পর্ব : ০৮
গল্প: #তুমি_এলে_হঠাৎ_বৃষ্টি_হয়ে…
লেখিকা: #মৈথালী_নিথু (#কল্পকথা)
বাসর ঘরে বসে আছে মেহুল। এটাকে আসলে বাসর ঘর বলা হয় কিনা জানে না সে।
তাদের যখন একা কথা বলার জন্য পাঠানো হয়েছিল তখনই মেহুলের বাবা কাজি কে নিয়ে আসতে চলে গিয়েছিলেন। মেহুল নাবিল কে অবশ্য সে বিয়েতে রাজি এটাই বলেছিলো । সে এমন একটা পরিস্থিতিতে ছিল যে হ্যা ছাড়া না বলারও কোনো উপায় ছিল না৷
নাবিল তার ঘর থেকে বের হতে না হতেই তার সব কাজিনরা তার ঘরে ঢুকে পরে, কাজি নাকি চলে এসেছে বিয়ে এখনই হবে৷ তারপর ‘ও’ কিছু বুঝে উঠার আগেই নাবিলের সাথে ওর বিয়ে টা হয়ে যায়। মেহুল যখন কবুল বলেছিল তখন ওর সাথে রাফিন বসে ছিল। খুশিতে সে লাফাচ্ছিলো কারণ তাকে তার দাদি বলেছে আজ থেকে নাকি মেহুল তাদের পরিবারের সদস্য হয়ে যাবে। এটা শুনেই রাফিন আজ এত্তো খুশি।
আজ রাত অনেক হয়ে গিয়েছিলো তাই মেহুলকে অর্থাৎ বউকে নিয়ে আজই ঢাকায় যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই মেহুলদের বাড়িতেই নাবিলদের থাকার ব্যবস্তা করা হলো। মেহুলের রুমটা মেহুল আর নাবিলের জন্য ছেড়ে দেওয়া হলো।
বিয়ের পর মেহুলকে তার ঘরে রেখেই সবাই বেরিয়ে যায় তারপর থেকে মেহুল ওভাবেই বিশ মিনিট ধরে বিছানায় বসে আছে।
তার মনের পরিস্থিতি সে নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না। সে এই বিয়েতে খুশি ও না আবার তার কোনো আফসোস ও হচ্ছে না৷ মেহুল এখনও সিউর না নাবিলের জন্য তার অনুভূতি টা আসলে কেমন।
নাবিল উঠোনের আম গাছের নিচে দাড়িয়ে আছে। বিয়ের সব কাজকর্ম শেষ হলে রুমা বেগম ওকে বলেছিলেন ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে। কিন্তু নাবিলের কেন যেন ঘরে যাওয়ার সাহস হচ্ছে না৷ মেহুলের মুখোমুখি হতে কেন যেন তার এখন অস্বস্তি কাজ করছে। মেহুল তাকে বিয়েটা চাপে পরে করেছে এটা সে জানে হয়তো এ কারণেই মেহুলের সাথে নজর মিলাতে পারবে কি না এটা নিয়ে ভাবছে সে। নিজের মনের সাথে অনেক বুঝাপড়া করে অবশেষে সে ঘরে যাওয়ার জন্য মন স্থির করলো।
নাবিল যখন ঘরে এলো মেহুল তখনও সেভাবেই বিছানায় বসে ছিল। নাবিল দরজা আটকাতেই মেহুল তার দিকে তাকালো। নাবিল দরজা আটকিয়ে মেহুলের সামনে এসে বিছানায় বসলো। সে মেহুলকে কি বলবে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না৷
অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পরও যখন নাবিল কিছু বলছিল না তখন মেহুলই বলা শুরু করলো-
” আমাকে বিয়ে করে কি এখন আফসোস লাগছে নাবিল সাহেব!”
মেহুলের এমন কথায় চমকে তার দিকে তাকালো নাবিল।
” আফসোস কেন হবে মেহুল। এটা কেন বলছেন!”
” মনে তো হচ্ছে। ”
” কেন এমন মনে করলেন আপনি মেহুল?”
