#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_4
রাশিয়ার মস্কো শহরের ভোরটা যেন আজ অন্যরকম। শহরটা তখন কুয়াশায় ঢেকে আছে। কুয়াশা আর ঠান্ডা হাওয়া মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অদ্ভুত শীতলতা। রাস্তাগুলো ফাঁকা, মাঝে মাঝে কেবল হালকা তুষার পড়ছে। দূরে ভেসে আসছে গির্জার ঘণ্টাধ্বনি। সাদা কুয়াশার ভেতর দিয়ে ভোরের আলো ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে, যেন আকাশের আঁচড়ে পরা আলো শহরটা নতুন করে জেগে উঠছে।
নীশ নিজের রুমে কাউকে ঢুকতে দেয় না। তাই সে রোদকে পাশের রুমে নিয়ে এসেছে। সেখানেই ডাক্তার এসে ট্রিটমেন্ট করছে। পুরো রুমটাকে এখন যেন অস্থায়ী হসপিটাল বানানো হয়েছে। চারপাশে মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি, স্যালাইন স্ট্যান্ড আর রক্তের ব্যাগ।
রোদের অবস্থা খুবই খারাপ। তার সেন্স নেই। কালরাতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে তার। রোদের শরীরে অনেক কাচের টুকরো ঢুকে ছিল, ডাক্তার খুব সাবধানতার সাথে সেগুলো বের করেছে।
ডাক্তারের হাতের ব্যস্ততা, একের পর এক ইনজেকশন, রক্ত সঞ্চালনের প্রস্তুতি চলছেই।
নীশ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে রোদের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে ভয়ের বদলে এক অদ্ভুত আগ্রহ—যেন রোদের প্রতিটা নিঃশ্বাস এখন শুধু তারই নিয়ন্ত্রণে।
নীশের শরীরে ও গভীর ক্ষতের দাগ। কাল রাতে সে নিজেও ভীষণভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। কিন্তু সে নিজের ট্রিটমেন্ট করতে কারও সাহায্য নেয়নি। ডাক্তার তো দূরের কথা, লোকাল অ্যানেসথেসিয়া বা পেইনকিলার—কোনো কিছুকেই সে পাত্তা দেয়নি।
রক্ত ঝরতে ঝরতেই আয়নার সামনে বসে সে নিজের ক্ষত নিজেই সেলাই করেছে। তীব্র যন্ত্রণা সত্ত্বেও একবারও দমে যায়নি। উল্টো যেন এই ব্যথা তাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ডাক্তার ধীরে ধীরে নীশের পাশে চলে এলেন। তিনি রোদের ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নেওয়া লক্ষ্য করলেন, তারপর নীশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“নীশ, রোদের অবস্থা খুবই নাজুক। রক্তক্ষরণ অনেক হয়েছে। যদি সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়া যেত, আজকে তার জীবন সংকটের মধ্যে পড়ত।”
নীশ মাথা নিচু করে শুনল। তার চোখে কোনো ভয়ের ছাপ নেই। সে সরাসরি রোদের দিকে তাকিয়ে আছে।
“আমি সব দেখছি, ডক্টর। আমি রোদের পাশে থাকব। যেকোনো মুহূর্তে যা দরকার হয়, আমি সব ব্যবস্থা করে দিব।”
ডাক্তার নীশের ক্ষতবিক্ষত হাতে তাকালেন।
“আপনি নিজেও আহত। আপনারও ভালো চিকিৎসা দরকার, নীশ। যদি আপনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, রোদের দেখাশোনা করতে পারবেন না। মনে রাখবেন, এই ধরনের ট্রমা থেকে কেউ সহজে বেরোতে পারে না।”
নীশ কেবল হালকা মাথা নেড়ে উত্তর দিল,
“আমি সামলাতে পারব, ডক্টর। রোদের জন্য আমি সব করব। নিজের ব্যথাকে এখন মনে রাখছি না।”
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপচাপ রোদের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
“ঠিক আছে।”
নীশ কেবল রোদের দিকে তাকিয়ে থাকল। হঠাৎ রোদের ফোন বেজে উঠল। নীশ ফোনের কাছে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফোনের দিকে তাকাল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে ‘মম’ লেখাটা।
নীশ ধীরে ডাক্তারকে ইশারা করল। ডাক্তার ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে কলটা রিসিভ করলেন।
“হ্যালো, ম্যাম!”
