||৬||
#তোমার_অস্তিত্ব
#মুসলিমা_ইসলাম
ইমনদের বাড়ি থেকে মহুয়াদের বাড়ি বেশি দূর না গাড়িতে গেলে ঘন্টা খানেক সময় লাগে,মহুয়া এসেই তার দাদির কাছে ছুটে গেলো জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে।সুফিয়া তখন কাজ করছিলো সে খবর পেয়েছে তার ছেলেরা আসছে তাই সব কিছু গুছিয়ে রাখছে।হুট করে জড়িয়ে ধরাতে ভরকে গেছিলো।
“এতদিন পর মনে পড়লো এই বুড়ি টাকে? ভুলেই তো গেছিলি।”
“কি যে বলো দাদি, তুমি আমার জান, তোমাকে ভুলবো কিভাবে তোমাকে অনেক অনেক মিস করছি।”
“ছাড়, ছাড় এমন করে কেউ ধরে, একি দাদা ভাই তুমি দাঁড়িয়ে কেনো এসো বসো।” ইমন যেয়ে বসে পড়লো পাশে চৌকিতে।মহুয়ার জন্য আলাদা রুম ছিল সেখানে যেয়ে দেখলো সব কিছু সুন্দর করে গুছানো। সব পাল্টে বাহিরে চলে আসলো ইমন উঠে পড়লো মহুয়ার কাছে এসে বললো__
“আমি একটু দোকানের দিকে যাচ্ছি, তুমি সাবধানে থেকো”এখানে আগেও আসছে তাই সব কিছু তার চিনা জানা। সমস্যা হলোনা।
দাদি সব কিছু এত গুছানো কেনো কেউ আসবে নাকি? সুফিয়ার কাছে যেয়ে বললো মহুয়া
তোর বড় চাচা আর মেজো চাচা আসছে, সাথে তাদের ছেলে মেয়েরা। খবর পেয়ে একটু গুছিয়ে রাখলাম যতই হোক শহরে মানুষ। মহুয়ার একটু রাগ হলো এতদিন পর কেনো আসছে? এতদিন তো কোনো খোঁজ নেইনি।দাদিকে আবার ওরা কি নিয়ে যাবে মহুয়ার আপন বলতে তো তার দাদি সে যদি চলে যায় কার কাছে আসবে সে? পরে মনকে একটু বুঝালো একা মানুষ নিয়ে গেলে ভালোই হবে।
“কি রে, কি ভাবছিস রাগ করছিস নাকি এতদিন খোঁজ খবর না নিয়ে এখন আসছে।”
“না দাদি, তাদের বাড়ি তারা তো আসবে আমি রাগ করতে যাবো কেনো।”
“বুঝতে পারছি কষ্ট পাচ্ছিস,এখন বল ও বাড়ির মানুষ কেমন ভালো আছিস তো।”
“হুম দাদি উনারা খুব ভালো।”
“আলহামদুলিল্লাহ, শুনে মনে শান্তি পেলাম।”এমন সুখে থাকিস দোয়া করি।কিছু সময় পর ইমন বাজার করে নিয়ে আসছে হাত ভর্তি করে।
“মহুয়া এগুলা ধরো।”
“এত বাজার করতে গেলেন কেনো? এটার কি দরকার ছিল।”
দাদা ভাই এসব করতে গেলে কেনো আসছো কষ্ট করে এখন আবার বাজার করে নিয়ে আসলে, মহুয়া পানি এনে দে যা।
“তার প্রোয়জন নেই দাদি, শীতে ভালোই লাগছে” দেখুন বাজার পছন্দ হয় কিনা, আজ কিন্তু আপনার হাতের রান্না খাবো।
সুফিয়া হেঁসে বললো “আচ্ছা বাপু” আমিই রান্না করে খাওয়াবো এখন একটু বিশ্রাম নেও যাও ঘরে যাও। ইমন চলে যেতেই তার দাদি মহুয়াকেও যেতে বললো কিন্তু মহুয়া এখন যাবেনা কতদিন পর আসছে দাদির সাথে কাজে সাহায্য করতে চাইলো।
“আমি পারবো, তুই জামাইয়ের কাছে যা দেখ কিছু লাগবে কিনা।” মহুয়া কিছুতেই গেলো না বাজার গুলা রান্না ঘরে নিয়ে সব বের করলো,, আলু, পেয়াজ, রসুন, প্রোয়জনিই সব কিছুই আনছে সাথে বড় রুই মাছ, পাঙ্গাস মাছ আর দেশি মুরগি।
“এত সব আনতে গেলো কেনো ছেলেটা, তুই বলছিস তাইনা।”
