#পনেরো_টাকার_নোট (০৩)
লেখা: ইফরাত মিলি
__________________
সামিরার পরিকল্পনা ছিল সে সাত দিন পেরোলে তবেই বাড়ি ফিরবে। কিন্তু তাকে ফিরতে হয়েছে পালিয়ে যাওয়ার পরের দিনই। ফিরেছে বলা ঠিক নয়, তাকে জোর করে নিয়ে আসা হয়েছে। খালাকে কত্ত করে বুঝিয়ে বলেছিল যেন খালা বাড়িতে কিছু না জানায়, কিন্তু খালা চুপিচুপি ঠিকই জানিয়ে দিয়েছে। তার দিকটা একবারও ভেবে দেখেনি। তার ধারণা ছিল আর কেউ না বুঝলেও তার ছোটো খালা অন্তত তাকে বুঝবে। কিন্তু না, কেউ বুঝলো না। তবে মনে কঠিন বিশ্বাস ছিল বিয়েটা ভাঙতে সে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাড়িতে আসার পর শুনলো বিয়েটা না-কি হবে! সে বুঝতে পারছে না পাত্র পক্ষের মাথায় গন্ডগোল আছে কি না। তার পালানোর খবর জানার পরেও কেন বিয়েটা ভেঙে দিলো না? খালার বাড়িতে গিয়েছিল বলে কি এটাকে তারা দোষ বলেই গণ্য করলো না? এত উদার মনের মানুষও হয়? সে তো ছেলের গার্ডিয়ান হলে কিছুতেই এ বিয়ে হতে দিতো না।
বিয়েটা যেহেতু ভাঙেনি এখনো, তাই সামিরা ভাবছিল কীভাবে বিয়েটা ভাঙা যায়। পালানোর উপায় আর নেই। সে একটা নতুন পরিকল্পনা করলো। এটা খুব জনপ্রিয় পন্থাও বলা যায়। বহু সিনেমাতে দেখেছে। বাস্তব জীবনেও এই কৌশলটা কাজে লাগতে পারে। তাকে পাত্রের সঙ্গে দেখা করতে হবে। এরপর নিজের ব্যাপারে কিছু বানোয়াট কথা বলতে হবে। বাস এতটুকুই। এরপর লোকটা নিজেই ভেঙে দেবে বিয়ে।
কিন্তু মা-বাবাকে যখন বললো সে তাহমিদের সঙ্গে দেখা করতে চায়, বাবা সঙ্গে সঙ্গে না বলে দিলো। তাহমিদের সাথে তার না-কি বিয়ের আগে আর দেখাসাক্ষাৎ হবে না। শুধু এতটুকু বলেই যে ক্ষান্ত হয়েছে তা নয়। তার পালিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনেও এক বিস্তৃত বক্তৃতা দিয়েছে। সামিরা চুপচাপ শুনছিল, কিছুই বলার ছিল না তার। পালিয়ে গিয়ে সে তো সত্যিই অন্যায় করেছে। কিন্তু তাই বলে কি সামান্য কথা অবধিও বলতে দেবে না লোকটার সঙ্গে? লোকটার ফোন নম্বরটা পর্যন্ত কেউ দেয়নি তাকে। এ ভারি অন্যায়! এর আগে তো মা লোকটার সাথে কথা বলানোর জন্য পাগল হয়ে যেত একেবারে। অথচ এখন সাফ জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা কথা বলার বিয়ের দিন বোলো। এত কঠিন আচরণ কেন করা হচ্ছে তার সাথে হঠাৎ? একবার বাসা থেকে পালিয়ে গিয়েছিল বলে কি এমন করা ঠিক? প্রথমে দেখা করতে চাইলো, সেটা মানলো না। এরপর ফোন নম্বর চাইলো, তাও দিলো না। সবশেষে একটা ছবি দেখতে চাইলো মাত্র, কিন্তু ছবি পর্যন্তও দেখালো না। আগে যখন সে দেখতে চায়নি তখন ঠিকই তাকে ছবি দেখাতে চাইতো। আর এখন দেখতে চাইলেও দেখতে দেওয়া হচ্ছে না।
সামিরা ফেসবুকে তাহমিদ রহমান লিখে সার্চ করেছে। কিন্তু অনেক খুঁজেও পায়নি। পাবেই বা কী করে? মানুষটাকে তো সে দেখেনি যে ছবি দেখেই চিনে ফেলবে। অনেক আইডিতে তো ছবিও নেই। এছাড়া বেশিরভাগ আইডি ছিল লক করা। তাই অতগুলো আইডির মাঝখান থেকে অচেনা একজন মানুষকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এভাবে তো সে হাল ছেড়ে বসে থাকতে পারবে না।
___________________
দুপুরে খাবার টেবিল থেকে সামিরা উঠে গেল খুব তাড়াতাড়ি। জানে, এই সময় বাবা-মা ফোন রুমে রেখেই খেতে আসে। তাই হাত ধুয়ে সে সোজা চলে গেল মা-বাবার রুমে। ব্যস্ত হয়ে বাবার ফোনের কনট্যাক্ট লিস্ট খুঁজে দুইখানা নম্বর পেল তাহমিদ লিখে সেভ করা। তবে একজনের নামের পাশে ব্রাকেটে লিখে রাখা ‘জামাই’। ব্যাপারটা সামিরার ভালো লাগলো না। জামাই হতে পারেনি, তার আগেই নামের পাশে জামাই লিখে রাখা হয়েছে। সবকিছুতেই বাবার বাড়াবাড়ি!
