জোড়াতালি [শেষপর্ব]
প্রভা আফরিন
শহর নিয়ে সাজুর যে বিশাল এক রূপকথাময় কাল্পনিক ধারণা ছিল, তা চুরমার হতে সময় লাগল না। দুপুরে ওরা যখন হামিদা বুড়ির সাথে পিচঢালা পথ ও অট্টালিকাময় স্থানে এসে পৌঁছালো, পিপাসায় সাজুর গলা শুকিয়ে কাঠ। সাজু বলল, “মা, পানি খামু।”
সামিনার সঙ্গে পানি নেই। আশেপাশে কোথাও কল দেখতে পেল না। হামিদা বুড়ি বললেন, “সবুর কর। আগে জায়গামতো পৌঁছাই। নাইলে সব হাতছাড়া হইয়া যাইব। আমার কাছে খবর আছে কোন কোন জায়গায় জাকাত দেওয়া হইব।”
অত হিসেব-নিকেশ তো সাজু করতে পারে না। বড়োদের সঙ্গে পা চালাতে হিমশিম খায় সে। তারওপর গায়ে নেই পোশাক৷ রোদের তাপ সরাসরি তার চামড়ায় আঁচড় কাটছে। কিছুটা পথ এগিয়ে ছেলের শুকনো মুখটা দেখে আর থাকতে পারল না সামিনা। একটা দোকানের সামনে পানি রাখা দেখে নিতে যেতেই দোকানদার বাধা দিয়ে বলল, “দুই টেকায় এক গেলাস পানি।”
সামিনা চোখ বড়ো বড়ো করে ফেলল। গ্রামে খাল-বিলের পানিতে বড়ো হওয়া মানুষদের কাছে এ যেন পাহাড়সম বিস্ময়ের কথা। পানির আবার দাম হয় নাকি! এ কথা তো তার জানা ছিল না। সামিনা অনুরোধের সুরে বলল, “আমার কাছে তো টেকা নাই। পোলাডার গলা হুকাইয়া গেছে। ইট্টু পানি দেন। আল্লাহ আপনের ভালা করব।”
দোকানি সে কথায় বিশেষ পাত্তা দিলো না। ওদের পোশাকেই যেন সামাজিক অবস্থার কথা লেখা আছে। সকলে কপাল কুচকে তাকায়। যেন ওরা অচ্ছুৎ। গ্লাস ধরলে নোংরা লেগে যাবে। দোকানি তাদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলো।
সামিনা বলল, “এ কোন জায়গায় আনলা গো বু? এরা ইট্টু পানিও বেইচা খায়?”
হামিদা বুড়ি বলল, “এরই নাম শহর। এইখানে সবই বেচাকেনা হয়। আয় তোগোরে পানির ব্যবস্থা কইরা দিতাছি।”
সাজু পানি পান করল এক বস্তি থেকে। সেখানে হামিদা বুড়ির এক দূর সম্পর্কের বোনজি থাকে। শহরে এলে হামিদা বুড়ি এখানেই থাকেন। লাকি বলল, “খালার মেমান মানে আমার মেমান। আপনে শরম পাইয়েন না। আইজ এই গরীবের ঘরে থাকেন।”
সামিনা ও সাজুকে একটা ঘর দিলো লাকি৷ টিনের ছোটোখাটো একটা খুপরি। হামিদা বুড়ি বললেন, “তুই পুতের লগে ইট্টু জিরাইয়া ল, সাজুর মা৷ আমি গিয়া খোঁজ লই কোন জায়গায় জাকাত দিব।”
অচেনা স্থানে থাকতে সংকোচ হলো সামিনার। বলল, “আমারে লইয়া যাও লগে।”
হামিদা বুড়ি বাধা দিলেন, “তোর যাওন লাগত না। আমার বইনজির ঘরে শরম পাইস না। হেই অনেক ভালা। আমি আইয়া পড়মু ইট্টু পরে।”
হামিদা বুড়ি সামিনাকে রেখে চলে গেল। লাকি অবশ্য আছে, কিন্তু সে দূরে দাঁড়িয়ে সারাক্ষণ ফোনে ফিসফিস করে কথা বলে আর হাসে। এরই মাঝে সাজু বলল, “মা, আমার খিদা লাগছে।”
সামিনা তীব্র অস্বস্তিতে বুদ। কার কাছে খাবার চাইবে? ঘরে তো কোনো খাবারের ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। এদিকে অভুক্ত ছেলের মুখ দেখে মায়ায় হৃদয় মুচড়ে ওঠে। বাধ্য হয়ে সে গেল লাকির কাছে। লাকি সামিনাকে দেখে ফোন কান থেকে সরালো না। বলল, “কিছু লাগবোনি?”
