#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা(ফ্যান্টাসি রোমান্স)
#শারমিন_প্রিয়া
৮.
মেয়ের ভাবভঙ্গি ভালো ঠেকছে না রুদ্রাণীর। মেয়ে একা একা হাসে, একা একা কথা বলে। কলেজ থেকে ফিরে রুমে শুয়ে থাকে। দু-তিন দিন ধরে এটা লক্ষ্য করছেন রুদ্রাণী। মা হিসেবে এই পরিবর্তন চোখ এড়ায় না তার। মেয়েদের এই বয়সে মন অন্যদিকে ঝুঁকে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। রুদ্রাণীর সবার প্রথমে মাথায় এসেছে প্রেমের কথা। এই বয়সে মেয়েরা প্রেমে মজে। আরশীর বেলায়ও হয়তো তাই হয়েছে।ে
রুদ্রাণী বিকেলবেলা মেয়ের রুমে গিয়ে জিজ্ঞেস করেই বসলেন,
— তুমি অনেক পাল্টে গেছো আরশী। তোমার সবকিছু কেমন যেন। আমি যদি ভুল না হই তুমি প্রেমে পড়েছো।
আরশী চমকে উঠলো। মনে মনে ভাবলো— মা কেমনে বুঝলেন!
সে মাথা নাড়ালো,
— না, ওরকম কিছু না।
— তুমি লুকাচ্ছো আরশী। আমাকে বলতে পারো। আমি ভালো সাজেশন দেবো তোমাকে।
আরশী ‘না না’ বলে বলেই ফেলল আরহামের সাথে ঘটে যাওয়া সব কথা।
সব শুনে রুদ্রাণী কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকেন। তারপর মুখে কোমল হাসি ফুটিয়ে বলেন—
— ছেলেটা নিশ্চয়ই ভালো, নয়তো বিয়ের প্রস্তাব দিতো না। তারা আসুক। আমি কথা বলব। সব ভালো ঠেকলে আমি বিয়ে দিয়েই দেবো।
— আমাকে বিয়ে দিলে তুমি কী করে থাকবে মা?
রুদ্রাণী মেয়ের মাথায় হাত রাখেন। মমতায় চোখ ভিজে উঠে তার।
— মেয়েরা ঘরে রাখার জিনিস নয়। আমি যেভাবে আছি এভাবেই থাকব।
বিয়ের বিষয়ে মায়ের থেকে পজিটিভ কথা শুনে আরশীর মনে মনে রঙিন প্রজাপতি উড়তে লাগলো।
সকাল এগারোটা। কায়ান রাত্রেশের প্রাসাদ নিরিবিলি চুপচাপ। বাইরে বড় উঠোনে বেলিফুল গাছ থেকে তীব্র সুগন্ধ ভেসে আসছে। বিলের ধার থেকে আসা মৃদু বাতাসে বাড়ির বড় বড় নারকেল গাছের পাতা নড়ছে। এক অদ্ভুত সুন্দর আলো-ছায়া বিরাজ করছে কায়ানের নতুন প্রাসাদে।
কায়ান, রাভান, দ্রোহান গুহায় আছে। পাশে লাল মশাল জ্বলছে। কায়ান সবাইকে আদেশ করলো—
— উপরে এসো। রেডি হতে হবে। সিলথারা, দ্রোভানা, তোমরাও রেডি হও। সবার জামাকাপড় গতকাল শপিং করে নিয়ে এসেছি।
কায়ান আজ পরেছে সাদা শার্ট আর কালো ব্লেজার। চুল সুন্দর করে সেট করেছে। হাতে পরেছে কালো ঘড়ি। বের হওয়ার আগে আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নেয় কায়ান।
সিলথারা কায়ানকে দেখে মুগ্ধ হয়ে বলে,
— আপনার মানবরূপ এত সুন্দর সর্দার! মানুষ মেয়েরা তো পাগল হয়ে উঠবে।
কায়ান গায়ে বডি স্প্রে দিতে দিতে বলে, আমার আরশী আমার জন্য পাগল হলেই যথেষ্ট। আর কাউকে লাগবে না।
সিলথারা নীল শাড়ি পরে। রাভান-দ্রোহানও ইন করে স্যুট পরে। সবাইকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। তারা প্রাইভেট গাড়িতে উঠে। যেতে যেতে দ্রোহান বলল— তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে সর্দার, বেশিক্ষণ মানুষ হয়ে থাকতে পারব না।
— অবশ্যই। আর শোন, খাবার দেখলে আমাদের ভেতরের রাক্ষস জেগে উঠবে, সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সব খাওয়া যাবে না।
— নিজেকে সামলাতে অসম্ভব হবে সর্দার।
— সম্ভব। আমার কথার অমান্য হলে ছাড়ব না কাউকে।
রাভান এতক্ষণ চুপ ছিলো, এবার বলল— হেমন্তকে নিয়ে যে তোলপাড় হচ্ছে সর্দার। আরশী আর আপনাকে সবাই সন্দেহ করছে। আপনি তো মানবরূপে থাকেন। ধরা খাওয়ার চান্স আছে নাকি?