ফোন নম্বর নেওয়া হলেই সামিরা দ্রুত নিজের রুমে চলে আসলো। রুমের দরজা আটকে এরপর চলে গেল ব্যালকনিতে। রুম আর ব্যালকনির সাথে সংযুক্ত দরজাটাও বন্ধ করে দিলো। যাতে কথা বললে রুমের বাইরে থেকে শোনা না যায়। কথাও বলতে হবে খুব সাবধানে যেন মা-বাবা শুনতে না পায় কিছু।
সামিরা কল করলো। কলটা রিসিভ হলো ঠিক কেটে যাওয়ার আগ মুহূর্তে। সে তো ভেবেছিল ভদ্র লোক বোধহয় কল তুলবেই না। রিসিভ হওয়া মাত্রই সামিরা বললো,
“হ্যালো! আমি সামিরা বলছি।”
সামিরার নম্বর সেভ করেই রাখা ছিল তাহমিদের ফোনে। তাই চিনতে সমস্যা হলো না তার। তবে ভাবেনি সামিরা কল করবে কখনও। কেন কল করেছে? ভাঙানি দিবে না-কি নিজের বিয়েতে নিজেই? তাহমিদ চেনা সত্ত্বেও জিজ্ঞেস করলো,
“কোন সামিরা?”
সামিরা একটু অপ্রস্তুত হলো। কীভাবে নিজের পরিচয় দেবে ভাবলো এক মুহূর্ত। তারপর বললো,
“যার সাথে আপনার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, সেই সামিরা!”
“ও আচ্ছা। কিন্তু বিয়ে হওয়ার কথা ছিল বলছেন কেন? বিয়েটা কি হবে না? আবার পালাবেন না-কি?”
সামিরা প্রশ্নের উত্তরে কিছু বলতে পারলো না। বললো,
“আমি যে পালিয়ে গিয়েছিলাম, এটা তাহলে জানেন আপনি?”
খুব ভালো করে জানি, মনে মনে ভাবলো তাহমিদ। মুখে এত রঞ্জিত করে বললো না অবশ্য। স্বাভাবিকভাবেই বললো,
“হুম জানি। পালিয়ে আপনার খালার বাসায় গিয়েছিলেন।”
“মিথ্যে, মিথ্যে…ডাহা মিথ্যে কথা। আমি তো খালার বাসায় যাইনি। আপনাকে কে বলেছে এটা?”
তাহমিদ হাসলো নিঃশব্দে। যা ভেবেছিল ঠিক তাই, বিয়েতে ভাংচি দেওয়ারই চেষ্টা করছে মেয়েটা। সামিরা যে নিজের খালার বাসায় গিয়েছিল এ সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত সে। সামিরার বাবা মেয়ের খবর পাওয়া মাত্রই তাদেরকে জানিয়েছিল সে রাতে। সামিরা নিজের খালার বাড়িতে গেছে এ কথা তারা বিশ্বাস করেনি প্রথমে। তাই সামিরার বাবা তাদেরকেও নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিল গাজীপুরে। তাহমিদের পরিবার থেকে কেউই যায়নি তাদের সঙ্গে। তবে তাহমিদ আলাদা ভাবে গিয়েছিল ঘটনাটার সত্যতা যাচাইয়ে। সামিরার মা-বাবা ওকে যখন আনতে গিয়েছিল, সেও তখন গিয়েছিল। তবে সামিরার সামনে পড়েনি একদমই, আলাদা গাড়ি নিয়ে গিয়েছিল, ওর আড়ালেই থেকেছে। এছাড়া আরও খোঁজখবর নিয়েছে পরে। আর যে ছেলেটাকে সেদিন রাতে দেখেছিল, ওটা সামিরার প্রেমিক ছিল না। ছেলেটা সামিরার খালাতো ভাই। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট। অথচ সেই ছেলেটাকেই সেদিন সামিরার প্রেমিক ভেবে বসেছিল। ওদের মাঝে সেরকম কোনো সম্পর্ক আদৌ নেই। তাহমিদ বললো,
“খালার বাড়িতে যাননি, তাহলে কোথায় গিয়েছিলেন?”