“না দাদি আমি এসব কিছুই বলিনি। কিন্তু আসার সময় শাশুড়ি তাকে ডেকে যেনো কিসব বলছিল।” সুফিয়া আর শুনলো না সে বুঝে গেলো, এটাও বুঝলো মহুয়ার শাশুড়ি কতটা ভালো মনের,এমন শাশুড়ি এখন দেখা যায় না। মেয়েটা সুখি হোক মনে মনে আরো দোয়া করলো আল্লাহর কাছে।
___________
আরিয়ানদের গাড়ি এসে থামতেই এক এক করে সবাই বের হয়ে আসলো, এত সময় বসে থেকে সবার মাজা পিঠ ব্যাথা হয়ে গেছে সেই ভোর বেলায় গাড়িতে উঠছে এখন আসরের আযান শেষ কিছু খাওয়া প্রোয়জন পাশে হোটেল থেকে সবাই খেয়ে হাটতে লাগলো দশ মিনিটের মতো হাটলেই তাদের বাড়ি।মালিহা বিরক্ত হয়ে আছে মুখে কিছু বলতেও পারছে না, সবাই চুপচাপ হাটছে সবার আগে ইকরাম আর আকরাম দুই ভাই অনেকদিন পর গ্ৰামে তাদের মন জুড়িয়ে যাচ্ছে।
“গ্ৰামের পরিবেশ তো আগের থেকে ভালো হয়েছে” ইকরাম বড় ভাইয়ের কথা শুনে সেও বললো
“ঠিক বলেছো ভাই, উন্নত ও হয়েছে, আগে তো কতদূরে যেতে হতো ভালো খাবার খেতে এখন আমাদের বাজারেও পাওয়া যায়।” দুই ভাই কথা বলতে বলতে হাটতে লাগলো। তানিয়া আর পারছে না একটু পর পর দাড়িয়ে যাচ্ছে।
“কি হলো আম্মু তুমি হাটছো না কেনো”
“আর পারছি না রে, আরিয়ান বাবা আর কত দূর।”
“বেশি নেই মেঝো চাচি, এই তো আর একটু।” মালিহা বিরক্ত নিয়ে একবার স্বামী আরেকবার নিজের ছেলের দিকে তাকাচ্ছে। কয়টা বেশি কথা শুনাতে ইচ্ছা করছে কিন্তু পারছে না।
কিছু সময় পর সবাই একসাথে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো, মহুয়া তখন দাদির মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছিল তাদের দেখতেই উঠে নিজের রুমে চলে গেলো, ইমন একটু আগে বাহিরে গেলো সুফিয়া অনেকদিন পর সবাইকে দেখে খুশিতে কান্না করে দিলো, আকরাম, ইকরাম যেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলো।
“কেমন আছো মা”
“আমার ছেলেরা এসেছে, আমি কি আর খারাপ থাকতে পারি” মালিহার এসব সয্য হচ্ছে না। সবাই এক এক করে সুফিয়ার সাথে কুশল বিনিময় করলো সুফিয়া খেয়াল করলো তার বড় দাদু ভাই দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
“দাদু ভাই দাঁড়িয়ে আছো কেনো কাছে আসো।”
আরিয়ান মূলত তাকিয়ে ছিল মহুয়ার যাওয়ার দিকে তারা আসতেই রুমের ভিতর চলে গেলো? একটু সবার সাথে কথা বললো না। সে একটু দেখতেও পেলো না। দাঁড়িয়ে না থেকে ভিতরে চলে আসলো। বাড়িটা মহুয়ার দাদা থাকতে বানানো ছিলো ইটের তৈরী দেয়াল অনেক জায়গায় ফাঁটল ধরছে।রুমের ভিতর থেকে মহুয়া সব কিছুই দেখছে তার এখন মা বাবার কথা খুব মনে পড়ছে সবাই সবার মা বাবার সাথে শুধু তার নেই? নিজেকে খুব অসহায় লাগলো। মাথায় ঘোমটা টেনে বাহিরে আসলো।
“আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন সবাই।”
