#শেষ_বেঞ্চের_মা
#আরেব্বা_চৌধুরী
#পর্ব_সংখ্যা_০৮
এক সময় যারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো, একে একে তারাও নিজেদের হাত গুটিয়ে নিলো।
তাদের সংসার, তাদের দায়িত্ব সবারই তো হিসেব-নিকেশ আছে।
তবুও মা দমে যাননি। নিজের গহনার বাক্সটা খোলার শব্দ যেন প্রতিদিন একটু একটু করে আরও নিঃস্ব হওয়ার ইতিহাস লিখত, তবু মায়ের মুখে অভিযোগের ছায়া ছিলো না।
তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিটি দিনকে বাঁচিয়েছেন কেবল আমাকে ঘিরে।
যেভাবে কাঁটার ঝোপের মাঝেও একটি মা তার বাচ্চাকে আগলে রেখে নিরাপদ পথ খোঁজে মা ঠিক তেমনই ছিলেন।
এভাবে দেখতে দেখতে আমার পড়ালেখা শেষ হলো।
বাড়ির শেষ সম্বল মায়ের সঞ্চিত কিছু গহনা বিক্রি করে শহরে আসলাম।
মাত্র দুই মাসের মধ্যেই একটা চাকরির ব্যবস্থা হলো।
মা যেন তার প্রতিটি সকাল আমায় ঘিরেই শুরু করতে চাইতেন। ভোরের আলো ফোটার আগেই রান্নাঘরে তাঁর পায়ের শব্দ শুনতে পেতাম,
কখনো পরোটা, কখনো ভুনা খিচুড়ি, কখনো ডিম ভাজি, আবার টিফিনে কী দেবেন তার হিসেব করে ছোট ছোট ডিব্বা সাজিয়ে রাখতেন টেবিলের উপর।
আমি বের হওয়ার আগে মা দু’হাত বাড়িয়ে টিফিন এগিয়ে দিতেন,
-খালি পেটে থাকিস না বাবা।
তারপর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতেন যতক্ষণ না আমি মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে যাই।
আর সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময়।
দূর থেকেই দেখা যেতো মা দরজার চৌকাঠে বসে আছেন।
মনে হতো যেন সূর্য ডুবার আগে তিনি আমাকে না দেখে শান্তি পান না।
আমি ঘরে ঢুকলে তিনি হাঁফ ছেড়ে বলতেন,
-এবার আমার নিঃশ্বাসটা ঠিকমতো চলছে।
নাহিদ নিশির দিকে তাকিয়ে বললো,
-তুমি বলো নিশি, এমন একজন মানুষকে তুমি কি স্বাভাবিক বলবে?
একজন মা তার সন্তানকে নিয়ে এতোটা ভয়, এতোটা অনিশ্চয়তায় বাঁচলে তা কি সত্যিই স্বাভাবিক?
নিশি বিরক্ত মুখে সরে গিয়ে বললো,
-এসব কাহিনি অন্য কোথাও গিয়ে বলো নাহিদ। আমার কাছে নয়।
-নিশি, আমি তো শুধু বোঝাতে চাইছি।
-আমাকে কিছুই বোঝাতে হবে না। এসবের দায় আমার নয়।
-আমি তো বলেছি, তোমার দায় নয়।
-তাহলে এসব শুনতে আমাকে বাধ্য করছো কেন?