“ওই আসলে…পোলাডার খিদা লাগছে…”
বাকি কথা কণ্ঠ থেকে বের হতে পারল না। লাকি বুঝে বলল, “ওই যে ডিব্বায় মুড়ি আছে। মুড়ি খাইতে দেন।”
সামিনা জবাব শুনে চলে যাচ্ছিল। এমন সময় লাকির একটা অস্পষ্ট কথা কানে এসে বিধল, “আর কইয়ো না, খালায় আবার একটারে ধইরা আনছে।”
সামিনার কপাল কুচকে যায়। আবার একটাকে ধরে এনেছে মানে? আর কাকে এনেছিল? আর কেনই বা? অভুক্ত ছেলের চাহনি দেখে আর কিছু ভাবতে পারল না সামিনা। হতে পারে হামিদা বুড়ি আগেও কোনো সঙ্গী এনেছিল। বিকেল গড়িয়ে সূর্যটি লাল হয়ে গেছে। হামিদা বুড়ির আসার নাম নেই। লাকিকেও আর আশেপাশে দেখা যাচ্ছে না। সাজু বলল, “এইডা কি শহর, মা? শহরে টিনের ঘর ক্যা? মহিনে তো কইছে শহরে নাকি সবাই পাকা দালানে ঘুমায়৷ দামী কাপড় পিন্দে। আমরা এইহানে বইয়া রইছি ক্যান? বাইরে যামু না? রাস্তায় কত সুন্দর সুন্দর গাড়ি চলে। পিপ পিপ বাজি বাজায়। আমি গাড়ি দেখমু। আইচ্ছা আমরা কি আইজ শহরে থাকমু? গেরামে কহন যামু?”
সাজু একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। এদিকে সামিনার তলপেটে তীব্র চাপ লেগেছে। ছেলেকে বসিয়ে রেখে আবারও বাইরে উঁকি দিলো। লাকিকে দেখা যাচ্ছে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ফোনেই কথা বলে চলেছে। সামিনা টয়লেটটা কোনদিকে জানার জন্য লাকির কাছে গেল। তার নগ্ন পায়ের চলনে কোনো শব্দ নেই। তাই লাকি টের পেল না। সামিনা নিকটে এগিয়ে শুনতে পেল লাকি ফোনে বলছে, “খালা যে জিনিস? খালার মতো হইতে হইলে আমার আর এক জনম লাগব। দুইদিন পর পর ক্যামনে জানি গেরাম থিকা মাইয়া ধইরা আনে। এইবারেরডা বয়স বেশি না কিন্তু লগে পুত আছে। খালায় গেছে দালালরে আনতে। রাইতে পার কইরা দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। ভালা দাম পাইলে আমারে ঈদের মার্কেট করতে বেশি টেকা দিব কইছে। তোমারে এইবার পাঞ্জাবি দিমু।”
সামিনার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেল। জীবনের যাতাকলে পোড় খাওয়া মানুষ সে। সহজেই বুঝে গেল স্বেচ্ছায় কোন মরণ ফাঁদে পা দিয়েছে। যেভাবে নিঃশব্দে এসেছিল, সেভাবেই নিঃশব্দে সরে গেল সে। সামিনা এখানে কিছুই চেনে না। কীভাবে পালাবে বুঝে উঠতে পারল না। এদিকে ঘাবড়ে গিয়ে পেটের চাপ দ্বিগুণ। সে আবার বেরিয়ে এসে লাকিকে ডেকে বলল, “লেপ্টিনটা দেখায় দেও।”
লাকি অত্যন্ত বিরক্ত মুখে তাকে টয়লেট দেখিয়ে দিলো। সামিনা শৌচকর্ম সারার পাশাপাশি আশপাশটাও বুঝে নিল। এরপর ছেলের কাছে গিয়ে তার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, “দৌড় লাগাইতে পারবা, বাপ?”