— কেউ ধরতে পারবে না। হেমন্তকে নিয়ে আসতে বা খেতে কেউ তো দেখেনি। আর দেখলেই বা কী? আমাদের কি কাউকে ভয় পাওয়ার কথা?
— না সর্দার।
— এখন ওসব বাদ। সব ফোকাস থাকবে আরশীকে নিয়ে। কোনভাবে রুদ্রাণীর যেন সন্দেহ না হয়। আর মনে রেখো— দ্রোহান আমার বন্ধু, ভাইয়ের সমান; সিলথারা বোন, তার স্বামী রাভান। আর দ্রাভিনা বোন— সে বাইরে পড়ালেখা করে। আমাদের মা-বাবা এক্সিডেন্টে মারা গেছেন অনেক আগে। আমাদের আসল বাড়ি অন্য শহরে। এখানে প্রাসাদটা কিনে সিফট হয়েছি। আর হে, অবশ্যই নিজেদের নতুন নামগুলো বলবে। কোন ভুল যেন না হয়। সবার মনে থাকবে?
সবাই একসাথে বলল, জি সর্দার। সব মনে থাকবে।
কায়ানরা বাজারে গিয়ে মিষ্টি-দই কিনলো। আধঘণ্টা পর কায়ানরা আরশীর বাসায় পৌঁছালো। আরশী জানলা ফাঁক করে দেখলো সবাইকে। আরহামকে দেখে পাগল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা তার। এত কিউট লাগছে যে, এই প্রথম তার ইচ্ছে করছে লাফ দিয়ে আরহামের কোলে উঠে চুমুতে ভরিয়ে দিতে।
রুদ্রাণী বের হয়ে হাসিমুখে গ্রহণ করলেন সবাইকে। তারপর বসতে দিলেন। আরশীকে গিয়ে একবার দেখে নিলেন। একটু আগে লাল শাড়ি পরে সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছেন তিনি আরশীকে।
— তুমি আসো আরশী। নাস্তাগুলো তুমি নিয়ে যাবে তাদের সামনে।
— আমি একা যাব মা?
— আমিও যাব। নার্ভাস হয়ে পড়ো না।
আরশী শাড়ির আঁচল এক হাতে ধরে, সাথে নাস্তার ট্রে নিয়ে কায়ানদের সামনে যায়। আরশীকে দেখে কায়ান হাবলার মতো তাকিয়ে থাকে। লাল শাড়িতে যেন লাল পরী লাগছে আরশীকে। কায়ান কিছুতেই বুঝতে পারে না— এই মানবী আরশীকে তার চোখে এত সুন্দর লাগে কেন!
আরশী মাথা নিচু করে বসে। রুদ্রাণী সবার হাতে হাতে নাশতা দিচ্ছেন। কায়ান চোখ সরিয়ে আসল কথায় আসে। রুদ্রাণীকে উদ্দেশ্য করে বলে—
— আমি আরহাম। আমার গার্ডিয়ান বলতে আমিই। আপনার কাছে সরাসরি প্রস্তাব দিচ্ছি— আপনার মেয়েকে আমার মহারাণী বানিয়ে নিয়ে যেতে চাই। আপনি দয়া করে মত দিন। এরা আমার সব। আমার ভাই-বোন। আপনার মেয়ে আমার জীবনসঙ্গী হলে আমি কথা দিচ্ছি, আপনার মেয়ের গায়ে একটুও আঁচ লাগতে দেবো না। এত যত্নে রাখব। বোন ভার্সিটিতে পড়ে, সে চলে যাবে, আরেক বোন শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে। বন্ধুটা ভাইয়ের মতো। সে মাঝেমাঝে আমার সাথে থাকে। পরিবারে মানুষ নেই, বিয়ে হলে শুধু আমি আর আরশী থাকব। চাইলে আপনিও সাথে থাকতে পারবেন।
আরও অনেক কথা বলল কায়ান।
প্রথমত আরহাম উরফে কায়ানকে দেখেই রুদ্রাণীর পছন্দ হয়ে যায়। তারপর তার মুখের ভদ্রতা, সম্মান আর দায়িত্বশীল কথা শুনে মন পুরোটা জিতে নিয়েছে রুদ্রাণীর। তিনি একদিন সময় নেন, সব যাচাই করার জন্য। আরহামের বাড়িঘর দেখার জন্য।
ঠিক পরের দিনই রুদ্রাণী একা আরহামের বাড়ি গিয়ে দেখে আসেন। তাদের আপ্যায়নে তিনি মুগ্ধ হন। এত বড় বাড়ি সব আরশীর হবে— এই ভেবেই তিনি আনন্দ পান। রাক্ষস কায়ান না জানি কখন তার মেয়ের ক্ষতি করে বসে— এইজন্য আরহামের সাথে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে চান রুদ্রাণী। তিনি একা আর কতদিন সামাল দেবেন! আরহাম রুদ্রাণীর অনুমতি নিয়ে সামনের সপ্তাহেই বিয়ের তারিখ ফেলে।