অপাশ থেকে কি বলল, শোনা গেল না। ডক্টর আবারও বলল,
“রোদ ম্যাম, নীশ রোজারিও- এর বাড়িতে আছেন। তিনি তার একটা প্রজেক্টের কাজে নীশ স্যারের সাথে কথা বলতে কালরাতে এখানে এসেছিলেন। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, প্রজেক্টের কাজ শেষ হওয়া পযর্ন্ত তিনি এখানেই থাকবেন। কিন্তু হঠাৎ তার খুব জ্বর এসেছে। এখন অনেকটা সুস্থ। আপাতত তিনি ঘুমাচ্ছে। আপনি চিন্তা করবেন না। ব্যাপারটা খুব বেশি সিরিয়াস না।”
নীশ ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রইল। ডাক্তার রোদের মমের সাথে কথা বলে, কলটা কাটলেন। হঠাৎ রোদের নিঃশ্বাসে কিছুটা স্থিরতা ফিরতে শুরু করল। ডাক্তার সেদিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই নীশের ফোন বেজে উঠল। সে অস্বাভাবিক ভাবে চোখ তুলে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে ‘প্রফেসর’ লেখা নামটা ভেসে উঠল। নীশ সাইডে গিয়ে কলটা রিসিভ করে কথা বলল।
সে কথা শেষ করে এসে ডাক্তারের উদ্দেশ্যে বলল,
“আমি একটু ল্যাবে যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি ফিরে আসব। আমি ফিরে আসা পর্যন্ত আপনি রোদের খেয়াল রাখবেন। আর যদি কিছু প্রয়োজন হয়, আমাকে অবশ্যই জানাবেন।”
ডাক্তার শুধুই মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। নীশ রোদের দিকে একবার তাকাল। তারপর সে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
•
নীশ ল্যাবে প্রবেশ করল। ল্যাবের ভিতর হালকা নীল আলো ছড়িয়ে আছে, যন্ত্রপাতিগুলো ঝকঝক করছে। টেবিলের উপর বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্র, সার্কিট বোর্ড আর ছোট ছোট রোবটিক অংশ রাখা। নীশ দ্রুত এগিয়ে গেল রোবট প্রজেক্টরের দিকে। প্রজেক্টরটি আধা-সাজানো অবস্থায় ছিল। তার চারপাশে ছোট ছোট সেন্সর, ওয়্যারিং এবং লাইটের জটলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে। নীশ সাবধানে ডিভাইসটি পরীক্ষা করতে লাগল। প্রতিটি সংযোগ, বোতাম এবং স্ক্রিন মনোযোগ দিয়ে খতিয়ে দেখতে লাগল সে। প্রতিটি পদক্ষেপে তার একটাই চাহিদা, “রোবটের প্রজেক্টর যেন নিখুঁতভাবে শেষ করতে পারে।” সে শুধু প্রযুক্তিগত দিকটি নয়, একই সঙ্গে প্রজেক্টরের কার্যকারিতা ও স্থায়িত্বের দিকেও নজর রাখল। তার চোখে এক অদ্ভুত তীব্র আগ্রহ, যেন এই যন্ত্রটি শুধু একটি মেশিন নয়, বরং তার নিজের একটা অংশ।
হঠাৎ ল্যাবে দরজার কাছে শব্দ হলো। প্রফেসর আলেকজান্ডার আর রোশান ঢুকে পড়ল। প্রফেসর এসে সরাসরি নীশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“প্রজেক্ট তো প্রায় কমপ্লিট। ওর শরীরে আর্টিফিশিয়াল ফ্ল্যাশ বসাবে না?”
নীশ ছোট করে উত্তর দিল,
“হুম!”
সে আর কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে, মনোযোগ ফেরাল প্রজেক্টরের দিকে। রোশান নীরব থেকে প্রজেক্টরের স্ক্রিনের দিকে নজর দিল। হঠাৎ সে ল্যাবের ভেতরটা খেয়াল করে বলল,
“রোদ কোথায়? ওকে আজ ফোনেও পেলাম না।”
নীশ ধীর এবং ভাবনাহীন ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,
“এটা কাজের জায়গা। এখানে অপ্রয়োজনীয় কথা আমি শুনতে চাই না।”
কিন্তু রোশান থেমে থাকল না। রাগের আভা নিয়ে সে আরও জোরে বলল,
“রোদের খোঁজ নেওয়াটা অপ্রয়োজনীয় নয়।”
নীশ অস্থিরতা না দেখিয়ে শুধু রোশানের চোখে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে প্রজেক্টরের দিকে মনোযোগ ফিরিয়ে নিল।
প্রফেসর আলেকজান্ডার হালকা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“সত্যি আজ রোদ আসেনি কেন?”
নীশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ধীরভাবে বলল,
“ও একটু অসুস্থ।”
রোদ অসুস্থ শুনে রোশানের মন যেন অস্থির হয়ে উঠল। তার চোখে উদ্বেগের ছাপ আর কণ্ঠে ব্যথার সুর ফুটে উঠল। সে দৌড়ে ল্যাব থেকে বেরোনোর উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই নীশ ঠান্ডা স্বরে বলল,
“ও এখন রোজারিও মেনশনে।”
রোশান হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। অবাক চোখে নীশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার বাড়িতে কেন?”
নীশ ধীরগতিতে বলল,
“কালরাতে ও আমার বাড়িতেই ছিল। ও এতোটাই ড্রাঙ্ক ছিল যে, ওর বাড়িতে ওই অবস্থায় ওর মম-ড্যাডের সামনে ছেড়ে আসার কোনো সিচুয়েশন ছিল না।”
রোশান কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু নীশের দৃঢ় দৃষ্টি দেখে সে থমকে গেল। ল্যাবের মধ্যে নীরবতা কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে গেল।
রোশান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“রোদের কি হয়েছে?”
নীশ স্থির দৃষ্টিতে রোশানের দিকে তাকাল। সে আবারও একটু সময় নিয়ে ধীরে ধীরে উত্তর দিল,
“রোদের জ্বর এসেছে। আপাতত ঠিক আছে। এখন সে ঘুমাচ্ছে। আর ট্রিটমেন্ট চলছে। আমি ডাক্তার রেখে এসেছি”
রোশানের চোখ বড় হয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ থমকে রইল। তারপর চাপা কন্ঠে বলল,
“আমি ওকে দেখতে চাই। আমাকে তোমার বাড়িতে নিয়ে চলো।”
নীশ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি তোমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি—আমি আমার বাড়িতে কাউকে এলাউ করি না।”
রোশান রাগিস্বরে বলল,
“তাহলে ওকে ওর নিজের বাড়িতে বা হসপিটালে পাঠানোর ব্যবস্থা করো। আমি রোদকে সেখানেই দেখতে যাব।”
নীশ আবার বলল,
“অযথা ঝামেলা বাড়িও না। রোদ এখন আমার দায়িত্বে। জ্বরটা যখন আমার বাড়িতে গিয়ে এসেছে, তখন ওকে সুস্থও আমি করব। আর এই ব্যাপারে ওর ফ্যামিলির সাথেও আমার কথা হয়েছে। সো, প্লিজ! আমার মাথা গরম করিও না।”
রোশান এগিয়ে এসে বলল,
“কি করবে তোমার মাথা গরম হলে?”
প্রফেসর একটু ধমকেরস্বরে বলল,
“দুজনেই চুপ করো। রোশান! তুমি তোমার কাজে যাও। আর নীশ! তোমার কাজ শেষ করে, বাড়িতে তাড়াতাড়ি ফিরে যাও।”
নীশ মাথা নাড়ল। প্রফেসর একটু চিন্তিত কন্ঠে বলল,
“ওর খেয়াল রেখো। আমি এখন যাচ্ছি”
তিনি চলে গেলেন। তার সাথে সাথে রোশানও চলে গেল। সে ল্যাবের দরজা থেকে বেরিয়ে এসে কয়েকটা দৃঢ় পা চালাল। তারপর দ্রুত তার ফোন বের করল এবং ড্রাগ ডিলারের নম্বরে কল দিল। আড়ালের একটি ছায়াযুক্ত জায়গায় দাঁড়িয়ে সে প্রশ্ন করল,
“আপনার ড্রাগের ব্যাড ইফেক্ট কি? রোদের জ্বর কেন এলো?”
