#শেষ_বেঞ্চের_মা
#আরেব্বা_চৌধুরী
#পর্ব_সংখ্যা_১১
ঈদের আগের দিন নাহিদ এলো, নুরজাহানের জন্য একটি সুন্দর শাড়ি, সঙ্গে কিছু ফলমূল। আর নিশি নিজ হাতে রেঁধে পাঠিয়েছে নুরজাহানের পছন্দের খাসির গোশত। প্যাকেটগুলোতে যত্নের ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু সেই যত্নের উষ্ণতা এখন কি আর মায়ের বুক পর্যন্ত পৌঁছায়?
মহিলা কক্ষ হওয়ায় নাহিদকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হলো না। বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে সেবিকা বললেন,
-আমি নুরজাহান খালাকে ডেকে নিয়ে আসছি।
আশ্রমের শেষ মাথার ডান দিকের পাঁচটি কক্ষ রুবি নামের সেবিকার তত্ত্বাবধানে। সুযোগ পেলেই যিনি নুরজাহানের চিঠি লিখে দিতেন, তার নিঃশব্দ কান্নার সাক্ষী হয়েছেন বহুবার। আজ তার মুখেও আলাদা এক উচ্ছ্বাস।
দ্রুত পায়ে নুরজাহানের কক্ষের দিকে ছুটে গিয়ে বললেন,
-খালা, আপনার ছেলে এসেছে আপনার সঙ্গে দেখা করতে।
কথাগুলো যেন নুরজাহানের হৃদয়ের দরজায় গিয়ে ধাক্কা খেল, কিন্তু ভেতরে ঢুকতে পারল না। নুরজাহানের মুখে কোনো রেখাপাত নেই, চোখে নেই কোনো আলো।
নুরজাহানের নিস্পৃহতা দেখে সেবিকা আবার বললেন,
-খালা, শুনছেন? আপনার ছেলে এসেছে।
এবার নুরজাহান চোখ বন্ধ করলেন। গলার স্বর ধীর, যেন বহু আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে,
-বলে দাও, নুরজাহান মরে গেছে।
কথাটা শুনে সেবিকার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল কিছু একটা। এও কি সম্ভব? যে নুরজাহান দিনের পর দিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পথ গুনতেন, যে মা ছেলের একটুখানি খবরের আশায় রাত জাগতেন, আজ সেই মা ছেলের দেখা নিতে চান না!
নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলেন সেবিকা,
-একটা মানুষ কতটা কষ্ট পেলে এমন হয়ে যায়? ছেলেকে ঘিরে এত এত আবেগময় চিঠি, ছেলের জন্য অশ্রুপাত, সব কি আজ পাথর হয়ে গেছে?
তিনি লক্ষ করলেন, নুরজাহানের ভেতরে বড় একটা পরিবর্তন এসেছে। আগের সেই বাচ্চাসুলভ আচরণ নেই, নেই ‘ছেলে-ছেলে’ করে তিন বেলা নাকে ফেনা তোলার অভ্যাস। এই বদলটা কি ভেতর থেকে আসা পরিণতি, নাকি শুধুই এক ধরনের আত্মরক্ষা?
ভাবনার জাল ছিঁড়ে সেবিকা আবার জিজ্ঞেস করলেন,
-আপনি দেখা করবেন না, খালা?
-না।
নিচে নেমে সেবিকা নাহিদকে জানালেন,
-উনি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান না।
নাহিদ অস্থির হয়ে উঠল। চোখে অপরাধবোধ, গলায় ব্যাকুলতা,
-আমি জানি, এতদিন না আসাতে মা আমার ওপর অভিমান করেছে। আপনি একটু বুঝিয়ে বলুন প্লিজ। কাজের অনেক চাপ ছিল, দূরের রাস্তা তাই আসা হয়ে ওঠেনি।
সেবিকা আবার নুরজাহানের কক্ষে গেলেন। আগের মতো এবারও নুরজাহান উঠলেন না। জানালার পাশে বসে থাকা অবয়বটা যেন আরও গুটিয়ে গেছে, আরও দূরে সরে গেছে পৃথিবী থেকে।
-খালা, উনি নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছেন।
নুরজাহান ধীরে মাথা নাড়লেন।
-আমাকে আর জোর করো না, মেয়ে। সব কিছু জোর করে টিকিয়ে রাখা যায় না।
সেবিকা একটু থেমে আবার বললেন,
-আপনার লেখা চিঠিগুলো, উনার হাতে পৌঁছে দেব?