কিছুটা থেমে নিশি কঠোর গলায় বললো,
-শোনো, আমি কাল সকালেই আমার বাপের বাড়ি চলে যাবো। তুমি ইচ্ছা হলে আমার সাথে এসো, নাহলে তোমার মায়ের সাথে থাকো।
নাহিদ স্থির দাঁড়িয়ে রইলো।
তার মুখের নিস্তব্ধতা যেন জানলা দিয়ে ঢুকে পড়া শীতের হাওয়া কাঁপিয়ে দিচ্ছে, ব্যথা দিচ্ছে, অথচ শব্দহীন।
নিশি বিছানায় গা এলিয়ে দিতে দিতে বললো,
-সবাই অস্বাভাবিক, শুধু আমিই স্বাভাবিক। সবার সাথে মানিয়ে চলার দায় যেনো জন্ম থেকেই আমার কাঁধে চাপিয়ে রাখা হয়েছে। অনেক হয়েছে, আর না। এবার আমি এই অভিশাপের থেকে মুক্তি চাই। একটা মেয়ে বিয়ের সময় কত স্বপ্ন দেখে, সংসারটা নিজের মতো করে সাজাবে, নিজের মতো করে চলবে। কেউ তো বিয়ের পর প্রতিদিন কান্নায় ভেঙে পড়ার জন্য বিয়ে করে না।
এক মুহূর্ত থেমে নিশি দীর্ঘশ্বাস ফেললো, তারপর ফিসফিস করে বললো,
-আমারই দোষ হয়তো আমার কপালেই হয়তো সংসার লিখা ছিলো না।
ঘরের বাতাসটা হঠাৎ আরও ভারী হয়ে গেল।
নাহিদ চুপচাপ চিত হয়ে শুয়ে পড়লো, হাতটা এনে কপালের উপর রাখলো।
কথাগুলো তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে গেঁথে বসতে লাগলো। তার মনে হলো সে যেনো নদীর বুকে ভাসমান একটি নৌকা, যার না আছে দাঁড়, না আছে দিকনির্দেশনা। চারপাশে অন্ধকার, মাঝ নদীতে একা দাঁড়িয়ে আছে সে। একদিকে মা, যে তাকে পৃথিবীর বিনিময়েও ছাড়তে প্রস্তুত নন। অন্যদিকে স্ত্রী, যে প্রতিটি দিনের শেষে ক্লান্তি আর ক্ষোভে ভেঙে পড়ছে সেই মায়ের কারণেই।
নাহিদের বুকের গভীর থেকে একটা নিঃশ্বাস বের হয়ে এলো, নিঃশ্বাসটা যেনো অপরাধবোধ, দুঃখ আর অসহায়তার সবটুকু মিলেমিশে জমাট হওয়া একটা দীর্ঘশ্বাস।
চোখ বন্ধ করতেই অতীতের স্মৃতিগুলো ঢেউয়ের মতো এসে আঘাত করতে লাগলো, মা কীভাবে তার হাত ধরে স্কুলের গেট পর্যন্ত নিয়ে যেতেন। কীভাবে ছেলের জন্য একবেলা না খেয়ে চাচিদের বাসায় বসে থাকতেন।
কীভাবে রাতের অন্ধকারে দরজার সামনে বসে থাকতেন তার ফেরার অপেক্ষায়।
আর পাশে শুয়ে থাকা স্ত্রী, যার চোখে এখন অভিমান, রাগ, হতাশার স্ফুলিঙ্গ। যে আশা করেছিল তার সাথে একটা শান্ত, স্বস্তির সংসার গড়বে।
দুই দিক থেকে দুইজন তাঁকে টেনে ধরছে,
আর নাহিদ ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে লাগলো
এ লড়াইয়ের শেষ কোথায় তা জানে না সে, কাকে ধরে রাখলে বাঁচবে, কাকে ছাড়লে ডুবে যাবে সে নিজেই বোঝে না।
সকালে ঘুম থেকে উঠে নাহিদ শুকনো মুখে নিশিকে বললো,
- তুমি থাকো আমি যাচ্ছি। ভালো কোনো বৃদ্ধাশ্রমের খোঁজে। মাকে সেখানেই রেখে আসবো।
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে যেন নিশির চোখে অব্যক্ত তৃপ্তির এক ঝিলিক খেলে গেল।
ভোরের হালকা আলোয় নাহিদের মুখটা ফ্যাকাসে, কোনো কথা না বলে সে উঠে দাঁড়ালো।
নাশতার থালা সামনে রাখা থাকলেও তার গলা দিয়ে কিচ্ছু নামলো না। হাতের গ্লাসের জলটাও আনমনে অশান্তভাবে নাড়তে লাগলো।
ঘরের কোণে বসে নুরজাহান বেগম সব শুনলেও নাহিদের কথাগুলো তার কাছে ছিলো অস্পষ্ট।
সারাটা দিন কেটে গেল।
সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে, তবু নাহিদ ফেরেনি।
বাড়িটা ভারী নিস্তব্ধ হয়ে আছে। নুরুজাহান বেগমের লাঠির ঠুক-ঠুক শব্দে মাঝে মাঝে সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে যাচ্ছে। তিনি কখনো ঘর থেকে বারান্দায়,বারান্দা থেকে ঘর পায়চারি করছেন, অস্থির, আতঙ্কিত, প্রায় কাঁপতে থাকা কণ্ঠে।
মাঝে মাঝে এসে নিশির কানের কাছে ঝুঁকে বলছেন,
- আমার ছেলের কাছে ফোন দাও। একবার শুনি, দুপুরে কিছু খেয়েছে কিনা? তুমি কেমন করে এত নিশ্চিন্ত হয়ে বসে আছো? আমার ছেলে বাইরে আছে, কেমন আছে, খেয়েছে কিনা কে জানে!
