#শেষ_বেঞ্চের_মা
#আরেব্বা_চৌধুরী
#পর্ব_সংখ্যা_০৩
কাজের বুয়া চুপিচুপি দুই পিস মাংস আলাদা করে এনে ভদ্রতার সহিত নুরজাহান বেগমের সামনে রাখলো।
-খেয়ে নিন।
এই দুই পিস মাংস যেনো বহুদিনের দমিয়ে রাখা ক্ষুধার মাঝে হঠাৎ পাওয়া আনন্দ।
নুরজাহান বেগম চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে স্বাদ নিলেন।
আঙুলের ডগায় মাংসের ঝোলের উষ্ণতা লেগে রইলো,
স্বাদের ঘ্রাণ যেনো পুরোনো দিনে ফেরত নিয়ে গেলো।
আঙুল চাটতে চাটতে আবেগ মিশ্রিত স্বরে বললেন,
-জানো, কতদিন পর এমন স্বাদের রান্না খেলাম!
বউমা এসব আমাকে খেতে দেয় না,
বলে অতিরিক্ত তেল-মসলায় নাকি আমার পেট খারাপ হবে।
বুয়া মলিন হেসে মাথা কাত করে জিজ্ঞেস করলো,
-বুড়ো হলে কি সবার পরিণতিই এমন হয়?
প্রশ্নটা শুনে নুরজাহান বেগমের মুখে হালকা লজ্জা মাখা হাসি ফুটে উঠলো।
কত কথা আসছিলো মনে কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারলেন না।
হয়তো কোনো এক জায়গায় ছেলে মানুষ করায় কোনো ত্রুটিছিলো।
হয়তো জীবনের যে শিক্ষাটি তাকে দিতে হতো সেটা তিনি দিতে পারেন নি, অথবা সময়ই তাকে সুযোগ দেয়নি।
একটু নিঃশ্বাস নিয়ে তিনি ধীর স্বরে বললেন,
-সবার ভাগ্য কি এক হয়?
যার ভাগ্যে যা লিখা, মানুষ তার চেয়ে বিন্দুমাত্র বেশি পায় না।
এটাই আমার জীবনের লিখন এই নিঃসঙ্গতা, এই নীরবতা, এই অভিমান নিয়ে বাঁচা।
বুয়া কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইলো।
তারপর আবারও ধীর গলায় প্রশ্ন করলো,
-আপনি আর বাচ্চা নেন নি খালা? দু-তিনজন ছেলে থাকলে হয়তো একজন না দেখলেও অন্যজন ঠিকই আপনাকে দেখতো, কদর করতো।
নুরজাহান বেগমের কণ্ঠে তখন গভীর ক্লান্তি আর তীব্র আকুলতা একসাথে মিশে গেলো।
-বিয়ের পর থেকে আমার কোনো সন্তান বাঁচতো না হয়তো পেটে মারা যেতো, নয়তো জন্মের পরই পৃথিবীটা ছাড়তো। অনেক কান্না, অনেক চিকিৎসা আর দোয়ার পর নাহিদকে আল্লাহ বাঁচিয়েছেন। সে আমাদের প্রাণ, আমাদের দোয়া। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছয় বছর অব্দি আর কোনো সন্তান নিইনি, ভয় পেতাম যদি ওর যত্নে একটু অবহেলা হয়, যদি আমার কোনো ভুলে আমার এই আলোটুকু নিভে যায়?
তারপর একটু থেমে নরম গলায় বললেন,
-ছয় বছর পর অবশ্য চেষ্টা করেছিলাম আরেকটা সন্তান নিতে, যাতে সে তার সুখ দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার মতো কাউকে পাশে পায়, আমি না থাকলে যার সাথে প্রাণ খুলে হাসতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তখন আর চাননি।
বুয়া কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইলো নুরজাহানের দিকে।
-আপনার ছেলে কি আপনার কাছে আসে না? খোঁজ নেয় না?