নুরজাহানের চোখের পাতা কেঁপে উঠল। গলা আরও নিচু হয়ে এলো।
-ওগুলো আর প্রাপকের কাছে যেতে চায় না।
-এতদিন ধরে যে চিঠিগুলো লিখেছেন, সব ফেলে দেবেন?
-না। আমার কাছেই থাকুক। যতদিন নিঃশ্বাস আছে, ততদিন। ওগুলোই তো আমার অস্তিত্বের প্রমাণ।
-তাহলে নিচে গিয়ে বলবো আপনি দেখা করতে চান না?
-হ্যাঁ। বলে দাও, ওর মা এখানে থাকে না। এখানে থাকে শুধু নুরজাহান, যার কোনো সন্তান নেই।
সেবিকার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। শেষ চেষ্টা হিসেবে বললেন,
-আরেকবার ভেবে দেখুন খালা। আজ যদি সে ফিরে যায়, যদি আর কখনো না আসে, কষ্টটা কিন্তু আপনারই হবে।
নুরজাহান তাচ্ছিল্যের একচিলতে হাসি হাসলেন। সেই হাসিতে আনন্দ নেই, আছে দীর্ঘদিনের ক্লান্তি।
-ওই কষ্টেই আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি মেয়ে। শান্তি চাইলে হয়তো আজও অপেক্ষা করতাম। আমি কষ্টকেই আপন করে নিয়েছি।
নিচে নেমে সেবিকা নাহিদকে জানালেন, উনি দেখা করতে চান না।
নাহিদ তবুও বিশ্বাস করছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই তো একটু পরেই মা নিচে নেমে আসবেন, তাকে বুকে জড়িয়ে ধরবেন।
সে দাঁড়িয়ে রইল। এক মিনিট, পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট… সময় গড়িয়ে গেল, কিন্তু নুরজাহান এলেন না।
প্রায় এক ঘণ্টার অপেক্ষার পর নাহিদের চোখে জমে উঠল নিঃশব্দ হতাশা। সেবিকার হাতে ব্যাগটা তুলে দিয়ে বলল,
-মাকে দিয়ে বলবেন, এগুলো উনার ছেলে পাঠিয়েছে। আর খাসির গোশতটা নিশি নিজে রেঁধেছে, মায়ের খুব পছন্দ তো তাই।
কথা শেষ করেই নাহিদ চলে গেল। ফিরে তাকাল না আর।
সেবিকা ব্যাগটা নিয়ে নুরজাহানের কক্ষে ঢুকলেন। ধীরে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
-খালা, আপনার ছেলে পাঠিয়েছে।
নুরজাহান ব্যাগটার দিকে তাকালেন না। ছুঁয়েও দেখলেন না। গলা কেটে কেটে বেরোল শব্দ
-কাউকে দিয়ে দাও। না হলে ফেলে দাও। এগুলোর আমার কোনো দরকার নেই।
-আপনার পছন্দের খাসির গোশত রেঁধে পাঠিয়েছে আপনার বউমা।
নুরজাহান তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন,
-যৌবনে যখন নিজের খাওয়া-পরার দিকে ফিরেও তাকাইনি, শুধু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়েছি। এখন কি আর এসব দেখার প্রয়োজন আছে?
সেবিকা ব্যাগটা মালতির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
-তোমরা তিনজন ভাগ করে খেয়ে নিও। শাড়িটাও যার দরকার সে নিয়ে নিও।
এই বলে তিনি বেরিয়ে যেতে যেতে আরেকবার নুরজাহানের দিকে তাকালেন। অবাক হয়ে লক্ষ করলেন, নুরজাহানের চোখে কোনো জল নেই, নেই কোনো উচ্চস্বরে আক্ষেপ। যেন সব কান্না অনেক আগেই শুকিয়ে গেছে, ভেতরে শুধু জমে আছে একরাশ নীরবতা।
রাতে মালতি, রায়না আর রাশেদা খেতে খেতে হাসাহাসি করে উঠল।
-তোমার বউয়ের হাতের রান্না তো সত্যিই ভালো, স্বাদ আছে।।
নুরজাহান তাকালেন না। কোনো কথা বললেন না। শুধু চোখের কোণ গলে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সেই জল কারো চোখে পড়ল না, কেউ দেখার প্রয়োজনও বোধ করল না।
রাতের খাবারের সময় সেবিকা ডেকেছিলেন নুরজাহানকে। কিন্তু তিনি নিচে নামলেন না। সেবিকাও আর জোর করলেন না। তিনি জানতেন, আজ এই মানুষটার গলা দিয়ে খাবার নামবে না। অভিমান সাময়িকভাবে ক্ষুধা ভুলিয়ে দিতে পারে, কিন্তু বুকের ভেতরের দাহন কি কোনো খাবারে নেভে?