“কোথায় আবার? আমার প্রেমিকের সাথে ওর বাড়িতে গিয়েছিলাম। আমি তো আমার প্রেমিকের সঙ্গেই পালিয়েছিলাম। আমার মা-বাবা আপনাদের সত্যি কথাটা বলেনি। মিথ্যা বলেছে যাতে বিয়েটা না ভাঙে।”
মেয়েটার মিথ্যা বলার স্কিল ভালোই, নিজ মনে ভাবলো তাহমিদ। তবে সে সত্যিটা জানে বলে এসব খুবই হাস্যকর লাগছে। সে বললো,
“তাই? আপনার মা-বাবা মিথ্যা কথা বলেছে, আর আপনি সত্য কথা বলছেন?”
সামিরা কণ্ঠে আরও দৃঢ়তা বাড়িয়ে বললো,
“হ্যাঁ, অবশ্যই। একটা মেয়ে কি কখনও অযথাই প্রেমিক আর পালিয়ে যাওয়া নিয়ে মিথ্যা বলে নিজের নাম খারাপ করে? আমি আমার প্রেমিকের সঙ্গেই পালিয়েছিলাম। শতভাগ সত্য ঘটনা। তাই আপনার ভালোর জন্যই বলছি, আমাকে বিয়ে করবেন না। ঠকে যাবেন কিন্তু।”
“বাহ আপনি তো আমার কথা খুব ভাবছেন। বউ হিসেবে তো এমন মেয়েই দরকার। বিয়ের আগেই এত ভাবছেন আমার ভালোমন্দ নিয়ে, না জানি বিয়ের পর কত ভাববেন।”
সামিরা হতভম্ব হয়ে গেল। সে কী বললো, আর এই লোক কী বুঝছে, কী বলছে এসব!
সামিরা বললো,
“আপনি কি আমার কথা বুঝতে পারছেন না আসলে?”
“হ্যাঁ, বুঝতে পারবো না কেন? খুব ভালোই বুঝতে পেরেছি, বউ হিসেবে আপনি আমার জন্য পারফেক্ট হবেন।”
সামিরার মনে হলো লোকটার মাথা খারাপ। নয়তো সে প্রেমিকের সাথে পালিয়ে যাওয়ার কথা বলার পরেও কোনো সুস্থ মানুষের এসব বলার কথা না। সামিরা উদ্বেগ নিয়ে বললো,
“আপনি এসব কী বলছেন? আমি তো আপনাকে বললাম আমার বয়ফ্রেন্ড আছে, তার সাথে পালিয়েও গিয়েছিলাম।”
তাহমিদের কাছে বেশ মজার লাগছে ব্যাপারটা। জিজ্ঞেস করলো,
“কোনো সাক্ষী আছে?”
“সাক্ষী মানে?” তাজ্জব হয়ে গেল সামিরা।
“এই যে আপনি আপনার প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিলেন, এ ব্যাপারে কেউ সাক্ষ্য দিতে পারবে? মানে আপনাদের দুজনকে একসাথে পালাতে দেখেছে এমন কেউ কি আছে?”
সামিরা এবার বিরক্ত হলো। অদ্ভুত মানুষ তো! সে নিজ মুখে প্রেমিকের সাথে পালানোর কথা বলছে অথচ সেটা বিশ্বাস না করে সাক্ষী খুঁজছে! সে যদি এই লোকের জায়গায় থাকতো এ কথা শোনা মাত্রই তো বিয়ে নাকচ করে দিতো। অথচ এই লোক…
সামিরা বললো,
“আমার কথা কি আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না?”
“না।”
এভাবে না শুনতে ভালো লাগলো না সামিরার। তার মনে হচ্ছে সে কোনো আদালতে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে তার কথার কোনো দাম নেই। দরকার সাক্ষী আর প্রমাণের। সে বললো,
“হ্যাঁ আছে সাক্ষী।”
“তাই? কে?”