সালামের জবাব দিয়ে সবাই তাকিয়ে পড়লো মহুয়ার দিকে আরিয়ান অবাক চোখে তাকিয়ে আছে মহুয়ার দিকে, নাকে নাকফুল, হাতে বালা, কানে দুল এসব কেনো? এসব তো বিয়ে হলে মেয়েরা পড়ে থাকে, মহুয়া কেনো পড়ছে তবে কি?.. না না এটা তো হওয়ার কথা ছিল না। আগে সত্যি টা জেনে নিক, নিজেকে শান্ত করলো।
“এমন সং সেজে আছিস কেনো? বউদের মতো বিয়ের করার এতো শখ তোর।” বলে উঠলো মালিহা পাশ থেকে তানিয়াও বলে উঠলো
“হ্যাঁ রে মহুয়া তুই এমন বউদের মতো নাক ফুল, চুড়ি, এসব পড়ে আছিস কেনো? মাথায় আবার ঘোমটাও।”
“এই মেয়ে তো ছোট থেকে এমন সাজসজ্জা, এখনো দেখো কেমন সেঁজে আছে, খুলে ফেল এগুলো যার বাপ নেই মা নেই তাকে কে বিয়ে করবে?”” বলেই হেঁসে উঠলো মালিহা।
“তুমি চুপ করবে মালিহা আসতে না আসতেই শুরু করে দিলে।” মা যহুয়াকে কি বিয়ে দিয়ে দিছো? আকরাম প্রশ্ন টা করলো। সুফিয়া এত সময় চুপ করে ছিল এবার আর চুপ থাকলো না।
“হ্যাঁ, মহুয়ার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ”
কথাটা তিঁরের মতো বিধলো আরিয়ানের বুকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকলো তার দাদির দিকে, সে তো বলছিল তাহলে? এমনটা হতে পারেনা।
“দাদি তুমি যে….”
“ওখানেই থেমে যাও দাদু ভাই, এই কথা দ্বিতীয়বার তোমার মুখ থেকে শুনতে চাইনা।” আর আসছো সবাই যাও বিশ্রাম নেও এই বিষয়ে পরে কথা হবে। যে যার মতো চলে গেলো তাবাস্সুম কে নিয়ে গেলো মহুয়ার রুমে। আকরাম আর ইকরামের আলাদা রুম ছিল, মহুয়াদের মা বাবার রুমে আরিয়ানকে দিলো।রাতের ব্যবস্থা করা যাবে। সুফিয়া রান্না ঘরে চলে আসলো রাতের জন্য রান্না করতে হবে আসার সময় আরিয়ানও বাজার করে আনছে। বড় রুই মাছ আর মুরগি দুপুরে রান্না করছিল কিছু থেকে গেছে বাকি কিছু রান্নার জন্য কাটতে লাগলো।
“তোমার মা এটা কি করলো আমাদের না জানিয়ে মহুয়াকে বিয়ে দিয়ে দিলো? একটু প্রোয়জন মনে করলো না।”
“খোঁজ নিয়েছিলে কোনোদিন যে বলবে? আর ভালোই তো করেছে ভালো পাএ পেয়েছে দিয়ে দিয়েছে তোমার সমস্যা কিসে।”
“আমার আবার কিসের সমস্যা বললাম আর কি।” মালিহা বলেই চুপ হয়ে গেলো এই মেয়েকে তার সয্য হয়না।
আরিয়ান ক্লান্ত শরীর নিয়ে বসে আছে মাথা নিচু করে তার কিছুতেই মন মানছে না মহুয়ার বিয়ে হয়েছে এটা সে মানতে পারছে না। সব এলোমেলো লাগছে তার কাছে।এই মেয়ের জন্য কোনো মেয়েকে সে তার জীবনে আসতে দেইনি কিন্তু আজ তার অস্তিত্ব নিয়ে আরেকজন, না আর ভাবতে পারছে না।
““তুমি আমার না হলেও অন্যের কেনো হলে? তোমার অস্তিত্ব কি আমার হতে পারতো না? এ কেমন যন্ত্রনা মহুয়া, তুমি কি বুঝবে? তুমি অন্য কারো মানতেই যে কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে।””
ইমন বাসার সামনে আসতেই চোখে পড়লো বাড়ির ভিতরে বেশ মানুষের ভীর সে ভিতরে ঢুকেই ডাকতে লাগলো..