রাত গভীর হলে সেবিকা রুম চেক দিতে এলেন। সবাই ঘুমিয়েছে কি না দেখছিলেন। দেখলেন নুরজাহান বিছানায় শুয়ে নেই, জানালার পাশে বসে আছেন, অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে।
-ঘুম আসছে না, খালা? নরম করে জিজ্ঞেস করলেন সেবিকা।
নুরজাহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন,
-এই আশ্রমে কেউ মারা গেলে, তার লাশ কী করো তোমরা?
সেবিকা একটু থমকে গেলেন।
-অনেকের বাড়ির লোক এসে নিয়ে যায়।
-আর যাদের নিতে আসে না?
-তাদের এখানকার কবরস্থানেই দাফন করা হয়।
নুরজাহান শান্ত স্বরে বললেন,
-আমার দাফনটাও ওখানেই করো।
-এসব কী বলছেন আপনি, খালা! সেবিকার গলা কেঁপে উঠল।
-হ্যাঁ মেয়ে। এখন এই আশ্রম, এই মানুষগুলো, এই কবরস্থান, এই সবই তো আমার ঠিকানা। আমার লাশ এখানেই রেখে দিও।
-এভাবে কথা বলতে নেই খালা।
নুরজাহান হালকা নিশ্বাস ফেললেন।
-শুনতে হবে। কখন যে চলে যাই বলা যায় না। মরার আগে কিছু কথা বলে রাখলে অন্তত ভেতরটা হালকা হয়।
-আর যদি আপনার ছেলে নিতে আসে?
-তাকে বলে দিও, মৃত মানুষ ভাত খায় না। নুরজাহান আর ভাত খেতে যাবে না। মরার পর যে-কোনো মাটিতে দাফন করলেই চলবে। আমার আর কোনো দাবি নেই।
-কালকে ঈদ। আজ এসব কথা বলতে হয় না, খালা।
-ঈদের দিন মানুষ মরে না, সেবিকা?
-অযথা দুশ্চিন্তা করবেন না। ঘুমান।
-একটা আফসোস থেকে গেল মেয়ে, তোমাকে দেওয়ার মতো কিছুই আমার নেই। তুমি অনেক সঙ্গ দিয়েছো, অন্তত একটু বুঝতে চেয়েছো আমাকে।
-আপনি শুধু মানিয়ে নিন খালা। দেখবেন, এখানের সবাই একদিন আপনার হয়ে যাবে।
নুরজাহান ক্ষীণ হেসে বললেন,
-যাও মেয়ে, ঘুমাও। রাত অনেক হয়েছে, আমার জন্য শুধু শুধু রাত জেগে থেকো না।
সেবিকা চলে গেলেও নুরজাহানের চোখে আর ঘুম এলো না। ঘরের আলো জ্বালিয়ে বালিশের নিচ থেকে খাতাটা বের করলেন। একটার পর একটা চিঠি পড়তে লাগলেন, যেন প্রতিটা শব্দ বুকের ভেতর নতুন করে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। এত লিখেও যে কত কথা বলা বাকি রয়ে গেছে, তা আজ আরও তীব্রভাবে বুঝতে পারলেন তিনি। অন্যদিনের তুলনায় আজ কষ্টটা যেন শতগুণ ভারী হয়ে বুকে চেপে বসেছে।
হঠাৎ মালতির বিরক্ত কণ্ঠ,
-ঘুমোতে দিবে না নাকি? আলো নিভাও।
নুরজাহান মৃদু হাসলেন। কোনো উত্তর দিলেন না। আলো নিভিয়ে দিলেন ঠিকই, কিন্তু বুকের ভেতরের আলো-অন্ধকারের কোনো বদল হলো না।
রাত পেরিয়ে ভোরের দিকে শরীরটা হঠাৎ দুর্বল হয়ে এলো। গলা শুকিয়ে কাঠ। বুকের ভেতর কেমন একটা ধকধকানি। নুরজাহান কাঁপা গলায় রায়নাকে ডাকলেন,
-রায়না… আমায় একটু পানি খাওয়াও।
রায়না পাশ ফিরে ঝাঁজালো স্বরে বলল,
-নিজে এনে খাও। সবাই কি তোমার চাকর নাকি!