সাজু বলল, “পারমু তো। আমি অনেক দৌড়াই।”
সামিনা বলল, “একেবারে চুপ কইরা দৌড় দিতে হইব। কোনো আওয়াজ না কইরা। মায়ের হাত ছাড়বা না কিন্তু।”
সামিনা ছেলেকে টয়লেটে নেওয়ার নাম করে আবার বের হলো। লাকি জানে এরা শহরের কিছুই চেনে না। ওদের সাথে কী হবে তাও জানে না। সুতরাং সে নির্ভাবনাতেই প্রেম করে যাচ্ছিল। কিন্তু সামিনা সেই সুযোগে অচেনা চিপাগলির দিকে ছেলের হাত ধরে দৌড় দিলো। লাকি তাদের দেখতে পেয়ে পেছন থেকে ধাওয়া দিলো। সামিনা ঊর্ধ্বশ্বাসে শুধু ছুটল। কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে যাচ্ছে জানে না। শুধু জানে পালাতে হবে। লাকি শেষ চেষ্টা করতে চোর চোর বলে আশেপাশের মানুষকে সজাগ করে দিলো। চোরের কথা শুনে এবার যাচাই না করেই অনেকে সামিনাকে ধাওয়া দিতে বের হয়েছিল। সামিনা ততক্ষণে মিলিয়ে গেছে লোকালয়ের ভিড়ে।
অচেনা গলিতে ছুটতে ছুটতে ঠিক কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে ওরা জানে না। সামিনা থামল ছেলের চিৎকারের শব্দে। সাজু দৌড়াতে দৌড়াতে নিচে পড়ে গেছে। সামিনা থেমে তাকে মাটি থেকে তুলে গায়ের ধুলো ঝেড়ে দিতে লাগল। সাজু তার পায়ে পরা জুতো খুলে দেখল গুনা দিয়ে বেধে দেওয়া ফিতেটা হোঁচট খেয়ে ছিড়ে গেছে। সাজুর কান্না পেয়ে গেল সেটা দেখে। বলল, “আমার জুতাডা ছিড়া গেল মা।”
সামিনা আশেপাশে তাকিয়ে ছেলেকে বুঝ দিয়ে বলল, “বাঁইচা থাকলে নতুন কিন্যা দিমু, বাপ। এহন চলো।”
মাগরিবের আযান পড়েছে। এখানে বুঝি অনেক মসজিদ। একটার পর একটা আযান হয়েই যাচ্ছে। সাজু ছেড়া জুতোটা কোলে নিয়ে ফুটপাতে বসে আছে। সামিনা মুখে আঁচল ঢেকে আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। এমন সময় এক পথচারী পলিথিনে প্যাচানো শুকনো মুড়ি, ছোলা, খেজুরের পুটলি ধরিয়ে দিল সাজুর হাতে। সাজু অবাক হয়ে বলল, “দেহো মা, ওই ব্যাডা আমারে এডি দিয়া গেল।”
সামিনা বলল, “ইফতারি দিছে। তুমি খাও। তোমার না খিদা লাগছে।”
সাজু পুটলিটা উলটে পালটে দেখে বলল, “এইডাই ইফতারি?”