অপাশ থেকে ড্রাগ ডিলারের কণ্ঠ শোনা গেল। সে শান্ত কিন্তু সতর্ক স্বরে বলল,
“স্যার! সে যদি প্রথমবার ড্রাগটি নিয়ে থাকে, তাহলে শরীর অনেক বেশি দুর্বল হতে পারে। তবে জ্বর আসবে না। জ্বর সম্ভবত অন্য কোনো কারণে এসেছে।”
রোশান ফোন হাতে কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে উদ্বেগ আর মনে নতুন প্রশ্নের ছাপ। তার মনে হল, “রোদের অসুস্থতা হয়তো একেবারেই অন্য কোনো কারণে এসেছে।”
সে আড়ালে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে নিজের চিন্তায় ডুবে গেল। হঠাৎ তার মনের ভিতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা সৃষ্টি হলো।
•
ল্যাবের ভিতরে নীশ পুরোপুরি নিজের কাজে মনোযোগী। তার চোখ কনসোলের স্ক্রিনে, হাতে সরঞ্জাম, এবং চারপাশে ছড়ানো রোবটের অংশপত্র। আজকের কাজটা অন্য দিনগুলোর মতো সহজ নয়। সে আজ রোবটের শরীরে আর্টিফিশিয়াল ফ্ল্যাশ বসাবে।
নীশ প্রতিটি তার ও সংযোগ পরীক্ষা করছিল, যেন কোনো ভুল না হয়। ছোট্ট এলইডি লাইট, প্রতিটি সেন্সর এবং প্রতিটি ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট—সবেতেই তার নিখুঁত মনোযোগ চাচ্ছিল। রুমের মধ্যে শুধু টুলসের ক্লিক-ধ্বনি আর হালকা হিউমের আওয়াজ ভেসে আসছিল। সে নিজের হাতের কাজ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে, বাইরের পৃথিবীর তার কাছে অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে। তার চোখে এখন শুধু রোবট, আর তার মনোযোগে শুধু ফ্ল্যাশের দিকে। সে খুব সর্তকতার সাথে ফ্ল্যাশের প্রতিটি অংশ ঠিকমতো বসালো। তারপর সে প্রতিটি অংশ পুনরায় পরীক্ষা করল, যেন কোনো ত্রুটি না থেকে যায়।
টানা পাঁচ ঘণ্টা পরিশ্রমের পর নীশ অবশেষে ল্যাবের কাজ থেকে বিরতি নিল। সে ধীরে ধীরে ক্যান্টিনের দিকে হেঁটে গেল। ক্যান্টিনের হালকা আলো আর শান্ত পরিবেশ তার মনকে কিছুটা প্রশান্তি দিল। চারপাশে শুধুই হালকা কথা আর কফির গন্ধ। নীশ একটি খালি টেবিল বেছে নিয়ে বসল। নিজের হাতে তৈরি নোটবুক থেকে আজকের কাজের নোটগুলো দেখে নেওয়ার চেষ্টা করল। আপাতত তার মাথার মধ্যে শুধু একটাই ভাবনা, “রোবটের ফ্ল্যাশ বসানো শেষ, এবং আগামীকালই সেটি চালু করার দিন।”
তীব্র ব্যস্ততার মধ্যেও এই ক্ষুদ্র বিরতি নীশের জন্য একরকম শীতলতা নিয়ে এলো। একজন ওয়েটার এসে কফি রেখে গেল। কাপ হাতে নিয়ে সে ধীরে ধীরে ব্ল্যাক কফির গরম বাতাসে মিশে যাওয়া গন্ধে মন ভাসাল। ল্যাবের কাজ আর সারাদিনের ক্লান্তি থেকে দূরে এসে, সে এখন শুধু নিজেকে কিছুক্ষণ শান্ত রাখার চেষ্টা করল। সে তার পরনের হোয়াইট শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খুলে দিল। তারপর কফির কাপে ছোট করে চুমুক বসিয়ে কাপটা টেবিলের ওপর রাখল। মাথা চেয়ারের সাথে হেলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে হাত দিয়ে গলায় স্লাইড করতে লাগল। হঠাৎ তার চোখের সামনে গতকাল রাতের ঘটনা ভেসে উঠল। সে ঠোঁটের কোণে বাঁকা এক হাসি টেনে বলল,
“সফট গার্ল’স বডি ইজ নট পারফেক্ট ফর মি। গার্ল’স বডি ক্যান’ট উইথস্ট্যান্ড নীশ রোজারিও। অ্যাম আই সাইকো? আই জাস্ট ওয়েন্ট আ লিটল ক্লোজ টু রোদ। আই শোড রোদ আ লিটল ডেমো অফ মাই টাচ, ইয়েট রোদ ইজ ফাইটিং উইথ ডেথ। অ্যান্ড ইফ আই হ্যাড শোড হার মাই ফুল ডার্ক সাইড, উড রোদ ইভেন বি আলাইভ নাউ?” (কোমল মেয়েদের শরীর আমার জন্য উপযুক্ত নয়। মেয়েদের শরীর নীশ রোজারিওকে সহ্য করতে পারে না। আমি কি পাগল? আমি শুধু রোদের একটু কাছে গিয়েছিলাম। আমি রোদকে আমার ছোঁয়ার সামান্য একটা ডেমো দেখিয়েছিলাম, এতেই রোদ এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে। আর যদি আমি তাকে আমার পুরো অন্ধকার দিকটা দেখাতাম, তবে রোদ কি এখনো বেঁচে থাকত?)