নুরজাহান বেগম নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো হাসলেন,
-ডাকলে আসে।
বুয়া জিভে দাঁত চেপে মলিন হাসলো,
-এই বয়সে গরাদের মতো ঘরে বসে থাকা, কে জানে কতটা ভয়াবহ কষ্ট।
নুরজাহান বেগম তসবিহের দানাগুলো আঙুলে ধীরে ধীরে ঘুরাতে ঘুরাতে বললেন,
-ওই যে বললাম মা, ভাগ্যের লিখন কেউ খণ্ডাতে পারে না। কেউ দূর থেকে চোখ ভরে আপনাকে দেখে, আর কেউ কাছে বসেই ভুলে যায়।
-আচ্ছা খালা, আমি যাই। অনেক কাজ পড়ে আছে।
-যাও মা, তোমার সাথে গল্প করে আজ মনটা একটু হালকা হলো।
বাইরে বেরিয়ে গেলো বুয়া।
বাইরে এখনো তুমুল কোলাহল, হৈ-হুল্লোড়, হাসি-ঠাট্টা অনুষ্ঠানের শেষ প্রহরের উচ্ছ্বাস।
চারপাশের সেই উচ্ছ্বসিত শব্দ যেনো নুরজাহান বেগমের নিঃশব্দতার সাথে অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করছিলো।
তিনি ধীরে ধীরে তাসবিহ আঙুলে গেঁথে পড়তে লাগলেন, বিগত দিনের স্মৃতি, না বলা আক্ষেপ, সব যেনো মনটাকে ভারী করে তুলছিলো।
এই ছোট ছোট দোয়ার দানার মধ্যেই তিনি খুঁজে নিলেন নিজের শান্তির আশ্রয়।
গোটা অনুষ্ঠান শেষে সব অতিথি বিদায় নিলে নাহিদ নিশিকে জিজ্ঞেস করলো,
-মা খেয়েছেন?
-হ্যাঁ।
মাকে দেখে আসি এই ভাবনা থেকেই নাহিদ নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়ালো নুরজাহানের রুমে।
নুরজাহান বেগম তখন গভীর ঘুমে তলিয়ে আছেন।
নাহিদ ধীরে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।
মায়ের ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক তৃপ্তি পেলো, কৃতজ্ঞতার হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে।
কিছুক্ষণ নীরবে বসে থেকে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে আবার নিজের ঘরে ফিরে গেলো।
রাতে শুয়ে শুয়ে নিশি বললো,
-মা বলছিলেন তানিয়া-তাহসানকে নিয়ে একদিন ওবাড়ি গিয়ে ঘুরে আসতে। অনেকদিন হলো বাবার বাড়ি যাওয়া হয় না।
নাহিদের স্বর ভারী হয়ে উঠলো,
-মাকে একা ফেলে কিভাবে যাবে?
-খাবার-দাবার, পানি, সব আমি উনার ঘরেই সাজিয়ে রেখে যাবো। একটা দিনের ব্যাপার। সকালেই যাবো, বিকেলেই ফিরে আসবো।
-আমি ভেবে দেখবো।
-আমি কালই যেতে চাই।
-আচ্ছা, যাও।
-আচ্ছা যাও মানে! তুমি যাবে না?
-কাল আমার অফিস আছে, কিভাবে যাবো?
-একদিন ছুটি নিলে কিছু হবে না। বাপের বাড়ি কি রোজ রোজ যাই! ছেলে-মেয়ে নিয়ে একদিন একটু হাওয়াপরিবর্তন করলে এমন কি ক্ষতি?
নাহিদ খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলো। শেষে ধীরে বললো,ঠিক আছে, যাবো।
নাহিদের কথায় নিশির মুখে আলো ঝলমল করে উঠলো।
একটু থেমে নাহিদ জিজ্ঞেস করলো,
-তবে মা’কে কি করবে?
-উনার সব প্রয়োজনীয় জিনিস উনার খাটের পাশে সাজিয়ে রাখবো। একদিনই তো… বিকেলেই ফিরে আসবো। চিন্তা করো না। এখন ঘুমাও সকাল সকাল রওনা দিতে হবে।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই বেশ যত্নসহকারে শাশুড়ির ঘরটা গুছাতে লাগলো নিশি।
রুটি আর ডাল নুরজাহান বেগমের সামনে রেখে সে মৃদু গলায় বললো,
-আজ আমরা আমার বাপের বাড়ি যাবো।
নুরজাহান বেগম উৎসুক চোখে তাকিয়ে বললেন,
-আমিও যাবো? অনেকদিন হলো বাইরে বের হইনি। একটু আলো-বাতাস, একটু সবুজ গাছপালা দেখতে মনটা কেমন ছটফট করে।
নিশির স্বর কঠোর হয়ে উঠলো,
-ওখানে যাচ্ছিই তো সংসারের এই বেড়াজাল থেকে একটু বের হয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে। ঝামেলা যদি সাথে নিয়েই নিতে হয় তবে সেখানে গিয়েই বা লাভ কি?