আরশী কলেজ যাওয়া একটু কমিয়ে দিলো বিয়ের জন্য। মায়ের জমানো টাকা থেকে মা-মেয়ে ইচ্ছেমতো শপিং করল। রুদ্রাণী বললেন আরশীকে, তোমার যা যা শখ সব বলবে। আমার সাধ্যের মধ্যে সব দেবো।
আরহাম বিয়ের এক গাদা শপিং করে আগেরদিন দ্রোহানকে দিয়ে আরশীর বাড়িতে পৌঁছে দিলো।
আরশীর মা যতটুকু পারেন বাসাটা সাজালেন। তাদের তো আত্মীয় নেই, তাই পাশের বিল্ডিংয়ের সবাইকে দাওয়াত করলেন। সবাই আসছে, কথা বলছে, আড্ডা দিচ্ছে— সবমিলিয়ে একটা বিয়ে-বিয়ে আমেজ তৈরি হলো।
আরশী রুমে বসে আছে। তার এখনও বিশ্বাসই হচ্ছে না, আরহাম-তার পছন্দের মানুষ, তাকে বিয়ে করছে। হুট করে এক রাজপুত্র এসে মন জয় করলো, তাকে জয় করলো, অবশেষে বউ বানিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সব যেন স্বপ্নের মতো হলো, হচ্ছে।
আরশী মিটিমিটি হেসে বেলকনিতে যায়। বিকেলের আকাশ তার খুব ভালো লাগে। দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ করে চোখ বন্ধ করে মৃদু স্বরে বলে— উপরওয়ালা, আরহামের সাথে যেন কখনও আমার বিচ্ছেদ না হয়। মানুষটাকে আজন্ম আমার করে রেখো।
একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে চোখ খুলতেই দেখে— গেট দিয়ে আজ পাশের বাসার অনেক মানুষজন আসছে। আরশী তাদের মধ্যে দেখতে পেলো সেই পাগলটাকে এক কোণায় দাঁড়িয়ে। তার বুক ধক করে উঠল। পাগলটা তার দিকে তাকাচ্ছে না— বাড়িটার দিকে তাকাচ্ছে।
আরশী আর দেরি না করে দৌড়ে নিচে নামে। গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় পাগলটার সামনে। ভালো করে দেখে পাগলটাকে।
– হে, ওই লোকটাই তো!
আরশী হাঁপাতে হাঁপাতে বলে—
তুমি এখানে কীভাবে আসলে?
পাগলটা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আরশীর দিকে।
আরশী হাত নাড়িয়ে বলে—
বলো না তুমি এখানে কীভাবে?
এবার লোকটা হকচকিয়ে উঠে—
— আরে লাবনী তুই? তুই এখানে কেমনে?
— এ প্রশ্ন তো আমারই। তুমি এখানে কেমনে?
পাগলটা হালকা হাসলো—
আমি তো সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াই। এখানে-ওখানে… যেদিকে মন টানে।
— তুমি মিথ্যা বলছো? আচ্ছা তুমি সত্যি পাগল তো? নাকি আমাদের পিছু নিয়েছো? কোন মতলব আছে? বলছো না কেন? আমি কিন্তু পুলিশে দেবো তোমাকে!
কন্ঠে কঠোরতা এল আরশীর।
পাগলটা কিছু না বলে নির্বাক তাকিয়ে থাকে। ধীরে ধীরে তার চোখে পানি জমে। একফোঁটা পানি গাল বেয়ে পড়ে। আরশী স্তব্ধ হলো, দুঃখ লাগলো তার।
— আরেঃ কাঁদছো কেন? ইশ, কেঁদো না। আমি এমনি বলেছি। তুমি পাগল মানুষ, তুমি কারই বা ক্ষতি করবে! আসলে তোমার এ জায়গায় হঠাৎ চলে আসাটা আমার সন্দেহ লাগছিল। ভয় পেয়েছিলাম। এসব বাদ দাও। ভালোই হয়েছে তুমি এসেছো। আমার কাল বিয়ে। আমার বিয়ে খেতে পারবে।
— কি কস লাবনী? তোর বিয়ে?
— হাঁ। সুন্দর একটা ছেলের সাথে। সে অনেক সুন্দর। তুমি দেখলে বুঝবে।
— ছেলে কি করে?
— তার বাবার বড় বিজনেস আছে শহরে। সে তাই দেখাশোনা করে। অনেক টাকাপয়সা। মানুষ দিয়ে কাজ করায়।
— বাহ, বিশাল ব্যাপার তো লাবনী!
— হাঁ। কাল অবশ্যই এসে খেয়ে যেও। আর দোয়া করো। এখন খেয়েছো?
— এক দোকানে পাউরুটি দিয়েছিলো, তাই খেয়েছি।
— ইশ, পাউরুটি খেলে পেট ভরে নাকি! আসো আমার সাথে। মা মাংস রান্না করেছেন। তোমাকে খেতে দেব।
পাগলটা আরশীর পেছনে পেছনে আসে আর মলিন হেসে মনে মনে বলে—
এত নরম আর সহজ সরল মনের মেয়ে তুমি। তোমার সাথে আর খারাপ কিছু না হোক।
চলমান……!