নিশি বিরক্ত মুখে উত্তর দিচ্ছে,
তবু নুরজাহানের কানে সেই উত্তর যেন পৌঁছায়ই না।
রাত নটায় নাহিদ বাড়ি ফিরতেই নুরজাহান অস্থির হয়ে উঠলেন। নাহিদ নুরজাহানের কাছে আজ আবদার করে বসলো, তাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে। ছোটবেলার সেই মুহূর্তগুলো যেনো পুনরায় জীবন্ত হয়ে উঠল মা তাঁকে খাওয়াতে বসেছেন, গরুর গোশত মেখে ভাত তার মুখে তুলে দিচ্ছেন। নাহিদ যেনো হারানো এক শান্তি খুঁজে পেয়েছে, মুহুর্তে সমস্ত ক্লান্তি মুছে মুখে মৃদু হাসি ফুটল।
নাহিদ নিশির দিকে তাকিয়ে বললো,
-মায়ের ব্যাগটা গোছিয়ে রাখো, কাল সকালে মাকে নিয়ে রওয়ানা হবো।
নিশি আর দেরি না করে ছুটে গেলো নুরজাহানের রুমে, দ্রুত ব্যাগ গোছাতে লাগলো, যেন সময়ও তার পিছু নিয়ে এগোচ্ছে।
নুরজাহান শিশুমনে কেঁপে উঠলেন, -আমি কোথায় যাবো নাহিদ? আমার সাথে কি তুইও যাবি?
নাহিদ ছোট করে উত্তর দিলো, -হু।
নুরজাহান আবার প্রশ্ন করলেন, -বউমা সাথে যাবে না?
নাহিদ মাথা নাড়িয়ে না করলো, কিন্তু মুখ থেকে কোনো শব্দ বেরুলো না।
সেই মুহূর্তে নিশি কপালে ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এল। নুরজাহান ভ্রু উঁচু করে নিশিকে লক্ষ্য করে বললেন, -আমায় তো তুমি সহ্য করতে পারো না, দেখো আমার ছেলে আমায় কত ভালোবাসে, আমায় নিয়ে অনেক দূর যাবে, তোমাকে সঙ্গে নিবে না।
নিশি অল্প কিছুক্ষণ স্থবির হয়ে তাকালো। মনে হলো শাশুড়ি আর বউয়ের মধ্যে এক রহস্যময় দ্বন্দ্ব চলছে নাহিদের ভালোবাসা কার প্রতি বেশি, কার প্রতি কম। নুরজাহানের চোখে মমতা, নিশির চোখে নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা; আর নাহিদ তাদের দুইজনের মাঝেই নিখাদ ভালোবাসা মিশিয়ে রেখে অদৃশ্যভাবে নিজ পথ খুঁজে চলেছে।
গোটা রাত নিশির সঙ্গে আর একটিও কথা বললেন না নাহিদ।
নিশি দু-একবার কথা বলতে চাইলেও নাহিদ মুখ ঘুরিয়ে নিল। একটু অভিমান, একটু ক্লান্তি, আর খানিকটা অব্যক্ত কষ্ট জমে ছিলো তাঁর চোখে।
নিশিও শেষ পর্যন্ত জোর করলেন না; মনে হলো রাতটা নীরবতারই হোক।
দুপুরে নুরজাহানকে নিয়ে বেরোনোর সময় নাহিদ নিশির দিকে তাকিয়ে বলেছিলো,
-তুমি চাইলে মানিয়ে নিতে পারতে।
শব্দগুলো খুব ধীরে বলা হলেও নিশির বুকের ভেতর যেনো ধাতব শব্দে বাজলো, গভীর ভার রেখে গেলো।
নুরজাহানকে নিয়ে সিএনজিতে বসতেই নাহিদের বুক ধকধক করতে লাগলো।
মা সারা পথ উৎসুক চোখে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন, যেনো ছোট্ট শিশু কোন আনন্দের ঠিকানা জানতে চাইছে।
অবশেষে নূরজাহান ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
-বাবা, আমরা কোথায় যাচ্ছি?