নীশ হঠাৎ কফির কাপে ভেসে ওঠা ধোঁয়ার ভেতরে হাত চালাল, যেন ধোঁয়াটাই তার সাথে খেলছে। ঠোঁটের কোণে সেই অদ্ভুত বাঁকা হাসিটা আরও স্পষ্ট হলো। তার চোখের কোণ লালচে, কিন্তু দৃষ্টিতে এক অদম্য শীতলতা। কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশ নিস্তব্ধ।
সে টেবিলের ওপর রাখা কফির কাপের দিকে তাকাল। তারপর আবারও চেয়ারে মাথা হেলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল। তার আঙুল ধীরে ধীরে গলায় বুলিয়ে নামল উন্মুক্ত বুকের ওপর। সে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“এ ডেমো ওয়াজ ইনাফ টু ব্রেক ইউ, রোদ। ইমাজিন, ইফ আই শো ইউ দ্য ফুল ডার্কনেস অফ নিশ রোসারিও।” (একটা ডেমোই তোমাকে ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল, রোদ। কল্পনা করো, যদি আমি তোমাকে নিশ রোসারিওর সম্পূর্ণ অন্ধকার দেখাতাম।)
সে আবার কাপটা হাতে নিয়ে এক চুমুক খেল। কফি ঠোঁটে ছুঁতেই সে ধীরে বলে উঠল,
“তুমি এখনো বেঁচে আছো, রোদ। কিন্তু কতক্ষণ? দ্যাট’স দ্য রিয়েল কোয়েশ্চন।”
হঠাৎ পাশের টেবিল থেকে দুটো মেয়ে নীশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারা নীশের সৌন্দর্যে মুগ্ধ। একজন চাপা স্বরে বলল,
“উফ্ফ! কি হ্যান্ডসাম। এমন ছেলেকে একরাতের জন্য বেডে পাওয়াও ভাগ্য।”
অপরজন লজ্জামিশ্রিত হাসি দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি দেখো, ওর চোখগুলো। জোশ তাইনা? আমি তো ওর চোখের মায়ায় পড়ে গেছি।”
নীশের কানে সব কথা গেল। সে বেজায় ঠান্ডা, অল্প একটি অর্ধহাসি ঠোঁটে টেনে নিল। কিন্তু কোনো কথা বলল না। সে কাপে আরেক চুমুক দিল, আর তারপর আবার চেয়ারে ঝুঁকে চোখ বন্ধ করে নিল।
হঠাৎ নীশের ফোনে কল এলো। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই সে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে দেখল, ডক্টরের কল। সে ধীরে ফোনটা কানে তুলল। অপর প্রান্ত থেকে তাড়াহুড়ো করা কণ্ঠ ভেসে এলো,
“মিস্টার রোজারিও, রোদের কন্ডিশন খুব খারাপ। হার্ট রেট ডেঞ্জারাসলি লো। ইউ নিড টু কাম, রাইট নাও।”
নীশ ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি টানল। তারপর শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“রিল্যাক্স ডক্টর। ও এখন মরবে না। রোদকে আমি মরে যেতে দেব না। অন্তত এখনই নয়।”
ফোন কেটে দিয়ে সে এক মুহূর্ত স্থির রইল। চোখ বুজে ফিসফিস করে বলল,
“ফাইট, রোদ। ফাইট আ লিটল লংগার। আই ওয়ান্ট টু সি, কতক্ষণ তুমি নীশ রোজারিওকে সহ্য করতে পারো।” (লড়ো, রোদ। আর একটু লড়ো। আমি দেখতে চাই, কতদূর তুমি নীশ রোজারিওকে সহ্য করতে পারো।)
তারপর আবার ধীরে কাপটা হাতে তুলে ঠোঁটে ছুঁইয়ে দিল, যেন ফোনে পাওয়া রোদের খবরও তাকে এক বিন্দু বিচলিত করতে পারেনি।
চলবে..?