“হ।”
সাজু পেটের খিদেয় আর কথা বাড়াল না। সামিনা এক দৃষ্টিতে ছেলের দিকে চেয়ে আছে। গতকাল রাতে নিজ কুড়েঘরে মায়ের কোলে বসে খাওয়া ছেলেটা আজ রাস্তায় বসে খাচ্ছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওরা কুড়েঘর থেকে এখন রাস্তার ছিন্নমূল মানুষে পরিণত হয়েছে। কান্নাটা ঠেলেঠুলে বেরোতে চাইলেও ছেলের মুখ চেয়ে ঠোঁট টিপে রইল সামিনা।
রাস্তায় রাস্তায় তিনটে দিন পার করল মা-ছেলে। না গোসল, না ঠিকমতো খাওয়া। সামিনার শতচ্ছিন্ন বস্ত্র দেখে লোকে তাকে ভিক্ষুক ভাবে। রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় কেউ কেউ দুই-চার-পাঁচটা টাকা ছুড়ে দিয়ে যায় তার দিকে। জীবনে কখনো ভিক্ষা না করা সামিনা পেটের দায়ে এখন সেই টাকা নিয়েছে। তিন দিনে অনেকবার স্থান বদলে করেছে সে, যেন হামিদা বুড়ির খপ্পরে না পড়তে হয়। লোকের দ্বারে দ্বারে ঘুরে জিজ্ঞেস করেছে নদীটা কোথায়? ঘাট কত দূরে? মানুষ তাকে যেসব পথ দেখায় তার কিছুই সামিনা বোঝে না। এদিকে সাজু সকাল বিকাল কেঁদে বলে, “আমি বাড়িত যামু। আমারে বাড়িত নিয়া যাও।”
সামিনা ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, “আমরা কাইলই বাড়িত পৌছাইয়া যামু।”
সাজু বনে-বাদাড়ে চষে বেড়ানো বালক। এ বিপদসংকুল শহর তার ভালো লাগে না৷ পথে এত কুকুর যে ভয়ে সে মায়ের কাছ থেকে নড়ে না। রাস্তার ওপর শুয়েও কি বিচিত্র অভিজ্ঞতা হচ্ছে তার। কত মানুষ তারই মতো রাস্তায় ঘুমায়, রাস্তাতেই খাবার খায়। লোকের কাছে হাত পাতে। সাজুও তাদের মতো হাত পাততে শুরু করেছে। সামিনা প্রথমবার সেই দৃশ্য দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিল। বলেছিল, “বাপরে, তোরে আমি জামা দেওয়ার কথা কইয়া এ কোন জীবন দিলাম!”
সাজু মায়ের চোখের জল মুছিয়ে বলেছে, “তুমি কাইন্দো না। আমার নতুন জামা লাগত না। জুতাও লাগত না।”
সাজু নতুন জামা-জুতো লাগবে না বললেও প্রতি রাতে মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে রঙিন পোশাকের স্বপ্ন দেখে। ওই যে দালানে থাকা ছেলেগুলো যে পোশাক পরে, ওইরকম। স্বপ্নে ভাবে একদিন নিশ্চয়ই সে ওদের মতো দালানে থাকবে। মাকেও ভালো ভালো শাড়ি কিনে দেবে তখন।
রাতে সাজুর ঘুম ভাঙে তীব্র ঝাঁকুনিতে। ঘুমচোখে সে দেখতে পায় এক মাতাল লোক তার মায়ের হাত ধরে টানছে। সামিনা ধস্তাধস্তি করে ছুটতে চেষ্টা করছে। সাজু ভয় পেয়ে গেল। এই লোককে সে দিনের বেলায় মসজিদের সামনে পঙ্গুদের মতো শুয়ে ভিক্ষা করতে দেখেছে। রাতে সেই লোক মাতাল হয়ে নারী শরীরের ঘ্রাণ শুকছে। সামিনাকে কাবু করতে না পেরে লোকটা বিশ্রী গালি দিয়ে বলল, “রাস্তায় হুতোস আবার এত শরম কীয়ের? আয় তোরে ঠোঁট পালিশ কিন্না দিমু, বিরানি খাওয়ামু।”