নাহিদ নিঃশ্বাস টেনে মৃদু গলায় বলল,
-গেলেই দেখতে পাবে মা।
সিএনজির জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকে নূরজাহানের সাদা চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছিলো।
তিনি দু’হাত দিয়ে আঁচল ঠিক করছিলেন, কিন্তু চোখে ছিলো এক অদ্ভুত ভাব ভয়, উত্তেজনা আর অভিমান মিলেমিশে তৈরি করা এক অচেনা আলো।
নাহিদ চুপচাপ সামনের দিকে তাকিয়ে রইলো। সারা পথ যেনো তার বুকের ভেতর এক ভারী পাথর ঝুলে আছে সে জানে কোথায় যাচ্ছে, কিন্তু মাকে কীভাবে বুঝাবে সে জানে না।
মায়ের আঙুলগুলো ধীরে ধীরে তার হাতের ওপর এসে ঠেকল,
নূরজাহান বললেন,
-বাবা, আমি তো কিছুতেই তোর থেকে দূরে থাকতে পারবো না।
নাহিদের গলা শুকিয়ে গেলো, চোখের কোণে পানি চিকচিক করলো,
কিন্তু তবুও সে মুখ ফিরিয়ে বাইরের তাকিয়ে রইলেন।
যেনো সামনে ছুটে চলা রাস্তা তাকে কোনো কঠিন সিদ্ধান্তের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
চার ঘন্টার ক্লান্তিকর পথ পেরিয়ে সিএনজি থামতেই নুরজাহান ধীরে ধীরে চারপাশে তাকালেন। অচেনা গেট, সাদামাটা বিল্ডিং, নিস্তব্ধ আঙিনা এক মুহূর্তেই তিনি বুঝে গেলেন, এ কোনো আত্মীয়ের বাড়ি নয়, এটা বৃদ্ধাশ্রম।
সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর চোখ দুটো জলে ভরে উঠলো। ঠোঁট কাঁপলো, কিন্তু শব্দ বের হলো না। যেনো গলার ভেতর জমাট বাঁধা ব্যথা আটকে রেখেছে সব কথা। নাহিদ ব্যাগগুলো নামিয়ে মাকে ধরতে গেলেও নুরজাহান হাতটা আলতো করে সরিয়ে দিলেন শুধু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সামনে।
ভাঙা গলায় তিনি বললেন,
-তবে এটাই হওয়ার ছিলো আমার শেষ পরিণতি?
এক জীবনে সবই তো হারালাম নিজের মানুষ, নিজের ঘর, নিজের সম্মান।
ছেলেকে নিয়ে গর্ব করে বেঁচে ছিলাম, ভাবতাম আমার বার্ধক্যটা অন্তত তার কাঁধে ভর দিয়েই কাটবে।
তিনি কাঁপা গলায় আবার বললেন,
-কীই বা পেলাম বলো? যে ছেলে একমুঠো ভাত মুখে তোলার আগে আমার চোখের দিকে তাকাতো আজ সেই ছেলেই আমায় এখানে রেখে চলে যাবে, আমি কি এতোটাই বোঝা হয়ে গেছি?
চোখের জল এবার আর থামলো না।
-আমায় তুই একবার জিজ্ঞেস করলি না কোথায় থাকতে চাই?একবার বললে না মা, তুমি কি ভয় পাচ্ছো?
