জোড়াতালি [পর্ব-১]
প্রভা আফরিন
নৌকাটা ঘাটে ভিড়ল সন্ধ্যায়। আজ পনেরো রোজা। ব্যাপারীর ছেলেরা শহর থেকে ফিরছে। ওদের দুই হাত ভর্তি শপিং ব্যাগ। প্রতিবার ঈদেই ব্যাপারীরা শহরে যায় কেনাকাটা করতে। কত বাহারি পোশাক যে কিনে আনে! ঈদের দিন সকালে ঈদগাহ মাঠে যখন নামাজ পড়তে যায়, সকলে ব্যাপারী বাড়ির ছেলেদের দিকে চেয়ে থাকে। দামী পোশাক, দামী জুতো, চোখে সানগ্লাস, গা থেকে ভেসে আসে আতরের সুঘ্রাণ। তাদের আশেপাশে অন্যরা সহজে ভিড়তে পারে না।
সাজু ঘাটে বসে বসে ব্যাপারীদের ব্যাগগুলো গুনছিল। এক দুই, তিন, চার, পাঁচ…শেষই হয় না। অবশ্য সাজু খুব বেশি গুনতেও পারে না। ব্যাপারীর ছোটো ছেলে মহিন তারই বয়সী বালক। সে ঘাটে নামা মাত্রই সাজু কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ঈদের জামা কিনতে গেছিলা?”
মহিন সাজুর সঙ্গে মেশে না। সাজু হতদরিদ্র পরিবারের ছেলে। চালচলন, পোশাক-আশাক কিছুই ভালো না। অবশ্য পোশাক বলতে কিছু আছে বলেও মনে হয় না। সর্বদা খালি গায়ে ঘোরে। পরনের একটা মাত্র হাফপ্যান্টও পেছনে তালি দেওয়া। অবস্থাপন্ন কেউই তার সঙ্গে মেশে না। সাজুই মহিনের আগে-পিছে ঘুরঘুর করে। মহিন এতে মজা পায়। সে সাজুকে উদ্দেশ্য করে দম্ভের সাথে বলল, “হ, এইবার পাঁচটা জামা কিনছি। হাফ শার্ট, ফুল শার্ট, পাঞ্জাবি, পায়জামা, জিন্সের প্যান্ট সব কিনছি।”
সাজু আরো আগ্রহ নিয়ে বলল, “জুতা কিনছো?”
“হ, বুটজুতা কিনছি। স্যান্ডেলও কিনছি।”
সাজু কুণ্ঠিত হয়ে তার নগ্ন পায়ের দিকে তাকাল। নতুন জুতো পরার সৌভাগ্য তার হয়নি কখনো। তবে একবার মা কোত্থেকে যেন একজোড়া দুই ফিতার ছেঁড়া স্যান্ডেল এনে দিয়েছিল। রাতের বেলা কুপির আগুনে গুনা গরম করে সেই স্যান্ডের সেলাই করে দিয়েছিল। সাজু সেই স্যান্ডেল তাকের ওপর পুটলিতে বেধে তুলে রাখে বিশেষ বিশেষ দিনে পরার জন্য। অবশ্য বিশেষ দিন তার জীবনে ঈদ ছাড়া আর একটাও আছে বলে মনে পড়ে না। কোনো আত্মীয়ের বাড়ি নেই যে বেড়াতে যাবে। মাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করে নানাবাড়ির কথা। মা বলে কেউ নেই। এই গ্রামের গণ্ডিতেই সাজুর সকাল থেকে সন্ধ্যা, বৈশাখ থেকে চৈত্র, শৈশব থেকে বাল্যকাল।
মহিন যেতে যেতে বলল, “আজকে শহর থিকা ইফতারি কিনা আনছি। এত সুন্দর সুন্দর খাওন! জীবনে চোখেও দেখোস নাই।”