কথাটুকু শুনেই নুরজাহান বেগমের মুখটা যেনো নিস্প্রভ হয়ে গেলো।
চোখের কোণায় জমে থাকা সেই দীর্ঘ নিঃশ্বাস তিনি চেপে রাখলেন অনেকটা শক্ত হয়েই।
-নাহিদও যাবে? অনেকটা আশা ভরসার মতো শোনালো প্রশ্নটা।
নিশি গম্ভীর স্বরে বললো,
-হ্যাঁ। মা খুব করে বলেছেন সে যেন আমাদের সাথেই যায়।
নুরজাহান বেগম নিঃশব্দে মাথা নিচু করলেন।
বুকের ভিতরে চাপা থেকে যাওয়া হাজারো কষ্ট যেনো জমে থাকা বরফের মতো ধীরে ধীরে গলা ধরতে লাগলো।
তিনি চোখ মুছলেন, ঠিক বুঝতে পারছিলেন না নিজের ঘরে থেকেও তিনি কি সত্যিই এই সংসারের একজন?
নাকি কেবল এক অপ্রয়োজনীয় সত্তা, যাকে রেখে গেলেও কেউ প্রশ্ন করে না, নিয়ে গেলেও কেউ গণ্য করে না।
নিশি নুরজাহান বেগমের খাটের পাশের ছোট টেবিলটিতে ধীরে ধীরে ভাত, ডাল আর মাছ ভুনা ঢেকে রাখলো।
-সময় মতো খেয়ে নিবেন, বলেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
নুরজাহান কেবল নিঃশব্দে মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি দিলেন।
কিছুক্ষণ পর নাহিদ এসে মায়ের পাশে দাঁড়ালো।
-মা আমরা নিশিদের বাড়ি যাচ্ছি। খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো। তুমি নিজের খেয়াল রেখো।
নাহিদের কথা শেষ হতেই, নুরজাহানের মাথা আরো বেশি নিচু হয়ে গেলো।
চোখের কোণ ঘিরে থাকা জল টুপটাপ বিছানার চাদরে পড়ে দাগ ফেলতে লাগলো।
ভাঙা স্বরে তিনি নিজেকেই যেন বললেন,
-তুমি যখন ছোট ছিলে, তোমার একটুও ব্যথা সহ্য করতে পারতাম না বাবা, তোমাকে ফেলে তো এক মুহূর্তের জন্যও কোথাও যাইনি আমি। আজ তুমি সহজে চলে গেলে আমাকে ফেলে তোমার মনটায় কি একবারও ভয় হল না? যদি এই বন্ধ দরজার ভেতরেই নিঃশ্বাস আটকে আমি থেমে যাই, তখন?