” বিয়ের পর এতো সময় বাইরে ছিলেন ঘরে এসেও চুপচাপ বসে আছেন তাই মনে করেছি আমার মতো এমন মেয়েকে বিয়ে করে হয়তো পস্তাচ্ছেন। ”
” আর একটাও বাজে কথা বলবেন না মেহুল। আমি সময় নিচ্ছিলাম আপনার জন্যই। আর আপনি এসব ভাবছেন আমাকে নিয়ে। ”
এবার মেহুল আর কোন কথা বললো না। ঘরের পরিস্থিতি কেমন যেন গুমোট হয়ে উঠলো। নাবিল এটাকে স্বাভাবিক করতে বললো-
” আপনি চাইলে শাড়ি-গহনা গুলো খুলে আরামদায়ক কিছু পরে তারপর ঘুমোতে পারেন। এভাবে শুলে কষ্ট হবে৷
মেহুল মাথা নাড়িয়ে বিছানা থেকে উঠে নিচে নামলো। কিন্তু ওর ঘরে তো ওয়াশরুম নেই এটা মনে হতেই আবার বিছানায় বসে পড়লো৷
” আবার বসলেন কেন? যান। ”
” না থাক৷ এখন আবার বাইরে গিয়ে এসব চেঞ্জ করতে পারবো না। ওয়াশরুমেও শাড়ি পাল্টাতে কষ্ট হবে এর থেকে ভালো এগুলো পরেই থাকি। এক রাতেরই ব্যাপার।
” একদম না। আচ্ছা আমি বের হয়ে যাচ্ছি ঘর থেকে আপনি চেঞ্জ করে নিন আগে। ”
” না না….! বাইরে এখন মানুষ থাকবে তারা এখন আপনাকে ঘর থেকে বের হতে দেখলে আমার নামে আবার কথা উঠাবে তাই আপনি ঘরেই থাকুন। ”
” আচ্ছা তাহলে আমি চোখ বন্ধ করে ওপাশ ফিরে আছি আপনি পাল্টে নিন। ভয় নেই আমি আপনার দিকে তাকাবো না। ”
” ঠিক আছে।”
মেহুল থ্রি-পিস বের করে শাড়ি টা খুলার আগের গহনা খুলার চেষ্টা করলো কিন্তু কিছু গহনা খুলতে পারলেও গলার ছোট সেট টা পারলো না। খুলার অনেক চেষ্টা করার ফলে ওর হাত ব্যথা হয়ে গেলো। এবার একটাই উপায় আছে তার কাছে তা হলো নাবিল।
” নাবিল.. শুনছেন!”
” হ্যা!”
” আমার গলার সেট টা খুলতে পারছি না একটু সাহায্য করবেন প্লিজ।”
” ঠিক আছে। ”
নাবিল মেহুলের পিছনে এসে দাঁড়ালো। পিছনের সেট টা খুলার চেষ্টা করলো। নাবিলের ঠান্ডা হাতের স্পর্শে মেহুল কেঁপে উঠলো৷ তার চোখ আপনা আপনি বন্ধ হয়ে গেলো। নাবিলের সেট টা খুলা হয়ে গেলে সে যখন এটা রাখতে যাবে তখন আয়নায় মেহুল বন্ধ চোখের কাঁপা-কাঁপি দেখে তার নিজেরও নিশ্বাস দ্রুত গতিতে চলতে লাগলো। কোন মতে সে নিজেকে সামলিয়ে বললো-
” মেহুল হয়ে গেছে এখন শাড়ি টা পাল্টে নিন।”
মেহুলও এবার চোখ খুলল আর শাড়ি পাল্টিয়ে থ্রি-পিস পরলো।
” আমার হয়ে গেছে নাবিল। ”
” এলুন এবার আপনাকে ওয়াশরুমে নিয়ে যাই। ”
“না থাক এখন আর যাবো না। রাত হয়েছে অনেক ঘুম ও পাচ্ছে খুব। ”
মেহুল শুয়ে পরলো। নাবিল বিছানায় বসেই ছিল। সে দোটানায় ভুগছিল তারপর নিজের মাথা চুলকিয়ে মেহুলকে বললো-
” মেহুল আমি কোথায় শুবো!”
” কোথায় মানে? বিছানা ছাড়া আর কোথায় শুবেন?”
” না মানে আপনার যদি কোন সমস্যা হয়। সেজন্য বলছিলাম।”
” আমার কোন সমস্যা নেই। আমার পাশে শুয়ে পরুন৷”
নাবিল ও মাথা নাড়িয়ে শুয়ে পরলো।
আগেরদিন রাতেও মেহুল সারা রাত ঘুমাতে পারে নি আবার আজ সারাদিনের ধকল অনেক ছিল তাই শুয়ার সাথে সাথেই মেহুল ঘুমিয়ে গেলো। কিন্তু নাবিল আর ঘুমাতে পারলো না। সারা রাত সে মেহুলের দিকেই তাকিয়ে ছিল। শেষ রাতের দিকে তার চোখ লেগে গেলো।
—-
বাইরের হৈচৈ এর শব্দে মেহুলের ঘুম ভেঙে যায় । পাশেই নাবিল শুয়ে আছে। সে দিকে তাকিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তারপর উঠে বাইরে বের হয়। মাত্র ভোরের আলো উঠতে শুরু করেছে। আত্মীর বাচ্চারাই সকাল সকাল এতো শব্দ করছিলো।
মেহুলের বাবা- মার মনের অবস্থাও ভালো নেই। তারা সারা রাত চিন্তা করেছে মেয়ের জন্য। মেহুলকে জোর করে কোন ভুল করে ফেলেছেন কিনা এটা নিয়ে ও ভাবছে তারা।