সামিনা সজোরে ধাক্কা দিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে সাজুর হাত ধরে ছুটতে শুরু করল। কিছুটা দূরে অন্ধকার গলি। সামিনা সেখানেই সাজুকে নিয়ে ঘাপটি মেরে রইল। সাজু মায়ের কোল থেকে মাথা তুলে দূরের সেই মাতাল লোকটার দিকেই চেয়ে রইল। সামিনাকে কাবু করতে না পেরে সে একটি বালিকার কাছে গিয়েছে। সেই মেয়েটি অবশ্য চিৎকার করল না। শুধু দশ টাকার বিস্কুটের প্যাকেট পেয়ে লোকটার সঙ্গে চলে গেল। সাজু এরপর থেকে সামিনার অজান্তেই রাত জেগে মাকে পাহারা দিতে শুরু করল। ঘুমের ভান ধরে পড়ে থেকে রাস্তার মানুষগুলোর বিচিত্র জীবনের গল্পগুলো দেখতে লাগল। ওই যে চৌমাথায় ভিক্ষে করে যে কাবেরী, রোজ রাতে তার বর এসে সব ভিক্ষের টাকা কেড়ে নিয়ে চলে যায়। টুনি মেয়েটা বিস্কুট, কেক, সিঙ্গারার বিনিময়ে লোকেদের সঙ্গে অন্ধকারে চলে যায়। লোকমান নামের পঙ্গু লোকটা আসলে হাঁটতে পারে, দুই পা বেঁধে কায়দা করে বসে যেন তাকে দেখলেই মনে হয় তার পা নেই। আর সাজুর সমবয়সী দুলাল নামের ছেলেটা পলিথিনে করে আঠা খায়। ওটা খেলে নাকি কোনো খিদে, কষ্ট তাকে কাবু করতে পারে না।
ওদের দেখতে দেখতে সাজু তার গ্রামের স্মৃতি মনে করে কাঁদে। গাড়ির হর্নের মাঝে চাপা পড়ে যায় তার ফোঁপানোর শব্দ।
ঈদের ঠিক আগের দিন সকালে সাজু টুনির কাছে খবর পেল স্কুলের মাঠে নাকি শাড়ি, লুঙ্গি বিতরণ করা হচ্ছে। টুনি যাবে শাড়ি আনতে। শাড়ির কথা শুনে সাজুর চোখে ভেসে উঠল তার মায়ের ছেড়া শাড়িটার কথা৷ তা দিয়ে লজ্জা নিবারন করাও কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামিনা যে কত কায়দা করে ওটুকু কাপড় শরীরে প্যাচিয়ে রাখে! সাজু সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে ফেলল টুনির সঙ্গে সেও যাবে কাপড় আনতে। মাকে ভীষণ চমকে দেবে সে।
আজ সামিনার মন ভীষণ ভালো। একটু আগেই একটা সুসংবাদ পেয়েছে সে। ব্রিজের নিচে ভিক্ষা করা চামেলির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর জানতে পেরেছে আগামীকাল ঈদ করতে নাকি তারা গ্রামে যাবে। গ্রামে যায় নদীপথে৷ আজ মধ্যরাত অবধি ভিক্ষা করে রওনা দেবে। সামিনা চামেলির কাছে অনুরোধ করে এসেছে তাকেও যেন নদীর ঘাট অবধি নিয়ে যায়। তাহলে সেও ঈদের দিন ছেলেকে নিয়ে গ্রামে পৌঁছাতে পারবে।