কথাটা শুনে নুরজাহানের চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল। আর কোনো ডাক বেরোল না। ধীরে ধীরে বালিশের নিচে রাখা খাতাটার ওপর হাতটা রাখলেন তিনি, যেন শেষ ভরসাটুকু ছুঁয়ে আছেন। ঠোঁট নড়ে উঠল, কিন্তু শব্দ বেরোল না।
সকালের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। ঈদের সকাল। সকল কক্ষে নতুন কাপড়ের খসখসানি, কারও চোখে ঘুম, কারও মুখে চাপা উচ্ছ্বাস।
রাশেদা উঠে গোসল সেরে নতুন শাড়িটা পরে নিল। নুরজাহানের দিকে তাকিয়ে একটু বিরক্তি নিয়েই ডাক দিল,
-এই নুরজাহান, ওঠো। আর কত ঘুমাবে? নতুন কাপড় নাইবা পড়লে, অন্তত গোসলটা করে নাও।
কোনো সাড়া এলো না।
নুরজাহান একই ভঙ্গিতে পড়ে আছেন, চোখ বন্ধ, মুখ শান্ত, বুকের ওঠানামা নেই।
রায়না পাশ থেকে কটাক্ষ করে বলল,
-বুড়ির দেমাগটা যায় না আর।
রাশেদা কাছে গিয়ে হালকা করে ধাক্কা দিল,
-এই, নুরজাহান!
শরীরটা নিস্তেজভাবে পড়ে রইলো, তাতে প্রাণ নেই। ঠান্ডা একটা শিরশিরে অনুভূতি রাশেদার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। গলা শুকিয়ে এলো তার। কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,
-আরে… নুরজাহান… মরে টরে গেলো না কি?
কথাটা শুনে মালতি আর রায়নাও ছুটে এলো। চোখের সামনে নিথর দেহটা দেখে সবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কেউ একজন কপালে হাত রাখলো, কেউ নাকের কাছে হাত নিলো।
একসাথে চিৎকার করে উঠলো,
-এ তো মনে হয় মরে গেছে!
পাশের কক্ষের কয়েকজন ছুটে এলো। মুহূর্তের মধ্যেই কানাঘুষা ছড়িয়ে পড়ল,
-সত্যিই তো, নিশ্বাস নেই।
-রাতে ভালোই তো ছিল!
-ঈদের দিনই নাকি মরলো!
কেউ আর দেরি করলো না। একজন দৌড়ে গেল সেবিকার কাছে,
-আপা, আশ্রমের ওই পাগল বুড়িটা, মনে হয় মরে গেছে। কোনো সাড়া নাই।
সেবিকার মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বিশ্বাস করতে পারলেন না তিনি। দ্রুত পা বাড়াতে বাড়াতে বললেন,
-কি বলছো! গত রাতেই তো আমি কথা বলে এসেছি। ভালোই তো ছিল খালা।
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই তার চোখে পড়লো ঘরের ভেতরের দৃশ্য,
নুরজাহান শুয়ে আছেন নিঃশব্দে, নিথর, বুকের ওপর দু’হাত ভাঁজ করা। বালিশের নিচে রাখা খাতার এক কোণা বেরিয়ে আছে। মুখে অদ্ভুত এক শান্তি, যেন দীর্ঘ কষ্টের পরে অবশেষে বিশ্রাম মিলেছে।
ঈদের সকালটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল।
আজ কেউ আর বললো না, নুরজাহান পাগল ছিল।
আজ সবাই বুঝলো, তিনি একা, ভীষণ একা ছিলেন।
খবরটা পৌঁছাতে একটুও সময় লাগেনি।
সেবিকার ফোনের ওপাশে নাহিদের কণ্ঠ প্রথমে নিস্তব্ধ হয়ে গেল, যেন শব্দগুলো হঠাৎ করে পথ হারিয়ে ফেলেছে। পরমুহূর্তেই সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল অস্ফুট কান্নায়। মোবাইলটা হাত থেকে পিছলে পড়ে গেল নিশির পায়ের কাছে। নিশি কিছু বুঝে ওঠার আগেই বুকের ভেতর অজানা এক শঙ্কা ঢেউ তুলে উঠলো।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আশ্রমের ফটকে এসে দাঁড়ালো নাহিদ। সঙ্গে নিশি, তানিয়া, তাহসান, সবার চোখ ফোলা, মুখে বিস্ময় আর অস্বীকারের মিশেল।
নাহিদ কাউকে কিছু না বলেই ছুটে গেল ভেতরের দিকে। যে কক্ষটায় মা থাকতেন, সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়েই তার পা দুটো কেঁপে উঠলো।
ভেতরে ঢুকে মায়ের নিথর দেহটা দেখামাত্রই সে নিজেকে আর সামলাতে পারলো না।
নুরজাহানের বুকের উপর মুখ গুঁজে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো নাহিদ,
-মা… আমার সাথে দেখা করলে না কেনো? আমি তো এসেছিলাম, শেষবারের মতো দেখা করতে পারতে, ছেলের উপর এতো অভিমান নিয়ে বিদায় নিলে?
