সাথে আমাদেরও অপদস্থ হতে হবে! আর হ্যাঁ, আপনার মেয়ে তার প্রেমিকের সাথেই পালিয়েছে।”
“তুমি কী করে জানলে?” অবাক হয়ে শুধালেন আশরাফ হোসেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস তার মেয়ের কোনো ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিল না। থাকলে বিয়ে করতে না চাওয়ার কারণ হিসেবে তো সেই ছেলের কথাই বলতো। কিন্তু এমন কিছু বলেনি তো কখনো। তবে হ্যাঁ, সন্তানদের অনেক কিছুই হয়তো মা-বাবার অগোচরেই থেকে যায়। তিনি তো এটাও দুঃস্বপ্নে ভাবতে পারেননি যে তার মেয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু গিয়েছে তো।
“আমি দেখেছি ওদের।” আশরাফ হোসেনের প্রশ্নের উত্তরে বললো তাহমিদ।
সবার বিস্ময়ের পালা এবার আরও ভারী হলো। হাফিজুর রহমান উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কোথায়? কীভাবে?”
তাহমিদ ঘটনা খুলে বললো। সব শুনে হাফিজুর রহমান বিস্ময়ের চরম শিখরে পৌঁছে বললেন,
“কী? তুমি নিজের বউকে তার প্রেমিকের কাছে পৌঁছে দিয়ে এসেছো? তুমি কি পাগল হয়ে গেলে তাহমিদ? আটকালে না কেন? জানালে না কেন আমাদের?”
তাহমিদ বাবার দিকে তাকালো। মেয়েটাকে বাবা তার বউ বলে সম্বোধন করছে কেন? তাদের বিয়েটা তো হয়নি। অথচ বাবার বলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে বিয়ের পরই যেন পালিয়ে গেছে মেয়েটা। তাহমিদ বললো,
“আটকে কী করতাম আব্বু? যে মেয়েটা পালিয়ে যাচ্ছিল তাকে আটকে বিয়ে করবো? যাতে বিয়ের পর পালিয়ে যেতে পারে?”
আশরাফ হোসেন বললেন,
“তুমি জানতে ও পালাচ্ছে, অথচ জেনেও তুমি কিছুই বললে না আমাদের? তোমার কি একবারও মনে হয়নি আমাদের পরিস্থিতি কী হবে?”
তাহমিদ কিছু বলার আগেই হাফিজুর রহমান কথার প্রত্যুত্তর দিলেন,
“খবরদার! আপনি আমার ছেলেকে দোষ দিবেন না। নিজের মেয়েকে দেখে রাখতে পারেননি এ দায় সম্পূর্ণ আপনাদের…”
কথার পর কথা, এরপর আবারও কথা, এভাবেই চলতে থাকলো ড্রয়িংরুমের পরিবেশ। প্রায় ত্রিশ মিনিট যাবৎ তর্কবিতর্ক চললো। তাহমিদ এর মাঝে আর একটা কথাও বলেনি। চুপচাপ শুনছিল কেবল। আর মাঝে মাঝে ভাবছিল সামিরার কথা। কী দরকার ছিল মেয়েটার পালিয়ে যাওয়ার? ওর তো একটা প্রেমিক না থাকলেও পারতো! ও যদি না পালিয়ে যেত তাহলে এখন এখানকার পরিবেশটা অন্য রকম হতো। কিন্তু ও তো দুই পক্ষের মাঝে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে চলে গেল!
_________________________________________________
সামিরা জয়দেবপুর রোডে দাঁড়িয়ে আছে, বায়োজিন কসমেসিউটিক্যালসের সম্মুখে। তার সামনে রয়েছে সেই রাতের বাইক ড্রাইভার। আজ এভাবে হঠাৎ ছেলেটার সাথে এখানে দেখা হয়ে যাবে ভাবতে পারেনি সে। এতদিন মনে মনে খুব চেয়েছে ছেলেটার সাথে তার দেখা হোক। ছেলেটা কীভাবে তার নাম জানলো, বিয়ের কথা জানলো এসব এক গভীর রহস্য তার কাছে। সে কখনও ছেলেটাকে দেখেনি এর আগে। আত্মীয় নয়, পাড়ার ভাই নয়, স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতেও দেখেনি কখনও। তবে কে ছিল? এই ভাবনাগুলো ভীষণ জ্বালাতন করতো তাকে। সে প্রতি মুহূর্তে ভাবতো ওকে। ছেলেটাকে ভাবার বিষয়টা ঠিক রোগের মতো হয়ে গিয়েছিল। সে ফেসবুকেও ছেলেটার নাম লিখে তন্নতন্ন করে খুঁজেছে, কিন্তু কোনো হদিস পায়নি। তবে অদৃষ্টের প্রভাবে আজ সামনাসামনিই দেখা হলো।
“আপনি কে?” সামিরা সর্বপ্রথম এই প্রশ্নটাই করলো। আর এই মুহূর্তে এটাই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
“হাবিবুর রহমান। বলেছিলাম না আগেও?”
“নাম জানতে চাইনি, পরিচয় জানতে চেয়েছি।”
হাবিবুর রহমানকে একটু দ্বিধান্বিত দেখালো। বললো,
“নাম ছাড়া কি পরিচয় হয়?”
সামিরা ভীষণ বিরক্ত হলো। এই ছেলেটা ভীষণ বোকা! আর বোকা লোকদের সাথে কথা বলতে গেলেই তার মেজাজ খারাপ হয়। তবে সে নিজেকে শান্ত রাখলো। কারণ, এখন মাথা গরম করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ছেলেটার পরিচয় জানা। সে ওর বোকা বোকা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জানতে চাইলো,
“আপনি কীভাবে চেনেন আমাকে? আমার নাম সামিরা এটা আমি আপনাকে বলিনি। আর আমার বিয়ের কথা, সেটাই বা কীভাবে জানলেন?”
হাবিবুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“এক দেশ, এক শহর, আর একই আকাশের নিচে থাকলে অনেক কিছুই জানা যায়।”
সামিরা প্রত্যুত্তরে কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু বলতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেল। কারো ডাক কানে আসছে তার। কেউ একজন তার নাম ধরে ডাকছে। সামিরা চোখ মেললো। আর তার দু চোখের তারায় ভেসে উঠলো মায়ের মুখ। স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে সামিরার মনে হলো প্রকৃত দুঃস্বপ্ন বোধহয় এটা যেটা সে চোখ মেলে দেখছে এখন। তার দু চোখে ভয় জমলো, বিস্ময় জমলো। মাকে এখানে দেখবে তা একদম আশা করেনি। মা কী করে জানলো সে এখানে আছে? ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো সামিরা। ভীত স্বরে ডাকলো,
“মা!”
রাহিলা বেগম সজোরে চ’ড় মা’রলেন সামিরার গালে।
(চলবে)