কিছুক্ষণ পরেই দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।
ধিরে ধিরে সেই নীরবতা আরও ভারি হতেই নুরজাহান বুঝে ফেললেন সবাই বেরিয়ে গেছে কিছু সময়ের স্বাধীনতার জন্য, নিজেরা নিঃশ্বাস নেবে নতুন বাতাসে।
মুক্তি নেই শুধু তাঁর জন্য।
এই ঘরই যেন তাঁর বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন এক কারাগার যেখানে তাকে নিঃশব্দেই, যন্ত্রণার প্রহরে বাঁচতে হবে কিংবা মরতে হবে।
শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছাতেই নাহিদকে কোথায় বসতে দিবেন, কি খাবার সামনে তুলে ধরবেন তা নিয়ে সামিরা বেগমের তোড়জোড় যেনো থামতেই চাইছে না।
নিশি আড়চোখে বারবার ভাবির দিকে তাকাচ্ছিল। তার দৃষ্টিতে বিরক্তির ম্লান রঙ ফুটে উঠছে যেনো নিশির আগমনেই কোন অস্বস্তি বয়ে এসেছে ঘরে।
নিশি ইশারা করে সামিরা বেগমকে তা বুঝিয়ে দিলো।
সামিরা বেগম হালকা হাসলেন,
-ওসব পাত্তা দিও না, বহুদিন পর এসেছো, আজ একটু আরাম কর, মন খুলে গল্প কর।
তানিয়া আর তাহসানও আজ বেশ উচ্ছ্বসিত।
ওদের হাসি খুশির শব্দে বাড়ির উঠোন কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
ঘরে বসে নাহিদ দরজার ফাঁক দিয়ে বাচ্চাদের সেই মুগ্ধ হাসি লক্ষ্য করলো।
এক মুহূর্তের জন্য বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো,
আমার মা-ও তো আমায় এভাবেই ভালোবাসতেন।
কিন্তু জীবনের এতো দৌড়ঝাঁপ, সংসারের হাজারটা দৈনন্দিন হিসাব-নিকাশের ভিড়ে কবে থেকে যে মায়ের পাশে বসা হয় না, কথা বলা হয় না,
সে হিসাব নাহিদ নিজেও দিতে পারে না।
দুপুরে ভাত খেতে বসে নুরজাহান বেগম ধীরে ধীরে থালার ঢাকনাটি সরালেন।
ভাত ঠান্ডা হয়ে শক্ত হয়ে গেছে।
মাছ ভাত মেখে মুখে নিতেই ভাত যেন গলায় আটকে আসছে বারবার।
জিভে কোনো স্বাদ লাগে না তবু ক্ষুধার টানে দু’এক লোকমা খেয়ে আবারও বিছানায় শরীরটা ফেলে দিলেন তিনি।
হাঁটুগুলো ভারী হয়ে গেছে, চোখের সামনে আলো যেন ঘোলাটে।
দরজা ঠেলে দেখলেন দরজাটা বাইরে থেকে আটকানো।
অতৃপ্ত পেট নিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে কিছু খোঁজার উপায়টুকুও নেই আজ।
এই নিঃসঙ্গ ঘরটাই যেন তার সারা দুনিয়া হয়ে গেছে।
এদিকে শ্বশুরবাড়ি মধুর হাড়ি, নাহিদের ক্ষেত্রেও যেন সেই কথার রেশই সত্যি হয়ে ফুটে উঠলো।
সামিরা বেগম নিজ হাতে রেঁধে বেড়ে খাওয়াচ্ছেন জামাইকে,
বারবার পাতে বাড়িয়ে দিচ্ছেন এইটা-সেইটা।
তানিয়া আর তাহসানের মুখে হাসি লেগেই আছে প্রভূত আদর আর স্নেহে।
সামিরা বেগম নিজ হাতে নাতি নাতনিকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন।
নিশি আয়েসি ভঙ্গিতে চেয়ারে ঠেস দিয়ে বসে বললো,
-আজ নিজেকে যেন রাজরানী মনে হচ্ছে! দেখছো তো, বাবার বাড়িতে মেয়েদের কদর কত!
তোমার সন্তানরাও এখানে এসে কতটা খুশি!
এটাই তো মা আর শাশুড়ির ফারাক, বাচ্চারাও বুঝতে পারে, কে সত্যিই তাদের ভালোবাসে আর কে নয়!
নাহিদ মুখ নিচু করে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বললো,
-যে নিজেকে সামলানোর বয়সটাই ভুলে বসে আছে, সে আবার নাতি-নাতনিকে সামলাবে?
বাক্যগুলো যেন শলাকার মতো নাহিদের বুকে বিঁধে যায়।
কিন্তু যার জন্য এই কষ্ট, তার মা এখন একা পড়ে আছেন অন্ধকার ঘরে।
দুই ভিন্ন বাড়ির দুই ভিন্ন দুপুর কেউ তৃপ্তিতে মুখ ভেজায়, আর কেউ নিঃসঙ্গতায় ক্ষুধা লুকিয়ে রাখে।
❝আপনারা যারা গল্প পড়েন প্রত্যেকে রেসপন্স করুন।❞
চলবে,,,,