নুরজাহান কোনো উত্তর দিলেন না।
যে মুখটা সারাজীবন ছেলের নাম উচ্চারণ করে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল, আজ সেই মুখ নিঃশব্দ।
নাহিদ হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
-মাকে আমি নিয়ে যাবো। আমার বাড়িতে। আমার মায়ের জায়গা এখানে না।
সেবিকা সামনে এসে দাঁড়ালেন।
-না। উনি মারা যাওয়ার আগে বলে গেছেন, এখানেই যেন উনার দাফন হয়। এটা উনার শেষ ইচ্ছা।
ঠিক তখনই আশ্রমের তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তা এসে পৌঁছালেন।
তার নাম আব্দুল হালিম, এই আশ্রমের সুপারিন্টেনডেন্ট। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ চোখে অনেক মৃত্যু দেখেছেন, তবু আজ তার গলাও কেঁপে উঠলো।
তিনি শান্ত স্বরে বললেন,
-নুরজাহান আমাদের আশ্রমের মানুষ ছিলেন। উনার কাফন-দাফন এখানেই হবে। এটা উনার ইচ্ছা, আর আমরা সেই ইচ্ছার মর্যাদা রাখবো।
নাহিদ কিছু বলতে গেল, কিন্তু শব্দ পেল না।
আব্দুল হালিম স্যার আবার বললেন,
-কাফনের কাপড় থেকে শুরু করে দাফনের সব খরচ আশ্রম বহন করবে। আপনার কাছ থেকে এক টাকাও নেওয়া হবে না।
যে জীবিত অবস্থায় মাকে ঠিকমতো খাওয়াতে পারে না, তার কাছ থেকে মৃত মানুষের কাফনের কাপড় এনে লোক দেখানো আদিখ্যেতা দেখাতে আমরা রাজি নই।
কথাগুলো যেন ছুরির মতো নাহিদের বুকে গেঁথে গেল।
সে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
রায়না কাঁপা কণ্ঠে বললো,
-ভোরের দিকে সে হয়তো শেষ মুহূর্তে একটু পানি খাওয়ার জন্য আমাকে ডেকেছিল, আর আমি… আমি রেগে গিয়েছিলাম।
মালতি চোখ মুছতে মুছতে বললো,
-গত রাতেও আমি মানুষটাকে বকেছি, জানতাম না এটাই তার জীবনের শেষ রাত।
সবার চোখ ভিজে উঠলো।
কেউ কেউ মাথা নিচু করলো, কেউ চুপচাপ দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইলো।
নাহিদ তখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে।
চারপাশের মানুষ, শব্দ, কান্না কিছুই আর তার কাছে স্পষ্ট লাগছে না।
তার মনে হচ্ছে, গোটা দুনিয়াটা আজ হঠাৎ করেই অন্ধকার হয়ে গেছে।
যে মায়ের জন্য কখনো সময় হয়নি,
আজ সেই মায়ের নিথর শরীরের সামনে দাঁড়িয়ে
নাহিদ বুঝতে পারলো,
কিছু অপেক্ষা আর কিছু ক্ষমা আছে, যেগুলোর মূল্য মানুষ বেঁচে থাকতে থাকতেই; মৃত্যুর পর সেগুলো অর্থহীন।
চলবে,,,,,,