“হাবিবুর রহমান, বাইক ড্রাইভার। আমি তার বাইকেই রেলওয়ে স্টেশনে গিয়েছিলাম। সে দেখেছে আমাদের একসঙ্গে।”
তাহমিদ জানতো মেয়েটা তার কথাই বলবে। বললো,
“আচ্ছা, তো সেই বাইক ড্রাইভারের সাথে আমার আলাপ করিয়ে দিন, সে বললেই আমি বিশ্বাস করবো।”
“আরে আজব! আমি সেই ড্রাইভারকে এখন কোথায় পাবো?”
“কোথায় পাবেন সেটা তো আমি জানি না। তবে যদি সেই ড্রাইভারকে দিয়ে বলাতে না পারেন, তাহলে আমিও বিশ্বাস করছি না।”
এই লোকটাকে কীভাবে বোঝাবে বুঝতে পারছে না সামিরা। আরও কঠিন কিছু বলতে হবে। সে বললো,
“সেই ড্রাইভারকে হয়তো আমি পাবো না, আর আপনার সাথে কথাও বলাতে পারবো না। তবে আমি কিন্তু আপনাকে সাবধান করছি। আমাকে বিয়ে করা একদমই ঠিক হবে না। আপনার কি প্রাণের ভয়ও নেই?”
“প্রাণের ভয় কেন থাকবে? বিয়ে হলে মে’রে-টেরে ফেলবেন না-কি আমাকে?”
“হ্যাঁ, মে’রেও তো ফেলতে পারি।”
“আচ্ছা, শুভকামনা তাহলে। যথাসম্ভব প্রমাণ না রেখেই মা’রার চেষ্টা করবেন, নয়তো ফেঁসে যাবেন কিন্তু।”
সে অত বড়ো হুমকি দেওয়ার পরেও লোকটা গ্রাহ্য করছে না? উলটো এসব কী বলছে? সামিরা এতক্ষণ যাবৎ সহ্য করছিল লোকটার কথা। কিন্তু এবার বুঝে গেল এই অদ্ভুত লোকটাকে এসব বলে লাভ নেই। মানুষ এমনও হয়? পাত্রী যেচে এসে নিজের সম্পর্কে এসব বলা সত্ত্বেও বিশ্বাস করছে না! সামিরা আর রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বললো,
“আপনাকে যে মেয়ে বিয়ে করবে, সে মেয়ের কলাপ পুড়বে!”
“তাই? আপনার জন্য তাহলে আমার খারাপই লাগছে, কারণ বিয়েটা তো আপনিই করছেন।”
সামিরা কী বলবে, কী করবে কিছু বুঝতে পারছে না এই মুহূর্তে। মনে হচ্ছে বিয়ে করা ছাড়া অন্য কোনো গতি নেই। কী ভেবেছিল, আর কী হলো! এর আগে লোকটাকে পছন্দ ছিল না অন্য কারণে, কিন্তু এখন কথা বলার পর অপছন্দ করার আরও কারণ উদ্ঘাটিত হলো। এর সাথে বিয়ে হলে গোটা এক জীবন কাটাবে কী করে? সম্ভব নয়। সামিরার কান্না পাচ্ছে।
তাহমিদের মনে হলো সামিরার আর কিছু বলার নেই। কথা অল্পতে শেষ হওয়াই ভালো। সে সমাপ্তি টানতে গিয়ে বললো,
“যদি আবার পালিয়ে না যান, তবে বিয়েতে দেখা হবে। সেই পর্যন্ত ভালো থাকুন। আশা করছি বিয়ে করতে গিয়ে আমার শুনতে হবে না যে আমার বউ পালিয়েছে।”
তাহমিদ কল কেটে দিলো।
সামিরার খুব অসহায় লাগছে। হঠাৎ করেই পালিয়ে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে আবার। খালার বাসায় না, এবার দূরে কোথাও। অনেক দূরে। আর সেই পালানোর পথে যদি আবার হাবিবুর রহমানের সাথে দেখা হয়ে যেত তার! জীবনের এত দুর্যোগপূর্ণ সময়েও হাবিবুর রহমানের কথা ভাবছে দেখে সামিরার অবাক লাগলো। ছেলেটা তাকে স্বপ্নে তো জ্বালাচ্ছেই, জেগে থাকলেও ওর ভাবনা থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না। একদিকে এই বিয়ে আর তাহমিদ নামের অদ্ভুত লোকটা, অন্য দিকে সেই বাইক চালক হাবিবুর রহমান। সমস্ত চিন্তা এক সঙ্গে মিলেমিশে পাগল করে দিচ্ছে তাকে!