সাজু মনে মনে অদেখা ইফতারির বাহারি কল্পনা করতে করতে মহিনের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। কি সুন্দর খট খট শব্দ তুলে জুতো পায়ে হেঁটে যাচ্ছে সে। জুতোর নিচ থেকে উড়তে থাকা বালিগুলো যেন তাদের অর্থের দাপটে ওঠে-বসে।
মসজিদের মাইকে মাগরিবের আযান পড়েছে। সাজু ছুটে গেল মসজিদে। রোজার মাসে প্রতিদিন কেউ না কেউ মসজিদে জিলাপি, বাতাসা দেয়। ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে শিন্নী, খিচুড়িও মেলে। তা নিয়ে ভীষণ কাড়াকাড়ি লেগে যায়। গ্রামের একটা বিরাট অংশ হতদরিদ্র কিনা। সাজু প্রতিদিন আছরের পর থেকেই মসজিদের আশেপাশে ঘুরঘুর করে। আজ দেরি হলো। গিয়ে দেখে শিন্নী ভাগাভাগি হয়ে গেছে। মসজিদের উঠানে তিল ধারণের জায়গা নেই। সকলে কলাপাতা বিছিয়ে বসেছে। খাদেম দুই বালতি শিন্নী নিয়ে সবাইকে এক চামচ করে দিয়েছে। আযান পড়ার অপেক্ষা না করে অনেকে আগেই খেয়ে নিয়েছে। সাজু দেখল আরো আধা বালতি শিন্নী অবশিষ্ট আছে। খাদেমের কাছে গিয়ে হাত পেতে বলল, “হুজুর, আমারে দেন।”
খাদেম জসিম বড়ো হাতাওয়ালা চামচটা উঁচিয়ে মারের ভয় দেখালো সাজুকে। ধমকে বলল, “হাভাইত্যা কাঙ্গাল, তোর লইগ্যা কি লঙ্গরখানা খুলছি? প্রত্যেকদিন আইয়া হাজির হয়।
সাজু ধমক খেয়ে পিছু হটলো। চামচটা উঁচিয়ে নাড়ানোর সময়ে এক ফোটা গরম শিন্নী এসে সাজুর পেটে পড়েছে। সেটুকুই আঙুলে তুলে জিভে দিলো সাজু। কি মিষ্টি! সাজুর কান্না পেয়ে গেল। কান্না চোখে নিয়েই সে দেখল খাদেম জসিম আধ বালতি শিন্নী সবার অগোচরে নিজের ছেলেটার হাতে দিয়ে মসজিদের পেছনের দিক দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছে। তাদের জীবনে যেমন অভাবের ছাপ রয়েছে, ধর্মীয় জ্ঞান ও নৈতিকতাতেও অভাবের ছাপ প্রকট।
সাজু ঝাপসা চোখ ও জিভে লেগে থাকা এক চিমটি শিন্নীর মিষ্টত্বের আক্ষেপ নিয়ে বাড়ি ফিরল। দেখল মা চুলার পাশে বসে শাক বেছে নিচ্ছে। চুলায় ফুটছে ভাতের হাড়ি। অর্থাৎ আজ রাতে শাক-ভাত জুটবে। সাজু মন খারাপ করে মায়ের কাছে গা ঘেঁষে বসল। সামিনা ছেলের শুকনো মুখ দেখে জিজ্ঞেস করল, ” কীরে বাপ, আইজ মসজিদে কি খাওয়াইছে?”
সাজু বলল, “শিন্নী খাওয়াইছে।”
“পেট ভইরা খাইছোনি?”