রোজার মাসে মানুষ দান-খয়রাত করে বেশি। সামিনা অল্প কদিনেই বুঝে গেছে কোথায় কোথায় বেশি টাকা মেলে৷ দুদিনে মা ছেলে দুবেলা খেয়েও কিছু টাকা অতিরিক্ত জমেছে। সামিনা ঠিক করেছে আজ আরো কিছু জমিয়ে ভ্যান থেকে ছেলের জন্য একটা শার্ট কিনবে। সাজুর আকাশী রঙ ভীষণ পছন্দ। সামিনা সেই কথা মাথায় রেখে দুপুরে ছেলেকে দুটো ডাল-ভাত খাইয়ে নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়ে লুকিয়ে শার্ট কিনতে চলে গেল। অনেক দেখে বেছে একটা ফুলের ছাপ দেওয়া আকাশী রঙের শার্ট কিনতে পারল। দাম মিটিয়ে ফিরে আসবার সময় বারবার কল্পনা করতে লাগল সাজুকে কাপড়টায় কেমন মানাবে! ছেলেটা কাল নতুন জামা পরে ঈদগাহে যাবে নামাজ পড়তে। এত কষ্টের মাঝে একটা ইচ্ছে তো পূরণ হতে চলেছে।
ফিরে এসে সাজুকে পাওয়া গেল না। সাজু সারাদিন এখানটাতেই বসে ড্যাবড্যাব করে গাড়ি চলাচল দেখে। আর মায়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করে। ডাক দিলেই সাড়া মেলে। আজ ডেকে গলা শুকিয়েও ছেলের সাড়া মিলল না। সামিনা প্রথম দফায় ভীষণ ভয় পেল। অচেনা শহরে ছেলেটা যদি হারিয়ে যায়! এর ওর কাছে ছেলের বর্ণনা দিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগল কেউ সাজুকে দেখেছে কিনা। দুলাল বলল সাজুকে দেখেছে টুনির সঙ্গে যেতে। সামিনা বুঝে পেল না কোথায় গেছে টুনি। অনেকক্ষণ ধরে খোঁজাখুঁজির পর হঠাৎ দেখল আতঙ্কিত হয়ে মানুষেরা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে। টুনিকে দেখা গেল তাদের। মধ্যেই। সামিনা ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ও টুনি, আমার সাজু কই?”
টুনি বুকের সঙ্গে একটা সস্তা ছাপা শাড়ি চেপে ধরে ভীত কণ্ঠে বলল, “সাজু তো আমার লগে ইশকুলের মাঠে গেছিল কাপড় লইতে। কিন্তু ওইহানে স’ন্ত্রা’সীরা বো’ম মা’রছে। কোনোমতে পলাইয়া আইছি।”
সামিনার হৃৎপিণ্ডটা খামচে ধরে। লোকেরা যেদিক থেকে ছুটে আসছে ওদিকেই দৌড় লাগায়। স্কুলের মাঠে ধোঁয়ায় পরিপূর্ণ। লোকজন সব স্থান ছেড়ে পালিয়েছে। সামিনা ধোঁয়ার মাঝে ঢুকে পড়ে কাশতে কাশতে সাজু বলে ডাকতে লাগল। ধোঁয়া একসময় কমে এলো। সামিনার কাছে দৃশ্যমান হলো স্কুলের দলিত ঘেসো জমিনে কে যেন পড়ে আছে। সামিনার গায়ে শক্তি নেই। মাটিতে বসে পড়ে হামাগুড়ি দিয়ে কাছে গেল সে। দেখতে পেল তার সাত রাজার ধন একটা ছাপা শাড়ি বুকের সঙ্গে আগলে ধরে নিথর হয়ে পড়ে আছে। তার নগ্ন গায়ে মানুষের পায়ের ছাপ। স’ন্ত্রা’সীদের বো’মা হামলায় সকলে যখন দিকবিদিকশুন্য হয়ে ছুটতে থাকে, ছোট্ট সাজু ভিড়ের মাঝে পড়ে গিয়ে পদদলিত হয়। ছোট্ট সাজু মাকে নতুন শাড়ি উপহার দিয়ে চমকে দিতে চেয়েছিল। সে চমকে দিতে পেরেছে। কিন্তু সামিনা ছেলের ইচ্ছেটা পূরণ করতে পারেনি। সাজুর আর নতুন জামা পরে ঈদগাহে নামাজ পড়া হয়নি। সামিনা ছেলের নিথর দেহ কোলে নিয়ে স্কুলের মাঠে নির্বাক হয়ে বসে রইল। পাশে পড়ে রইল দুটি মানুষের স্বপ্নমাখা আকাশী রঙের শার্ট ও ছাপা শাড়ি।
(সমাপ্ত)