______________________________________________
পুরো বাড়িটাই লোকাকীর্ণ হয়ে আছে। দুই-তিন দিন ধরেই আত্মীয়স্বজনরা এসে জড়ো হচ্ছিল। আর আজ তো বিয়ে। তাই আজকে সবচেয়ে বেশি লোক সমাগম দেখা যাচ্ছে। এত এত লোককে আমন্ত্রণ জানানোর দরকার কী ছিল বুঝতে পারছে না সামিরা। তবে হ্যাঁ, এত লোকের মাঝেও তার রুমটা কীভাবে যেন ফাঁকাই রয়েছে। সে জানতো কনের রুমেই সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়ে থাকে। কিন্তু তার বিয়েতে তার রুমটাই একমাত্র খালি, বাকি সব রুমই মানুষজনে ভর্তি। কিছুক্ষণ পর পর অবশ্য একজন-দুজন তাকে দেখার জন্য আসছে তার রুমে। তবে থাকছে না বেশিক্ষণ।
সামিরা এখন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে মেরুন রঙের শাড়ি, মাথায় দোপাট্টা। তাকে পুরোদস্তুর বিয়ের কনের মতো সাজানো হয়েছে। সাজানো হবেই বা না কেন? আজ তো তার বিয়েই। তবে মেকআপটা মনঃপূত হয়নি তার। মনে হচ্ছে মেকআপ আর্টিস্টের চেয়ে সে নিজেও ঢের ভালো সাজতে পারতো। মন মেজাজ ভালো থাকলে নিজেই সাজতো, কিন্তু তার মনটা ভালো নেই। বিয়েটা শেষমেশ হয়েই যাচ্ছে। মা তাকে এ কদিনে অনেক বুঝিয়েছে। সেও কথাগুলো উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছে। তার মা-বাবা তো তার খারাপ চায় না, নিশ্চয় যা করছে তা তার ভালোর জন্যই। এটা সে আগে বুঝতে চায়নি। এখন নিজেকে বোঝানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। তবে একটা অশান্তির খচখচানি রয়েই যাচ্ছে মনের ভিতর। কিছুই ভালো লাগছে না। রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। বাড়ির সামনের এই রাস্তাটা থেকেই তো সেদিন হাবিবুর রহমানের বাইকে উঠেছিল সে। এই রাস্তা দিয়ে বোধহয় আর যাতায়াত করে না ছেলেটা। করলে একদিন না একদিন তো ঠিক চোখে পড়তো। এ কদিন কত দাঁড়িয়ে থেকেছে সে এখানে ছেলেটাকে দেখার জন্য। কিন্তু দেখতে পেলই না। ছেলেটার সাথে কি আর কখনও দেখা হবে তার? সামিরা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
কিছুক্ষণ আগে বরযাত্রীরা এসেছে। তবে এখনো অবধি বরকে দেখতে পারলো না সামিরা। তার যে খুব দেখার ইচ্ছা তা নয়। সেও যেচে গিয়ে দেখার আগ্রহ পাচ্ছে না। আর এখন দেখা হলেই বা কী, আর না হলেই বা কী। ওই মানুষটাকেই তো বিয়ে করতে হবে। এরপর সারাজীবন কাটাতে হবে তার সঙ্গে!
দরজা খোলার শব্দ হলে সামিরা বারান্দা থেকেই একবার ভিতরে তাকালো। মামাতো বোন সুহানা এসেছে। জানালো,
“তোর জন্য একটা গিফট এসেছে।”
“টেবিলের উপর রাখো।”
সুহানা টেবিলের উপর রাখলো না, গিফট বক্সটা সামিরার হাতে দিয়েই বের হয়ে গেল।
ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত লাগলো সামিরার। এটাকে এভাবে কেন তার কাছে দিয়ে যাওয়া হলো? লাল রঙের একটা গিফট বক্স। চারপাশে সুন্দর করে রিবন বাঁধা। বক্সের গায়ে একটা ছোটো কাগজ ঝুলছে। সেটাতে লেখা,
‘প্রেরক,
হাবিবুর রহমান।
প্রাপক,
আনজুম।’
সামিরা স্তব্ধ হয়ে গেল নাম দুটো পড়ে।
(চলবে)