সাজুর চোখ আবার টলটল করে উঠল। মাথা নত করেই বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে জানাল, “ভাগে পাই নাই। ওই জসিম হুজুরের কাছে এত্তডি শিন্নী আছিল। আমারে দিলো না।”
ছেলের মুখ দেখে সামিনার মন ভার হয়ে গেল। শাক বাছা ফেলে আট বছরের ছেলেকে কোলে তুলে নিল সে। ছেলেটি এত রুগ্ন যে কোলে নিতে সামিনার কোনো কষ্টই হয় না। আহ্লাদ পেয়ে সাজু এবার মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। সামিনা সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “তোমারে আমি ঈদের দিন শিন্নী রাইন্ধা খাওয়ামু বাপ। কাইন্দো না।”
সাজুর কান্না থামে না। শুধু শিন্নী না পাওয়ার জন্য নয়। জসিম তাকে অপমান করে হাভাইত্যা, কাঙাল বলেছে, সেই অপমানও ছোট্ট মন ভুলতে পারছে না।
রাতে শাক দিয়ে ভাত খাওয়ার সময় সাজু বলল, “ও মা, আমারে একদিন ইফতারি খাওয়াইবা? মহিনরা নাকি প্রত্যেকদিন ইফতারি খায়।”
“এই যে ভাত খাইতাছি মায়-পুতে। এইডাই আমাগো ইফতারি।”
সাজু সবজান্তার মতো মাথা দুলিয়ে বলল, “উঁহু, এইডা ইফতারি না। ইফতারি অনেক পদের খাওন। অনেক সুন্দর ঘেরান। মহিনরা যখন আমার পাশ দিয়া হাইট্যা যাইতাছিল, আমি ঘেরান পাইছি।”
সামিনা তার শতছিন্ন শাড়ির আঁচলের কোণা দিয়ে ছেলের মুখ মুছিয়ে দিয়ে বলল, “আইচ্ছা, আল্লাহ দিলে তোমারে আমি ইফতারি খাওয়ামু।”
“আমারে ঈদে একটা জামা কিন্যা দিবা। ঈদের নামাজ পড়তে যামু নতুন জামা পিন্দা।”
সামিনা বলল, “গতবার না হেলেনগো বাড়িত্তে একটা ফতুয়া আর হাপ্পেন আইন্যা দিছিলাম।”
“ওইডা না। নতুন নতুন।”
সামিনা কিছু বলল না। জন্মাবধি সাজুকে নতুন পোশাক কিনে দেওয়ার সামর্থ্য হয়নি তার৷ সাজুর বাপ তো থেকেও না থাকারই সমান। তাই প্রতিবছর অবস্থাপন্ন ধনী কৃষক, মহাজনদের বাড়ি থেকে পুরোনো কাপড় এনে ছেলেকে পরাতো সামিনা। হেলেনদের বাড়িতে সাজুর সমবয়সী এক ছেলে আছে। তাই অনায়াসে তাদের পুরোনো কাপড়টা মিলে যেত। ছেলেটা অনেকদিন ধরে ছেঁড়া প্যান্ট পরে দেখে এবার সামিনা আগেই গিয়েছিল চাইতে। পায়নি। ওরা নাকি পুরোনো কাপড়ের বিনিময়ে হকারের থেকে পাতিল কিনেছে।
সাজু ঘুমিয়ে পড়ার পর সামিনা কাঠের বাক্সটা খুলল। গতবার যে ফতুয়াটা হেলেনদের বাড়ি থেকে এনে দিয়েছিল সেটা বের করতে গিয়ে দেখল ইঁদুরে কেটে ফেলেছে। কেটেছে পুরোনো কাঁথাসহ সামিনার তুলে রাখা ভালো কাপড়টাও। সামিনা বলল, “হায় রে ইন্দুর, সবার মতো তুইও গরিবের কপাল কাটতে আইলি!”
সামিনা বুকের ভেতর আটকে থাকা কান্নাটাকে বুকেই চেপে ভাতের হাড়িতে পানি ঢেলে রাখল। সকালে মা-ছেলের পানতা হয়ে যাবে। এরপর কুপি নিভিয়ে সাজুর পাশে শুয়ে পড়ল। সাজু ঘুমের মাঝে কথা বলে। সারাদিন যা করে তাই বকে। কিন্তু আজ সে শুধু একটাই কথা বলল, “দেহো মহিন, তোমার থিকা আমার ঈদের জামা বেশি সুন্দর।”
চলবে…?