তিনি দুই হাত বুকের কাছে তুলে ফিসফিস করে বললেন,
-তুই তো আমার বেঁচে থাকার শেষ কারণ ছিলি নাহিদ,
আজ তুই-ই আমাকে এখানে রেখে যাচ্ছিস? এবার বুঝলাম, বার্ধক্য মানুষের চোখের পানি আর নিঃশব্দ বিদায়ের আরেক নাম।
নাহিদ মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো, তার কাছে এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই।
চারদিকে হালকা হাওয়া বইছে, কিন্তু নুরজাহানের বুকের ভেতর যেনো হাজার ঝড় বয়ে চলছে…
বৃদ্ধাশ্রমের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মুহূর্তে তার চোখের জল আর নীরব দীর্ঘশ্বাস মাটির ওপর পড়ার আগেই মানুষের হৃদয় চিরে যায়।
নুরজাহানের ব্যাগপত্র গুছিয়ে রাখলো নাহিদ।
কোনো শব্দ না করে এক কোণে বসে ছিলেন নুরজাহান, চোখের নিচে কালি, মুখটায় ক্লান্তির ছায়া, অথচ সেই চিরচেনা মাতৃস্নেহের আলো মুছে যায়নি একটুও।
নুরজাহান ধীরে ধীরে মাথা তুলে বললেন,
-চলেই তো যাবি, আটকাবো না আর। একটু থেমে আবারও বললেন,
-শুধু যাওয়ার আগে একটা কলম আর খাতা দিয়ে যা। যখন তোর কথা খুব মনে পড়বে, যখন তোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করবে, তখন ওই খাতাটাকে তুই ভেবে কথা বলবো। তোর সাথে তো কথা বলার সুযোগ আর পাবো না, তাই খাতাটাই হবে আমার নাহিদ আমার সোনা ছেলের জায়গা।
নাহিদের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। কথা যেন গলায় আটকে গেল। সে উঠে বাইরে গিয়ে ছোট্ট এক খাতা আর কলম কিনে আনলো খাতা যেটির পাতা একেবারে সাদা, ঠিক মায়ের মতোই নির্মল।
ফিরে এসে খাতাটা মায়ের হাতে দিলো। নুরজাহান দু’হাত দিয়ে খাতাটা আঁকড়ে ধরলেন, যেন এটা কোনো খাতা নয় তাঁর ছেলের বুক। তারপর ধীর ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে নাহিদের কাছে এগিয়ে গেলেন। নাহিদ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে, যেন অপরাধী।
নুরজাহান হাত বাড়িয়ে ছেলেকে বুকের ভেতর টেনে নিলেন। এমন শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন, যেভাবে শৈশবে ভয় পেলে তাঁকে জড়িয়ে ধরতেন।
তিনি ফিসফিস করে বললেন,
-তোকে ছাড়া আমি কেমন করে থাকবো বাবা? তুই তো জানিস, তোর ছাড়া আমার একদিনও কাটে না।
একটু পর তিনি আবার বললেন।
-কিন্তু তোর সুখের পথে কখনো আমি বাধা হবো না। যদি এটাই তোর ভালো লাগে যদি ভাবিস এতে তোর সংসার টিকে যাবে তবে আমিও মানিয়ে নেবো বাবা।
নাহিদের চোখ ঝাপসা হয়ে উঠলো।
মায়ের কাঁধে মুখ রেখে সে কান্না চেপে বললো,
-মা…
কিন্তু বাকিটা মুখ দিয়ে বের হলো না। সব অব্যক্ত কথা গলে পড়লো নীরব কান্নায়।
মা তার গাল দুটো দু’হাতে ধরে আদর করে বললেন,
-কাঁদিস না। তুই কাঁদলে আমার মন ভেঙে যায়। আমি ভালো থাকবো বাবা। তুই শুধু সুখে থাকিস এইটুকুই চাই। তারপর নুরজাহান ধীরে ধীরে নাহিদের হাত ছেড়ে দিলেন।
চলবে,,,,,