সাহিবা সকাল সকালই তাদের ঢাকায় ফিরার সব বন্ধবস্থ করে ফেলেছেন৷ প্রাইভেট কার বুক করেছেন আর বাকি কাজ ঢাকায় ফিরেই করবেন।
মেহুলের বাবা-মা নাস্তা করে তারপর যেতে বললে ও সাবিহা রাজি হয় নি। তিনি বলেছেন –
” নতুন বউ নিয়ে যাবো এতো দূরের রাস্তা আবার বাসায় গিয়েও কাজ আছে অনেক তাই আর দেরি করতে চাই না৷ এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। ”
ওনার কথার পর আর কারোরই কোনো কথা বলার থাকে না৷
আট টার দিকেই সাবিহা নাবিল সবাইকে বিদায় জানিয়ে মেহুলকে নিয়ে ঢাকায় রওনা দেয়। আসার সময় রুমা বেগম অনেক কান্না করলেও মেহুল বেশি কান্না করে নি শুধু চোখ দিয়ে পানি পরেছিলো।
—-
সারা রাস্তা মেহুল চুপচাপ ছিল। মনে মনে কি চিন্তা ভাবনা করেছে সেই জানে শুধু।
তাদের ঢাকায় ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে গেলো। সাবিহা বাসায় এসেই মেহুলকে সোফায় বসিয়ে বললো-
” তুমি এখানে বসো মা কিছু রীতি আছে নতুন বউ এর জন্য আমি এখনই আসছি। আর নাবিল আমার সাথে এসো। ”
মেহুল সোফায় বসে রাফিনের সাথে গল্প করতে থাকলো৷ নাবিল গেলো সাবিহার সাথে রান্না ঘরে।
” কি মা বলো!
” এই শুন রাত তো হয়েই গেলো প্রায়, আজ তো তোর বাসর রাত যা না বাবা বাজারে গিয়ে ফুল কিনে নিয়ে আয়। আমি জবাদের বলে তোর ঘরটা সাজিয়ে দিবো।”
” আহা মা বাসর রাত তো কালই চলে গিয়েছে। আর কি দরকার এসব ঝামেলা করার।”
” চুপ থাক! সব সময় এক লাইন বেশি বুঝিস তুই৷ তোর না হয় এটা দ্বিতীয় বাসর কিন্তু মেয়েটার তো প্রথম। ওর ও তো ফুলে সাজানো বাসর ঘরে যাওয়ার ইচ্ছে আছে। এমনিতেই বিয়ে টা এমন ভাবে হলো যে মেয়েটার সপ্নই উল্টে গেছে এখন যেটুকু পারবো ওটাও ওর জন্য করবো না বলছিস?”
সাবিহার কথায় নাবিলের আরেকটা ধাক্কা লাগলো। আসলেই তো তার জন্য না হয় এসব নতুন না কিন্তু মেহুলের জন্য তো সব নতুন৷ মা’র মাথায় যেটা এসেছে সেটা ওর মাথায় কেন আসলো না!
” যাচ্ছি মা ”
নাবিল বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলে সাবিহা সব রীতি পালন করে মেহুলকে রাফিনের ঘরে পাঠালেন গোসল করে রেস্ট নেওয়ার জন্য।
মেহুল রাফিনের ঘরে এসে গোসল করার জন্য প্রস্তুতি নিলো। রাফিনেরও গেমে অবস্থা খারাপ ছিল তাই সে আগে রাফিনকে গেসল করিয়ে বের করে তারপর নিয়ে গোসল করলো। মেহুল বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখলো সবিহা ঘরে খাবার নিয়ে বসে আছেন৷ মেহুলকে দেখে তিনি হাসি দিয়ে বললেন-
” হয়েছে তোমার! আসো এখন এখানে খায়িয়ে দিচ্ছি।”
” আন্টি আপনি কেন কষ্ট করবেন। আমিই খেতে পারবো।”
” হ্যা আমি জানি তুমি খেতো পারবে কিন্তু এখন আমিই খায়িয়ে দিবো তোমাদের দুই জন কে৷ কাল থেকে কিছু খাও নি জানি আমি এখন এসে বসো এখানে। ”
মেহুল গিয়ে বসলো ওনার সামনে। সাবিহা অনেক আদর-যত্ন করে মেহুল আর রাফিনকে খায়িয়ে দিলেন। ওনার এতো ভালোবাসায় মেহুলের চোখে পানি চলে আসলো। বাড়ি থেকে আসার সময় এতোটা খারাপ না লাগলেও এখন তার মা কে খুব মনে পড়ছে।
—-
আবারও বাসর ঘরে বসে আসে মেহুল। কিন্তু এবার আর ওই রুখাশুখা নয় বরং
ফুলে ফুলে সাজানো বাসর ঘরে। সাবিহা তখন ওকে খায়িয়ে তারপর সুন্দর একটা মেরুন রঙের শাড়ি পরিয়ে দিয়েছিলেন। সবশেষে তাকে নাবিলের ঘরে নিয়ে এসে বসিয়ে রেখে গিয়েছেন।
চলবে…?