“মহুয়া, মহুয়া..।”
মহুয়া রান্না ঘরে ছিল ডাক শুনতেই বাহিরে চলে আসলো।
“এতো মানুষ,কারা এসেছে মহুয়া।”
“বড় চাচা,মেজো চাচা আসছে সাথে তাদের বউ বাচ্চা।”
“ওহ, এতদিন পর হঠাৎ? না আসলে আমার জানা মতে তারা তো তোমাদের খোঁজ নিতো না।”
“আমিও জানিনা” আপনি রুমে চলুন। ইমনের সাথে মহুয়াও চলে গেলো।
মা তুমি কি এটা ঠিক করছো, এভাবে হুট করে মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দিছো আমাদের একটু জানাতে পারতে। বললো মহুয়ার মেজো চাচা।
তোদের কি বলবো তোরা খোঁজ নিয়েছিস কোনোদিন, মেয়েটার মা মরার পর বাপ দেখে শুনে রাখতো আমাকেও দেখতো, তোরা সুযোগ বুঝে চলে গেলি ভাই মরার পর মাটি দিয়ে আবারো চলে গেলি এই মায়ের দিকেও তাকাস নি কারন ভাইয়ের মেয়ের দায়িত্বও নিতে হবে এই জন্য। ছেলে ভালো মেয়েও সুখে আছে এর চেয়ে আর কি চাই।
ইকরাম আর কোনো কথা বলতে পারলো না কি বা বলবে তার বলারও কিছু নেই তারা ভুল করছে এখন ভালোই বুঝতে পারলো।সবাই ক্লান্ত থাকার কারনে রাতের খাবার দ্রুত খেয়েই শুয়ে পড়লো আরো শীতের রাত গ্ৰামে ঠান্ডা প্রচুর।আরিয়ানের সাথে নাঈমকে শুতে দেওয়া হয়েছে, সুফিয়ার সাথে তাবাস্সুমকে।
“কাল বাসায় যেতে চাচ্ছিলাম তুমি কি যাবে?”
মহুয়া কথাটা শুনে একটুও খুশি হলোনা, সে আর কিছুদিন থাকতে চাই।
“কালকের দিনটা থেকে যায়? আম্মা কি যেতে বলেছে।”
“না, আমারি ভালো লাগছে না।” দাদিকে সাথে করে নিয়ে যাবো ভাবছিলাম কিন্তু এখন তো সেটা হবেনা।
আরিয়ান এই শীতের ভিতরেও বাহিরে দাড়িয়ে আছে, চোখ তার দূরে বহু দূরে তার কোনো সিমানা নেই। কুয়াশায় অন্ধকার হয়ে আছে চারিপাশ ঠিক তেমনি আরিয়ানের মনের ভিতরেও, কত আশা নিয়ে এসেছিল সে গ্ৰামে, দাদির কাছে চাইবে, জানিয়ে দিবে তার মনের ইচ্ছে চেয়ে নিবে তার ছোট চাচির রেখে যাওয়া সম্বল। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেলো সব।হঠাৎ কিছুর শব্দ পেতেই আরিয়ান ঘুরে যা দেখলো সেটা দেখার জন্য সে একটুও প্রস্তুত ছিল না।
#চলবে?
